বিষয়ের ভূমিকা
ভারতের অর্থনীতির ইতিহাস বুঝতে গেলে ১৯৪৭ সালের আগের প্রেক্ষাপট জানা অত্যন্ত জরুরি। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ব্রিটিশ শাসনে থাকার পর ভারত যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। একাদশ শ্রেণির অর্থনীতির প্রথম অধ্যায় 'স্বাধীনতা প্রাক্কালে ভারতীয় অর্থনীতি' আমাদের শেখায় কীভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ভারতের সমৃদ্ধ অর্থনীতিকে একটি অনুন্নত ও স্থবির অর্থনীতিতে পরিণত করেছিল। এই অধ্যায়ের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক নীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করা এবং স্বাধীনতার সময় ভারতের কৃষি, শিল্প, বৈদেশিক বাণিজ্য ও পরিকাঠামোর অবস্থা তুলে ধরা। ব্রিটিশদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারতকে তাদের শিল্পের জন্য সস্তা কাঁচামালের জোগানদার এবং তাদের তৈরি পণ্যের একটি বিশাল বাজার হিসেবে ব্যবহার করা।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. কৃষি খাতের অবস্থা (Agricultural Sector)
ব্রিটিশ আমলে ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু তাসত্ত্বেও কৃষি খাত ছিল অত্যন্ত অনগ্রসর। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা: ব্রিটিশরা জমিদারী প্রথা প্রবর্তন করেছিল (বিশেষ করে বাংলা প্রেসিডেন্সিতে)। এই ব্যবস্থায় কৃষকদের থেকে খাজনা আদায় করাই ছিল জমিদারদের প্রধান লক্ষ্য, কৃষির উন্নতির জন্য তারা কোনো বিনিয়োগ করত না।
- কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ: ব্রিটিশরা তাদের শিল্পের প্রয়োজনে কৃষকদের খাদ্যশস্যের বদলে বাণিজ্যিক ফসল (যেমন– নীল, তুলা, পাট) চাষ করতে বাধ্য করত। এর ফলে খাদ্য সংকট দেখা দিত।
- প্রযুক্তির অভাব: সেচ ব্যবস্থার অভাব, পুরানো প্রযুক্তি এবং সারের অপ্রতুলতার কারণে উৎপাদনশীলতা ছিল অত্যন্ত নিম্নমুখী।
২. শিল্প খাতের অবস্থা (Industrial Sector)
ভারত একসময় তার সূক্ষ্ম হস্তশিল্পের জন্য বিশ্বখ্যাত ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনে পরিকল্পিতভাবে ভারতের শিল্প ধ্বংস করা হয়েছিল (De-industrialization)।
- হস্তশিল্পের পতন: ব্রিটিশরা ভারতের হস্তশিল্পের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ করে এবং ইংল্যান্ড থেকে যন্ত্রে তৈরি সস্তা পণ্য আমদানির পথ প্রশস্ত করে। ফলে দেশীয় কারিগররা তাদের জীবিকা হারায়।
- আধুনিক শিল্পের ধীর গতি: ১৯শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কিছু আধুনিক শিল্প (যেমন– সুতি বস্ত্র, পাট কল, লোহা ও ইস্পাত শিল্প) গড়ে উঠতে শুরু করলেও তার গতি ছিল অত্যন্ত মন্থর। ১৯০৭ সালে টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি (TISCO) প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
- মূলধনী পণ্যের অভাব: ভারতে কোনো শক্তিশালী 'ক্যাপিটাল গুডস' বা মূলধনী পণ্য তৈরির শিল্প ছিল না, যা ভবিষ্যতে শিল্পায়নে সাহায্য করতে পারত।
৩. বৈদেশিক বাণিজ্য (Foreign Trade)
প্রাচীনকাল থেকেই ভারত বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের ধরন সম্পূর্ণ বদলে যায়:
- ভারত কাঁচামালের (যেমন– তুলা, রেশম, নীল, চিনি) রপ্তানিকারক এবং বিলেতি তৈরি পণ্যের আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়।
- ভারতের অর্ধেকের বেশি বাণিজ্য কেবল ব্রিটেনের সাথে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।
- সম্পদের নির্গমন (Drain of Wealth): ভারতের রপ্তানি উদ্বৃত্ত থেকে প্রাপ্ত অর্থ ভারতের উন্নয়নে ব্যয় না করে ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক খরচ এবং যুদ্ধ পরিচালনার কাজে ব্যবহার করা হতো। একেই দাদাভাই নওরোজি 'সম্পদের নির্গমন' বলে অভিহিত করেছেন।
৪. জনতাত্ত্বিক অবস্থা (Demographic Profile)
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের জনসংখ্যার মান ছিল খুবই নিম্নপর্যায়ে:
- উচ্চ জন্মহার ও মৃত্যুহার: উভয় হারই ছিল অত্যন্ত বেশি, যা একটি অনগ্রসর অর্থনীতির লক্ষণ।
- স্বল্প সাক্ষরতার হার: সামগ্রিক সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ শতাংশের নিচে এবং মহিলা সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৭ শতাংশ।
- জনস্বাস্থ্য: জনস্বাস্থ্য পরিষেবা ছিল অত্যন্ত নগণ্য, যার ফলে জলবাহিত ও মহামারি জনিত রোগে প্রচুর মানুষের মৃত্যু হতো। গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩২ বছর (বর্তমানে যা ৭০ বছরের কাছাকাছি)।
৫. পরিকাঠামো (Infrastructure)
ব্রিটিশরা ভারতে রেলপথ, বন্দর, জলপথ এবং ডাক ও তার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। তবে তাদের উদ্দেশ্য ভারতীয়দের কল্যাণ ছিল না, বরং তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করা ছিল মূল লক্ষ্য:
- রেলপথ (১৮৫০): ব্রিটিশরা রেলপথ তৈরি করেছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনী সহজে যাতায়াত করতে পারে এবং কাঁচামাল দ্রুত বন্দরে পৌঁছাতে পারে সেজন্য। তবে রেলপথের প্রভাবে ভারতের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বাধা দূর হয়েছিল এবং দীর্ঘ দূরত্বের ভ্রমণে সুবিধা হয়েছিল।
- ডাক ও তার ব্যবস্থা: আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ব্রিটিশ আমলে ভারতের কৃষি কেন স্থবির হয়ে পড়েছিল?
উত্তর: ব্রিটিশদের প্রবর্তিত জমিদারি প্রথা, খাজনা আদায়ের কঠোর নিয়ম, কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ এবং সেচ ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবের কারণে ভারতের কৃষি ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছিল।
প্রশ্ন ২: 'সম্পদের নির্গমন' (Drain of Wealth) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের রপ্তানি থেকে অর্জিত উদ্বৃত্ত অর্থ ভারতের উন্নয়নে ব্যয় না করে ব্রিটিশদের প্রশাসনিক ব্যয়, সামরিক খরচ এবং বিলেতি কোম্পানির লভ্যাংশ হিসেবে ব্রিটেনে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। একেই 'সম্পদের নির্গমন' বলা হয়।
প্রশ্ন ৩: ব্রিটিশরা ভারতে রেলপথ কেন চালু করেছিল?
উত্তর: ব্রিটিশরা প্রধানত তিনটি কারণে রেলপথ চালু করেছিল– ১. ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করা, ২. ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে বন্দরে পাঠানো এবং ৩. ব্রিটিশ পণ্য ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া।
সারসংক্ষেপ
- স্বাধীনতা প্রাক্কালে ভারতের অর্থনীতি ছিল একটি উপনিবেশিক, সামন্ততান্ত্রিক এবং স্থবির অর্থনীতি।
- কৃষি ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত অনুন্নত এবং জমিদারি প্রথার চাপে পিষ্ট।
- বিশ্বখ্যাত হস্তশিল্প ধ্বংস করা হয়েছিল ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক স্বার্থে।
- জনতাত্ত্বিক দিক থেকে উচ্চ মৃত্যুহার এবং নিম্ন সাক্ষরতা ছিল দুশ্চিন্তার কারণ।
- রেলপথ ও পরিকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছিল মূলত ব্রিটিশ শাসনের সুবিধার জন্য, যদিও দীর্ঘমেয়াদে এটি ভারতের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।