ইতিহাস স্যারের সাথে অর্জুন: সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস, অধ্যায় ২ – নতুন রাজা ও রাজ্যগুলির উত্থান
অর্জুন: স্যার, নমস্কার! আমি আজ ভারতের একটা পুরনো মানচিত্র দেখছিলাম। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর আর দিল্লি সুলতানি বা মুঘলদের আসার আগে, মানে মাঝখানের সময়টাতে ভারতের ইতিহাসটা ঠিক কেমন ছিল? মানচিত্রটাতে কোনো একক বড় সাম্রাজ্যের বদলে অনেক ছোট ছোট রাজ্যের নাম দেখছি। এই সময়টা নিয়ে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
ইতিহাস স্যার: বাহ্ অর্জুন! খুব সুন্দর একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করলে। তোমার এই আগ্রহ দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। তুমি ঠিকই ধরেছ, গুপ্তদের পর এবং তুর্কি আক্রমণের আগে, অর্থাৎ প্রায় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত, ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো একক কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল না। এই সময়কালে বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক নতুন নতুন রাজবংশের উত্থান হয়েছিল। তোমার সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়টা ঠিক এই বিষয় নিয়েই – 'নতুন রাজা ও রাজ্য' (New Kings and Kingdoms)। চলো, আজ আমরা এই увлекательный সময়ে ডুব দিই।
নতুন রাজবংশগুলির উত্থান কীভাবে হলো?
অর্জুন: দারুণ হবে স্যার! আচ্ছা, এই নতুন রাজারা কারা ছিলেন? হঠাৎ করে এত নতুন রাজবংশ কোথা থেকে এলো?
ইতিহাস স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন। সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে উপমহাদেশে অনেক বড় জমিদার বা যোদ্ধা প্রধানের আবির্ভাব হয়েছিল, যাদেরকে তৎকালীন রাজারা প্রায়শই তাদের অধীনস্থ বা 'সামন্ত' (samantas) হিসেবে স্বীকৃতি দিতেন।
অর্জুন: 'সামন্ত'? মানে তারা রাজার অধীনে কাজ করত?
ইতিহাস স্যার: একদম তাই। তাদের দায়িত্ব ছিল রাজার জন্য উপহার নিয়ে আসা, রাজার দরবারে হাজির থাকা এবং প্রয়োজনে রাজাকে সামরিক সহায়তা প্রদান করা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই সামন্তরা যখন প্রচুর ক্ষমতা ও সম্পদের অধিকারী হতো, তখন তারা নিজেদের 'মহা-সামন্ত' বা 'মহা-মণ্ডলেশ্বর' (অর্থাৎ, 'মহান অঞ্চলের অধিপতি') ইত্যাদি বড় বড় উপাধি দিত।
অর্জুন: তার মানে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছিল?
ইতিহাস স্যার: ঠিক ধরেছ। অনেক সময় তারা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠত যে, নিজেদের রাজার অধীনতা অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করত। এর একটা খুব ভালো উদাহরণ হলো দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটরা। তারা প্রথমে কর্ণাটকের চালুক্য রাজাদের অধীনস্থ ছিল। কিন্তু অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি, দন্তিদুর্গ নামে একজন রাষ্ট্রকূট প্রধান তার চালুক্য অধিপতিকে পরাজিত করে নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি 'হিরণ্যগর্ভ' (সোনার গর্ভ) নামে একটি যজ্ঞও করেছিলেন।
অর্জুন: 'হিরণ্যগর্ভ' যজ্ঞ? এটা আবার কী?
ইতিহাস স্যার: এটা একটা খুব মজার প্রথা। বিশ্বাস করা হতো যে, জন্মসূত্রে ক্ষত্রিয় না হলেও এই যজ্ঞের মাধ্যমে যজমান বা আয়োজনকারী 'ক্ষত্রিয়' হিসেবে পুনর্জন্ম লাভ করে এবং রাজ্য শাসন করার অধিকার পায়। এভাবেই অনেক নতুন রাজবংশ, যেমন গুর্জর-প্রতিহার বা কদম্ব বংশের প্রতিষ্ঠাতারাও ব্রাহ্মণ হয়েও নিজেদের অস্ত্রবিদ্যা ও শাসনের মাধ্যমে ক্ষত্রিয় পরিচয় লাভ করেছিলেন।
রাজ্যগুলিতে প্রশাসন কেমন ছিল?
অর্জুন: তার মানে, শুধু যুদ্ধ জয় করলেই হতো না, সামাজিক স্বীকৃতিও দরকার ছিল। আচ্ছা স্যার, এই নতুন রাজারা তাদের রাজ্য চালাতেন কীভাবে? তাদের প্রশাসন ব্যবস্থা কেমন ছিল?
ইতিহাস স্যার: এই নতুন রাজারা নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার জন্য 'মহারাজ-াধিরাজ' (রাজাদের রাজা) বা 'ত্রিভুবন-চক্রবর্তীন্' (তিন জগতের অধিপতি)-এর মতো বিশাল বিশাল উপাধি গ্রহণ করতেন। কিন্তু এত বড় উপাধি থাকা সত্ত্বেও, তারা প্রায়শই তাদের সামন্তদের এবং কৃষক, ব্যবসায়ী ও ব্রাহ্মণদের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে ক্ষমতা ভাগ করে নিতেন।
অর্জুন: তার মানে ক্ষমতাটা পুরোপুরি রাজার হাতে ছিল না?
ইতিহাস স্যার: বলা যেতে পারে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীভূত ছিল। রাজ্যের সম্পদ আসত মূলত উৎপাদকদের কাছ থেকে, অর্থাৎ কৃষক, পশুপালক, কারিগরদের থেকে। তাদের উৎপাদনের একটা অংশ কর বা খাজনা হিসেবে আদায় করা হতো। ব্যবসায়ীদের থেকেও কর নেওয়া হতো। তামিলনাড়ুতে শাসনকারী চোলদের শিলালিপি থেকে আমরা প্রায় ৪০০ রকমের করের কথা জানতে পারি!
অর্জুন: ৪০০ রকমের কর! কীসের ওপর এত কর নেওয়া হতো?
ইতিহাস স্যার: যেমন, 'ভেট্টি' নামে এক ধরনের কর ছিল, যা নগদ টাকায় নয়, বরং বাধ্যতামূলক শ্রমের মাধ্যমে নেওয়া হতো। আবার 'কদমাই' ছিল এক ধরনের ভূমিরাজস্ব। এমনকি খড়ের চাল দেওয়া বা খেজুর গাছে ওঠার জন্য মই ব্যবহার করার মতো জিনিসের ওপরও কর বসানো হতো।
অর্জুন: বাবা! সাধারণ মানুষের জন্য তো খুব কঠিন ছিল নিশ্চয়ই। এই করের টাকা দিয়ে কী করা হতো?
ইতিহাস স্যার: এই সম্পদ দিয়েই রাজার প্রশাসন চলত, বড় বড় দুর্গ এবং মন্দির তৈরি হতো, এবং অবশ্যই, যুদ্ধ পরিচালনা করা হতো। যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে আরও সম্পদ, বিশেষ করে জমি এবং বাণিজ্যপথ দখল করার একটা প্রবণতা সবসময়ই ছিল। আর রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে সাধারণত প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ করা হতো, এবং এই পদগুলো প্রায়শই বংশানুক্রমিক হয়ে যেত। সেনাবাহিনীতেও একই নিয়ম দেখা যেত।
প্রশস্তি এবং ভূমিদান
অর্জুন: আমি বইতে 'প্রশস্তি' বলে একটা শব্দ পেয়েছি। জিনিসটা কী, স্যার?
ইতিহাস স্যার: 'প্রশস্তি' হলো এক ধরনের বিশেষ শিলালিপি, যা সাধারণত রাজার গুণগান করে লেখা হতো। এগুলো বিদ্বান ব্রাহ্মণদের দিয়ে লেখানো হতো, যারা প্রায়শই প্রশাসনিক কাজেও রাজাকে সাহায্য করতেন। এই প্রশস্তিতে রাজাদের শৌর্যবীর্য, তাদের বিজয় এবং মহৎ গুণাবলীর বর্ণনা থাকত। তবে এগুলো সবসময় সত্যি হতো, তা কিন্তু নয়। রাজারা নিজেদেরকে যেমনভাবে দেখতে বা দেখাতে চাইতেন, প্রশস্তিতে ঠিক তেমনটাই লেখা হতো।
অর্জুন: মানে, অনেকটা আজকের দিনের বিজ্ঞাপনের মতো?
ইতিহাস স্যার: হাহাহা, খানিকটা সেরকমই বলতে পারো। এই প্রশস্তির একটা বড় উদ্দেশ্য ছিল রাজার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা। যেমন, নাগভট্ট নামে এক প্রতিহার রাজার প্রশস্তিতে বলা হয়েছে যে, তিনি সিন্ধু, বিদর্ভ, কলিঙ্গের রাজাদের পরাজিত করেছেন, যদিও তিনি তখন নিতান্তই এক রাজকুমার ছিলেন। ব্রাহ্মণরা এই প্রশস্তি লেখার বিনিময়ে রাজাদের কাছ থেকে প্রায়শই জমি বা গ্রাম অনুদান হিসেবে পেতেন। এই অনুদানপত্রগুলো তামার পাতে খোদাই করে রাখা হতো, যা জমি গ্রহণকারীকে দেওয়া হতো।
ধন-সম্পদের জন্য যুদ্ধ
অর্জুন: স্যার, আপনি বলছিলেন যে রাজারা প্রায়ই একে অপরের সাথে যুদ্ধ করত। কোনো বিশেষ জায়গা নিয়ে কি তাদের মধ্যে বেশি লড়াই হতো?
ইতিহাস স্যার: হ্যাঁ, ঠিক তাই। প্রতিটি রাজবংশই অন্য অঞ্চলের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইত। এর মধ্যে সবচেয়ে লোভনীয় অঞ্চল ছিল গঙ্গা উপত্যকার কনৌজ শহর। আজকের উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত এই শহরটির ওপর নিয়ন্ত্রণ মানেই ছিল বিশাল উর্বর কৃষিভূমি এবং বাণিজ্যপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ।
অর্জুন: কনৌজ! এর নাম তো শুনেছি।
ইতিহাস স্যার: হ্যাঁ। এই কনৌজ দখল করার জন্য গুর্জর-প্রতিহার, রাষ্ট্রকূট এবং পাল—এই তিনটি প্রধান শক্তি দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ চালিয়েছিল। ইতিহাসে এই ঘটনা 'ত্রিশক্তি সংগ্রাম' (Tripartite Struggle) নামে পরিচিত। প্রায় ২০০ বছর ধরে এই তিনটি বংশ কনৌজের জন্য লড়াই করেছে।
অর্জুন: ২০০ বছর! একটা শহরের জন্য এত লম্বা যুদ্ধ!
ইতিহাস স্যার: ঠিক তাই। এছাড়া, শাসকরা তাদের ক্ষমতা ও সম্পদ প্রদর্শনের জন্য বড় বড় মন্দির তৈরি করত। তাই এক রাজা যখন অন্য রাজ্য আক্রমণ করত, তখন তারা প্রায়শই সেই রাজ্যের মন্দিরগুলোকে নিশানা করত। কারণ মন্দিরগুলো তখন প্রচুর ধন-সম্পদ ও ঐশ্বর্যের ভান্ডার ছিল।
অর্জুন: তার মানে ধর্মীয় কারণে নয়, মূলত অর্থনৈতিক কারণে মন্দির আক্রমণ করা হতো?
ইতিহাস স্যার: একদম। এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো আফগানিস্তানের গজনীর সুলতান মাহমুদ। তিনি প্রায় ১০২৫ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের সোমনাথ মন্দির সহ ভারতের অনেক মন্দির লুণ্ঠন করেছিলেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মন্দিরের বিপুল সম্পদ দখল করে সেই টাকা দিয়ে তার রাজধানী গজনীকে একটি वैभवशाली শহরে পরিণত করা। তিনি একজন দক্ষ শাসকও ছিলেন এবং ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পর্কে জানতে আল-বিরুনি নামে একজন পণ্ডিতকে নিয়োগ করেছিলেন, যার লেখা 'কিতাব-উল-হিন্দ' আজও ঐতিহাসিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
একটু অন্যরকম: চোলদের কথা
অর্জুন: স্যার, দক্ষিণ ভারতের চোলদের কথা বইতে খুব সুন্দর করে লেখা আছে। তাদের সম্পর্কে আরও কিছু বলুন না।
ইতিহাস স্যার: অবশ্যই! চোল সাম্রাজ্য এই সময়কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। কাবেরী নদীর উর্বর বদ্বীপ অঞ্চলে মুত্তারাইয়ার নামে এক ছোট সর্দার পরিবারের শাসন ছিল, যারা কাঞ্চিপুরমের পল্লব রাজাদের সামন্ত ছিল। নবম শতকের মাঝামাঝি, উরাইয়ুরের চোল বংশীয় বিজয়ালয় এই মুত্তারাইয়ারদের পরাজিত করে বদ্বীপটি দখল করেন। তিনি সেখানে থাঞ্জাভুর শহর এবং দেবী নিশুম্ভসূদিনীর জন্য একটি মন্দির নির্মাণ করেন।
অর্জুন: তার মানে চোলদের শুরুটা বেশ ছোট ছিল?
ইতিহাস স্যার: হ্যাঁ। কিন্তু বিজয়ালয়ের উত্তরসূরীরা আশেপাশের অঞ্চল জয় করে রাজ্যকে আয়তনে ও শক্তিতে বাড়িয়ে তোলেন। পল্লব ও পাণ্ড্যদের এলাকাগুলোও তাদের সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে যায়। চোল রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে করা হয় প্রথম রাজরাজকে। তিনি ৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা হন এবং সাম্রাজ্যের বেশিরভাগ অঞ্চলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সাম্রাজ্যের প্রশাসন ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজান। তার পুত্র প্রথম রাজেন্দ্র তার নীতি অনুসরণ করে গঙ্গা উপত্যকা, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতেও অভিযান চালান। এর জন্য তিনি একটি শক্তিশালী নৌবাহিনীও তৈরি করেছিলেন।
অর্জুন: নৌবাহিনী! তার মানে তারা সমুদ্রপথেও যুদ্ধ করতে যেত?
ইতিহাস স্যার: ঠিক। রাজরাজ ও রাজেন্দ্রর তৈরি করা থাঞ্জাভুর ও গঙ্গৈকোণ্ডচোলপুরমের বিশাল মন্দিরগুলো স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের অপূর্ব নিদর্শন। এই মন্দিরগুলো শুধুমাত্র উপাসনার স্থান ছিল না, এগুলি ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মন্দিরের вокруг কারিগর, পুরোহিত, নর্তকী, músicos, ঝাড়ুদারদের বসতি গড়ে উঠেছিল। মন্দিরের জমি থেকে উৎপাদিত ফসল দিয়ে এই সকলের ভরণপোষণ চলত।
অর্জুন: আর চোলদের ব্রোঞ্জ মূর্তিগুলো তো বিশ্ববিখ্যাত!
ইতিহাস স্যার: একদম। চোলদের তৈরি ব্রোঞ্জ মূর্তিগুলো, বিশেষ করে নটরাজ মূর্তি, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্যের অন্যতম বলে গণ্য করা হয়। এগুলো 'লস্ট-ওয়াক্স' বা 'হারানো মোম' পদ্ধতিতে তৈরি করা হতো, যা এক অত্যন্ত উন্নত কৌশল।
অর্জুন: তাদের কৃষি আর সেচব্যবস্থা কেমন ছিল, স্যার?
ইতিহাস স্যার: চোলদের উন্নতির একটা বড় কারণ ছিল উন্নত কৃষি। কাবেরী নদীর জল দিয়ে তারা জমিতে সেচ করত। তারা খাল খনন করে, কুয়ো খুঁড়ে এবং জলাধার তৈরি করে সেচের ব্যবস্থা করেছিল। এর ফলে বছরে দুটি ফসল ফলানো সম্ভব হতো। জঙ্গল পরিষ্কার করে এবং জমি সমতল করে কৃষির অধীনে আনা হয়েছিল।
চোল প্রশাসন: এক অনন্য ব্যবস্থা
অর্জুন: আমি শুনেছি চোলদের গ্রাম প্রশাসন নাকি খুব উন্নত ছিল?
ইতিহাস স্যার: তুমি একদম ঠিক শুনেছ। চোলদের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা ছিল অসাধারণ। কৃষকদের বসতিগুলিকে বলা হতো 'উর' (Ur)। এই 'উর' গুলি একত্রিত হয়ে 'নাড়ু' (Nadu) গঠন করত। 'নাড়ু' বিচার ও কর আদায়ের মতো প্রশাসনিক কাজ করত। ধনী কৃষকদের কেন্দ্রীয় চোল সরকারের তত্ত্বাবধানে 'নাড়ু'র কাজকর্মের ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ছিল।
অর্জুন: আর ব্রাহ্মণদের ভূমিকা কী ছিল?
ইতিহাস স্যার: ব্রাহ্মণদের প্রায়শই জমি অনুদান দেওয়া হতো, যাকে বলা হতো 'ব্রহ্মদেয়'। এর ফলে কাবেরী উপত্যকায় প্রচুর ব্রাহ্মণ বসতি গড়ে ওঠে। প্রতিটি 'ব্রহ্মদেয়' দেখাশোনা করার জন্য ব্রাহ্মণদের একটি সভা বা পরিষদ ছিল। এই সভাগুলি খুব দক্ষতার সাথে কাজ করত। তামিলনাড়ুর উত্তরার্মেরুর থেকে পাওয়া শিলালিপিতে এই সভাগুলির গঠনতন্ত্রের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
অর্জুন: কী ধরনের বর্ণনা?
ইতিহাস স্যার: সেখানে লেখা আছে কীভাবে সভার বিভিন্ন সমিতির, যেমন সেচ, বাগান, মন্দির ইত্যাদি দেখাশোনার জন্য সদস্য নির্বাচন করা হতো। তালপাতার ছোট ছোট ٹکٹে যোগ্য প্রার্থীদের নাম লিখে একটি মাটির পাত্রে রাখা হতো। তারপর একটি ছোট ছেলেকে দিয়ে পাত্র থেকে টিকিটগুলো তোলা হতো এবং এভাবেই লটারির মাধ্যমে সদস্য নির্বাচন করা হতো। এটা অনেকটা আজকের দিনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো, তাই না?
অর্জুন: হ্যাঁ স্যার! এটা তো খুবই আধুনিক চিন্তাভাবনা। ভাবতেই অবাক লাগছে যে হাজার বছর আগেও এত সুন্দর ব্যবস্থা ছিল।
আপনার প্রশ্ন, স্যারের উত্তর
অর্জুন: স্যার, পুরো বিষয়টা খুব পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি কি আপনাকে কয়েকটা ছোট প্রশ্ন করতে পারি?
ইতিহাস স্যার: নিশ্চয়ই, অর্জুন। বলো তোমার কী প্রশ্ন।
অর্জুন: প্রথমত, 'প্রশস্তি' লেখার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এগুলো থেকে আমরা ঠিক কী জানতে পারি?
ইতিহাস স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন। প্রশস্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজার গুণগান করা এবং তার ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে তোলা। এগুলো প্রায়শই সভাকবি বা বিদ্বান ব্রাহ্মণরা লিখতেন। এগুলো থেকে আমরা জানতে পারি একজন শাসক নিজেকে কীভাবে দেখতেন বা প্রজাদের কাছে নিজেকে কীভাবে তুলে ধরতে চাইতেন। যেমন, তারা নিজেদেরকে বিজয়ী, ধার্মিক এবং প্রজাপালক হিসেবে চিত্রিত করত। তবে মনে রাখতে হবে, এগুলিতে প্রায়শই অতিরঞ্জন থাকত।
অর্জুন: আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, কনৌজ শহরকে নিয়ে 'ত্রিশক্তি সংগ্রাম' কেন হয়েছিল? এর এত গুরুত্ব কী ছিল?
ইতিহাস স্যার: কনৌজের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি উত্তর ভারতের উর্বর গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে অবস্থিত ছিল, যা ছিল কৃষিসম্পদে পরিপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, এটি ছিল তৎকালীন উত্তর ভারতের প্রধান বাণিজ্যপথগুলির সংযোগস্থল। তাই যে কনৌজ নিয়ন্ত্রণ করত, সে উত্তর ভারতের অর্থনীতি ও রাজনীতিকেও নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পেত। এই 엄청 সম্পদ ও ক্ষমতার লোভেই পাল, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূট বংশ প্রায় ২০০ বছর ধরে একে অপরের সাথে যুদ্ধ করেছিল।
অর্জুন: বুঝতে পেরেছি। আমার শেষ প্রশ্ন চোলদের গ্রাম প্রশাসন নিয়ে। তাদের 'সভা' কীভাবে কাজ করত এবং সদস্য নির্বাচন কীভাবে হতো, যদি আরেকবার সংক্ষেপে বলেন।
ইতিহাস স্যার: অবশ্যই। চোলদের 'ব্রহ্মদেয়' গ্রামগুলিতে ব্রাহ্মণদের নিয়ে গঠিত 'সভা' বা পরিষদ ছিল। এই সভাগুলি গ্রামের সমস্ত প্রশাসনিক কাজ, যেমন কর আদায়, বিচার, সেচব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি করত। উত্তরার্মেরুর শিলালিপি অনুসারে, সভার বিভিন্ন সমিতির সদস্য পদের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের নাম তালপাতার ছোট ٹکٹে লিখে একটি মাটির কলসিতে রাখা হতো। তারপর একটি ছোট বালককে দিয়ে লটারির মতো করে একটি একটি করে টিকিট তুলে সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হতো। এভাবেই অত্যন্ত সংগঠিত এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাদের গ্রাম প্রশাসন চলত।
আজ আমরা কী শিখলাম?
ইতিহাস স্যার: তাহলে অর্জুন, আজকের আলোচনা থেকে আমরা সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। চলো, একবার সংক্ষেপে দেখে নিই মূল বিষয়গুলো।
- নতুন রাজবংশের উত্থান: এই সময়ে অনেক বড় জমিদার বা যোদ্ধা প্রধান, অর্থাৎ 'সামন্ত'রা ক্ষমতাশালী হয়ে নিজেদের স্বাধীন রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। যেমন, রাষ্ট্রকূটরা।
- প্রশাসন ও সম্পদ: রাজারা বড় বড় উপাধি নিলেও সামন্ত, ব্যবসায়ী ও ব্রাহ্মণদের সাথে ক্ষমতা ভাগ করে নিতেন। রাজ্যের আয় হতো মূলত কৃষক, কারিগরদের থেকে আদায় করা বিভিন্ন ধরনের করের মাধ্যমে।
- প্রশস্তি ও ভূমিদান: রাজারা ব্রাহ্মণদের দিয়ে নিজেদের গুণগান করে 'প্রশস্তি' লেখাতেন এবং প্রায়শই তাদের জমি অনুদান দিতেন। এই তাম্রলিপিগুলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
- ধন-সম্পদের জন্য যুদ্ধ: সম্পদশালী অঞ্চল, বিশেষ করে কনৌজ দখলের জন্য পাল, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটদের মধ্যে 'ত্রিশক্তি সংগ্রাম' হয়েছিল। মন্দিরগুলোও সম্পদের ভান্ডার হওয়ায় প্রায়শই আক্রমণের শিকার হতো।
- চোল সাম্রাজ্য: আমরা চোলদের উত্থান, তাদের শক্তিশালী শাসক রাজরাজ ও রাজেন্দ্র, তাদের নির্মিত বিশাল মন্দির, বিশ্ববিখ্যাত ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য, উন্নত কৃষি ও সেচ ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি, তাদের অনন্য স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন বা গ্রাম প্রশাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানলাম।
অর্জুন: ধন্যবাদ স্যার! আজকের আলোচনাটা অসাধারণ ছিল। গুপ্তদের পর আর সুলতানি শাসনের আগের ভারতের ইতিহাসটা যে এত ঘটনাবহুল এবং আকর্ষণীয় ছিল, তা আমি আগে বুঝতেই পারিনি। বিশেষ করে চোলদের গ্রাম প্রশাসনের কথা জেনে আমি মুগ্ধ। মনে হচ্ছে যেন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তখন বিভিন্ন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল।
ইতিহাস স্যার: একদম ঠিক বলেছ, অর্জুন। ইতিহাস মানে শুধু বড় বড় সাম্রাজ্যের গল্প নয়, এই ছোট ছোট রাজ্য আর তাদের শাসনব্যবস্থার মধ্যেও অনেক কিছু শেখার আছে। তোমার এই আগ্রহ বজায় রেখো, দেখবে ইতিহাস তোমার কাছে আরও জীবন্ত হয়ে উঠবে।