বিষয়ের ভূমিকা
উন্নয়ন বা প্রগতি এমন একটি ধারণা যা চিরকাল আমাদের সঙ্গে রয়েছে। আমাদের প্রত্যেকেরই আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা থাকে যে আমরা কেমন হতে চাই বা আমরা কীভাবে জীবন কাটাতে চাই। একইভাবে, একটি দেশের জন্য আমাদের কিছু ধারণা থাকে। একটি আদর্শ দেশ কেমন হওয়া উচিত? সেখানে কী কী সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন? সবার জন্য কি জীবনযাত্রা উন্নত করা সম্ভব? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এবং উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়েই দশম শ্রেণির অর্থনীতির প্রথম অধ্যায় 'উন্নয়ন' (Development) আবর্তিত হয়েছে। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব যে উন্নয়ন বলতে কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি বোঝায় না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবনের গুণগত মানের উন্নতিও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি: বিভিন্ন ব্যক্তি, ভিন্ন লক্ষ্য
উন্নয়নের ধারণাটি সবার কাছে এক নয়। একেকটি মানুষের কাছে উন্নয়নের লক্ষ্য একেক রকম হতে পারে। এমনকি একজনের কাছে যা উন্নয়ন, অন্যজনের কাছে তা ধ্বংসাত্মকও হতে পারে। নিচে কিছু উদাহরণের মাধ্যমে এটি ব্যাখ্যা করা হলো:
- ভূমিহীন গ্রামীণ শ্রমিক: তার কাছে উন্নয়ন হলো বছরে আরও বেশি দিন কাজ পাওয়া, ন্যায্য মজুরি এবং তার সন্তানদের জন্য স্থানীয় স্কুলে উন্নত শিক্ষার সুযোগ।
- পাঞ্জাবের সমৃদ্ধ কৃষক: তার লক্ষ্য হলো ফসলের উচ্চমূল্য নিশ্চিত করা এবং সস্তায় শ্রমিকের মাধ্যমে কঠোর পরিশ্রমী জীবন কাটানো যাতে তিনি তার সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে পারেন।
- নর্মদা উপত্যকার আদিবাসী: তাদের কাছে উন্নয়ন হলো বড় বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা, কারণ বাঁধের ফলে তাদের জমি প্লাবিত হয় এবং তাদের বাস্তুচ্যুত হতে হয়। অন্যদিকে, একজন শিল্পপতির কাছে ওই একই বাঁধ হতে পারে উন্নয়নের প্রতীক কারণ এটি থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
সুতরাং, আমরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে পারি: (ক) ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির উন্নয়নের লক্ষ্য আলাদা হতে পারে এবং (খ) একজনের জন্য যা উন্নয়ন, তা অন্যজনের জন্য উন্নয়ন নাও হতে পারে, এমনকি ক্ষতিকরও হতে পারে।
২. আয় এবং অন্যান্য লক্ষ্য
মানুষ কেবল বেশি আয় চায় না, তারা আয়ের পাশাপাশি আরও অনেক কিছু আশা করে। আপনি যদি লক্ষ্য করেন, তবে দেখবেন মানুষ কাজ খোঁজার সময় বেতনের পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করে:
- সমমর্যাদা এবং স্বাধীনতা: কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে সমান ব্যবহার ও স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- নিরাপত্তা: কাজের নিরাপত্তা এবং শারীরিক নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে পড়ে।
- পরিবেশ: একটি ভালো এবং দূষণমুক্ত পরিবেশে কাজ করা বা বসবাস করাও উন্নয়নের অংশ।
অনেক ক্ষেত্রে, আয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এই মানসিক ও সামাজিক দিকগুলো। উদাহরণস্বরূপ, একজন মহিলা যদি বাইরে কাজ করেন, তবে সমাজে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু যদি পরিবার এবং সমাজে তার কাজের নিরাপত্তা না থাকে, তবে তিনি বাইরে গিয়ে কাজ করতে ভয় পাবেন। সুতরাং, উন্নয়নের লক্ষ্য কেবল উচ্চ আয় নয়, বরং জীবনের অন্যান্য উন্নত সুযোগ-সুবিধার একটি মিশ্রণ।
৩. জাতীয় উন্নয়ন (National Development)
ব্যক্তিগত উন্নয়নের মতোই একটি দেশের উন্নয়নের ব্যাপারেও মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকতে পারে। ভারত কীভাবে উন্নত হতে পারে? কেউ বলতে পারেন শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে, কেউ বলতে পারেন শিল্পের উন্নতির মাধ্যমে। জাতীয় উন্নয়ন বলতে বোঝায় এমন একটি পথ বেছে নেওয়া যা অধিকাংশ মানুষের উপকার করবে এবং যা ন্যায্য ও যৌক্তিক।
৪. বিভিন্ন দেশ বা রাজ্যকে কীভাবে তুলনা করা হয়?
দেশগুলোর মধ্যে তুলনা করার জন্য সবচেয়ে সাধারণ পরিমাপ হলো 'আয়'। যে দেশের আয় বেশি, তাকে সাধারণত উন্নত বলা হয়। তবে মোট আয় দিয়ে তুলনা করা সঠিক নয় কারণ বিভিন্ন দেশের জনসংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন। তাই আমরা মাথাপিছু আয় (Per Capita Income) বা গড় আয় ব্যবহার করি।
- মাথাপিছু আয়: দেশের মোট আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়।
- বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড: বিশ্বব্যাংক তাদের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদনে দেশগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করার জন্য মাথাপিছু আয়ের মানদণ্ড ব্যবহার করে। যেসব দেশের মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট সীমার উপরে, তারা উচ্চ আয়ের দেশ এবং যাদের নিচে, তারা স্বল্প আয়ের দেশ।
মাথাপিছু আয়ের সীমাবদ্ধতা: গড় আয় বা মাথাপিছু আয় দেশের সামগ্রিক চিত্র দিলেও এটি আয়ের বৈষম্য লুকিয়ে রাখে। এটি বলে না যে টাকাটা মানুষের মধ্যে কীভাবে বন্টিত হয়েছে। কোনো দেশে হয়তো মুষ্টিমেয় লোক খুব ধনী আর বাকি সবাই খুব গরিব, কিন্তু গড় আয় অনেক বেশি হতে পারে।
৫. আয় এবং অন্যান্য মানদণ্ড (Income and Other Criteria)
ভারতের হরিয়ানা, কেরালা এবং বিহারের তুলনা করলে দেখা যায়, হরিয়ানার মাথাপিছু আয় কেরালার চেয়ে বেশি। কিন্তু অন্যান্য সামাজিক সূচকে কেরালা অনেক এগিয়ে।
- শিশু মৃত্যুহার (Infant Mortality Rate): কেরালায় শিশু মৃত্যুহার হরিয়ানার তুলনায় অনেক কম। এর কারণ কেরালায় স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পুষ্টির মান উন্নত।
- সাক্ষরতার হার (Literacy Rate): কেরালায় সাক্ষরতার হার অনেক বেশি, যা দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের চাবিকাঠি।
- নিট উপস্থিতির অনুপাত (Net Attendance Ratio): স্কুলে যাওয়া শিশুদের সংখ্যা কেরালায় বেশি।
এ থেকে বোঝা যায় যে, পকেটে টাকা থাকলেই সমস্ত উন্নত সুযোগ-সুবিধা (যেমন দূষণমুক্ত পরিবেশ বা সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা) কেনা সম্ভব নয়।
৬. জনপরিষেবা (Public Facilities)
উন্নয়নের জন্য সরকারি বা জনপরিষেবার ভূমিকা অনস্বীকার্য। সরকার যদি স্কুল, হাসপাতাল বা গণবণ্টন ব্যবস্থা (PDS) ঠিকমতো পরিচালনা না করে, তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে এই পরিষেবাগুলো কেনা অসম্ভব। কেরালায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান ভালো কারণ সেখানে সরকার এই খাতগুলোতে বিশেষ নজর দিয়েছে। তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যে রেশনিং ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় মানুষের পুষ্টির মান উন্নত।
৭. মানব উন্নয়ন সূচক (Human Development Index - HDI)
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) দেশগুলোর তুলনা করার জন্য কেবল আয় নয়, বরং শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দেয়। একেই বলা হয় 'মানব উন্নয়ন রিপোর্ট'। এর প্রধান তিনটি সূচক হলো:
- জন্মের সময় প্রত্যাশিত গড় আয়ু: এটি স্বাস্থ্যের মান নির্দেশ করে।
- শিক্ষার স্তর: গড় পড়াশোনার বছর এবং স্কুলে কাটানো প্রত্যাশিত বছর।
- মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (GNI): ক্রয়ক্ষমতার সমতা (PPP) অনুযায়ী।
বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, ভারতের অনেক প্রতিবেশী দেশ (যেমন শ্রীলঙ্কা) অনেক সূচকে আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে।
৮. উন্নয়নের স্থায়িত্ব (Sustainability of Development)
উন্নয়ন মানে কেবল বর্তমানের উন্নতি নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ টিকিয়ে রাখা। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এই পৃথিবী উত্তরাধিকার সূত্রে পাইনি, বরং আমরা এটি আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।
- ভূগর্ভস্থ জল: ভারতে ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত ব্যবহার একটি বড় সমস্যা। আমরা যদি পুনর্নবীকরণযোগ্য সম্পদও অতিরিক্ত ব্যবহার করি, তবে ভবিষ্যতে জলের সংকট দেখা দেবে।
- প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাস: অপরিশোধিত তেল বা কয়লার মতো অনবায়নযোগ্য সম্পদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যদি আমরা এখনই বিকল্প শক্তি (যেমন সৌরশক্তি) খুঁজে না পাই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়ন থমকে যাবে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: মাথাপিছু আয় কাকে বলে? এটি কি উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি?
উত্তর: দেশের মোট আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যা পাওয়া যায়, তাকেই মাথাপিছু আয় বলে। না, এটি উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না কারণ এটি আয়ের বণ্টন বা জীবনযাত্রার গুণগত মান (যেমন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা) প্রকাশ করে না।
প্রশ্ন ২: কেরালায় মাথাপিছু আয় হরিয়ানার চেয়ে কম হওয়া সত্ত্বেও কেন কেরালা বেশি উন্নত বলে বিবেচিত হয়?
উত্তর: কেরালায় শিশু মৃত্যুহার কম, সাক্ষরতার হার অনেক বেশি এবং জনগণের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিষেবা অত্যন্ত উন্নত। উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্য কেবল অর্থ নয়, বরং মানুষের কল্যাণ, যা কেরালায় বেশি দৃশ্যমান।
প্রশ্ন ৩: উন্নয়নের স্থায়িত্ব কেন প্রয়োজন?
উত্তর: বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর সময় যদি আমরা প্রাকৃতিক সম্পদ শেষ করে ফেলি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সংকটে পড়বে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী অগ্রগতির জন্য উন্নয়নের স্থায়িত্ব অপরিহার্য।
সারসংক্ষেপ
- উন্নয়ন একটি বহুমুখী ধারণা যা একেক জনের কাছে একেক রকম হতে পারে।
- কেবল আয় নয়, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
- বিশ্বব্যাংক মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে দেশগুলোর তুলনা করে, অন্যদিকে UNDP শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মানদণ্ড ব্যবহার করে।
- জনপরিষেবা এবং সরকারি নীতি উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে।
- স্থায়ী উন্নয়নের জন্য আমাদের সম্পদ ব্যবহারে সচেতন হতে হবে যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।