বিষয়ের ভূমিকা
নমস্কার বন্ধুরা! আজ আমরা ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের গভীরে প্রবেশ করব, যা শুধুমাত্র একটি দেশের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের চিন্তাধারাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমরা আলোচনা করব নবম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের প্রথম অধ্যায় – ফরাসি বিপ্লব (The French Revolution)। ১৭৮৯ সালে ঘটে যাওয়া এই বিপ্লব ছিল নিছক কোনো ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, এটি ছিল স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের অবসান এবং স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের (Liberty, Equality, and Fraternity) মতো মহান আদর্শের জন্ম।
ফরাসি বিপ্লবকে আধুনিক যুগের সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি দেখিয়েছিল যে সাধারণ মানুষও পারে সংগঠিত হয়ে অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণ করতে। এই অধ্যায়ে আমরা জানব, কেন এই বিপ্লব ঘটেছিল, এর পেছনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো কী ছিল, কোন কোন ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে এটি এগিয়েছিল এবং অবশেষে এর ফলাফল কী হয়েছিল। চলুন, ইতিহাসের সেই উত্তাল সময়ে ফিরে যাই এবং ফরাসি বিপ্লবের প্রতিটি পরত উন্মোচন করি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ফরাসি বিপ্লবকে ভালোভাবে বুঝতে হলে, আমাদের প্রথমে বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে হবে। এই সময়কার সমাজ ব্যবস্থাকে বলা হতো 'পুরাতন তন্ত্র' বা 'Ancien Régime'।
ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে ফ্রান্সের সমাজ (Late 18th Century French Society)
অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সের সমাজ মূলত তিনটি শ্রেণিতে বা এস্টেটে (Estate) বিভক্ত ছিল। এই বিভাজন জন্মের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল এবং এটি ছিল অত্যন্ত বৈষম্যমূলক।
- প্রথম এস্টেট (The First Estate - যাজক সম্প্রদায়): এঁরা ছিলেন চার্চের যাজক বা পাদ্রী। এঁরা ছিলেন সমাজের সর্বোচ্চ স্তরের মানুষ। ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম হয়েও তাঁরা দেশের মোট জমির প্রায় ১০ শতাংশের মালিক ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তাঁদের কোনো প্রকার কর দিতে হতো না। বরং তাঁরা 'টাইদ' (Tithe) নামক একপ্রকার ধর্মীয় কর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করতেন।
- দ্বিতীয় এস্টেট (The Second Estate - অভিজাত সম্প্রদায়): এঁরা ছিলেন বংশানুক্রমিক জমিদার এবং অভিজাত শ্রেণির মানুষ। এঁরাও জনসংখ্যার খুব সামান্য একটি অংশ (প্রায় ২ শতাংশ) ছিলেন কিন্তু দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন। যাজকদের মতোই এঁরাও রাষ্ট্রকে কোনো প্রত্যক্ষ কর দিতেন না এবং বিভিন্ন সামন্ততান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন। বড় বড় সরকারি ও সামরিক পদগুলো তাঁদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল।
- তৃতীয় এস্টেট (The Third Estate - সাধারণ মানুষ): ফ্রান্সের প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষই ছিলেন এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই শ্রেণির মধ্যেও অনেক ভাগ ছিল।
- বুর্জোয়া শ্রেণি: এর মধ্যে ছিলেন বড় ব্যবসায়ী, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক এবং সরকারি কর্মচারীর মতো শিক্ষিত ও ধনী ব্যক্তিরা। আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক মর্যাদায় তাঁরা অভিজাতদের থেকে পিছিয়ে ছিলেন এবং তাঁদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না।
- কারিগর ও শ্রমিক: শহরের ছোট কারিগর, দোকানদার এবং দিনমজুররা এই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
- কৃষক: তৃতীয় এস্টেটের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিলেন কৃষক। তাঁদের মধ্যে কিছু জমির মালিক থাকলেও অধিকাংশই ছিলেন ভূমিহীন বা অন্যের জমিতে ভাগচাষী। রাষ্ট্রের সমস্ত করের বোঝা মূলত তাঁদেরকেই বহন করতে হতো। রাষ্ট্রকে 'তাইলে' (Taille) নামক প্রত্যক্ষ কর ছাড়াও পরোক্ষ কর হিসেবে লবণ, তামাক ইত্যাদির উপর কর দিতে হতো।
এই বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা তৃতীয় এস্টেটের মানুষের মনে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, যা বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিপ্লবের কারণসমূহ (Causes of the Revolution)
ফরাসি বিপ্লব কোনো একটিমাত্র কারণে ঘটেনি। এর পেছনে ছিল একাধিক সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং বৌদ্ধিক কারণের সম্মিলিত প্রভাব।
১. সামাজিক কারণ (Social Causes)
উপরে আলোচিত এস্টেট-ভিত্তিক বৈষম্যই ছিল প্রধান সামাজিক কারণ। তৃতীয় এস্টেটের মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষিত বুর্জোয়া শ্রেণি, জন্মগত অধিকারের ভিত্তিতে তৈরি এই বৈষম্য মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁরা যোগ্যতার ভিত্তিতে সামাজিক মর্যাদা দাবি করছিলেন, যা পুরাতন তন্ত্রে সম্ভব ছিল না।
২. অর্থনৈতিক কারণ (Economic Causes)
রাজকোষ শূন্য: রাজা ষোড়শ লুই (Louis XVI) যখন সিংহাসনে বসেন, তখন রাজকোষ প্রায় শূন্য ছিল। এর পেছনে ছিল বেশ কিছু কারণ:
- দীর্ঘ যুদ্ধ: ফ্রান্স দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, যেমন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্রিটেনকে পরাস্ত করার জন্য আমেরিকা পক্ষকে সাহায্য করা। এর ফলে ফ্রান্সের উপর ঋণের বোঝা 엄청 বেড়ে গিয়েছিল।
- রাজপরিবারের বিলাসিতা: ভার্সাইয়ের বিশাল রাজপ্রাসাদে রাজা ও তাঁর রানী মারি আঁতোয়ানেত (Marie Antoinette) অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন, যার খরচ আসত সাধারণ মানুষের করের টাকা থেকে।
- ত্রুটিপূর্ণ কর ব্যবস্থা: কর ব্যবস্থার সমস্ত বোঝাই ছিল তৃতীয় এস্টেটের উপর। প্রথম দুই এস্টেট কর দিত না বলে রাষ্ট্রের আয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ছিল।
৩. রাজনৈতিক কারণ (Political Causes)
ফ্রান্সের বুরবোঁ (Bourbon) রাজবংশ ছিল স্বৈরাচারী। রাজা নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে মনে করতেন এবং তাঁর কথাই ছিল আইন। রাজা ষোড়শ লুই একজন দুর্বল এবং সিদ্ধান্তহীন শাসক ছিলেন। তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও অভিজাতদের চাপে কোনো কার্যকরী সংস্কার করতে পারেননি। প্রশাসন ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অদক্ষ।
৪. দার্শনিকদের ভূমিকা (Role of Philosophers)
অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সে একদল দার্শনিকের আবির্ভাব হয়, যাঁরা তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে পুরাতন তন্ত্রের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এঁদের বলা হয় জ্ঞানদীপ্তির (Enlightenment) যুগের দার্শনিক।
- জন লক (John Locke): তাঁর 'টু ট্রিটিজেস অফ গভর্নমেন্ট' (Two Treatises of Government) গ্রন্থে তিনি রাজার দৈবস্বত্ব বা ঈশ্বরের প্রদত্ত ক্ষমতার ধারণাকে খণ্ডন করেন।
- জঁ-জাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau): তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য সোশ্যাল কনট্র্যাক্ট' (The Social Contract)-এ তিনি জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা বলেন। তাঁর মতে, সরকার গঠিত হবে জনগণ এবং তাদের প্রতিনিধিদের মধ্যে সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে।
- মন্তেস্কু (Montesquieu): তাঁর 'দ্য স্পিরিট অফ দ্য লজ' (The Spirit of the Laws) বইতে তিনি ক্ষমতার বিভাজন নীতির প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, সরকারের ক্ষমতাকে আইনসভা (Legislative), কার্যपालिका (Executive), এবং বিচারবিভাগ (Judiciary)-এর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া উচিত, যাতে কোনো এক বিভাগ স্বৈরাচারী হতে না পারে।
এই দার্শনিকদের চিন্তাভাবনা বই, সংবাদপত্র, এবং সেলুন ও কফি হাউসের আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁদেরকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।
বিপ্লবের সূত্রপাত এবং প্রধান ঘটনাক্রম (The Outbreak and Major Events)
অর্থনৈতিক সংকট চরমে পৌঁছালে রাজা ষোড়শ লুই নতুন কর আরোপের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ফ্রান্সের নিয়ম অনুযায়ী, নতুন কর আরোপ করতে হলে এস্টেটস-জেনারেল (Estates-General) বা জাতীয় প্রতিনিধি সভার অনুমোদন প্রয়োজন ছিল।
এস্টেটস-জেনারেলের অধিবেশন: ১৭৫ বছর পর, ১৭৮৯ সালের ৫ই মে ভার্সাইয়ে এস্টেটস-জেনারেলের অধিবেশন ডাকা হয়। প্রথা অনুযায়ী, প্রতিটি এস্টেটের একটিমাত্র ভোট ছিল। এর অর্থ হলো, প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেট একজোট হয়ে সহজেই তৃতীয় এস্টেটের যেকোনো প্রস্তাবকে হারিয়ে দিতে পারত। তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে, প্রতিটি সদস্যের একটি করে ভোট থাকা উচিত (one person, one vote)। রাজা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা সভা থেকে বেরিয়ে যান।
টেনিস কোর্টের শপথ (Tennis Court Oath): ২০শে জুন, তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা ভার্সাইয়ের একটি টেনিস কোর্টে একত্রিত হন। তাঁরা শপথ নেন যে, যতক্ষণ না তাঁরা ফ্রান্সের জন্য একটি নতুন সংবিধান রচনা করছেন, ততক্ষণ তাঁরা সেখান থেকে যাবেন না। এই ঘটনাটি 'টেনিস কোর্টের শপথ' নামে পরিচিত। তাঁরা নিজেদের 'জাতীয় সভা' (National Assembly) বলে ঘোষণা করেন।
বাস্তিল দুর্গের পতন (Storming of the Bastille): এদিকে প্যারিসে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাজা জাতীয় সভাকে ভেঙে দেওয়ার জন্য সৈন্য পাঠাচ্ছেন। উত্তেজিত জনতা ১৪ই জুলাই, ১৭৮৯ তারিখে স্বৈরাচারী শাসনের প্রতীক বাস্তিল দুর্গ (Bastille Fortress) আক্রমণ করে। এই দুর্গটি ছিল রাজার কারাগার এবং অস্ত্রাগার। জনতা দুর্গটি ধ্বংস করে দেয় এবং বন্দীদের মুক্ত করে। এই ঘটনাটি ফরাসি বিপ্লবের প্রতীকী সূচনা হিসেবে গণ্য হয় এবং ফ্রান্সে ১৪ই জুলাই দিনটি জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়।
ফ্রান্স একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয় (France Becomes a Constitutional Monarchy)
বিপ্লবের চাপে রাজা জাতীয় সভাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন। ১৭৮৯ সালের ৪ঠা আগস্ট, জাতীয় সভা একটি আইন পাশ করে সামন্ততান্ত্রিক প্রথা, ধর্মীয় কর (টাইদ) এবং অভিজাতদের সমস্ত বিশেষ অধিকার বিলুপ্ত করে।
এরপর, 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র' (Declaration of the Rights of Man and Citizen) জারি করা হয়। এতে জীবনধারণের অধিকার, বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, এবং আইনের চোখে সকলের সমানাধিকারের মতো नैसर्गिक অধিকারগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
১৭৯১ সালে জাতীয় সভা সংবিধান রচনার কাজ শেষ করে। এই সংবিধানের মাধ্যমে রাজার ক্ষমতাকে সীমিত করে দেওয়া হয় এবং ক্ষমতাকে আইনসভা, কার্যपालिका ও বিচারবিভাগের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। ফ্রান্স একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। তবে, ভোটাধিকার সকলের জন্য ছিল না। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিমাণ কর প্রদানকারী ২৫ বছরের বেশি বয়সের পুরুষরাই 'সক্রিয় নাগরিক' (Active Citizen) হিসেবে ভোটাধিকার পান। বাকি পুরুষ এবং সমস্ত মহিলা 'নিষ্ক্রিয় নাগরিক' (Passive Citizen) হিসেবে গণ্য হন।
ফ্রান্স রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় (France Abolishes Monarchy and Becomes a Republic)
রাজা ষোড়শ লুই নতুন সংবিধান মনে মনে মেনে নিতে পারেননি। তিনি অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার রাজার সাথে গোপনে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে বিপ্লবী জনতা আরও ক্ষুব্ধ হয়। ১৭৯২ সালে জাতীয় সভা অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এই সময়ে রাজনৈতিক ক্লাবগুলি খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল জ্যাকোবিন ক্লাব (Jacobin Club), যার নেতা ছিলেন ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবসপিয়ের (Maximilien Robespierre)। জ্যাকোবিনরা ছিলেন সমাজের অপেক্ষাকৃত কম সচ্ছল অংশের প্রতিনিধি।
১৭৯২ সালের ১০ই আগস্ট, জ্যাকোবিনদের নেতৃত্বে একদল উত্তেজিত জনতা টুইলারিস (Tuileries) রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে এবং রাজাকে বন্দী করে। এরপর নতুন করে নির্বাচন হয় এবং নবগঠিত আইনসভার নাম হয় কনভেনশন (Convention)। ২১শে সেপ্টেম্বর, ১৭৯২, কনভেনশন রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটায় এবং ফ্রান্সকে একটি প্রজাতন্ত্র (Republic) হিসেবে ঘোষণা করে।
এরপর 'দেশদ্রোহিতা'র অভিযোগে রাজা ষোড়শ লুইয়ের বিচার হয় এবং ১৭৯৩ সালের ২১শে জানুয়ারি, গিলোটিনে (Guillotine) তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়।
সন্ত্রাসের রাজত্ব (The Reign of Terror)
প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর ফ্রান্স অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। এই পরিস্থিতিতে, জ্যাকোবিন নেতা রোবসপিয়ের ক্ষমতা দখল করেন। ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনকাল 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' নামে পরিচিত।
রোবসপিয়ের 'প্রজাতন্ত্রের শত্রু'দের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। অভিজাত, যাজক, এমনকি তাঁর নীতির বিরোধী নিজ দলের সদস্যদেরও গ্রেপ্তার করে বিপ্লবী আদালতে বিচার করা হতো। দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁদের গিলোটিনে পাঠানো হতো। এই সময়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়।
তবে, রোবসপিয়ের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও নিয়েছিলেন, যেমন খাদ্যদ্রব্যের দাম ও মজুরি নির্ধারণ করে দেওয়া, মাংস ও পাউরুটির রেশন ব্যবস্থা চালু করা ইত্যাদি। কিন্তু তাঁর চরমপন্থী নীতির কারণে জ্যাকোবিনরাও তাঁর বিরুদ্ধে চলে যায়। অবশেষে, ১৭৯৪ সালের জুলাই মাসে রোবসপিয়েরকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং গিলোটিনে তাঁরও শিরশ্ছেদ করা হয়। এর সাথে সাথেই সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে।
ডাইরেক্টরির শাসন এবং নেপোলিয়নের উত্থান (A Directory Rules and Napoleon's Rise)
রোবসপিয়েরের পতনের পর ফ্রান্সের ক্ষমতা আবার মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে চলে যায়। একটি নতুন সংবিধান তৈরি হয়, যা সম্পত্তিহীনদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়। পাঁচজন সদস্য নিয়ে গঠিত একটি কার্যনির্বাহী পরিষদ বা ডাইরেক্টরি (Directory) ফ্রান্সের শাসনভার গ্রহণ করে।
কিন্তু ডাইরেক্টরির সদস্যরা প্রায়শই আইনসভার সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়তেন, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ফরাসি সেনাবাহিনীর একজন তরুণ ও উচ্চাভিলাষী সেনাপতি, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (Napoleon Bonaparte), ১৭৯৯ সালে ক্ষমতা দখল করেন। প্রথমে তিনি কনসাল এবং পরে ১৮০৪ সালে নিজেকে ফ্রান্সের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন। ফরাসি বিপ্লবের সমাপ্তি ঘটে এবং নেপোলিয়নের যুগের সূচনা হয়।
বিপ্লবের উত্তরাধিকার (Legacy of the Revolution)
যদিও বিপ্লবটি নেপোলিয়নের একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল, কিন্তু এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
- স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব: এই তিনটি আদর্শ ছিল ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র, যা পরবর্তীকালে সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
- গণতান্ত্রিক অধিকার: বিপ্লবটি নাগরিক অধিকার, ভোটাধিকার এবং আইনের শাসনের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে।
- জাতীয়তাবাদ: বিপ্লবের সময় ফরাসি জনগণের মধ্যে যে ঐক্য ও দেশপ্রেমের জন্ম হয়েছিল, তা আধুনিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করে।
- সামন্ততন্ত্রের অবসান: বিপ্লব ইউরোপ থেকে সামন্ততান্ত্রিক প্রথার বিলুপ্তির পথ প্রশস্ত করে।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরাও, যেমন টিপু সুলতান এবং রাজা রামমোহন রায়, ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ফরাসি বিপ্লবের তিনটি মূল আদর্শ কী ছিল এবং তাদের তাৎপর্য কী?
উত্তর: ফরাসি বিপ্লবের তিনটি মূল আদর্শ ছিল – স্বাধীনতা (Liberty), সাম্য (Equality), এবং ভ্রাতৃত্ব (Fraternity)।
- স্বাধীনতা: এর অর্থ হলো ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্তি।
- সাম্য: এর অর্থ হলো আইনের চোখে সকলের সমান অধিকার এবং জন্ম বা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধার বিলুপ্তি।
- ভ্রাতৃত্ব: এর অর্থ হলো দেশের সকল নাগরিকের মধ্যে ঐক্য ও সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করা।
প্রশ্ন ২: 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' বলতে কী বোঝায়? এর জন্য কে দায়ী ছিলেন?
উত্তর: 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' বলতে ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত সময়কালকে বোঝায় যখন ফ্রান্সের শাসনভার জ্যাকোবিন নেতা ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবসপিয়েরের হাতে ছিল। এই সময়ে, প্রজাতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শত্রুদের দমন করার জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তির নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষকে 'প্রজাতন্ত্রের শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করে বিনা বিচারে বা সংক্ষিপ্ত বিচারে গিলোটিনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। এই চরম দমন-পীড়নের সময়কালকেই 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' বলা হয়। এর জন্য মূলত রোবসপিয়ের এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন 'কমিটি অফ পাবলিক সেফটি' দায়ী ছিল।
প্রশ্ন ৩: বাস্তিল দুর্গের পতন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ছিল?
উত্তর: ১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই বাস্তিল দুর্গের পতন ফরাসি বিপ্লবের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতীকী ঘটনা। এর কারণগুলি হলো:
- স্বৈরাচারের প্রতীক: বাস্তিল দুর্গ ছিল রাজার স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রতীক, কারণ এখানে রাজনৈতিক বন্দীদের আটকে রাখা হতো। এর পতন রাজার ক্ষমতার পতনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
- বিপ্লবের সূচনা: এই ঘটনাটিই ছিল রাজার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রথম সংগঠিত এবং সফল সশস্ত্র অভ্যুত্থান, যা বিপ্লবকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
- জনগণের শক্তি প্রদর্শন: এটি দেখিয়ে দেয় যে সংগঠিত জনতা রাজার সামরিক শক্তিকেও পরাজিত করতে পারে, যা বিপ্লবীদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সারসংক্ষেপ
আসুন, এই অধ্যায়ের মূল বিষয়গুলি একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক।
- ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ফ্রান্সের স্বৈরাচারী বুরবোঁ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায়।
- বিপ্লবের আগে ফরাসি সমাজ তিনটি এস্টেটে বিভক্ত ছিল, যেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেট সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত এবং তৃতীয় এস্টেটকে সমস্ত করের বোঝা বহন করতে হতো।
- অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য, রাজার দুর্বল শাসন এবং দার্শনিকদের অনুপ্রেরণা বিপ্লবের প্রধান কারণ ছিল।
- টেনিস কোর্টের শপথ এবং বাস্তিল দুর্গের পতন ছিল বিপ্লবের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ঘটনা।
- বিপ্লব বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যায়: সাংবিধানিক রাজতন্ত্র (১৭৯১-৯২), প্রজাতন্ত্র ও সন্ত্রাসের রাজত্ব (১৭৯২-৯৪), এবং ডাইরেক্টরির শাসন (১৭৯৫-৯৯)।
- রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ক্ষমতা দখল করেন এবং বিপ্লবের সমাপ্তি ঘটান।
- এই বিপ্লব বিশ্বকে 'স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব'-এর মতো মহান আদর্শ উপহার দিয়েছে যা আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছে।