বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের চারপাশের জগৎ সর্বদা পরিবর্তনশীল। প্রতিদিন আমরা আমাদের চারপাশে এমন অনেক পরিবর্তনের মুখোমুখি হই, যা কখনও অস্থায়ী হয় আবার কখনও স্থায়ী। রসায়ন বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিবর্তনগুলিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—ভৌত পরিবর্তন (Physical Change) এবং রাসায়নিক পরিবর্তন (Chemical Change)। যখন কোনো পদার্থে এমন পরিবর্তন ঘটে যার ফলে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট এক বা একাধিক নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয়, তখন তাকে রাসায়নিক পরিবর্তন বা রাসায়নিক বিক্রিয়া (Chemical Reaction) বলা হয়।

এনসিইআরটি (NCERT) দশম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যসূচির প্রথম অধ্যায়—'রাসায়নিক বিক্রিয়া ও সমীকরণ' আমাদের রসায়নের এই জাদুকরী জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই অধ্যায়টি পড়লে আমরা জানতে পারি কীভাবে লোহায় মরচে পড়ে, আমাদের শরীরে খাদ্য কীভাবে হজম হয়, কেন পাকা ফল মিষ্টি হয়ে যায় কিংবা কীভাবে একটি মোমবাতি জ্বলে ওঠে। এই সমস্ত প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম প্রক্রিয়ার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মূল নিয়মাবলি। এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা এই অধ্যায়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় আলোচনা করব, যা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভালো ফল করতে এবং বিজ্ঞানের এই মৌলিক ধারণাটি গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. রাসায়নিক বিক্রিয়া কী এবং কীভাবে এটি সনাক্ত করা যায়?

সহজ কথায়, যে প্রক্রিয়ায় এক বা একাধিক পদার্থ নিজেদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নতুন পদার্থে রূপান্তরিত হয়, তাকেই রাসায়নিক বিক্রিয়া বলে। বিক্রিয়ার শুরুতে যে পদার্থগুলি অংশগ্রহণ করে, সেগুলিকে বিক্রিয়ক (Reactants) বলা হয় এবং বিক্রিয়ার ফলে যে নতুন পদার্থ উৎপন্ন হয়, সেটিকে বিক্রিয়াজাত পদার্থ (Products) বলা হয়।

বাস্তব জীবনে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটেছে কিনা তা বোঝার জন্য আমাদের কিছু নির্দিষ্ট বাহ্যিক পরিবর্তন লক্ষ্য করতে হয়। এই বৈশিষ্ট্য বা সূচকগুলি নিম্নরূপ:

  • অবস্থার পরিবর্তন (Change in State): অনেক সময় বিক্রিয়ক এবং বিক্রিয়াজাত পদার্থের ভৌত অবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা হয়। যেমন হাইড্রোজেন গ্যাস ও অক্সিজেন গ্যাস বিক্রিয়া করে তরল জল উৎপন্ন করে।
  • বর্ণের পরিবর্তন (Change in Color): বিক্রিয়ার ফলে মূল পদার্থের রঙের পরিবর্তন ঘটতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, লোহার চামচকে কপার সালফেট দ্রবণে ডুবিয়ে রাখলে নীল রঙের দ্রবণটি হালকা সবুজ হয়ে যায়।
  • গ্যাসের নির্গমন (Evolution of a Gas): বহু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় গ্যাস উৎপন্ন হতে দেখা যায়। যেমন জিংকের টুকরোর সাথে লঘু সালফিউরিক অ্যাসিডের বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন গ্যাস নির্গত হয়।
  • উষ্ণতার পরিবর্তন (Change in Temperature): বিক্রিয়ার ফলে পাত্রের তাপমাত্রা বাড়তে বা কমতে পারে। পোড়াচুনে জল ঢাললে প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন হয় এবং পাত্রটি গরম হয়ে ওঠে। এটি একটি তাপমোচী বিক্রিয়ার উদাহরণ।
  • অধক্ষেপণ সৃষ্টি (Formation of a Precipitate): দুটি তরল বা দ্রবণের বিক্রিয়ায় কখনো কখনো একটি অদ্রবণীয় কঠিন পদার্থের সৃষ্টি হয় যা পাত্রের নিচে থিতিয়ে পড়ে। একে অধক্ষেপ বলে।

২. রাসায়নিক সমীকরণ এবং এর লেখার নিয়ম

কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়াকে শব্দ বা প্রতীকের সাহায্যে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করার পদ্ধতিকেই রাসায়নিক সমীকরণ (Chemical Equation) বলে। উদাহরণস্বরূপ:

শব্দ সমীকরণ: ম্যাগনেসিয়াম + অক্সিজেন → ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড

এই সমীকরণটিকে যখন আমরা রাসায়নিক সংকেত বা চিহ্নের সাহায্যে লিখি, তখন তা দাঁড়ায়:

Mg + O₂ → MgO

রাসায়নিক সমীকরণ লেখার সময় বাম দিকে বিক্রিয়ক পদার্থগুলিকে যোগ চিহ্ন (+) সহ লেখা হয় এবং ডান দিকে বিক্রিয়াজাত পদার্থগুলিকে যোগ চিহ্ন সহ লেখা হয়। এদের মাঝখানে একটি তীর চিহ্ন (→) দেওয়া হয়, যা বিক্রিয়ার অভিমুখ নির্দেশ করে।

৩. রাসায়নিক সমীকরণের সমতাবিধান (Balancing Chemical Equations)

রাসায়নিক সমীকরণের সমতাবিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। এর মূল ভিত্তি হলো ফরাসি রসায়নবিদ ল্যাভয়সিয়ে-এর দেওয়া ভরের নিত্যতা সূত্র (Law of Conservation of Mass)। এই সূত্র অনুযায়ী—"যেকোনো ভৌত বা রাসায়নিক পরিবর্তনে পদার্থের মোট ভরের কোনো সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না।" অর্থাৎ, রাসায়নিক বিক্রিয়ার পূর্বে বিক্রিয়কগুলির মোট ভর এবং বিক্রিয়ার পরে উৎপন্ন বিক্রিয়াজাত পদার্থগুলির মোট ভর সমান থাকে।

তাই একটি সমতাবিধানযুক্ত সমীকরণে সমীকরণের উভয় পাশে প্রতিটি মৌলের পরমাণুর সংখ্যা সমান হতে হবে। যে সমীকরণে দুপাশের পরমাণু সংখ্যা সমান থাকে না, তাকে অসমতাযুক্ত বা কঙ্কাল সমীকরণ (Skeletal Equation) বলে।

সমতাবিধানের পদ্ধতি (Hit and Trial Method):

আসুন আমরা একটি উদাহরণের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজে সমতাবিধান করা শিখি। লোহা এবং স্টিমের (জলীয় বাষ্প) বিক্রিয়ার সমীকরণটি নিচে দেওয়া হলো:

Fe + H₂O → Fe₃O₄ + H₂

  • ধাপ ১: প্রথমে সমীকরণের প্রতিটি সংকেতের চারপাশে একটি করে বাক্স তৈরি করুন। মনে রাখবেন, সমতাবিধানের সময় বাক্সের ভেতরের কোনো সংকেত পরিবর্তন করা যাবে না।
  • ধাপ ২: সমীকরণের উভয় পাশে বিভিন্ন মৌলের পরমাণু সংখ্যার একটি তালিকা তৈরি করুন।
    • বাম পাশে (বিক্রিয়ক): Fe = ১, H = ২, O = ১
    • ডান পাশে (বিক্রিয়াজাত): Fe = ৩, H = ২, O = ৪
  • ধাপ ৩: সবচেয়ে বেশি পরমাণু থাকা যৌগটিকে প্রথমে নির্বাচন করুন। এখানে সেটি হলো Fe₃O₄ এবং এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে অক্সিজেন (O) পরমাণু (৪টি)। বাম পাশে অক্সিজেন পরমাণু মাত্র ১টি আছে। তাই বাম পাশের H₂O-এর আগে ৪ বসিয়ে অক্সিজেন সমতাযুক্ত করি: Fe + 4H₂O → Fe₃O₄ + H₂
  • ধাপ ৪: এখন হাইড্রোজেন পরমাণুর সংখ্যা বাম পাশে হয়েছে ৪ × ২ = ৮টি, কিন্তু ডান পাশে আছে মাত্র ২টি। তাই ডান পাশের H₂-এর আগে ৪ বসিয়ে দিই: Fe + 4H₂O → Fe₃O₄ + 4H₂
  • ধাপ ৫: এবার লোহার (Fe) পরমাণু মেলানোর পালা। ডান পাশে Fe আছে ৩টি, কিন্তু বাম পাশে মাত্র ১টি। তাই বাম পাশের Fe-এর আগে ৩ বসিয়ে দিই: 3Fe + 4H₂O → Fe₃O₄ + 4H₂
  • ধাপ ৬: শেষে সমস্ত পরমাণু গণনা করে নিশ্চিত হোন যে উভয় পাশে পরমাণুর সংখ্যা সমান হয়েছে কিনা। এখানে উভয় পাশে Fe = ৩, H = ৮, O = ৪। সমীকরণটি এখন সম্পূর্ণ সমতাযুক্ত!

সমীকরণটিকে আরও তথ্যপূর্ণ করতে বিক্রিয়ক ও বিক্রিয়াজাত পদার্থের ভৌত অবস্থাগুলিকেও চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। যেমন কঠিনের জন্য (s), তরলের জন্য (l), গ্যাসের জন্য (g), এবং জলীয় দ্রবণের জন্য (aq) ব্যবহার করা হয়। সুতরাং, চূড়ান্ত সমীকরণটি হবে:

3Fe(s) + 4H₂O(g) → Fe₃O₄(s) + 4H₂(g)

৪. রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রকারভেদ

রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলি কীভাবে ঘটে এবং বিক্রিয়কগুলির মধ্যে পরমাণুর বিন্যাস কেমন হয়, তার ওপর ভিত্তি করে বিক্রিয়াগুলিকে মূলত পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:

(ক) সংযোজন বিক্রিয়া (Combination Reaction):

যে বিক্রিয়ায় দুই বা ততোধিক বিক্রিয়ক পদার্থ যুক্ত হয়ে একটিমাত্র নতুন বিক্রিয়াজাত পদার্থ উৎপন্ন করে, তাকে সংযোজন বিক্রিয়া বলে।

সাধারণ রূপ: A + B → AB

উদাহরণ: কয়লার দহন। কয়লা (কার্বন) বায়ুর অক্সিজেনের উপস্থিতিতে পুড়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন করে।

C(s) + O₂(g) → CO₂(g)

গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট: অনেক সংযোজন বিক্রিয়ায় প্রচুর তাপ নির্গত হয়। যে বিক্রিয়ায় বিক্রিয়াজাত পদার্থ উৎপাদনের সাথে সাথে তাপও উৎপন্ন হয়, তাকে তাপমোচী বিক্রিয়া (Exothermic Reaction) বলে। আমাদের শরীরে ঘটা শ্বসন (Respiration) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাপমোচী প্রক্রিয়া যেখানে গ্লুকোজ ভেঙে শক্তি এবং তাপ উৎপন্ন হয়।

(খ) বিয়োজন বিক্রিয়া (Decomposition Reaction):

যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একটিমাত্র বিক্রিয়ক পদার্থ ভেঙে দুই বা ততোধিক সরলতর পদার্থ উৎপন্ন করে, তাকে বিয়োজন বিক্রিয়া বলে। এটি সংযোজন বিক্রিয়ার ঠিক বিপরীত।

সাধারণ রূপ: AB → A + B

বিয়োজন বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য শক্তির প্রয়োজন হয় (তাপ, আলো বা বিদ্যুৎ)। শক্তির উৎসের ওপর ভিত্তি করে বিয়োজন তিন প্রকারের হয়:

  • তাপীয় বিয়োজন (Thermal Decomposition): তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে যে বিয়োজন ঘটে। যেমন ক্যালসিয়াম কার্বনেটকে (চুনাপাথর) উত্তপ্ত করলে তা ক্যালসিয়াম অক্সাইড (পোড়াচুন) ও কার্বন ডাইঅক্সাইডে পরিণত হয়।
    CaCO₃(s) + তাপ → CaO(s) + CO₂(g)
  • তড়িৎ বিশ্লেষণ (Electrolytic Decomposition): তরল বা গলিত পদার্থের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে যে বিয়োজন ঘটে। যেমন জলের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ চালনা করলে তা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাসে ভেঙে যায়।
    2H₂O(l) + বিদ্যুৎ → 2H₂(g) + O₂(g)
  • আলোক বিয়োজন (Photolytic Decomposition): সূর্যালোকের প্রভাবে যে বিয়োজন ঘটে। যেমন সিলভার ক্লোরাইডকে সূর্যালোকের সামনে রাখলে তা ধূসর রঙের সিলভার ধাতু এবং ক্লোরিন গ্যাসে পরিণত হয়।
    2AgCl(s) + সূর্যালোক → 2Ag(s) + Cl₂(g) (এই বিক্রিয়াটি আগে সাদা-কালো ফটোগ্রাফিতে ব্যবহার করা হতো)।

যে বিক্রিয়াগুলিতে শক্তি শোষিত হয়, সেগুলিকে তাপগ্রাহী বিক্রিয়া (Endothermic Reaction) বলা হয়। সকল বিয়োজন বিক্রিয়াই মূলত তাপগ্রাহী বিক্রিয়ার উদাহরণ।

(গ) প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Displacement Reaction):

যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো যৌগ থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি সক্রিয় মৌল অপর একটি কম সক্রিয় মৌলকে অপসারিত করে নিজের স্থান দখল করে, তাকে প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে।

সাধারণ রূপ: A + BC → AC + B

উদাহরণ: একটি লোহার পেরেককে কপার সালফেট (CuSO₄) দ্রবণে ডুবিয়ে রাখলে লোহা কপারকে তার দ্রবণ থেকে প্রতিস্থাপিত করে। কারণ লোহা (Fe), কপার (Cu) অপেক্ষা অনেক বেশি সক্রিয়।

Fe(s) + CuSO₄(aq) → FeSO₄(aq) + Cu(s)

এই বিক্রিয়ার ফলে দ্রবণের নীল রঙ হালকা সবুজ হয়ে যায় এবং লোহার পেরেকের ওপর তামার একটি বাদামী আস্তরণ জমা হয়।

(ঘ) দ্বিপতিস্থাপন বিক্রিয়া (Double Displacement Reaction):

যে বিক্রিয়ায় দুটি ভিন্ন যৌগের মধ্যে আয়ন বিনিময় ঘটে সম্পূর্ণ নতুন দুটি যৌগ উৎপন্ন হয়, তাকে দ্বিপতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে।

সাধারণ রূপ: AB + CD → AD + CB

উদাহরণ: সোডিয়াম সালফেট এবং বেরিয়াম ক্লোরাইড দ্রবণের মিশ্রণ। এই বিক্রিয়ার ফলে সাদা রঙের বেরিয়াম সালফেটের অদ্রবণীয় অধক্ষেপ তৈরি হয়।

Na₂SO₄(aq) + BaCl₂(aq) → BaSO₄(s) ↓ + 2NaCl(aq)

যে বিক্রিয়ায় একটি অদ্রবণীয় অধক্ষেপ সৃষ্টি হয়, তাকে অধক্ষেপণ বিক্রিয়া (Precipitation Reaction) বলা হয়।

(ঙ) জারণ ও বিজারণ বিক্রিয়া (Oxidation and Reduction / Redox Reaction):

রসায়নে জারণ এবং বিজারণ বিক্রিয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এই দুটি বিক্রিয়া সর্বদা একই সাথে ঘটে। তাই এদের একত্রে রেডক্স (Redox) বিক্রিয়া বলা হয়।

  • জারণ (Oxidation): কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের সংযোজন বা হাইড্রোজেনের অপসারণ ঘটলে তাকে জারণ বলে। আধুনিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, ইলেকট্রন বর্জনকেও জারণ বলা হয়।
  • বিজারণ (Reduction): কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের অপসারণ বা হাইড্রোজেনের সংযোজন ঘটলে তাকে বিজারণ বলে। আধুনিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, ইলেকট্রন গ্রহণকে বিজারণ বলা হয়।

একটি ক্লাসিক উদাহরণের মাধ্যমে এটি বোঝা যাক। কপার অক্সাইডকে হাইড্রোজেনের সাথে উত্তপ্ত করলে নিচের বিক্রিয়াটি ঘটে:

CuO + H₂ → Cu + H₂O

এখানে, কপার অক্সাইড (CuO) তার অক্সিজেন হারিয়ে কপারে (Cu) পরিণত হয়েছে, অর্থাৎ CuO-এর বিজারণ ঘটেছে। অন্য দিকে, হাইড্রোজেন (H₂) অক্সিজেন লাভ করে জলে (H₂O) পরিণত হয়েছে, অর্থাৎ H₂-এর জারণ ঘটেছে। এই বিক্রিয়ায় CuO হলো জারক পদার্থ এবং H₂ হলো বিজারক পদার্থ।

৫. দৈনন্দিন জীবনে জারণ বিক্রিয়ার প্রভাব

জারণ বিক্রিয়া কেবল ল্যাবরেটরিতেই সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের চারপাশেই প্রতিনিয়ত এর নানাবিধ ক্ষতিকর প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি প্রধান প্রভাব নিচে আলোচনা করা হলো:

(ক) ক্ষয়ীভবন (Corrosion):

যখন কোনো ধাতু তার চারপাশের বায়ু, আর্দ্রতা (জলীয় বাষ্প) বা অ্যাসিডের সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে নষ্ট হতে শুরু করে, তখন তাকে ক্ষয়ীভবন বলে।

এর সবচেয়ে সাধারণ উদাহরণ হলো লোহার মরচে পড়া (Rusting of Iron)। লোহা বাতাসে থাকা অক্সিজেন ও জলের সাথে বিক্রিয়া করে বাদামী রঙের হাইড্রেটেড আয়রন অক্সাইড [Fe₂O₃·xH₂O] গঠন করে, যাকে মরচে বলা হয়। এছাড়া তামার ওপর সবুজ রঙের আস্তরণ পড়া বা রূপোর জিনিস কালো হয়ে যাওয়াও ক্ষয়ীভবনের উদাহরণ।

প্রতিরোধের উপায়: ধাতুর ক্ষয় রোধ করতে রঙ করা, তেল বা গ্রিজ লাগানো কিংবা লোহার ওপর দস্তার প্রলেপ দেওয়া (যাকে গ্যালভানাইজেশন বা দস্তায়ন বলা হয়) অত্যন্ত কার্যকর।

(খ) চর্বি বা তেলের পচনশীলতা (Rancidity):

তেল বা চর্বিজাতীয় খাদ্যদ্রব্য দীর্ঘ সময় খোলা বাতাসে রেখে দিলে বাতাসের অক্সিজেনের প্রভাবে তাদের জারণ ঘটে। এর ফলে খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও রঙের পরিবর্তন ঘটে এবং খাবারটি খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়াকে চর্বি বা তেলের পচনশীলতা বা র্যানসিডিটি বলা হয়।

প্রতিরোধের উপায়: খাবার ভালো রাখতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট (যেমন BHA বা BHT) ব্যবহার করা হয়। এছাড়া চিপসের প্যাকেটে অক্সিজেন বের করে দিয়ে নিষ্ক্রিয় নাইট্রোজেন গ্যাস ভর্তি করা হয়, যাতে জারণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং চিপস মচমচে থাকে। বায়ু নিরোধক পাত্রে খাবার রাখলেও জারণের গতি অনেক হ্রাস পায়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: রাসায়নিক সমীকরণের সমতাবিধান করার প্রয়োজন হয় কেন? এটি কোন সূত্রের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত?

উত্তর: রাসায়নিক সমীকরণের সমতাবিধান করার মূল কারণ হলো 'ভরের নিত্যতা সূত্র' মেনে চলা। এই সূত্র অনুসারে, যেকোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নতুন কোনো ভরের সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। অর্থাৎ, বিক্রিয়ার আগে এবং পরে প্রতিটি মৌলের পরমাণু সংখ্যা সমান হতে হবে। এই ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যই সমীকরণের সমতাবিধান করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রশ্ন ২: দেয়াল চুনকাম করার কয়েকদিন পর দেয়ালটি চকচকে দেখায় কেন? এর সাথে জড়িত রাসায়নিক সমীকরণটি লেখো।

উত্তর: দেয়াল চুনকামের জন্য আমরা পোড়াচুনে জল মিশিয়ে তৈরি করা ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড বা কলিচুন [Ca(OH)₂] ব্যবহার করি। এটি যখন দেয়ালে লাগানো হয়, তখন তা বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) গ্যাসের সাথে ধীর গতিতে বিক্রিয়া করে দেয়ালের ওপর ক্যালসিয়াম কার্বনেটের [CaCO₃] একটি পাতলা এবং শক্ত আস্তরণ তৈরি করে। এই ক্যালসিয়াম কার্বনেট গঠনের ফলেই চুনকাম করার দুই-তিন দিন পর দেয়ালটি অত্যন্ত চকচকে দেখায়।
বিক্রিয়ার সমীকরণ:
Ca(OH)₂(aq) + CO₂(g) → CaCO₃(s) + H₂O(l)

প্রশ্ন ৩: কপার সালফেট দ্রবণে লোহার পেরেক রাখলে দ্রবণের রঙ কেন পরিবর্তিত হয়?

উত্তর: কপার সালফেট (CuSO₄) দ্রবণের রঙ নীল হয়। যখন এই দ্রবণে লোহার (Fe) পেরেক ডোবানো হয়, তখন লোহা কপার অপেক্ষা বেশি সক্রিয় হওয়ায় তা কপার সালফেট থেকে কপারকে প্রতিস্থাপিত করে নিজে আয়রন সালফেট (FeSO₄) গঠন করে। এই প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ার ফলে দ্রবণের নীল রঙ ধীরে ধীরে হালকা সবুজ রঙে রূপান্তরিত হয় এবং কপার মুক্ত হয়ে লোহার পেরেকের ওপর লালচে-বাদামী আস্তরণ সৃষ্টি করে।
বিক্রিয়ার সমীকরণ:
Fe(s) + CuSO₄(aq) → FeSO₄(aq) + Cu(s)

প্রশ্ন ৪: আলু বা চিপস প্রস্তুতকারক সংস্থা চিপসের প্যাকেটে নাইট্রোজেন গ্যাস ভরে কেন?

উত্তর: আলু বা চিপস দীর্ঘ সময় প্যাকেটে থাকলে বাতাসে থাকা অক্সিজেনের সাথে চর্বি ও তেলের জারণ ঘটে, যার ফলে খাবারটি নষ্ট হয়ে যায় এবং দুর্গন্ধ ছাড়ে (র্যানসিডিটি)। নাইট্রোজেন হলো একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস যা অক্সিজেনের সক্রিয়তাকে প্রতিহত করে। প্যাকেটের ভেতর থেকে অক্সিজেন বের করে নাইট্রোজেন ভর্তি করলে চিপসের জারণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং খাবারটি দীর্ঘকাল তাজা ও মচমচে থাকে।

সারসংক্ষেপ

  • রাসায়নিক পরিবর্তন: এমন একটি স্থায়ী পরিবর্তন যেখানে মূল পদার্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন নতুন ধর্মসম্পন্ন পদার্থে রূপান্তরিত হয়।
  • ভরের নিত্যতা সূত্র: বিক্রিয়কের মোট পরমাণু সংখ্যা সর্বদা বিক্রিয়াজাত পদার্থের মোট পরমাণু সংখ্যার সমান হবে।
  • সংযোজন বিক্রিয়া: দুই বা ততোধিক উপাদান মিলে একটি নতুন যৌগ গঠন করে (A + B → AB)।
  • বিয়োজন বিক্রিয়া: একটি জটিল যৌগ ভেঙে একাধিক সরল পদার্থ তৈরি করে (AB → A + B)। এর জন্য তাপ, আলো বা বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন হয়।
  • প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া: অধিক সক্রিয় মৌল কম সক্রিয় মৌলকে তার যৌগ থেকে সরিয়ে দেয় (A + BC → AC + B)।
  • দ্বিপতিস্থাপন বিক্রিয়া: দুটি যৌগের মধ্যে আয়নের আদান-প্রদানের মাধ্যমে নতুন যৌগ গঠিত হয় (AB + CD → AD + CB)।
  • জারণ ও বিজারণ (রেডক্স): জারণে অক্সিজেন যুক্ত হয় বা হাইড্রোজেন অপসারিত হয়; বিজারণে অক্সিজেন অপসারিত হয় বা হাইড্রোজেন যুক্ত হয়।
  • ক্ষয়ীভবন ও র্যানসিডিটি: এগুলি হলো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে জারণের ক্ষতিকর প্রভাব যা গ্যালভানাইজেশন, রঙ বা নাইট্রোজেন গ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব।