বিষয়ের ভূমিকা
জলনির্গমন বা 'ড্রেনেজ' (Drainage) শব্দটি শোনার সাথে সাথে আমাদের মাথায় এক গুচ্ছ ছোট-বড় নদী এবং তাদের প্রবাহ পথের চিত্র ভেসে ওঠে। নবম শ্রেণির ভূগোলের এই তৃতীয় অধ্যায়টি মূলত ভারতের নদী ব্যবস্থা সম্পর্কে। আমাদের ভারত নদীমাতৃক দেশ, আর এই নদীগুলো শুধু ভূগোলের অংশ নয়, এগুলি আমাদের জীবন, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার নদী ব্যবস্থার সামগ্রিক বিন্যাসকে বলা হয় জলনির্গমন ব্যবস্থা। এই অধ্যায়ে আমরা ভারতের প্রধান নদী ব্যবস্থা, তাদের উৎপত্তি, গতিপথ এবং দেশের অর্থনীতিতে নদী ও হ্রদের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. জলনির্গমন ব্যবস্থা কী?
একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদী এবং তার উপনদীগুলির সমন্বয়ে গঠিত ব্যবস্থাকে জলনির্গমন ব্যবস্থা বলা হয়। এখানে দুটি বিষয় বোঝা খুব জরুরি:
- জলনির্গমন অববাহিকা (Drainage Basin): একটি প্রধান নদী এবং তার সমস্ত উপনদী মিলে যে অঞ্চলের জল নিষ্কাশন করে, তাকে ওই নদীর অববাহিকা বলা হয়।
- জলবিভাজিকা (Water Divide): যখন কোনো পর্বত বা উচ্চভূমি দুটি প্রতিবেশী অববাহিকাকে পৃথক করে, তখন তাকে জলবিভাজিকা বলে। যেমন— আম্বালা শহর সিন্ধু ও গঙ্গা নদী ব্যবস্থার মধ্যে জলবিভাজিকা হিসেবে কাজ করে।
২. ভারতের নদী ব্যবস্থার শ্রেণিবিভাগ
ভারতের ভূ-প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে এদেশের নদীগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদী (Himalayan Rivers): এই নদীগুলি হিমালয়ের বরফ গলা জল এবং বৃষ্টির জল— উভয় থেকেই পুষ্ট। তাই সারা বছর এদের জল থাকে, এদের বলা হয় বহুবর্ষজীবী নদী। সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র হল এই শ্রেণির প্রধান নদী।
- উপদ্বীপীয় নদী (Peninsular Rivers): এই নদীগুলি মূলত বৃষ্টির জলের ওপর নির্ভরশীল। তাই শুষ্ক মরসুমে এদের জল খুব কমে যায়। দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন নদীগুলো এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। নর্মদা, তাপী, গোদাবরী, কৃষ্ণা এবং কাবেরী হল উল্লেখযোগ্য উপদ্বীপীয় নদী।
৩. হিমালয়ের প্রধান নদী ব্যবস্থা
হিমালয় থেকে উৎপন্ন তিনটি প্রধান নদী ব্যবস্থা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
(ক) সিন্ধু নদী ব্যবস্থা (Indus River System)
সিন্ধু নদ তিব্বতের মানস সরোবরের কাছে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে ভারতে (লাদাখ) প্রবেশ করে। এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৯০০ কিমি। এর প্রধান উপনদীগুলো হলো— শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা এবং বিতস্তা। সিন্ধু নদ পাকিস্তান হয়ে আরব সাগরে গিয়ে মেশে।
(খ) গঙ্গা নদী ব্যবস্থা (Ganga River System)
ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী গঙ্গা। গঙ্গোত্রী হিমবাহের 'গোমুখ' গুহা থেকে অলকানন্দা ও ভাগীরথী মিলিত হয়ে গঙ্গার সৃষ্টি করেছে। এটি হরিদ্বারে সমভূমিতে প্রবেশ করে। যমুনা, ঘর্ঘরা, গন্ডক এবং কোশী হলো এর প্রধান উপনদী। যমুনা নদী এলাহাবাদে গঙ্গার সাথে মিলিত হয়েছে। গঙ্গা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হয়ে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ 'সুন্দরবন' সৃষ্টি করে এবং বঙ্গোপসাগরে পড়ে।
(গ) ব্রহ্মপুত্র নদী ব্যবস্থা (Brahmaputra River System)
ব্রহ্মপুত্র নদ তিব্বতের মানস সরোবরের পূর্ব দিক থেকে উৎপন্ন হয়েছে। তিব্বতে এর নাম 'সাংপো' (Tsangpo)। অরুণাচল প্রদেশে 'দিহং' গিরিপথ দিয়ে ভারতে প্রবেশের পর এটি ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত হয়। এই নদীটি বর্ষাকালে প্রতি বছর অসম ও বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে।
৪. উপদ্বীপীয় বা দক্ষিণ ভারতের নদীসমূহ
উপদ্বীপীয় নদীগুলোকে তাদের প্রবাহের দিক অনুযায়ী দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- পশ্চিমবাহিনী নদী: নর্মদা ও তাপী প্রধান পশ্চিমবাহিনী নদী যা আরব সাগরে পড়ে। এরা বদ্বীপ সৃষ্টি করে না, বরং 'এস্টুয়ারি' বা খাড়ি তৈরি করে।
- পূর্ববাহিনী নদী: গোদাবরী, মহানদী, কৃষ্ণা ও কাবেরী পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। এরা বিশাল বদ্বীপ সৃষ্টি করেছে। গোদাবরীকে বলা হয় 'দক্ষিণ ভারতের গঙ্গা' (Dakshin Ganga)।
৫. হ্রদ (Lakes)
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য হ্রদ রয়েছে। কাশ্মীরের উলার হ্রদ ভারতের বৃহত্তম মিষ্টি জলের হ্রদ। এছাড়া ওড়িশার চিলিকা হ্রদ এবং রাজস্থানের সাম্ভার হ্রদ (লবণাক্ত জলের) বিখ্যাত। হ্রদগুলো শুধু পর্যটনের জন্য নয়, মাছ চাষ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ভারতীয় অর্থনীতিতে নদীর ভূমিকা
ভারত একটি কৃষিপ্রধান দেশ, তাই নদীর গুরুত্ব অপরিসীম।
- কৃষিকাজে জলসেচের প্রধান উৎস নদী।
- নদী থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
- জলপথ হিসেবে নদী ব্যবহার করা হয় যা পরিবহনে সাশ্রয়ী।
- মৎস্য চাষ ও শিল্পক্ষেত্রে নদীর জল ব্যবহার করা হয়।
৭. নদী দূষণ ও সংরক্ষণ
বর্তমানে অতিরিক্ত নগরায়ন এবং শিল্পায়নের ফলে নদীর জল মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য এবং শহরের নোংরা জল সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ভারত সরকার 'জাতীয় নদী সংরক্ষণ পরিকল্পনা' (NRCP) এবং 'নমামি গঙ্গে' (Namami Gange) প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. ভারতের বৃহত্তম নদী অববাহিকা কোনটি?
উত্তর: গঙ্গা নদী অববাহিকা ভারতের বৃহত্তম নদী অববাহিকা।
২. 'জলবিভাজিকা' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যখন কোনো পর্বত বা উঁচু ভূমি দুটি ভিন্ন নদীর অববাহিকাকে একে অপরের থেকে পৃথক করে, তখন সেই উচ্চভূমিকে জলবিভাজিকা বলে। উদাহরণস্বরূপ, সিন্ধু ও গঙ্গা নদী ব্যবস্থার মাঝে অবস্থিত আম্বালা উচ্চভূমি একটি জলবিভাজিকা।
৩. হিমালয় ও উপদ্বীপীয় নদীর মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: হিমালয়ের নদীগুলি বহুবর্ষজীবী (সারা বছর জল থাকে) কারণ এরা বরফ গলা জলে পুষ্ট। অন্যদিকে, উপদ্বীপীয় নদীগুলি বৃষ্টির জলের ওপর নির্ভরশীল এবং গ্রীষ্মকালে প্রায় শুকিয়ে যায়।
৪. সুন্দরবন বদ্বীপ কীভাবে গঠিত হয়?
উত্তর: গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর পলি সঞ্চয়ের ফলে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ সুন্দরবন গঠিত হয়েছে।
সারসংক্ষেপ
- ভারত মূলত দুটি প্রধান নদী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল: হিমালয় এবং উপদ্বীপীয় নদী।
- গঙ্গা ভারতের জীবনরেখা এবং এর বদ্বীপ সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম।
- সিন্ধু ও ব্রহ্মপুত্র আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে পরিচিত।
- উপদ্বীপীয় নদীগুলোর মধ্যে গোদাবরী দীর্ঘতম।
- নদী আমাদের অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রধান উৎস, তাই নদী দূষণ রোধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।