অ্যাসিড, ক্ষারক ও লবণ পরিচিতি
ছাত্রছাত্রীরা, তোমাদের NCERT দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকের দ্বিতীয় অধ্যায়: 'অ্যাসিড, ক্ষারক ও লবণ'-এর একটি বিস্তারিত আলোচনায় স্বাগত। এই অধ্যায়টি রসায়নের একটি ভিত্তিপ্রস্তর, যা আমাদের প্রতিদিন ব্যবহৃত অনেক পদার্থের ধর্ম বুঝতে সাহায্য করে। লেবুর টক স্বাদ থেকে শুরু করে বেকিং সোডার তিক্ত স্বাদ এবং খাবারের নোনতা ভাব পর্যন্ত, এই অধ্যায়ের নীতিগুলি আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। এই নির্দেশিকায়, আমরা নির্দেশক ব্যবহার করে অ্যাসিড এবং ক্ষারক শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে তাদের রাসায়নিক বিক্রিয়া, pH স্কেলের তাৎপর্য এবং লবণের আকর্ষণীয় জগৎ পর্যন্ত প্রতিটি ধারণা ভেঙে আলোচনা করব। এই পোস্টের শেষে, এই তিন শ্রেণীর যৌগ কীভাবে রসায়ন এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সে সম্পর্কে তোমাদের একটি সুস্পষ্ট এবং গভীর ধারণা তৈরি হবে।
অ্যাসিড এবং ক্ষারকের ধর্ম বোঝা
অ্যাসিড এবং ক্ষারক হলো দুটি মৌলিক শ্রেণীর রাসায়নিক যৌগ যাদের নির্দিষ্ট ধর্ম রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, অ্যাসিডগুলি তাদের টক স্বাদের জন্য পরিচিত ছিল ('acid' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'acidus' থেকে এসেছে যার অর্থ টক), এবং ক্ষারকগুলি তাদের তিক্ত স্বাদ এবং সাবানের মতো পিচ্ছিল অনুভূতির জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু, রাসায়নিক পদার্থের স্বাদ গ্রহণ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এটি কখনই করা উচিত নয়! পরিবর্তে, আমরা তাদের শনাক্ত করতে এবং অধ্যয়ন করতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং নির্দেশক ব্যবহার করি।
১. নির্দেশক: রাসায়নিক গোয়েন্দা
স্বাদ না নিয়ে আমরা কীভাবে বুঝব একটি পদার্থ আম্লিক না ক্ষারকীয়? আমরা নির্দেশক নামক বিশেষ পদার্থ ব্যবহার করি। একটি নির্দেশক হলো এমন একটি রঞ্জক যা অ্যাসিড বা ক্ষারকের সংস্পর্শে এলে তার রঙ পরিবর্তন করে। এগুলি আমাদের রাসায়নিক গোয়েন্দার মতো, যা একটি দ্রবণের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের চাক্ষুষ সংকেত দেয়।
প্রাকৃতিক নির্দেশক
- লিটমাস: স্কুল ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত সবচেয়ে সাধারণ নির্দেশক হলো লিটমাস, যা লাইকেন থেকে নিষ্কাশন করা হয়। একটি প্রশম দ্রবণে এর রঙ বেগুনি। যখন এটি একটি আম্লিক দ্রবণে যোগ করা হয়, তখন এটি লাল হয়ে যায়। যখন এটি একটি ক্ষারকীয় দ্রবণে যোগ করা হয়, তখন এটি নীল হয়ে যায়। লিটমাস দ্রবণ বা কাগজের স্ট্রিপ (নীল লিটমাস পেপার এবং লাল লিটমাস পেপার) হিসাবে পাওয়া যায়।
- হলুদ (Haldi): প্রত্যেক ভারতীয় রান্নাঘরের একটি সাধারণ মশলা, হলুদ, একটি প্রাকৃতিক নির্দেশকও বটে। এর রঙ হলুদ। একটি আম্লিক বা প্রশম দ্রবণে এটি হলুদই থাকে। কিন্তু, একটি ক্ষারকীয় দ্রবণে এটি একটি স্বতন্ত্র লালচে-বাদামী রঙ ধারণ করে। তোমরা হয়তো দেখে থাকবে যখন তোমাদের সাদা শার্টে তরকারির দাগ লাগে, তখন সাবান (যা ক্ষারকীয়) দিয়ে ধোয়ার পরে সেটি লাল হয়ে যায়।
- লাল বাঁধাকপির রস: লাল বাঁধাকপির রস মূলত বেগুনি রঙের। এটি আম্লিক দ্রবণে লালচে এবং ক্ষারকীয় দ্রবণে সবুজাভ-হলুদ হয়ে যায়।
সংশ্লেষিত (কৃত্রিম) নির্দেশক
এগুলি পরীক্ষাগারে আরও নির্ভুল পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত মনুষ্যসৃষ্ট নির্দেশক।
- ফেনলফথ্যালিন: এটি একটি বর্ণহীন দ্রবণ। এটি আম্লিক এবং প্রশম দ্রবণে বর্ণহীন থাকে কিন্তু ক্ষারকীয় দ্রবণে একটি উজ্জ্বল গোলাপি রঙে পরিণত হয়।
- মিথাইল অরেঞ্জ: এই নির্দেশকটি একটি প্রশম দ্রবণে কমলা রঙের হয়। এটি আম্লিক দ্রবণে লাল এবং ক্ষারকীয় দ্রবণে হলুদ হয়ে যায়।
ঘ্রাণভিত্তিক নির্দেশক
কিছু পদার্থের একটি বিশেষ গন্ধ থাকে যা আম্লিক বা ক্ষারকীয় দ্রবণে পরিবর্তিত হয়। এগুলিকে ঘ্রাণভিত্তিক নির্দেশক বলা হয়। এগুলি বিশেষভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য দরকারী।
- পেঁয়াজ: সূক্ষ্মভাবে কাটা পেঁয়াজের একটি বিশেষ ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। যখন পেঁয়াজের রসে ভেজানো কাপড়ের স্ট্রিপে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের মতো একটি ক্ষারকীয় দ্রবণ যোগ করা হয়, তখন পেঁয়াজের গন্ধ আর পাওয়া যায় না। কিন্তু, HCl-এর মতো একটি অ্যাসিড এই গন্ধ নষ্ট করে না।
- ভ্যানিলা এসেন্স: ভ্যানিলার একটি মনোরম গন্ধ আছে। এই গন্ধটি একটি আম্লিক দ্রবণে বজায় থাকে কিন্তু একটি ক্ষারকীয় দ্রবণে অদৃশ্য হয়ে যায়।
- লবঙ্গ তেল: ভ্যানিলার মতোই, লবঙ্গ তেল একটি অ্যাসিডে তার বিশেষ গন্ধ ধরে রাখে কিন্তু একটি ক্ষারকে তা হারায়।
| নির্দেশক | আম্লিক দ্রবণে রঙ/গন্ধ | ক্ষারকীয় দ্রবণে রঙ/গন্ধ |
|---|---|---|
| নীল লিটমাস | লাল | কোনো পরিবর্তন নেই (নীল) |
| লাল লিটমাস | কোনো পরিবর্তন নেই (লাল) | নীল |
| ফেনলফথ্যালিন | বর্ণহীন | গোলাপি |
| মিথাইল অরেঞ্জ | লাল | হলুদ |
| হলুদ | কোনো পরিবর্তন নেই (হলুদ) | লালচে-বাদামী |
| পেঁয়াজ (ঘ্রাণভিত্তিক) | গন্ধ থেকে যায় | গন্ধ চলে যায় |
২. ধাতুর সাথে অ্যাসিড এবং ক্ষারকের বিক্রিয়া কেমন হয়?
একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক ধর্ম হলো অ্যাসিড এবং ক্ষারক কীভাবে ধাতুর সাথে পারস্পরিক ক্রিয়া করে। যখন একটি অ্যাসিড কোনো সক্রিয় ধাতুর সাথে বিক্রিয়া করে, তখন এটি সাধারণত একটি ধাতব লবণ এবং হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে। হাইড্রোজেন গ্যাসের বুদবুদ ওঠার মাধ্যমে এটি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
সাধারণ বিক্রিয়াটি হলো:
অ্যাসিড + ধাতু → লবণ + হাইড্রোজেন গ্যাস
উদাহরণস্বরূপ, যখন জিঙ্কের দানা লঘু সালফিউরিক অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে:
H₂SO₄(aq) + Zn(s) → ZnSO₄(aq) + H₂(g)
এখানে, জিঙ্ক সালফেট (একটি লবণ) তৈরি হয় এবং হাইড্রোজেন গ্যাস নির্গত হয়। হাইড্রোজেন গ্যাস পরীক্ষা করার জন্য, গ্যাসের কাছে একটি জ্বলন্ত সলতে আনলে, এটি একটি বিশেষ 'পপ' শব্দ করে নিভে যাবে।
ক্ষারকগুলিও কিছু সক্রিয় ধাতু, যেমন জিঙ্ক এবং অ্যালুমিনিয়ামের সাথে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে। তবে, সমস্ত ধাতু ক্ষারকের সাথে বিক্রিয়া করে না।
সাধারণ বিক্রিয়াটি হলো:
ক্ষারক + ধাতু → লবণ + হাইড্রোজেন গ্যাস
উদাহরণস্বরূপ, যখন জিঙ্ক সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের মতো একটি শক্তিশালী ক্ষারকের সাথে বিক্রিয়া করে:
2NaOH(aq) + Zn(s) → Na₂ZnO₂(aq) + H₂(g)
এখানে গঠিত লবণটি হলো সোডিয়াম জিঙ্কেট।
৩. ধাতব কার্বনেট এবং ধাতব হাইড্রোজেনকার্বনেটের সাথে অ্যাসিডের বিক্রিয়া
অ্যাসিডগুলি ধাতব কার্বনেট (যেমন ওয়াশিং সোডা) এবং ধাতব হাইড্রোজেনকার্বনেট (যেমন বেকিং সোডা)-এর সাথে বিক্রিয়া করে লবণ, কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস এবং জল তৈরি করে।
সাধারণ বিক্রিয়াগুলি হলো:
অ্যাসিড + ধাতব কার্বনেট → লবণ + কার্বন ডাইঅক্সাইড + জল
অ্যাসিড + ধাতব হাইড্রোজেনকার্বনেট → লবণ + কার্বন ডাইঅক্সাইড + জল
উদাহরণস্বরূপ, সোডিয়াম কার্বনেটের সাথে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের বিক্রিয়া:
Na₂CO₃(s) + 2HCl(aq) → 2NaCl(aq) + H₂O(l) + CO₂(g)
এবং সোডিয়াম হাইড্রোজেনকার্বনেটের সাথে:
NaHCO₃(s) + HCl(aq) → NaCl(aq) + H₂O(l) + CO₂(g)
উৎপন্ন কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসটিকে চুনজলের (ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইডের দ্রবণ, Ca(OH)₂) মধ্যে দিয়ে চালনা করে পরীক্ষা করা যেতে পারে। ক্যালসিয়াম কার্বনেটের একটি সাদা অধঃক্ষেপ তৈরির কারণে চুনজল ঘোলা হয়ে যায়।
Ca(OH)₂(aq) + CO₂(g) → CaCO₃(s) + H₂O(l)
যদি অতিরিক্ত CO₂ চালনা করা হয়, তবে অধঃক্ষেপটি দ্রবণীয় ক্যালসিয়াম হাইড্রোজেনকার্বনেট তৈরি করে দ্রবীভূত হয়ে যাওয়ায় ঘোলাটে ভাবটি অদৃশ্য হয়ে যায়।
CaCO₃(s) + H₂O(l) + CO₂(g) → Ca(HCO₃)₂(aq)
৪. প্রশমন বিক্রিয়া: অ্যাসিডের সাথে ক্ষারকের বিক্রিয়া
যখন একটি অ্যাসিড এবং একটি ক্ষারক মেশানো হয় তখন কী ঘটে? তারা একে অপরের প্রভাবকে প্রশমিত করে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিক্রিয়াটিকে প্রশমন বিক্রিয়া বলা হয়।
এই বিক্রিয়ায়, একটি অ্যাসিড এবং একটি ক্ষারক বিক্রিয়া করে লবণ এবং জল তৈরি করে।
সাধারণ বিক্রিয়াটি হলো:
অ্যাসিড + ক্ষারক → লবণ + জল
উদাহরণস্বরূপ, যখন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (একটি অ্যাসিড) সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের (একটি ক্ষারক) সাথে বিক্রিয়া করে:
HCl(aq) + NaOH(aq) → NaCl(aq) + H₂O(l)
এখানে, সোডিয়াম ক্লোরাইড (সাধারণ লবণ) এবং জল তৈরি হয়। অ্যাসিড থেকে H⁺ আয়ন ক্ষারকের OH⁻ আয়নের সাথে মিলিত হয়ে জল (H₂O) তৈরি করে, যা কার্যকরভাবে আম্লিক এবং ক্ষারকীয় উভয় ধর্মকেই বাতিল করে দেয়।
৫. ধাতব অক্সাইডের সাথে অ্যাসিডের বিক্রিয়া
ধাতব অক্সাইডগুলি (একটি ধাতু এবং অক্সিজেনের যৌগ, যেমন কপার অক্সাইড বা ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড) সাধারণত ক্ষারকীয় প্রকৃতির হয়। যেহেতু তারা ক্ষারকীয়, তাই তারা অ্যাসিডের সাথে একটি প্রশমন বিক্রিয়ায় লবণ এবং জল তৈরি করে।
সাধারণ বিক্রিয়াটি হলো:
ধাতব অক্সাইড + অ্যাসিড → লবণ + জল
উদাহরণস্বরূপ, যখন কপার(II) অক্সাইড, একটি কালো কঠিন পদার্থ, লঘু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে, তখন কপার(II) ক্লোরাইড গঠনের কারণে দ্রবণটি নীল-সবুজ হয়ে যায় এবং অক্সাইডটি দ্রবীভূত হয়।
CuO(s) + 2HCl(aq) → CuCl₂(aq) + H₂O(l)
এটি নিশ্চিত করে যে ধাতব অক্সাইডগুলি হলো ক্ষারকীয় অক্সাইড।
৬. অধাতব অক্সাইডের সাথে ক্ষারকের বিক্রিয়া
বিপরীতভাবে, অধাতব অক্সাইডগুলি (একটি অধাতু এবং অক্সিজেনের যৌগ, যেমন কার্বন ডাইঅক্সাইড বা সালফার ডাইঅক্সাইড) সাধারণত আম্লিক প্রকৃতির হয়। আম্লিক অক্সাইড হিসাবে, তারা ক্ষারকের সাথে বিক্রিয়া করে লবণ এবং জল তৈরি করে।
সাধারণ বিক্রিয়াটি হলো:
অধাতব অক্সাইড + ক্ষারক → লবণ + জল
আমরা ইতিমধ্যে এর একটি উদাহরণ দেখেছি: কার্বন ডাইঅক্সাইড (একটি অধাতব অক্সাইড) এবং ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড (একটি ক্ষারক)-এর মধ্যে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম কার্বনেট (একটি লবণ) এবং জল তৈরি হয়।
CO₂(g) + Ca(OH)₂(aq) → CaCO₃(s) + H₂O(l)
এই সম্পর্কটি আমাদের তাদের বিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে অক্সাইডগুলিকে শ্রেণীবদ্ধ করতে সাহায্য করে।
সমস্ত অ্যাসিড এবং সমস্ত ক্ষারকের মধ্যে মিল কী?
যদিও অ্যাসিড এবং ক্ষারকের বিভিন্ন ধর্ম আছে, তাদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যও রয়েছে যা তাদের সংজ্ঞায়িত করে। এই মিলটি হলো তারা জলে দ্রবীভূত হয়ে যে আয়ন তৈরি করে তার মধ্যে।
H⁺(aq) এবং OH⁻(aq) আয়নের ভূমিকা
অ্যাসিড এবং ক্ষারক বোঝার চাবিকাঠি হলো জলীয় দ্রবণে (জলে দ্রবীভূত) তাদের আচরণ।
- সমস্ত অ্যাসিডের মধ্যে হাইড্রোজেন সাধারণ উপাদান। যখন একটি অ্যাসিড জলে দ্রবীভূত হয়, তখন এটি বিয়োজিত বা আয়নিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺) তৈরি করে। এই H⁺ আয়নের উপস্থিতিই তাদের আম্লিক ধর্মের জন্য দায়ী। উদাহরণস্বরূপ, জলে HCl, H⁺ এবং Cl⁻ আয়ন তৈরি করে।
- সমস্ত ক্ষারকের মধ্যে একটি হাইড্রক্সিল গ্রুপ সাধারণ উপাদান। যখন একটি ক্ষারক জলে দ্রবীভূত হয়, তখন এটি বিয়োজিত হয়ে হাইড্রক্সাইড আয়ন (OH⁻) তৈরি করে। এই OH⁻ আয়নের উপস্থিতি তাদের ক্ষারকীয় ধর্মের জন্য দায়ী। উদাহরণস্বরূপ, জলে NaOH, Na⁺ এবং OH⁻ আয়ন তৈরি করে।
জলীয় দ্রবণে অ্যাসিড এবং ক্ষারকের আচরণ
একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দেখায় যে আম্লিক ধর্ম কেবল জলের উপস্থিতিতেই প্রদর্শিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, শুষ্ক HCl গ্যাস শুষ্ক নীল লিটমাস পেপারের রঙ পরিবর্তন করে না। কিন্তু, যখন লিটমাস পেপারটি আর্দ্র থাকে, তখন এটি লাল হয়ে যায়। এর কারণ হলো HCl কেবল জলে দ্রবীভূত হলেই H⁺ আয়ন তৈরি করতে পারে।
অ্যাসিড দ্বারা উৎপাদিত হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺) একা থাকতে পারে না। তারা অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল এবং চারপাশের জলের অণু (H₂O) এর সাথে মিলিত হয়ে হাইড্রেনিয়াম আয়ন (H₃O⁺) তৈরি করে।
H⁺ + H₂O → H₃O⁺
সুতরাং, জলে HCl-এর বিয়োজন আরও সঠিকভাবে দেখানো হয় এভাবে:
HCl(g) + H₂O(l) → H₃O⁺(aq) + Cl⁻(aq)
একইভাবে, সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের মতো ক্ষারক জলে দ্রবীভূত হয়ে হাইড্রক্সাইড আয়ন দেয়:
NaOH(s) --(জল)--> Na⁺(aq) + OH⁻(aq)
যেসব ক্ষারক জলে দ্রবণীয়, তাদের ক্ষার বলা হয়। অতএব, সমস্ত ক্ষারই ক্ষারক, কিন্তু সমস্ত ক্ষারক ক্ষার নয় (কিছু ক্ষারক জলে অদ্রবণীয়, যেমন কপার(II) হাইড্রক্সাইড)।
জলে একটি অ্যাসিড বা ক্ষারক দ্রবীভূত করার প্রক্রিয়াটি একটি অত্যন্ত তাপমোচী বিক্রিয়া, অর্থাৎ এটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তাপ নির্গত করে। এই কারণেই আপনাকে সর্বদা ধীরে ধীরে এবং ক্রমাগত নাড়তে নাড়তে অ্যাসিডকে জলে যোগ করতে হবে, এবং কখনই উল্টোটা করা যাবে না। একটি গাঢ় অ্যাসিডে জল যোগ করলে এত তাপ উৎপন্ন হতে পারে যে মিশ্রণটি ছিটকে বেরিয়ে এসে গুরুতর পোড়া ক্ষতের কারণ হতে পারে।
অ্যাসিড এবং ক্ষারকের শক্তি: pH স্কেল
সমস্ত অ্যাসিড এবং ক্ষারক সমান শক্তিশালী নয়। কিছু, যেমন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, অত্যন্ত ক্ষয়কারী (শক্তিশালী অ্যাসিড), অন্যগুলো, যেমন অ্যাসিটিক অ্যাসিড (ভিনিগারে), অনেক হালকা (দুর্বল অ্যাসিড)। আমাদের এই শক্তিকে পরিমাণগতভাবে পরিমাপ করার একটি উপায় প্রয়োজন। এখানেই pH স্কেল আসে।
pH স্কেল বোঝা
pH স্কেল হলো একটি দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়ন ঘনত্ব পরিমাপের একটি স্কেল। pH-এর 'p' অক্ষরটি 'potenz' (পোটেনজ) থেকে এসেছে, যা একটি জার্মান শব্দ যার অর্থ 'শক্তি'। স্কেলটি সাধারণত ০ থেকে ১৪ পর্যন্ত হয়।
- একটি pH মান ৭ হলে তা প্রশম হিসাবে বিবেচিত হয় (যেমন বিশুদ্ধ জল)।
- একটি pH মান ৭-এর কম হলে তা একটি আম্লিক দ্রবণ নির্দেশ করে।
- একটি pH মান ৭-এর বেশি হলে তা একটি ক্ষারকীয় (বা ক্ষারীয়) দ্রবণ নির্দেশ করে।
pH মান যত কম হবে (০-এর কাছাকাছি), অ্যাসিড তত শক্তিশালী হবে। pH মান যত বেশি হবে (১৪-এর কাছাকাছি), ক্ষারক তত শক্তিশালী হবে। উদাহরণস্বরূপ, pH ১-এর একটি দ্রবণ pH ৬-এর একটি দ্রবণের চেয়ে অনেক শক্তিশালী অ্যাসিড। pH ১৩-এর একটি দ্রবণ pH ৮-এর একটি দ্রবণের চেয়ে অনেক শক্তিশালী ক্ষারক।
একটি সার্বজনীন নির্দেশক হলো বেশ কয়েকটি নির্দেশকের মিশ্রণ যা বিভিন্ন pH মানে বিভিন্ন রঙ দেখায়, যা সাধারণ লিটমাস পেপারের তুলনায় একটি দ্রবণের pH আরও নির্ভুলভাবে অনুমান করতে সাহায্য করে।
দৈনন্দিন জীবনে pH-এর গুরুত্ব
pH স্কেল শুধু একটি পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম নয়; এটি অনেক জৈবিক এবং পরিবেশগত প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. আমাদের পাচনতন্ত্রে pH
আমাদের পাকস্থলী হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl) তৈরি করে, যা প্রায় ১.৫ থেকে ৩.৫ pH-এর একটি অত্যন্ত আম্লিক পরিবেশ তৈরি করে। এই কম pH পেপসিন নামক এনজাইমের প্রোটিন হজম করার জন্য অপরিহার্য। তবে, কখনও কখনও অতিরিক্ত অ্যাসিড উৎপাদনের কারণে আমরা 'অম্বল' বা বদহজমে ভুগি। এটি থেকে মুক্তি পেতে, আমরা অ্যান্টাসিড গ্রহণ করি, যা ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রক্সাইড (মিল্ক অফ ম্যাগনেসিয়া) বা সোডিয়াম হাইড্রোজেনকার্বনেটের মতো মৃদু ক্ষারক। এই অ্যান্টাসিডগুলি পাকস্থলীর অতিরিক্ত অ্যাসিডকে প্রশমিত করে স্বস্তি দেয়।
২. দাঁতের ক্ষয়ের কারণ হিসাবে pH পরিবর্তন
আমাদের দাঁত এনামেল দ্বারা আবৃত, যা ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট দিয়ে তৈরি, যা আমাদের শরীরের সবচেয়ে কঠিন পদার্থ। এটি জলে দ্রবীভূত হয় না কিন্তু মুখের pH ৫.৫-এর নিচে নেমে গেলে ক্ষয় হতে শুরু করে। আমাদের মুখে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়া চিনি এবং খাদ্যকণা ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে। টুথপেস্ট ব্যবহার করা, যা সাধারণত ক্ষারকীয়, এই অ্যাসিডকে প্রশমিত করতে এবং দাঁতের ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।
৩. উদ্ভিদের জন্য মাটির pH
উদ্ভিদের সুস্থ বৃদ্ধির জন্য একটি নির্দিষ্ট pH পরিসীমা প্রয়োজন। বেশিরভাগ উদ্ভিদ প্রশম (pH ৬.৫ থেকে ৭.০)-এর কাছাকাছি মাটিতে ভালোভাবে জন্মায়। যদি মাটি খুব বেশি আম্লিক বা খুব বেশি ক্ষারকীয় হয়, তবে উদ্ভিদ সঠিকভাবে বাড়তে পারে না। কৃষকরা প্রায়শই আম্লিক মাটিকে প্রশমিত করতে পোড়াচুন (ক্যালসিয়াম অক্সাইড) বা কলিচুন (ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড)-এর মতো ক্ষারক দিয়ে শোধন করেন।
৪. প্রাণী এবং উদ্ভিদের আত্মরক্ষা
অনেক প্রাণী এবং উদ্ভিদ আত্মরক্ষার জন্য অ্যাসিড এবং ক্ষারক ব্যবহার করে। যখন একটি মৌমাছি হুল ফোটায়, তখন এটি ত্বকে একটি আম্লিক তরল (ফরমিক অ্যাসিড) প্রবেশ করায়, যা তীব্র ব্যথা এবং জ্বালা সৃষ্টি করে। বেকিং সোডা দ্রবণের মতো একটি মৃদু ক্ষারক প্রয়োগ করলে স্বস্তি পাওয়া যায়। একইভাবে, বিছুটি পাতার হুল মিথানোয়িক অ্যাসিড প্রবেশ করায়, যা জ্বালা সৃষ্টি করে। ডক পাতা, যা প্রায়শই বিছুটি গাছের কাছে জন্মায়, ক্ষারকীয় এবং হুলের জ্বালা প্রশমিত করতে আক্রান্ত স্থানে ঘষা যেতে পারে।
লবণ সম্পর্কে একটি গভীর আলোচনা
আমরা শিখেছি যে অ্যাসিড এবং ক্ষারকের বিক্রিয়া থেকে লবণ তৈরি হয়। তবে, বিভিন্ন ধর্ম এবং ব্যবহারসহ বিভিন্ন ধরণের লবণ রয়েছে।
লবণের পরিবার
একই ধনাত্মক আয়ন (ক্যাটায়ন) বা একই ঋণাত্মক আয়ন (অ্যানায়ন) যুক্ত লবণগুলিকে একটি পরিবারের অন্তর্গত বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ:
- সোডিয়াম লবণ: সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) এবং সোডিয়াম সালফেট (Na₂SO₄) সোডিয়াম লবণের পরিবারের অন্তর্গত।
- ক্লোরাইড লবণ: সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইড (KCl) ক্লোরাইড লবণের পরিবারের অন্তর্গত।
লবণের pH
মজার বিষয় হলো, জলে একটি লবণের দ্রবণ সবসময় প্রশম (pH ৭) হয় না। এটি যে অ্যাসিড এবং ক্ষারক থেকে তৈরি হয়েছে তার শক্তির উপর নির্ভর করে এটি আম্লিক, ক্ষারকীয় বা প্রশম হতে পারে।
- একটি শক্তিশালী অ্যাসিড এবং একটি শক্তিশালী ক্ষারকের লবণ: এই লবণগুলি, যেমন NaCl (HCl এবং NaOH থেকে), pH ৭ সহ একটি প্রশম দ্রবণ তৈরি করে।
- একটি শক্তিশালী অ্যাসিড এবং একটি দুর্বল ক্ষারকের লবণ: এই লবণগুলি, যেমন অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড (NH₄Cl, HCl এবং NH₄OH থেকে), pH ৭-এর কম সহ একটি আম্লিক দ্রবণ তৈরি করে।
- একটি দুর্বল অ্যাসিড এবং একটি শক্তিশালী ক্ষারকের লবণ: এই লবণগুলি, যেমন সোডিয়াম অ্যাসিটেট (CH₃COONa, CH₃COOH এবং NaOH থেকে), pH ৭-এর বেশি সহ একটি ক্ষারকীয় দ্রবণ তৈরি করে।
সাধারণ লবণ: অনেক রাসায়নিকের প্রবেশদ্বার
সাধারণ লবণ, বা সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl), শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য নয়। এটি অনেক অন্যান্য দরকারী রাসায়নিক তৈরির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
১. সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (NaOH) - ক্লোর-অ্যালকালি প্রক্রিয়া
যখন NaCl-এর জলীয় দ্রবণের (যাকে ব্রাইন বলা হয়) মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ চালনা করা হয়, তখন এটি বিয়োজিত হয়ে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াটিকে ক্লোর-অ্যালকালি প্রক্রিয়া বলা হয় কারণ উৎপাদিত পদার্থগুলি হলো: ক্লোরিন-এর জন্য 'ক্লোর' এবং সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড-এর জন্য 'অ্যালকালি' (ক্ষার)।
2NaCl(aq) + 2H₂O(l) → 2NaOH(aq) + Cl₂(g) + H₂(g)
এই তিনটি উৎপাদিত পদার্থ—সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড, ক্লোরিন গ্যাস এবং হাইড্রোজেন গ্যাস—বিভিন্ন শিল্পে অত্যন্ত দরকারী।
২. ব্লিচিং পাউডার (CaOCl₂)
শুষ্ক কলিচুনের (Ca(OH)₂) উপর ক্লোরিনের (ক্লোর-অ্যালকালি প্রক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত) ক্রিয়া দ্বারা ব্লিচিং পাউডার তৈরি করা হয়।
Ca(OH)₂(s) + Cl₂(g) → CaOCl₂(s) + H₂O(l)
এর ব্যবহারগুলির মধ্যে রয়েছে বস্ত্র শিল্পে সুতি এবং লিনেন ব্লিচ করা, কাগজ কারখানায় কাঠের মণ্ড ব্লিচ করা এবং পানীয় জল জীবাণুমুক্ত করা।
৩. বেকিং সোডা (NaHCO₃)
বেকিং সোডার রাসায়নিক নাম হলো সোডিয়াম হাইড্রোজেনকার্বনেট। এটি একটি মৃদু, অ-ক্ষয়কারী ক্ষারক। এটি কাঁচামাল হিসাবে সোডিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহার করে তৈরি করা হয়।
NaCl + H₂O + CO₂ + NH₃ → NH₄Cl + NaHCO₃
বেকিং সোডার ব্যবহার:
- রান্নাঘরে: এটি কেক এবং রুটি ফোলাতে রান্নায় ব্যবহৃত হয়। উত্তপ্ত করলে, এটি বিয়োজিত হয়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস তৈরি করে, যা ময়দার তালকে ফুলিয়ে তোলে: 2NaHCO₃(s) --(Heat)--> Na₂CO₃(s) + H₂O(l) + CO₂(g)। এটি বেকিং পাউডারেরও (বেকিং সোডা এবং টার্টারিক অ্যাসিডের মতো একটি মৃদু ভোজ্য অ্যাসিডের মিশ্রণ) একটি উপাদান।
- অ্যান্টাসিড হিসাবে: ক্ষারীয় হওয়ায়, এটি পাকস্থলীর অতিরিক্ত অ্যাসিডকে প্রশমিত করে।
- সোডা-অ্যাসিড অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রে: এটি অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে CO₂ তৈরি করে, যা আগুন নেভায়।
৪. ওয়াশিং সোডা (Na₂CO₃·10H₂O)
ওয়াশিং সোডা হলো ১০ অণু কেলাস-জল সহ সোডিয়াম কার্বনেট। এটি বেকিং সোডাকে উত্তপ্ত করে অনার্দ্র সোডিয়াম কার্বনেট (সোডা অ্যাশ) পাওয়ার পর, তাকে জলের সাথে পুনরায় কেলাসিত করে পাওয়া যায়।
Na₂CO₃(s) + 10H₂O(l) → Na₂CO₃·10H₂O(s)
ওয়াশিং সোডার ব্যবহার:
- কাচ, সাবান এবং কাগজ শিল্পে।
- বোরাক্সের মতো সোডিয়াম যৌগ তৈরিতে।
- গার্হস্থ্য কাজে পরিষ্কারক হিসাবে।
- জলের স্থায়ী খরতা দূর করার জন্য।
৫. প্লাস্টার অফ প্যারিস (CaSO₄·½H₂O)
প্লাস্টার অফ প্যারিস রাসায়নিকভাবে ক্যালসিয়াম সালফেট হেমিহাইড্রেট নামে পরিচিত। এটি জিপসামকে (CaSO₄·2H₂O) ৩৭৩ কেলভিন (১০০°সে) তাপমাত্রায় সাবধানে নিয়ন্ত্রিতভাবে উত্তপ্ত করে প্রস্তুত করা হয়।
CaSO₄·2H₂O(s) --(Heat at 373 K)--> CaSO₄·½H₂O(s) + 1½H₂O(g)
প্লাস্টার অফ প্যারিস একটি সাদা পাউডার। জলের সাথে মেশালে, এটি আবার একটি কঠিন ভরে (জিপসাম) পরিণত হয়।
CaSO₄·½H₂O(s) + 1½H₂O(l) → CaSO₄·2H₂O(s)
এই ধর্মটি ভাঙা হাড় ঠিক করার জন্য, খেলনা, আলংকারিক সামগ্রী তৈরি করার জন্য এবং পৃষ্ঠতল মসৃণ করার জন্য এটিকে দরকারী করে তোলে।
কেলাস-জল: কেলাসগুলি কি সত্যিই শুকনো?
অনেক লবণের কেলাস শুকনো মনে হলেও তাদের কেলাস কাঠামোর মধ্যে রাসায়নিকভাবে আবদ্ধ নির্দিষ্ট সংখ্যক জলের অণু থাকে। এই জলকে কেলাস-জল বলা হয় এবং এই ধরনের লবণকে সোদক লবণ বলা হয়।
উদাহরণস্বরূপ:
- কপার সালফেট কেলাস (CuSO₄·5H₂O) ৫ অণু কেলাস-জলের উপস্থিতির কারণে নীল রঙের হয়। উত্তপ্ত করলে, তারা এই জল হারিয়ে একটি সাদা অনার্দ্র পাউডারে পরিণত হয়।
- ওয়াশিং সোডার (Na₂CO₃·10H₂O) ১০ অণু জল থাকে।
- জিপসামের (CaSO₄·2H₂O) ২ অণু জল থাকে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
তোমাদের বোধগম্যতা পরীক্ষা করতে সাহায্য করার জন্য এখানে NCERT পাঠ্যপুস্তক থেকে কিছু সমাধান করা প্রশ্ন দেওয়া হলো।
প্রশ্ন ১: কেন HCl, HNO₃ ইত্যাদি জলীয় দ্রবণে আম্লিক চরিত্র প্রদর্শন করে কিন্তু অ্যালকোহল এবং গ্লুকোজের মতো যৌগের দ্রবণ আম্লিক চরিত্র প্রদর্শন করে না?
উত্তর: একটি পদার্থের আম্লিক চরিত্র তার জলীয় দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺) বা হাইড্রেনিয়াম আয়ন (H₃O⁺) এর উপস্থিতির কারণে হয়। যখন HCl এবং HNO₃ এর মতো অ্যাসিড জলে দ্রবীভূত হয়, তখন তারা বিয়োজিত হয়ে H⁺ আয়ন মুক্ত করে। উদাহরণস্বরূপ, HCl → H⁺ + Cl⁻। এই H⁺ আয়নগুলি তাদের আম্লিক ধর্মের জন্য দায়ী, যেমন নীল লিটমাসকে লাল করা এবং বিদ্যুৎ পরিবহন করা। অন্যদিকে, অ্যালকোহল (যেমন, C₂H₅OH) এবং গ্লুকোজ (C₆H₁₂O₆)-এর মতো যৌগগুলিতেও হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে, কিন্তু তারা জলে আয়নিত বা বিয়োজিত হয়ে H⁺ আয়ন তৈরি করে না। যেহেতু তারা দ্রবণে H⁺ আয়ন সরবরাহ করে না, তাই তারা আম্লিক চরিত্র প্রদর্শন করে না।
প্রশ্ন ২: প্রশমন বিক্রিয়া কী? দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: প্রশমন বিক্রিয়া হলো একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া যেখানে একটি অ্যাসিড এবং একটি ক্ষারক পরিমাণগতভাবে একে অপরের সাথে বিক্রিয়া করে লবণ এবং জল তৈরি করে। এই বিক্রিয়ায়, অ্যাসিড থেকে H⁺ আয়নগুলি ক্ষারক থেকে OH⁻ আয়নগুলির সাথে মিলিত হয়ে জল তৈরি করে, যার ফলে বিক্রিয়কগুলির আম্লিক এবং ক্ষারকীয় ধর্ম প্রশমিত হয়। সাধারণ রূপটি হলো: অ্যাসিড + ক্ষারক → লবণ + জল।
উদাহরণ ১: হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (একটি শক্তিশালী অ্যাসিড) এবং সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (একটি শক্তিশালী ক্ষারক)-এর মধ্যে বিক্রিয়া।
HCl(aq) + NaOH(aq) → NaCl(aq) + H₂O(l)
উদাহরণ ২: সালফিউরিক অ্যাসিড (একটি শক্তিশালী অ্যাসিড) এবং পটাশিয়াম হাইড্রক্সাইড (একটি শক্তিশালী ক্ষারক)-এর মধ্যে বিক্রিয়া।
H₂SO₄(aq) + 2KOH(aq) → K₂SO₄(aq) + 2H₂O(l)
প্রশ্ন ৩: ওয়াশিং সোডা এবং বেকিং সোডার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার উল্লেখ করো।
উত্তর:
ওয়াশিং সোডা (সোডিয়াম কার্বনেট)-এর ব্যবহার:
- এটি কাচ, সাবান এবং কাগজ শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
- এটি জলের স্থায়ী খরতা দূর করতে ব্যবহৃত হয়, যা এটিকে ধোয়া এবং অন্যান্য কাজের জন্য উপযুক্ত করে তোলে।
- এটি অ্যান্টাসিড হিসাবে বদহজম এবং বুকজ্বালা থেকে মুক্তি পেতে ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি পাকস্থলীর অতিরিক্ত অ্যাসিডকে প্রশমিত করে।
- এটি বেকিং পাউডারের একটি প্রধান উপাদান, যা কেক, রুটি এবং অন্যান্য বেকড খাবারকে ফুলতে এবং নরম করতে ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্ন ৪: প্লাস্টার অফ প্যারিস এবং জলের মধ্যে বিক্রিয়া দেখানোর জন্য একটি সমীকরণ লেখ।
উত্তর: প্লাস্টার অফ প্যারিস (ক্যালসিয়াম সালফেট হেমিহাইড্রেট, CaSO₄·½H₂O) একটি সাদা পাউডার। যখন এটিকে জলের সাথে মেশানো হয়, তখন এটি একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে জিপসাম (ক্যালসিয়াম সালফেট ডাইহাইড্রেট, CaSO₄·2H₂O) তৈরি করে, যা একটি কঠিন, শক্ত পদার্থ। এই জমাট বাঁধার ধর্মের কারণেই এটি ভাঙা হাড়কে স্থির রাখতে ব্যবহৃত হয়।
বিক্রিয়ার রাসায়নিক সমীকরণটি হলো:
CaSO₄·½H₂O (প্লাস্টার অফ প্যারিস) + 1½H₂O (জল) → CaSO₄·2H₂O (জিপসাম)
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
চলুন আমরা এই অধ্যায়ে আলোচিত মূল ধারণাগুলি দ্রুত পুনরালোচনা করি।
- অ্যাসিড হলো এমন পদার্থ যা জলীয় দ্রবণে H⁺ (বা H₃O⁺) আয়ন তৈরি করে। এগুলি টক স্বাদযুক্ত, নীল লিটমাসকে লাল করে এবং এদের pH ৭-এর কম হয়।
- ক্ষারক হলো এমন পদার্থ যা জলীয় দ্রবণে OH⁻ আয়ন তৈরি করে। এগুলি তিক্ত স্বাদযুক্ত, স্পর্শে সাবানের মতো পিচ্ছিল, লাল লিটমাসকে নীল করে এবং এদের pH ৭-এর বেশি হয়।
- নির্দেশক হলো এমন পদার্থ যা আম্লিক এবং ক্ষারকীয় মাধ্যমে রঙে (বা গন্ধে) একটি স্বতন্ত্র পরিবর্তন দেখায়।
- প্রশমন বিক্রিয়া: অ্যাসিড এবং ক্ষারকের মধ্যে লবণ এবং জল তৈরির বিক্রিয়া।
- অ্যাসিডের বিক্রিয়া: অ্যাসিড ধাতুর সাথে বিক্রিয়া করে H₂ গ্যাস এবং ধাতব কার্বনেট/হাইড্রোজেনকার্বনেটের সাথে বিক্রিয়া করে CO₂ গ্যাস তৈরি করে।
- pH স্কেল: ০ থেকে ১৪ পর্যন্ত একটি লগারিদমিক স্কেল যা একটি দ্রবণের আম্লিকতা বা ক্ষারকীয়তা পরিমাপ করতে ব্যবহৃত হয়। ৭ হলো প্রশম, <৭ হলো আম্লিক, এবং >৭ হলো ক্ষারকীয়।
- লবণ: প্রশমন বিক্রিয়া থেকে গঠিত আয়নিক যৌগ। এদের জলীয় দ্রবণ আম্লিক, ক্ষারকীয় বা প্রশম হতে পারে।
- সাধারণ লবণ (NaCl) থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক: সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (NaOH), ব্লিচিং পাউডার (CaOCl₂), বেকিং সোডা (NaHCO₃), এবং ওয়াশিং সোডা (Na₂CO₃·10H₂O)।
- প্লাস্টার অফ প্যারিস (CaSO₄·½H₂O): জিপসাম থেকে প্রস্তুত, এটি জলের সাথে মেশালে একটি কঠিন ভরে পরিণত হয়।
- কেলাস-জল: একটি লবণের কেলাস কাঠামোর এক ফর্মুলা এককে উপস্থিত নির্দিষ্ট সংখ্যক জলের অণু।