বিষয়ের ভূমিকা
নমস্কার বন্ধুরা! আজ আমরা এনসিইআরটি (NCERT) নবম শ্রেণির ভূগোল বইয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করব – 'নদনদী ও জলনির্গম প্রণালী' (Drainage)। যখন আমরা 'জলনির্গম প্রণালী' বা 'Drainage' শব্দটি শুনি, তখন আমাদের মনে প্রথমেই নদী, খাল, বিল ইত্যাদির ছবি ভেসে ওঠে। এই অধ্যায়ে আমরা জানব যে একটি দেশের শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে থাকা এই নদনদীগুলো কীভাবে সেই দেশের ভূপ্রকৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে।
ভারত একটি নদীমাতৃক দেশ। প্রাচীন সভ্যতা থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক সমাজ, সবকিছুই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে। গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরীর মতো নদীগুলি কেবল জলের উৎস নয়, এগুলি আমাদের সংস্কৃতি, ধর্ম এবং অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই নদীগুলি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার অবলম্বন।
এই অধ্যায়ে আমরা মূলত দুটি প্রধান বিষয় নিয়ে আলোচনা করব:
- ভারতের জলনির্গম প্রণালীর গঠন: ভারতের নদীগুলিকে তাদের উৎস অনুযায়ী কীভাবে ভাগ করা হয়েছে, যেমন – হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদী এবং উপদ্বীপীয় মালভূমি থেকে উৎপন্ন নদী।
- বিভিন্ন নদী প্রণালীর বৈশিষ্ট্য: সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রের মতো বিশাল নদী প্রণালী এবং নর্মদা, তাপ্তি, মহানদী, গোদাবরীর মতো উপদ্বীপীয় নদীগুলির গতিপথ, উপনদী এবং তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।
এই আলোচনাটি কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যই নয়, আমাদের দেশ ভারতকে আরও ভালোভাবে চিনতে ও বুঝতে সাহায্য করবে। তাহলে চলুন, ভারতের নদনদীর এই রোমাঞ্চকর জগতে ডুব দেওয়া যাক!
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
জলনির্গম প্রণালী (Drainage System) এবং সম্পর্কিত ধারণা
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে, কয়েকটি মৌলিক ধারণা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক।
- জলনির্গম প্রণালী (Drainage System): একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের নদী ব্যবস্থা, অর্থাৎ প্রধান নদী, তার উপনদী, শাখানদী मिलकर যে জালিকা তৈরি করে, তাকেই ওই অঞ্চলের জলনির্গম প্রণালী বলা হয়। যেমন - গঙ্গা নদী প্রণালী।
- নদী অববাহিকা (River Basin): একটি প্রধান নদী এবং তার সমস্ত উপনদী যে অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং সেই অঞ্চলের সমস্ত জল সংগ্রহ করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সমুদ্রে মেশায়, সেই সমগ্র অঞ্চলটিকে ওই নদীর অববাহিকা বলা হয়। যেমন - আমাজন অববাহিকা পৃথিবীর বৃহত্তম নদী অববাহিকা।
- জলবিভাজিকা (Water Divide): যে উচ্চভূমি (যেমন পাহাড় বা মালভূমি) দুটি পৃথক নদী অববাহিকাকে আলাদা করে, তাকে জলবিভাজিকা বলা হয়। যেমন - পশ্চিমঘাট পর্বতমালা আরব সাগরে পতিত নদী এবং বঙ্গোপসাগরে পতিত নদীগুলির মধ্যে একটি প্রধান জলবিভাজিকার কাজ করে।
ভারতের নদনদী: প্রধান দুটি ভাগ
উৎস এবং বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে ভারতের নদনদীগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: হিমালয় থেকে সৃষ্ট নদনদী (The Himalayan Rivers) এবং উপদ্বীপীয় মালভূমির নদনদী (The Peninsular Rivers)। এই দুই প্রকার নদীর মধ্যে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, যা নিচে আলোচনা করা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | হিমালয় থেকে সৃষ্ট নদনদী | উপদ্বীপীয় মালভূমির নদনদী |
|---|---|---|
| উৎস | উত্তরের হিমালয় পর্বতমালার বরফগলা জলে পুষ্ট। | মূলত মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের মালভূমি ও পাহাড় থেকে সৃষ্ট। |
| জলের প্রকৃতি | এগুলি চিরপ্রবাহী (Perennial), কারণ বরফগলা জল এবং বৃষ্টি উভয় উৎস থেকেই জল পায়। তাই সারাবছর জল থাকে। | এগুলি মূলত মৌসুমী (Seasonal), কারণ এগুলি বৃষ্টির জলের উপর নির্ভরশীল। গ্রীষ্মকালে জলের পরিমাণ খুব কমে যায়। |
| গতিপথ | এদের গতিপথ অনেক দীর্ঘ এবং এরা পার্বত্য অঞ্চল থেকে সমভূমিতে প্রবেশের সময় গভীর গিরিখাত (Gorge) তৈরি করে। সমভূমিতে এরা আঁকাবাঁকা পথে (Meanders) প্রবাহিত হয়। | এদের গতিপথ তুলনামূলকভাবে ছোট এবং এরা কঠিন শিলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় খুব বেশি গভীর উপত্যকা তৈরি করতে পারে না। |
| ক্ষয়কার্য | পার্বত্য অঞ্চলে এদের স্রোতের বেগ বেশি হওয়ায় ক্ষয় করার ক্ষমতা অনেক বেশি। এরা প্রচুর পরিমাণে পলি ও বালি বহন করে। | এদের ক্ষয় করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। |
| বদ্বীপ গঠন | মোহনার কাছে এরা বিশাল বদ্বীপ (Delta) তৈরি করে, যেমন - গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ (সুন্দরবন)। | পূর্ববাহিনী নদীগুলি (মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী) বদ্বীপ তৈরি করে, কিন্তু পশ্চিমবাহিনী নদীগুলি (নর্মদা, তাপ্তি) মূলত খাঁড়ি বা মোহনা (Estuary) তৈরি করে। |
হিমালয় থেকে সৃষ্ট নদনদী (The Himalayan Rivers)
হিমালয় থেকে উৎপন্ন প্রধান তিনটি নদী প্রণালী হলো – সিন্ধু, গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র। এই নদীগুলি অনেক দীর্ঘ এবং এদের সাথে অসংখ্য উপনদী এসে মিলিত হয়েছে।
১. সিন্ধু নদ প্রণালী (The Indus River System)
সিন্ধু নদ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ নদী অববাহিকাগুলির মধ্যে একটি। এর উৎস তিব্বতের কৈলাস পর্বতমালার কাছে মানস সরোবরের নিকটবর্তী একটি হিমবাহ থেকে।
- গতিপথ: তিব্বতে উৎপন্ন হওয়ার পর এটি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ভারতের লাদাখ অঞ্চলে প্রবেশ করে। এই অঞ্চলে এটি একটি মনোরম গিরিখাত তৈরি করেছে। লাদাখে এর সাথে জাস্কর, নুব্রা, শ্যাওক এবং হুনজার মতো উপনদী মিলিত হয়েছে। এরপর এটি বালটিস্তান ও গিলগিট হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে।
- উপনদী: ভারতের পাঞ্জাব সমভূমিতে এর প্রধান উপনদীগুলি হলো শতদ্রু (Satluj), বিপাশা (Beas), ইরাবতী (Ravi), চন্দ্রভাগা (Chenab) এবং বিতস্তা (Jhelum)। এই পাঁচটি নদী একসাথে মিলিত হয়ে পাকিস্তানের মিঠানকোটের কাছে সিন্ধুর সাথে মেশে। এই পাঁচ নদীর অঞ্চলকেই 'পাঞ্জাব' (পঞ্চ + আব, অর্থাৎ পাঁচ জলের দেশ) বলা হয়।
- গুরুত্ব: সিন্ধু নদের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৯০০ কিমি। এর একটি বড় অংশ পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়েছে। ১৯৬০ সালের 'সিন্ধু জল চুক্তি' (Indus Water Treaty) অনুযায়ী, ভারত এই নদী প্রণালীর মোট জলের মাত্র ২০% ব্যবহার করতে পারে, যা মূলত পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং রাজস্থানের সেচকার্যে ব্যবহৃত হয়।
২. গঙ্গা নদী প্রণালী (The Ganga River System)
গঙ্গা ভারতের দীর্ঘতম এবং পবিত্রতম নদী। এর অববাহিকা ভারতের সবচেয়ে উর্বর এবং ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল।
- উৎস: গঙ্গার প্রধান ধারা 'ভাগীরথী' উত্তরাখণ্ডের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়েছে। এটি দেবপ্রয়াগে অপর একটি ধারা 'অলকানন্দা'-র সাথে মিলিত হয়ে 'গঙ্গা' নামে পরিচিত হয়। অলকানন্দার উৎস বদ্রীনাথের কাছে সতোপন্থ হিমবাহ।
- গতিপথ: হরিদ্বারের কাছে গঙ্গা পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে সমভূমিতে প্রবেশ করে। এরপর এটি উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়।
- উপনদী: গঙ্গার অসংখ্য উপনদী রয়েছে।
- ডান তীরের উপনদী (উপদ্বীপীয় মালভূমি থেকে আগত): যমুনা (গঙ্গার দীর্ঘতম উপনদী, যা যমুনোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে এলাহাবাদে গঙ্গার সাথে মেশে), শোন, চম্বল, বেতোয়া।
- বাম তীরের উপনদী (হিমালয় থেকে আগত): রামগঙ্গা, গোমতী, ঘর্ঘরা, গণ্ডক, কোশী। কোশী নদী ঘনঘন গতিপথ পরিবর্তন এবং বিধ্বংসী বন্যার জন্য 'বিহারের দুঃখ' নামে পরিচিত।
- বদ্বীপ গঠন: পশ্চিমবঙ্গে এসে গঙ্গা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি শাখা 'ভাগীরথী-হুগলী' নামে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। অপর প্রধান শাখাটি 'পদ্মা' নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হয় (বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র যমুনা নামে পরিচিত)। শেষে এটি মেঘনা নাম নিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ 'সুন্দরবন' গঠন করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। গঙ্গার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫০০ কিমি-র বেশি।
৩. ব্রহ্মপুত্র নদ প্রণালী (The Brahmaputra River System)
ব্রহ্মপুত্র নদও তিব্বতের মানস সরোবরের পূর্ব দিক থেকে উৎপন্ন হয়েছে, যা সিন্ধু ও শতদ্রু নদীর উৎসের খুব কাছে।
- গতিপথ ও বিভিন্ন নাম: এটি তিব্বতে 'সাংপো' (Tsangpo) নামে পরিচিত, যার অর্থ 'শোধক'। তিব্বতে এটি হিমালয়ের সমান্তরালে পূর্ব দিকে দীর্ঘ পথ প্রবাহিত হয়। নামচা বারওয়া শৃঙ্গের কাছে এটি একটি গভীর গিরিখাত তৈরি করে ইংরেজি 'U' অক্ষরের মতো বাঁক নিয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে। এখানে এটি 'দিহং' নামে পরিচিত।
- ভারতে প্রবাহ: আসাম উপত্যকায় দিবাং, লোহিত এবং আরও অনেক উপনদীর সাথে মিলিত হয়ে এটি 'ব্রহ্মপুত্র' নাম ধারণ করে। আসামে এটি একটি বিশাল ও প্রশস্ত নদী। বর্ষাকালে এর দুই কূল প্লাবিত হয়ে আসামে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়। এটি প্রচুর পলি বহন করে এবং এর বুকে মাজুলির মতো পৃথিবীর বৃহত্তম নদী-দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে।
- বাংলাদেশে প্রবাহ: এরপর এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে 'যমুনা' নামে পরিচিত হয় এবং পদ্মার (গঙ্গা) সাথে মিলিত হয়।
উপদ্বীপীয় মালভূমির নদনদী (The Peninsular Rivers)
উপদ্বীপীয় ভারতের অধিকাংশ নদীই পশ্চিমঘাট পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে পূর্ব দিকে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। তবে নর্মদা ও তাপ্তি দুটি ব্যতিক্রমী নদী যারা পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে আরব সাগরে পতিত হয়েছে।
১. পশ্চিমবাহিনী নদী (West-flowing Rivers)
এই নদীগুলি কোনো বদ্বীপ গঠন না করে সরাসরি সমুদ্রে মেশার সময় খাঁড়ি বা Estuary তৈরি করে।
- নর্মদা (The Narmada): মধ্যপ্রদেশের অমরকণ্টক মালভূমি থেকে এর উৎপত্তি। এটি সাতপুরা এবং বিন্ধ্য পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে একটি গ্রস্থ উপত্যকা (Rift Valley) বরাবর পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে। জব্বলপুরের কাছে এটি মার্বেল পাথরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় 'ধুঁয়াধর' জলপ্রপাত সৃষ্টি করেছে, যা একটি দর্শনীয় স্থান। এটি গুজরাটের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আরব সাগরে পড়েছে।
- তাপ্তি (The Tapi): মধ্যপ্রদেশের সাতপুরা পর্বতমালার বেতুল জেলা থেকে এর উৎপত্তি। এটিও নর্মদার সমান্তরালে একটি গ্রস্থ উপত্যকার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আরব সাগরে পতিত হয়েছে। এর অববাহিকা মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট এবং মহারাষ্ট্রে বিস্তৃত।
- অন্যান্য নদী: এছাড়া সবরমতী, মাহী, পেরিয়ার ইত্যাদি ছোট নদীও পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়।
২. পূর্ববাহিনী নদী (East-flowing Rivers)
এই নদীগুলি মোহনার কাছে উর্বর বদ্বীপ তৈরি করেছে।
- মহানদী (The Mahanadi): ছত্তিশগড়ের উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি ওড়িশার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৬০ কিমি। হীরাকুদ বাঁধ এই নদীর উপরেই নির্মিত।
- গোদাবরী (The Godavari): এটি উপদ্বীপীয় ভারতের দীর্ঘতম নদী (দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০০ কিমি)। এর বিশাল আকার এবং অববাহিকার জন্য একে 'দক্ষিণ গঙ্গা' বলা হয়। এর উৎস মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার কাছে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা থেকে। এর প্রধান উপনদীগুলি হলো পূর্ণা, ওয়ার্ধা, প্রাণহিতা, মঞ্জিরা, ওয়েনগঙ্গা এবং পেনগঙ্গা। এর অববাহিকা মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা এবং অন্ধ্রপ্রদেশে বিস্তৃত।
- কৃষ্ণা (The Krishna): মহারাষ্ট্রের মহাবালেশ্বরের কাছে একটি প্রস্রবণ থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি প্রায় ১৪০০ কিমি পথ অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। তুঙ্গভদ্রা, কয়না, ঘাটপ্রভা, মুসী এবং ভীমা এর প্রধান উপনদী।
- কাবেরী (The Kaveri): পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ব্রহ্মগিরি পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৬০ কিমি। এটি দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু এবং উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু উভয় থেকেই জল পায়, তাই এতে প্রায় সারাবছরই জল থাকে। এই নদীর জলবণ্টন নিয়ে কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিবাদ রয়েছে।
হ্রদ এবং অর্থনীতিতে নদীর ভূমিকা
নদী ছাড়াও ভারতে অনেক প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট হ্রদ রয়েছে। কাশ্মীরের ডাল ও উলার হ্রদ, রাজস্থানের সম্বর হ্রদ (লবণাক্ত জলের হ্রদ), ওড়িশার চিল্কা (উপহ্রদ) ইত্যাদি বিখ্যাত। হ্রদগুলি পর্যটন, মৎস্যচাষ এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অর্থনীতিতে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম:
- কৃষি: ভারতের কৃষি ব্যবস্থা মূলত নদীর জলের উপর নির্ভরশীল। নদী থেকে খাল কেটে সেচব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
- জলবিদ্যুৎ: নদীগুলিতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, যা শিল্প ও গার্হস্থ্য কাজে ব্যবহৃত হয়।
- পরিবহণ: প্রাচীনকাল থেকেই নদীপথ পরিবহণের একটি সহজ মাধ্যম।
- পানীয় জল: শহর ও গ্রামের মানুষের পানীয় জলের প্রধান উৎস হলো নদী।
- নদী দূষণ: তবে শিল্প ও শহরের বর্জ্য, কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নদীতে মিশে জলকে দূষিত করছে। গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান বা নমামি গঙ্গে-র মতো প্রকল্পগুলি নদীকে দূষণমুক্ত করার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের সকলের উচিত নদীকে পরিষ্কার রাখা।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: হিমালয়ের নদী এবং উপদ্বীপীয় নদীর মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য কী কী?
উত্তর: প্রধান তিনটি পার্থক্য হলো:
- উৎস ও জলের প্রকৃতি: হিমালয়ের নদীগুলি বরফগলা জলে পুষ্ট হওয়ায় চিরপ্রবাহী। অন্যদিকে, উপদ্বীপীয় নদীগুলি বৃষ্টির জলের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় মৌসুমী প্রকৃতির।
- গতিপথের দৈর্ঘ্য: হিমালয়ের নদীগুলির গতিপথ অনেক দীর্ঘ এবং এরা সমভূমিতে সর্পিল পথে প্রবাহিত হয়। উপদ্বীপীয় নদীগুলির গতিপথ তুলনামূলকভাবে ছোট ও সোজা।
- ক্ষয়ক্ষমতা: হিমালয়ের নদীগুলির পার্বত্য প্রবাহে স্রোতের বেগ বেশি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষমতা অনেক বেশি এবং এরা প্রচুর পলি বহন করে। উপদ্বীপীয় নদীগুলির ক্ষয়ক্ষমতা কম।
প্রশ্ন ২: 'জলবিভাজিকা'-র কাজ কী? একটি উদাহরণ দিন।
উত্তর: জলবিভাজিকার প্রধান কাজ হলো দুটি পাশাপাশি নদী অববাহিকাকে পৃথক করা। এটি একটি উচ্চভূমি যা বৃষ্টির জলকে দুই দিকে ভাগ করে দুটি ভিন্ন নদী প্রণালীতে পাঠিয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, সিন্ধু এবং গঙ্গা নদী প্রণালীর মধ্যে আম্বালা শহরের নিকটবর্তী উচ্চভূমি একটি জলবিভাজিকার কাজ করে। একইভাবে, পশ্চিমঘাট পর্বতমালা আরব সাগরে পতিত নদী এবং বঙ্গোপসাগরে পতিত নদীগুলির মধ্যে একটি প্রধান জলবিভাজিকা।
প্রশ্ন ৩: গোদাবরী নদীকে 'দক্ষিণ গঙ্গা' বলা হয় কেন?
উত্তর: গোদাবরী নদীকে দুটি প্রধান কারণে 'দক্ষিণ গঙ্গা' বলা হয়:
- দৈর্ঘ্য ও অববাহিকা: এটি উপদ্বীপীয় ভারতের দীর্ঘতম নদী (প্রায় ১৫০০ কিমি)। এর নদী অববাহিকাও উপদ্বীপীয় নদীগুলির মধ্যে বৃহত্তম। গঙ্গার মতো এর বিশাল আকার ও বিস্তৃতির জন্যই এই নামকরণ।
- সাংস্কৃতিক গুরুত্ব: গঙ্গার মতো গোদাবরীও হিন্দুদের কাছে একটি পবিত্র নদী এবং এর তীরে অনেক তীর্থস্থান রয়েছে।
প্রশ্ন ৪: ভারতের নদী দূষণের প্রধান কারণগুলি কী কী?
উত্তর: ভারতের নদী দূষণের প্রধান কারণগুলি হলো:
- শিল্পজাত বর্জ্য: কলকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক এবং বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হয়।
- শহরের বর্জ্য: শহর ও নগরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার নোংরা জল এবং কঠিন বর্জ্য পদার্থ নদীতে মেশে।
- কৃষিজাত দূষক: কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির জলের সাথে ধুয়ে নদীতে এসে পড়ে।
- ধর্মীয় কার্যাবলী: প্রতিমা বিসর্জন এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী নদীতে ফেলা হয়, যা দূষণের কারণ হয়।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়টি পড়ার পর আমরা যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি মনে রাখব:
- একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের নদী ব্যবস্থাকে জলনির্গম প্রণালী বলে।
- উৎস অনুসারে ভারতের নদীগুলিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয় – হিমালয়ের নদী ও উপদ্বীপীয় নদী।
- হিমালয়ের নদীগুলি চিরপ্রবাহী, দীর্ঘ এবং পার্বত্য অঞ্চলে গভীর গিরিখাত তৈরি করে। প্রধান তিনটি প্রণালী হলো – সিন্ধু, গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র।
- উপদ্বীপীয় নদীগুলি মূলত মৌসুমী এবং এদের গতিপথ ছোট। এদের মধ্যে প্রধান হলো পশ্চিমবাহিনী নর্মদা ও তাপ্তি এবং পূর্ববাহিনী মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা ও কাবেরী।
- গোদাবরীকে তার বিশালতার জন্য 'দক্ষিণ গঙ্গা' বলা হয়।
- নদীগুলি ভারতের কৃষি, জলবিদ্যুৎ, পানীয় জল এবং পরিবহণের জীবনরেখা।
- ক্রমবর্ধমান দূষণ ভারতের নদীগুলির অস্তিত্বের জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করেছে, যা প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি।
আশা করি, ভারতের নদনদী সম্পর্কে এই বিস্তারিত আলোচনা তোমাদের বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করবে এবং আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে তোমাদের আরও আগ্রহী করে তুলবে।