প্রিয়া: স্যার, নমস্কার! আমি যখন পুরনো দিনের ছবি দেখি, তখন প্রায়শই কিছু বিশাল আর সুন্দর স্থাপত্য দেখি, যেমন তাজমহল বা দিল্লির লাল কেল্লা। আমি জানতে চাই, এগুলো কারা বানিয়েছিল আর কেনই বা এত বিশালভাবে?

ইতিহাস স্যার: খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছো, প্রিয়া! তোমার প্রশ্নটা ভারতীয় ইতিহাসের এক অত্যন্ত উজ্জ্বল অধ্যায়ের দিকে ইঙ্গিত করছে – সেটি হলো ‘মুঘল সাম্রাজ্য’। এই নামটা শুনেছো তো?

প্রিয়া: হ্যাঁ স্যার, মুঘল নামটা শুনেছি। কিন্তু এটা ঠিক কেমন সাম্রাজ্য ছিল? কারা এর রাজা ছিলেন? আর কীভাবে এটা এত শক্তিশালী হয়ে উঠলো?

ইতিহাস স্যার: অসাধারণ আগ্রহ তোমার! সপ্তম শ্রেণির ইতিহাসে আমরা এই 'মুঘল সাম্রাজ্য' নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করি, বিশেষ করে অধ্যায় ৪-এ। মুঘলরা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী শাসক গোষ্ঠী, যারা প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের বেশিরভাগ অংশে শাসন করেছিল। তাদের আগমন, শাসন পদ্ধতি, স্থাপত্য, শিল্পকলা এবং তাদের সাম্রাজ্যের পতন – সবটাই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। চলো, আজ আমরা এই বিশাল সাম্রাজ্যের উত্থান থেকে পতন পর্যন্ত এক ঝলক দেখে আসি।

মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা: বাবর এবং পানিপথের যুদ্ধ

ইতিহাস স্যার: মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জহিরুদ্দিন মহম্মদ বাবর। তিনি মোঙ্গল ও তুর্কিদের বংশধর ছিলেন। তাঁর মায়ের দিক থেকে তিনি চেঙ্গিস খানের বংশধর আর বাবার দিক থেকে তৈমুর লং-এর বংশধর ছিলেন। বাবরের জন্ম হয়েছিল বর্তমান উজবেকিস্তানের ফারগানা উপত্যকায়, কিন্তু সেখানে তার রাজ্য বেশিদিন টিকলো না, প্রতিদ্বন্দ্বীদের আক্রমণে তিনি বিতাড়িত হন।

প্রিয়া: তাহলে তিনি ভারতে এলেন কীভাবে? তিনি তো পারস্যের দিকে যাওয়ার কথা ছিল?

ইতিহাস স্যার: বুদ্ধিমানের মতো প্রশ্ন! বাবর ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে আফগানিস্তানের কাবুল থেকে ভারতের দিকে নজর দেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু ভারতের সমৃদ্ধি তাকে আকৃষ্ট করেছিল। তখন ভারতের দিল্লি সালতানাত লোদি রাজবংশের ইব্রাহিম লোদি দ্বারা শাসিত হচ্ছিল। ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে তার নিজের অনেক সভাসদ ও আত্মীয়দের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। পাঞ্জাবের শাসক দৌলত খান লোদি এবং রানা সাঙ্গাসহ অনেকেই বাবরকে ভারত আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানান। তারা ভেবেছিলেন বাবর হয়তো লুণ্ঠন করে ফিরে যাবেন, কিন্তু বাবরের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।

প্রিয়া: তার মানে বাবর ভারতের স্থানীয় শাসকদের সাহায্য পেয়েছিলেন? কিন্তু তিনি তাদের পরাজিত করলেন কীভাবে?

ইতিহাস স্যার: ঠিক তাই। এবং এর ফলস্বরূপই ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির কাছে পানিপথের ময়দানে এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ হয়, যা ‘প্রথম পানিপথের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। বাবর এক ছোট কিন্তু সুসংগঠিত এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনী নিয়ে ইব্রাহিম লোদির বিশাল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে বাবর প্রথমবারের মতো ভারতে গোলন্দাজ বাহিনী (কামান) এবং রণকৌশল হিসাবে 'তুলুঘমা' পদ্ধতি ব্যবহার করেন। 'তুলুঘমা' ছিল একটি কৌশল যেখানে সৈন্যরা শত্রুকে উভয় দিক থেকে ঘিরে ফেলতো।

প্রিয়া: বাহ! সে সময় কামান ছিল! এটা কি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল?

ইতিহাস স্যার: হ্যাঁ, সে সময় ভারতে এটি নতুন ছিল এবং বাবরের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কামান সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না, ফলে তারা গোলার আওয়াজ এবং আঘাতে ভীত হয়ে পড়ে। এই যুদ্ধের পরেই বাবর দিল্লিতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। কিন্তু শুধুমাত্র পানিপথের যুদ্ধে জয়ই যথেষ্ট ছিল না। তাকে আরও অনেক যুদ্ধ লড়তে হয়েছিল, যেমন ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে খানুয়ার যুদ্ধ রানা সাঙ্গার বিরুদ্ধে, এবং ১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে ঘাগরার যুদ্ধ আফগানদের বিরুদ্ধে। এসব যুদ্ধে জয়লাভের পরেই ভারতে মুঘল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। বাবর মাত্র চার বছর রাজত্ব করেছিলেন, কিন্তু তিনি তার আত্মজীবনী 'বাবরনামা' তে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, ভারতের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক চমৎকার বর্ণনা রেখে গেছেন।

হুমায়ুন: সিংহাসনের লড়াই এবং নির্বাসন

প্রিয়া: বাবরের পর কে রাজা হয়েছিলেন?

ইতিহাস স্যার: বাবরের মৃত্যুর পর তার পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে বসেন। কিন্তু হুমায়ুনের জীবন ছিল সংগ্রাম আর অস্থিরতায় ভরা। বাবরের নীতির কারণে তিনি সাম্রাজ্যকে তার তিন ভাই - কামরান, আসকারি ও হিন্দালের মধ্যে ভাগ করে দেন, যার ফলে সাম্রাজ্যের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে হুমায়ুনকে আফগান নেতা শের শাহ সুরীর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হয়।

প্রিয়া: শের শাহ সুরী কি খুব শক্তিশালী ছিলেন? তিনি তো লোদি বংশের কেউ ছিলেন না, তাই না?

ইতিহাস স্যার: অত্যন্ত শক্তিশালী! শের শাহ সুরী ছিলেন একজন আফগান নেতা এবং একজন অসাধারণ প্রশাসক। তিনি কেবল একজন সামরিক নেতা ছিলেন না, তার প্রশাসনিক সংস্কারগুলোও ছিল যুগান্তকারী। যেমন, তিনি গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড তৈরি করেন, ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় অনেক উন্নতি করেন এবং রৌপ্য মুদ্রা চালু করেন। ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে চৌসার যুদ্ধে এবং ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে কনৌজের যুদ্ধে শের শাহ সুরী হুমায়ুনকে পরাজিত করেন।

প্রিয়া: তাহলে হুমায়ুন কী করলেন? রাজ্য হারিয়ে ফেললেন?

ইতিহাস স্যার: হ্যাঁ, এই পরাজয়ের পর হুমায়ুনকে প্রায় ১৫ বছর ধরে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। এই সময়ে তিনি পারস্যের সাফাভিদ সম্রাট শাহ তাহমাস্প-এর দরবারে আশ্রয় নেন। পারস্যে থাকাকালীন তিনি পারস্য সংস্কৃতি ও শিল্পকলার সংস্পর্শে আসেন, যা পরে মুঘল শিল্পকলায় প্রভাব ফেলে।

প্রিয়া: তাহলে তিনি কি আর ফিরে আসতে পারেননি? ১৫ বছর তো অনেক লম্বা সময়!

ইতিহাস স্যার: অবশ্যই পেরেছিলেন! ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি শের শাহ সুরীর আকস্মিক মৃত্যুর পর সুর বংশের দুর্বলতার সুযোগ নেন। তিনি পুনরায় ভারত আক্রমণ করেন এবং দিল্লির সিংহাসন দখল করেন। কিন্তু তার এই দ্বিতীয় রাজত্ব খুব বেশি দিন টেকেনি। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে একটি লাইব্রেরির সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। তার আকস্মিক মৃত্যু মুঘল সাম্রাজ্যকে আবার এক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়।

আকবর: মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত স্থপতি

প্রিয়া: তারপর কে রাজা হলেন? আকবরের নাম শুনেছি, তিনি কি খুব বিখ্যাত ছিলেন?

ইতিহাস স্যার: আকবর, অর্থাৎ জালালুদ্দিন মহম্মদ আকবর, ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট। তার সময়েই মুঘল সাম্রাজ্য তার শিখরে পৌঁছেছিল। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ুনের মৃত্যুর পর মাত্র তেরো বছর বয়সে আকবর সিংহাসনে বসেন। তার প্রাথমিক দিনগুলোতে বৈরাম খান নামে একজন বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ অভিভাবক তাকে সাহায্য করেন।

প্রিয়া: তিনি কী কী করেছিলেন যে তাকে এত মহান বলা হয়?

ইতিহাস স্যার: আকবর শুধু একজন সামরিক বিজেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী প্রশাসক, ধর্মীয় সহনশীলতার প্রতীক এবং শিল্পের এক বিশাল পৃষ্ঠপোষক। তার শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্য প্রশাসনিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অসাধারণ সাফল্য লাভ করে।

  • দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ: ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে আকবর তার সেনাপতি বৈরাম খানের নেতৃত্বে হেমু, যিনি সুর বংশের একজন আফগান সেনাপতি ছিলেন, তাকে দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করেন। এটি তার সাম্রাজ্যের ভিত্তি আরও মজবুত করে এবং তাকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভে সাহায্য করে।
  • সাম্রাজ্য বিস্তার: আকবর মালব, গোন্ডোয়ানা, রাজপুতানা, গুজরাট, বাংলা, কাশ্মীর এবং দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ জয় করে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তিনি ভারতের একটি বড় অংশকে একত্রিত করে একটি কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
  • রাজপুত নীতি: আকবরের রাজপুত নীতি ছিল তার শাসনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি রাজপুতদের সঙ্গে শুধু সামরিক সংঘর্ষে জড়াননি, বরং মৈত্রী স্থাপন করেছিলেন। তিনি অনেক রাজপুত রাজকন্যাকে বিবাহ করেন (যেমন জোধাবাই) এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের উচ্চ প্রশাসনিক ও সামরিক পদে নিয়োগ করেন। এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি রাজপুতদের আনুগত্য তৈরি হয়, যা মুঘল শাসনের স্থায়িত্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি ছিল এক ধরনের সামরিক-কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
  • প্রশাসন ব্যবস্থা: আকবর একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
    • মনসবদারি প্রথা: এটি ছিল মুঘল প্রশাসনের মেরুদণ্ড। 'মনসব' মানে পদ বা পদমর্যাদা। মনসবদাররা ছিলেন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা। তাদের 'জাত' (ব্যক্তিগত পদমর্যাদা ও বেতন) এবং 'সওয়ার' (তার অধীনে কতজন ঘোড়সওয়ার সৈন্য রাখতে হবে) এর উপর ভিত্তি করে পদমর্যাদা নির্ধারণ করা হত। এই প্রথা মুঘলদের একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠনে সাহায্য করেছিল এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দক্ষতা নিয়ে আসে। মনসবদারদের বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী থেকে নিযুক্ত করা হত, যেমন তুর্কি, ইরানি, রাজপুত, আফগান ইত্যাদি।
    • জায়গিরদারি প্রথা: মনসবদারদের বেতন সাধারণত নগদ টাকায় না দিয়ে ‘জায়গির’ আকারে দেওয়া হতো। জায়গির ছিল এক ধরনের ভূমি বরাদ্দ। মনসবদারদের বেতনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের অধিকার দেওয়া হত। তবে তারা সেই জমির মালিক ছিলেন না, শুধু রাজস্ব আদায় করতে পারতেন। জায়গিরদাররা তাদের জায়গির থেকে রাজস্ব আদায় করে নিজেদের বেতন ও সৈন্যদের খরচ চালাতেন। এই জায়গিরগুলি ঘন ঘন স্থানান্তর করা হতো যাতে কোনো মনসবদার একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের উপর অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে না ওঠে।
    • জাবত প্রথা: এটি ছিল ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা। আকবরের অর্থমন্ত্রী রাজা টোডর মল এই ব্যবস্থার প্রধান স্থপতি ছিলেন। এর মাধ্যমে দশ বছরের জন্য জমির উর্বরতা ও উৎপাদনের গড় হিসাব করে রাজস্ব নির্ধারণ করা হত। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ সাধারণত রাজস্ব হিসাবে দিতে হত, যা নগদে সংগ্রহ করা হতো। এই ব্যবস্থা কৃষকদের উপর করের বোঝা কমাতে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়কে আরও সুসংগঠিত করতে সাহায্য করেছিল।
    • জামিনদার: স্থানীয় গ্রামের প্রধান বা শক্তিশালী সর্দাররা রাজস্ব আদায় করত এবং তাদের 'জামিনদার' বলা হত। তারা মুঘল প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের মধ্যে সেতু বন্ধনকারী হিসেবে কাজ করত, যদিও অনেক সময় তারা নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করত।
  • ধর্মীয় নীতি: আকবর ছিলেন ধর্মীয় সহনশীলতার প্রতীক। তিনি ‘সুলহ-ই-কুল’ বা ‘সর্বজনীন শান্তি’ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ‘ইবাদত খানা’ (উপাসনালয়) নামে একটি উপাসনালয় স্থাপন করেছিলেন ফতেহপুর সিক্রিতে, যেখানে বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতরা (হিন্দু, জৈন, খ্রিস্টান, জরোয়াস্ট্রিয়ান, মুসলিম) ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করতেন। এই আলোচনা তাকে ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে দূরে সরে আসতে সাহায্য করে।
  • দীন-ই-ইলাহি: যদিও এটি খুব জনপ্রিয় হয়নি, আকবর একটি নতুন ধর্মীয় ধারণা চালু করেছিলেন যার নাম 'দীন-ই-ইলাহি'। এটি মূলত সব ধর্মের ভালো দিকগুলোর সমন্বয় ছিল এবং এর ভিত্তি ছিল যুক্তিবাদ ও নৈতিকতা। এটি কোনো নতুন ধর্ম ছিল না, বরং আকবরের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ছিল।

জাহাঙ্গীর, শাহজাহান এবং ঔরঙ্গজেব: সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ এবং পতনের সূচনা

প্রিয়া: আকবরের পর কারা রাজা হয়েছিলেন? তার উত্তরাধিকারীরা কি তার মতো শক্তিশালী ছিলেন?

ইতিহাস স্যার: আকবরের পর তার পুত্র সেলিম, যিনি জাহাঙ্গীর (যার অর্থ 'বিশ্ব-বিজয়ী') নামে পরিচিত, ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। তার সময়ে মুঘল চিত্রকলা বিশেষ বিকাশ লাভ করে। জাহাঙ্গীর নিজে একজন দক্ষ শিল্পী ও চিত্রকলার ভালো সমঝদার ছিলেন। তার দরবারে ওস্তাদ মনসুর-এর মতো বিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা ছিলেন। জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূরজাহান ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নারী। প্রশাসনিক কাজে তার যথেষ্ট অবদান ছিল, এমনকি তার নামে মুদ্রা পর্যন্ত চালু হয়েছিল, যা মুঘল ইতিহাসে বিরল।

প্রিয়া: শাহজাহান কি জাহাঙ্গীরের পুত্র? তিনি কি শুধু সুন্দর সুন্দর জিনিস বানিয়েছিলেন?

ইতিহাস স্যার: হ্যাঁ, শাহজাহান ছিলেন জাহাঙ্গীরের পুত্র। তার আসল নাম ছিল খুররম। শাহজাহানের সময়কে মুঘল স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়। তুমি যে তাজমহল বা লাল কেল্লার কথা বলছিলে, সেগুলো শাহজাহানের সময়েই নির্মিত হয়েছিল।

  • তাজমহল: আগ্রায় অবস্থিত এটি বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম। শাহজাহান তার প্রিয় স্ত্রী মুমতাজ মহলের স্মৃতিতে এটি নির্মাণ করেন। এর নির্মাণে ২২ বছর সময় লেগেছিল এবং হাজার হাজার কারিগর ও শ্রমিক কাজ করেছিল। এটি পারস্য, ভারতীয় ও ইসলামিক স্থাপত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
  • লাল কেল্লা: দিল্লিতে অবস্থিত এই সুবিশাল দুর্গটি মুঘলদের ক্ষমতার প্রতীক ছিল। এর মধ্যে দেওয়ান-ই-আম এবং দেওয়ান-ই-খাস-এর মতো সুন্দর স্থাপত্য রয়েছে।
  • জামা মসজিদ: দিল্লির এই বিশাল মসজিদটিও শাহজাহানের সময়ে নির্মিত। এছাড়া আগ্রা ফোর্ট-এর মোতি মসজিদ, লাহোরের শালিমার বাগান সহ অনেক স্থাপত্য তার সময়ে নির্মিত হয়েছিল।

ইতিহাস স্যার: মোটেই না! তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারেও মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং দাক্ষিণাত্যে অনেক অভিযান চালিয়েছিলেন। তবে তার শাসনামলেই ব্যয়বহুল স্থাপত্য নির্মাণ এবং সামরিক অভিযানগুলোর কারণে রাজকোষে চাপ পড়তে শুরু করে। এছাড়া, তার শেষ জীবনে পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়, যার ফলে শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দী জীবন কাটাতে হয়েছিল।

প্রিয়া: ঔরঙ্গজেব কি শাহজাহানের ছেলে? তিনিই কি তার বাবাকে বন্দী করেছিলেন?

ইতিহাস স্যার: একদম ঠিক। ঔরঙ্গজেব ছিলেন শাহজাহানের পুত্র এবং তিনি মুঘল সাম্রাজ্যকে তার চূড়ান্ত ভৌগোলিক সীমায় নিয়ে যান। উত্তরাধিকার যুদ্ধে তিনি তার ভাই দারা শিকোহকে পরাজিত ও হত্যা করে সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তার নীতিগুলো সাম্রাজ্যের পতনের বীজ বপন করে।

  • সাম্রাজ্য বিস্তার: ঔরঙ্গজেব 'আলমগীর' (বিশ্ব-জয়ী) উপাধি গ্রহণ করেন এবং দাক্ষিণাত্য জয়ের জন্য প্রায় ২৫ বছর ব্যয় করেন। তিনি বিজাপুর ও গোলকোন্ডা রাজ্য জয় করেন, যা মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তনকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যায়। কিন্তু এই দীর্ঘ যুদ্ধগুলো ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং মুঘলদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদকে নিঃশেষ করে দেয়।
  • ধর্মীয় নীতি: আকবরের ‘সুলহ-ই-কুল’ নীতির সম্পূর্ণ বিপরীতে, ঔরঙ্গজেব ছিলেন একজন গোঁড়া সুন্নি মুসলিম। তিনি জিজিয়া কর (অমুসলিমদের উপর আরোপিত কর) পুনরায় চালু করেন এবং অনেক হিন্দু মন্দির ধ্বংসের নির্দেশ দেন। এর ফলে রাজপুত, জাঠ, শিখ (গুরু তেগ বাহাদুর ও গুরু গোবিন্দ সিং-এর নেতৃত্বে) এবং মারাঠাদের (ছত্রপতি শিবাজীর নেতৃত্বে) মতো বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিদ্রোহ শুরু হয়। এই নীতিগুলি সাম্রাজ্যের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং অমুসলিমদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।
  • প্রশাসনিক দুর্বলতা: দাক্ষিণাত্যের দীর্ঘ যুদ্ধগুলো মুঘলদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদকে নিঃশেষ করে দেয়। মনসবদারি ও জায়গিরদারি প্রথায় অসঙ্গতি দেখা দেয়। ভালো জায়গিরের সংখ্যা কমে যায় এবং মনসবদারদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় একটি 'জায়গির সংকট' দেখা দেয়, যা কৃষকদের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপায় এবং বিদ্রোহকে আরও উস্কে দেয়।

প্রিয়া: তার মানে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করে?

ইতিহাস স্যার: ঠিক তাই। ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দ্রুত পতনের দিকে এগোয়। তার অদূরদর্শী ধর্মীয় নীতি, দীর্ঘ দাক্ষিণাত্য অভিযান এবং মনসবদারি প্রথার ত্রুটিগুলো এই পতনের প্রধান কারণ ছিল। পরবর্তী মুঘল শাসকরা দুর্বল ছিলেন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো, যেমন মারাঠা, শিখ এবং বিভিন্ন স্বাধীন নবাব ও রাজা, তাদের ক্ষমতা বাড়াতে শুরু করে।

মুঘল প্রশাসন এবং সমাজ ব্যবস্থা: আরও বিস্তারিত

প্রিয়া: স্যার, আপনি মনসবদারি, জায়গিরদারি আর জাবত প্রথার কথা বলেছিলেন। এগুলো মুঘলদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

ইতিহাস স্যার: অবশ্যই। এগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল এবং আকবরের সাফল্যের চাবিকাঠি ছিল।

  • মনসবদারি প্রথা: 'মনসব' মানে পদ বা পদমর্যাদা। মনসবদাররা ছিলেন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা যাদের পদমর্যাদা নির্ধারণ করা হত 'জাত' এবং 'সওয়ার' সংখ্যার ভিত্তিতে। 'জাত' বলতে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পদমর্যাদা, তার সম্মান এবং বেতন বোঝাতো, আর 'সওয়ার' বলতে তাকে কতজন ঘোড়সওয়ার সৈন্য এবং ঘোড়া রাখতে হবে তা বোঝাতো। মনসবদারদের দুটি প্রধান দায়িত্ব ছিল: সামরিক দায়িত্ব (সম্রাটের জন্য সৈন্য সরবরাহ করা) এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব (নিজেদের জায়গির বা বরাদ্দকৃত অঞ্চলের প্রশাসন চালানো)। এই প্রথা মুঘলদের একটি শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল এবং দক্ষ সেনাবাহিনী বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।
  • জায়গিরদারি প্রথা: জায়গির হল এক ধরনের ভূমি বরাদ্দ। মনসবদারদের বেতনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের অধিকার দেওয়া হত। তবে তারা সেই জমির মালিক ছিলেন না, শুধু রাজস্ব আদায় করতে পারতেন। জায়গিরদাররা তাদের জায়গির থেকে রাজস্ব আদায় করে নিজেদের বেতন ও সৈন্যদের খরচ চালাতেন। এই প্রথাটি ঔরঙ্গজেবের সময়ে সমস্যার সৃষ্টি করে, কারণ সাম্রাজ্য যখন বিস্তার লাভ করতে লাগল, তখন যোগ্য মনসবদারের সংখ্যা বাড়ল কিন্তু তাদের জন্য বরাদ্দ করার মতো ভালো জায়গিরের সংখ্যা কমে গেল। এর ফলে জায়গির নিয়ে সংকট দেখা দিল এবং মনসবদারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকল, যা শেষ পর্যন্ত কৃষকদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
  • জাবত প্রথা: এটি ছিল মূলত ভূমি রাজস্ব নির্ধারণ ও আদায়ের একটি উন্নত পদ্ধতি। আকবরের অর্থমন্ত্রী টোডর মল এটি চালু করেন। এই প্রথায় বিগত দশ বছরের ফসল উৎপাদন এবং বাজারের দামের গড় হিসাব করে রাজস্বের হার নির্ধারণ করা হত। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ সাধারণত রাজস্ব হিসাবে দিতে হত, যা নগদে নেওয়া হতো। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আদায় আরও সুসংগঠিত হয় এবং কৃষকদের উপর অযৌক্তিক করের বোঝা কিছুটা কমে, কারণ একটি নির্দিষ্ট ও পূর্বাভাসযোগ্য কর ব্যবস্থা ছিল।
  • জামিনদার: জামিনদাররা ছিলেন স্থানীয় শক্তিশালী ব্যক্তি, গ্রাম প্রধান বা বংশগত সর্দার। তারা কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করে মুঘল কোষাগারে জমা দিত। এর বিনিময়ে তারা রাজস্বের একটি অংশ পেত। তারা স্থানীয় প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। অনেক সময় এই জামিনদাররা মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করত যখন কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ত।

প্রিয়া: তাহলে এই ব্যবস্থাগুলো মুঘল সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছিল, কিন্তু পরে সেগুলোই আবার সমস্যা তৈরি করল, তাই তো?

ইতিহাস স্যার: একদম ঠিক বলেছ। আকবরের সময়ে এই ব্যবস্থাগুলো অত্যন্ত সফল ছিল এবং সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে, বিশেষ করে ঔরঙ্গজেবের সময়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সীমিত ভূমি সম্পদ, এবং জায়গিরের অসম বন্টন এই ব্যবস্থাগুলোতে চাপ সৃষ্টি করে, যা সাম্রাজ্যের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মুঘল স্থাপত্য, শিল্পকলা ও সংস্কৃতিতে অবদান

প্রিয়া: মুঘলরা শুধু শাসনই করত নাকি শিল্পকলাতেও তাদের অবদান ছিল? তাজমহল ছাড়া আর কী কী ছিল?

ইতিহাস স্যার: অসাধারণ প্রশ্ন, প্রিয়া! মুঘলরা শুধু শাসকই ছিল না, তারা ছিল শিল্প, সাহিত্য এবং স্থাপত্যের এক বিশাল পৃষ্ঠপোষক। তাদের সময়ে ভারতীয় সংস্কৃতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। তাদের অবদান আজও আমাদের চারপাশের পরিবেশে দেখা যায়।

  • স্থাপত্য: মুঘল স্থাপত্য ভারতীয়-পারসিক স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তাজমহল, দিল্লির লাল কেল্লা, আগ্রা ফোর্ট, ফতেহপুর সিক্রি (আকবরের নির্মিত) এবং দিল্লির জামা মসজিদ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই স্থাপত্যগুলিতে মার্বেল এবং লাল বেলেপাথরের ব্যবহার, সূক্ষ্ম কারুকার্য, বিশাল গম্বুজ, মিনার এবং 'পিয়েট্রা ডুরা' (বা পাথর খোদাই করে ডিজাইন তৈরি) কৌশল দেখা যায়। হুমায়ুনের সমাধি ছিল মুঘলদের প্রথম বড় স্থাপত্য এবং তাজমহলের এক পূর্বসূরী। এছাড়া, মুঘলরা 'চারবাগ' শৈলীতে বাগান নির্মাণে অত্যন্ত দক্ষ ছিল, যা সুপরিকল্পিত বাগান তৈরিতে তাদের রুচির পরিচয় দেয়।
  • চিত্রকলা: মুঘল মিনিয়েচার পেইন্টিং বা ক্ষুদ্রাকৃতি চিত্রকলা বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। হুমায়ুনের সময় পারস্য থেকে এই শিল্পীরা ভারতে আসেন এবং ভারতীয় শিল্পীদের সঙ্গে মিশে এক নতুন শৈলী তৈরি হয়। জাহাঙ্গীর ছিলেন চিত্রকলা শিল্পের এক অসাধারণ সমঝদার এবং তার সময়ে চিত্রকলার চরম বিকাশ ঘটে। এই চিত্রগুলিতে সাধারণত দরবারী জীবন, শিকারের দৃশ্য, প্রকৃতি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো ফুটিয়ে তোলা হত, যার প্রতিটিই ছিল সূক্ষ্ম কারুকার্যে ভরা।
  • সাহিত্য: মুঘল শাসকরা ফার্সি, উর্দু এবং হিন্দিতে সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করতেন। বাবর স্বয়ং একজন কবি ও লেখক ছিলেন। তার আত্মজীবনী 'বাবরনামা' তুর্কি ভাষায় লেখা এক অমূল্য সম্পদ। আবুল ফজলের 'আকবরনামা' আকবরের শাসনকালের এক বিস্তারিত বিবরণ। এ সময়ে অনেক সংস্কৃত গ্রন্থ ফার্সিতে অনূদিত হয়। তুলসীদাসের 'রামচরিতমানস' এবং সুরদাসের কাব্য এই যুগেই রচিত হয়েছিল। এছাড়া, উর্দু ভাষার জন্ম ও বিকাশ মুঘল যুগেই ঘটেছিল।
  • সঙ্গীত: আকবরের দরবারে তানসেনের মতো কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। মুঘলরা হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতা করত এবং নতুন রাগ ও যন্ত্রপাতির উদ্ভাবনে অবদান রাখে।

প্রিয়া: তার মানে মুঘলরা আমাদের সংস্কৃতিতেও অনেক কিছু দিয়েছে, যা আমরা এখনও দেখি?

ইতিহাস স্যার: হ্যাঁ, ভারতীয় সংস্কৃতিতে মুঘলদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের স্থাপত্য, চিত্রকলা, সঙ্গীত, সাহিত্য এমনকি পোশাক, খাদ্যাভ্যাস (বিরিয়ানি, কাবাব) এবং ভাষা (উর্দু) ভারতীয় জীবনযাত্রার সাথে মিশে গেছে। এটি এক মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল, যা আজও আমাদের সমাজে বিদ্যমান। মুঘলদের শাসনকাল ছিল ভারতীয় ইতিহাসের এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও গতিশীল অধ্যায়।

মুঘল সাম্রাজ্যের পতন: কারণগুলি

প্রিয়া: এত শক্তিশালী একটা সাম্রাজ্য কীভাবে শেষ হয়ে গেল, স্যার? ঔরঙ্গজেবের পর সত্যিই আর কেউ তাদের মতো শক্তিশালী ছিলেন না?

ইতিহাস স্যার: মুঘল সাম্রাজ্যের পতন কোনো একটি একক কারণে ঘটেনি, বরং এটি ছিল একাধিক জটিল কারণের সম্মিলিত ফল। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যের ভাঙ্গন শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে তা একটি আনুষ্ঠানিক ক্ষমতায় পরিণত হয়।

  • ঔরঙ্গজেবের নীতি: তার দীর্ঘ দাক্ষিণাত্য অভিযান এবং কঠোর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নীতি সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। এতে মারাঠা, জাঠ, শিখ এবং রাজপুতদের মতো শক্তিগুলো মুঘলদের বিরুদ্ধে চলে যায়। দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধগুলো মুঘলদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদকে নিঃশেষ করে দেয় এবং সাম্রাজ্যের কেন্দ্র থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়।
  • মনসবদারি ও জায়গিরদারি সংকট: ঔরঙ্গজেবের সময়ে যোগ্য মনসবদারদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত এবং ভালো জায়গিরের অভাব দেখা দেয়। এর ফলে মনসবদারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে এবং তারা কৃষকদের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দিতে শুরু করে। এটি কৃষকদের বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দেয় এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।
  • দুর্বল উত্তরাধিকারী: ঔরঙ্গজেবের পর আসা শাসকরা ছিলেন দুর্বল ও অযোগ্য। তাদের মধ্যে দূরদর্শিতা, সামরিক দক্ষতা বা প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল না। ফলে তারা সাম্রাজ্যের বিশালতা ধরে রাখতে পারেননি এবং প্রায়শই দরবারের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের শিকার হতেন।
  • আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের উত্থান (ছত্রপতি শিবাজীর নেতৃত্বে), শিখদের সংগঠিত হওয়া এবং বাংলার মতো সুবাগুলিতে স্বাধীন নবাবদের (যেমন মুর্শিদ কুলি খান) ক্ষমতা বৃদ্ধি মুঘল কেন্দ্রকে দুর্বল করে দেয়। এই আঞ্চলিক শক্তিগুলো মুঘলদের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেদের স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে।
  • বিদেশী আক্রমণ: পারস্যের নাদির শাহের ১৭৩৯ সালের ভারত আক্রমণ এবং দিল্লির লুণ্ঠন মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে। নাদির শাহ প্রায় ৭০ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ লুট করেন, যার মধ্যে বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন এবং কোহিনূর হীরাও ছিল। এরপর আফগান আহমেদ শাহ আবদালীর বারবার আক্রমণ মুঘলদের আরও দুর্বল করে দেয়।
  • অর্থনৈতিক সংকট: দীর্ঘ যুদ্ধ এবং ব্যয়বহুল স্থাপত্য নির্মাণের ফলে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়েছিল। কৃষকদের উপর করের বোঝা বৃদ্ধি পায়, যা কৃষি উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বাণিজ্যিক কার্যকলাপকে বাধাগ্রস্ত করে।
  • ইউরোপীয় শক্তির আগমন: এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশ, ফরাসি, ওলন্দাজ-এর মতো ইউরোপীয় বাণিজ্যিক শক্তিগুলো ভারতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে।

প্রিয়া: এত কিছু শুনে আমার মনে হচ্ছে, একটা সাম্রাজ্য তৈরি করা যেমন কঠিন, তাকে টিকিয়ে রাখাও তার চেয়ে কঠিন! একটা ভুল নীতি বা একজন দুর্বল শাসক পুরো সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

ইতিহাস স্যার: একদম ঠিক বলেছ, প্রিয়া! ইতিহাস আমাদের এটাই শেখায় যে, শাসনের জন্য শুধু সামরিক শক্তি নয়, দূরদর্শিতা, সামাজিক সম্প্রীতি, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও সমান জরুরি। মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন থেকে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারি। তাদের সাফল্য যেমন স্থাপত্য ও শিল্পকলায় আমাদের মুগ্ধ করে, তেমনই তাদের ভুলগুলো আমাদের শেখায় কিভাবে একটি বিশাল সাম্রাজ্যও সঠিক নেতৃত্বের অভাবে পতনের মুখে পড়তে পারে।

প্রিয়া'র কিছু প্রশ্ন ও ইতিহাস স্যারের উত্তর (Q&A)

প্রিয়া: স্যার, এই অধ্যায়টা থেকে আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে, আপনি কি উত্তর দেবেন?

ইতিহাস স্যার: অবশ্যই, প্রিয়া। তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি প্রস্তুত। বলো তোমার প্রথম প্রশ্ন কী?

প্রিয়া: ১. প্রশ্ন: 'মনসবদারি' ও 'জায়গিরদারি' প্রথার মধ্যে সম্পর্ক কী? এবং এই প্রথাগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

ইতিহাস স্যার: উত্তর: 'মনসবদারি' প্রথা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মেরুদণ্ড। 'মনসবদার' ছিল একটি পদমর্যাদা, যা একজন কর্মকর্তার বেতন এবং তার অধীনে কতজন সৈন্য রাখতে হবে তা নির্ধারণ করত। অন্যদিকে, 'জায়গিরদারি' প্রথা ছিল মনসবদারদের বেতন পরিশোধের একটি পদ্ধতি। মনসবদারদের নগদ বেতনের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের অধিকার দেওয়া হত, যা 'জায়গির' নামে পরিচিত। এই প্রথাগুলি মুঘলদের একটি শক্তিশালী, সুসংগঠিত সেনাবাহিনী এবং একটি দক্ষ প্রশাসন বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। আকবরের সময়ে এটি সফল হলেও, ঔরঙ্গজেবের সময় জায়গির সংকট দেখা দেয়, যা সাম্রাজ্যের দুর্বলতার কারণ হয়।

প্রিয়া: ২. প্রশ্ন: মুঘলরা নিজেদের মোঙ্গল বা চেঙ্গিস খানের বংশধর না বলে কেন তৈমুর লং-এর বংশধর বলতে বেশি পছন্দ করত?

ইতিহাস স্যার: উত্তর: মুঘলরা মায়ের দিক থেকে মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খানের বংশধর হলেও, তারা নিজেদের বাবার দিক থেকে তৈমুর লং-এর বংশধর বলতে বেশি পছন্দ করত। এর কারণ ছিল চেঙ্গিস খানের নাম অসংখ্য গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল এবং তার স্মৃতি ছিল বিভীষিকাময় ও নেতিবাচক। অন্যদিকে, তৈমুর লং ১৫ শতকে দিল্লি দখল করেছিলেন এবং তার সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। তৈমুরের উত্তরাধিকার দাবি করা তাদের নিজেদের রাজবংশকে আরও বেশি মর্যাদাপূর্ণ, সভ্য এবং ভারতে সুপ্রতিষ্ঠিত প্রমাণ করতে সাহায্য করত। এটি তাদের শাসকদের বৈধতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় স্থাপনে সহায়ক ছিল।

প্রিয়া: ৩. প্রশ্ন: আকবরের 'সুলহ-ই-কুল' নীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ছিল এবং এর উদ্দেশ্য কী ছিল?

ইতিহাস স্যার: উত্তর: আকবরের 'সুলহ-ই-কুল' নীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সর্বজনীন শান্তি ও সহনশীলতা। এই নীতি অনুসারে, সমস্ত ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের প্রতি সমান সম্মান প্রদর্শন করা হত এবং ধর্মীয় বিভেদ ভুলে গিয়ে সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করত। আকবর বিশ্বাস করতেন যে, একটি বিশাল সাম্রাজ্যকে সফলভাবে শাসন করতে হলে ধর্মীয় গোঁড়ামি পরিহার করে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে শান্তি ও ঐক্য স্থাপন করা জরুরি। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় সহনশীলতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা, যা তার প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করেছিল।

প্রিয়া: ৪. প্রশ্ন: মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করুন এবং এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দিন।

ইতিহাস স্যার: উত্তর: মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের দুটি প্রধান কারণ হলো: প্রথমত, সম্রাট ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘস্থায়ী দাক্ষিণাত্য অভিযান এবং তার কঠোর ধর্মীয় নীতি। দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধগুলি সাম্রাজ্যের বিপুল সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ নিঃশেষ করে দেয়। একই সাথে, জিজিয়া কর পুনরায় চালু করা এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নীতি মারাঠা, শিখ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির বিদ্রোহের জন্ম দেয়, যা সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। দ্বিতীয়ত, মনসবদারি ও জায়গিরদারি প্রথার সংকট এবং পরবর্তী মুঘল শাসকদের দুর্বলতা ও অযোগ্যতা। জায়গিরের অভাব এবং জায়গিরদারদের মধ্যে অসন্তোষ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোকে ভেঙে দেয়, যা আঞ্চলিক শক্তিগুলির উত্থানকে ত্বরান্বিত করে এবং মুঘল কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে কার্যকরভাবে ভেঙে দেয়।