ঘটনার প্রেক্ষাপট

১৭৯১ সালের ভিয়েনা। সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, ভোলফগ্যাং আমাদিউস মোৎসার্ট, তখন তার সৃজনশীলতার শিখরে। চারিদিকে তার জয়জয়কার, কিন্তু এই খ্যাতির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর কালো ছায়া। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, এক রহস্যময় অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী। তার শেষ দিনগুলো ছিল শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি এক তীব্র মানসিক যন্ত্রণার। মোৎসার্ট তার স্ত্রী কনস্টানৎসেকে বারবার বলতেন, তাকে বিষ দেওয়া হয়েছে। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা তার জীবন শেষ করে দিতে চায়। কে ছিল সেই অদৃশ্য শত্রু? সত্যিই কি তাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল, নাকি এটি ছিল নিছকই এক শিল্পীর অন্তিম মুহূর্তের প্রলাপ? এই প্রশ্নগুলোই জন্ম দিয়েছে ইতিহাসের অন্যতম সেরা সঙ্গীতশিল্পীর মৃত্যুকে ঘিরে এক গভীর ও অমীমাংসিত রহস্যের।

রহস্যের জাল

১৭৯১ সালের গ্রীষ্মে, এক রহস্যময় আগন্তুক মোৎসার্টের কাছে এসে একটি ‘রিকুইয়েম মাস’ (মৃতের জন্য প্রার্থনাসঙ্গীত) রচনা করার বরাত দেন। লোকটি নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন, যা মোৎসার্টের মনে এক অশুভ ছায়া ফেলে। সময়ের সাথে সাথে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তার শরীরে তীব্র জ্বর, ফুসকুড়ি এবং অসহ্য যন্ত্রণা দেখা দেয়। মোৎসার্ট বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, এই রিকুইয়েম তিনি আসলে নিজের জন্যই লিখছেন। তার স্ত্রী কনস্টানৎসের মতে, মোৎসার্ট তাকে বলেছিলেন, "আমি নিশ্চিত যে আমাকে বিষ দেওয়া হয়েছে। আমি এই চিন্তা মাথা থেকে সরাতে পারছি না।"

এই অভিযোগের তীর সরাসরি গিয়ে পড়ে তার সমসাময়িক সুরকার আন্তোনিও সালিয়েরির দিকে। ভিয়েনার সঙ্গীত জগতে সালিয়েরি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং অনেকেই মনে করতেন যে, মোৎসার্টের অসাধারণ প্রতিভা তার জন্য ঈর্ষার কারণ ছিল। লোকমুখে প্রচলিত গুজবগুলো এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, পরবর্তীকালে ‘আমাদিউস’ নামক বিখ্যাত চলচ্চিত্র ও নাটকে সালিয়েরিকে মোৎসার্টের হত্যাকারী হিসেবেই চিত্রিত করা হয়েছে।

কিন্তু সত্যিই কি সালিয়েরি তাকে বিষ দিয়েছিলেন? ঐতিহাসিক নথি ঘেঁটে এর কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না। মোৎসার্টের মৃত্যুর পর তার চিকিৎসা সংক্রান্ত যে নথি পাওয়া গেছে, তাতে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে "তীব্র মিলিয়ারি ফিভার" উল্লেখ করা হয়েছে, যা এক ধরনের ফুসকুড়িযুক্ত জ্বর। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, তার মৃত্যু সম্ভবত রিউম্যাটিক ফিভার, কিডনি ফেলিওর বা পারদঘটিত বিষক্রিয়ার কারণেও হতে পারে, যা সেই সময়ে সিফিলিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো। তবে বিষ প্রয়োগের তত্ত্বটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায়নি, কারণ মোৎসার্টের উপসর্গগুলো বিষক্রিয়ার লক্ষণের সাথে মিলে যায়।

সত্যের উন্মোচন

মোৎসার্টের মৃত্যুর ২০০ বছরেরও বেশি সময় পরেও, তার আসল হত্যাকারী কে বা কী, তা নিয়ে বিতর্ক থামেনি। সালিয়েরির বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকায়, তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। অনেক গবেষক মনে করেন, মোৎসার্টের অসুস্থতা এবং মানসিক চাপ তাকে এই ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী করে তুলেছিল। তার শেষ দিনগুলোতে তিনি প্রচণ্ড আর্থিক অনটনের মধ্যে ছিলেন এবং ক্রমাগত কাজের চাপে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল।

তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য, মোৎসার্টের মৃত্যু সঙ্গীত জগতের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার অসমাপ্ত ‘রিকুইয়েম’ আজও তার অকালমৃত্যুর এক করুণ সাক্ষী হয়ে রয়েছে। তিনি কি সত্যিই এক নির্মম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন, নাকি তার অসামান্য প্রতিভা তাকে এমন এক মানসিক জগতে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা মুছে গিয়েছিল? ভিয়েনার সেন্ট মার্কস সিমেট্রির এক অচিহ্নিত কবরে শুয়ে থাকা এই মহান সুরকারের সাথে সাথেই হয়তো সমাধিস্থ হয়ে গেছে সেই রাতের আসল সত্যি।

আজও যখন তার ‘রিকুইয়েম’-এর সুর বেজে ওঠে, তখন শ্রোতাদের মনে প্রশ্ন জাগে - এটি কি শুধুই এক প্রার্থনাসঙ্গীত, নাকি এক কিংবদন্তী শিল্পীর মৃত্যুর আগে বলে যাওয়া শেষ রহস্যময় আর্তি?

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)