ক্যান্ডেললাইট ডিনার, নরম আলো, আপনার সামনে বসা ভালোবাসার মানুষ আর প্লেটে ধোঁয়া ওঠা গার্লিক বাটার লবস্টার! ভাবতেই জিভে জল চলে আসে, তাই না? আজকের দিনে লবস্টার বা গলদা চিংড়ি মানেই তো আভিজাত্য, বিশেষ মুহূর্ত উদযাপনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভালোবাসার মানুষকে খুশি করতে এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে! কিন্তু যদি বলি, আপনার আজকের এই ‘ডেটেড নাইট’-এর বিশেষ খাবারটি একসময় ছিল জেলের কয়েদিদের জন্য একঘেয়ে, বিরক্তিকর এক ‘শাস্তি’? বিশ্বাস হচ্ছে না? চলুন, ডুব দেওয়া যাক ইতিহাসের সেই অদ্ভুত অধ্যায়ে।

সমুদ্রের ‘আরশোলা’ থেকে রাজকীয় খাবার!

আজকের দিনে লবস্টারকে আমরা যে চোখে দেখি, কয়েকশ বছর আগে ছবিটা ছিল ঠিক তার উল্টো। আমেরিকার ঔপনিবেশিক যুগে, বিশেষ করে নিউ ইংল্যান্ডের উপকূলীয় অঞ্চলে, লবস্টারের প্রাচুর্য এতটাই বেশি ছিল যে মানুষ রীতিমতো বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। ঝড়ের পরে সমুদ্রতীরে প্রায় দুই ফুট উঁচু হয়ে লবস্টারের স্তূপ জমে যেত। ভাবা যায়!

এই অতিরিক্ত জোগান আর সহজলভ্যতার কারণেই লবস্টারকে তখন কেউ পাত্তা দিত না। বরং একে ‘সমুদ্রের আরশোলা’ (cockroach of the sea) বা গরিবের খাবার বলে উপহাস করা হতো। এতটাই অবহেলিত ছিল যে, এটি মূলত সার হিসেবে জমিতে বা মাছ ধরার টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর হ্যাঁ, সমাজের নিচু স্তরের মানুষ, যেমন – চাকর, শিক্ষানবিশ এবং কয়েদিদের নিয়মিত খাবার ছিল এই লবস্টার।

ভাবুন তো, ম্যাসাচুসেটসের কিছু চুক্তিবদ্ধ ভৃত্য এতটাই বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল যে তারা তাদের চুক্তিতে এই শর্ত যোগ করিয়েছিল যে, তাদের সপ্তাহে তিনবারের বেশি লবস্টার খেতে বাধ্য করা যাবে না!

ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, বাড়ির আশেপাশে লবস্টারের খোলা পড়ে থাকাটাকে চরম দারিদ্র্য এবং লজ্জার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। সে যুগে কেউ যদি তার প্রেমিকার জন্য লবস্টার নিয়ে যেত, তাহলে হয়তো তার সম্পর্কটাই ভেঙে যেত!

কীভাবে হলো এই ভোলবদল?

তাহলে প্রশ্ন আসেই, এই ‘অচ্ছুৎ’ খাবারটি কীভাবে আজকের বিলাসবহুল খাবারে পরিণত হলো? এর পেছনের নায়ক ছিল মূলত দুটি জিনিস – রেললাইন এবং মানুষের কৌতূহল।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন আমেরিকায় রেলপথের বিস্তার ঘটতে শুরু করে, তখন এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়। ট্রেনের যাত্রীদের জন্য সস্তা এবং সহজলভ্য খাবার পরিবেশন করার প্রয়োজন দেখা দেয়। আর তার জন্য লবস্টারের চেয়ে ভালো বিকল্প আর কী হতে পারে? ট্রেনের যাত্রীরা, যারা সমুদ্র থেকে অনেক দূরে থাকতেন এবং লবস্টারের এই ‘বদনাম’ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না, তারা এই নতুন খাবারটি পেয়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। তাদের কাছে এটি ছিল এক দারুণ স্বাদের, অভিনব সামুদ্রিক খাবার।

এই যাত্রীদের মুখেই লবস্টারের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে শহরের বড় বড় রেস্তোরাঁর শেফরা লবস্টার নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। তারা আবিষ্কার করেন যে, লবস্টারকে জীবন্ত রান্না করলে এর মাংস অনেক বেশি সুস্বাদু এবং টাটকা থাকে। এই নতুন রান্নার কৌশল লবস্টারের স্বাদকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়।

চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে যা হওয়ার তাই হলো। যা ছিল সহজলভ্য, তা ধীরে ধীরে দুষ্প্রাপ্য হতে শুরু করে এবং দামও আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন অন্যান্য অনেক খাবারে রেশন ব্যবস্থা চালু ছিল, তখন লবস্টার রেশনের বাইরে থাকায় ধনীদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। এভাবেই একসময়ের ‘সমুদ্রের আরশোলা’ আভিজাত্য এবং ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ওঠে।

সুতরাং, পরেরবার যখন আপনার প্রিয়জনের সাথে লবস্টার উপভোগ করবেন, তখন এই মজাদার ইতিহাসটা তাকে শোনাতে ভুলবেন না। কে জানে, এই অদ্ভুত প্রেমের গল্প আপনাদের ডিনার ডেটকে হয়তো আরও একটু বেশি মজাদার এবং স্মরণীয় করে তুলবে!