বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশের জগৎ অসংখ্য পদার্থ দিয়ে গঠিত। এই পদার্থগুলি অণু এবং পরমাণুর সমন্বয়ে তৈরি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছো, কেন দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু একত্রিত হয়ে একটি হাইড্রোজেন অণু (H₂) তৈরি করে, কিন্তু দুটি হিলিয়াম পরমাণু তেমনটা করে না? কেন জল (H₂O) তরল, কিন্তু কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂) গ্যাস? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় শক্তির মধ্যে, যা পরমাণুগুলোকে একসাথে ধরে রাখে। এই শক্তিই হলো রাসায়নিক বন্ধন (Chemical Bond)।
একাদশ শ্রেণির রসায়নের চতুর্থ অধ্যায়, 'রাসায়নিক বন্ধন এবং আণবিক গঠন' (Chemical Bonding and Molecular Structure), আমাদের এই মৌলিক শক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই অধ্যায়টি রসায়নের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর। এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কীভাবে পরমাণুগুলি একত্রিত হয়ে বিভিন্ন ধরণের অণু ও যৌগ গঠন করে এবং সেই অণুগুলির নির্দিষ্ট জ্যামিতিক আকৃতি কীভাবে তাদের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মকে প্রভাবিত করে। এই অধ্যায়ের জ্ঞান ছাড়া অজৈব এবং জৈব রসায়নের গভীরে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। চলুন, এই আকর্ষণীয় জগতের গভীরে ডুব দেওয়া যাক এবং পরমাণুদের একসাথে থাকার পেছনের বিজ্ঞানকে উন্মোচন করি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
এই অধ্যায়টি কয়েকটি মূল ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি। আমরা পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ধারণা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
১. কেন পরমাণু রাসায়নিক বন্ধন গঠন করে? কোসেল-লুইস ধারণা (Kossel-Lewis Approach)
১৯১৬ সালে বিজ্ঞানী কোসেল এবং লুইস পরমাণুগুলির রাসায়নিক সংযোগের কারণ ব্যাখ্যা করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব প্রদান করেন। তাদের ধারণাটি মূলত নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলির স্থিতিশীলতার উপর ভিত্তি করে তৈরি।
- অষ্টক নিয়ম (Octet Rule): লুইস প্রস্তাব করেন যে, পরমাণুগুলি তাদের যোজ্যতা কক্ষে (outermost shell) আটটি ইলেকট্রন (বা হিলিয়ামের ক্ষেত্রে দুটি) অর্জনের মাধ্যমে নিকটতম নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ইলেকট্রন বিন্যাস লাভ করার চেষ্টা করে। এই প্রবণতার কারণেই তারা ইলেকট্রন গ্রহণ, বর্জন বা ভাগাভাগির মাধ্যমে রাসায়নিক বন্ধন গঠন করে। যোজ্যতা কক্ষে আটটি ইলেকট্রনের এই বিন্যাসকে অষ্টক বলা হয়।
- লুইস প্রতীক (Lewis Symbols): লুইস পরমাণুর যোজ্যতা ইলেকট্রনগুলিকে বোঝানোর জন্য একটি সহজ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এক্ষেত্রে, মৌলের প্রতীকের চারপাশে ডট (.) বা ক্রস (x) চিহ্ন দিয়ে যোজ্যতা ইলেকট্রন সংখ্যা দেখানো হয়। যেমন, সোডিয়ামের (Na) একটি যোজ্যতা ইলেকট্রন আছে, তাই এর লুইস প্রতীক হলো Na•। ক্লোরিনের (Cl) সাতটি যোজ্যতা ইলেকট্রন আছে, তাই এর প্রতীক হলো Cl যার চারপাশে সাতটি ডট থাকবে।
২. আয়নীয় বা তড়িৎযোজী বন্ধন (Ionic or Electrovalent Bond)
যখন একটি পরমাণু থেকে অন্য পরমাণুতে এক বা একাধিক ইলেকট্রনের সম্পূর্ণ স্থানান্তর ঘটে, তখন যে বন্ধন তৈরি হয়, তাকে আয়নীয় বন্ধন বলে।
- কীভাবে গঠিত হয়? সাধারণত একটি ধাতু (যা সহজে ইলেকট্রন বর্জন করতে পারে) এবং একটি অধাতুর (যা সহজে ইলেকট্রন গ্রহণ করতে পারে) মধ্যে এই বন্ধন গঠিত হয়। যে পরমাণুটি ইলেকট্রন বর্জন করে, সেটি ধনাত্মক আয়নে (ক্যাটায়ন) পরিণত হয় এবং যে পরমাণুটি ইলেকট্রন গ্রহণ করে, সেটি ঋণাত্মক আয়নে (অ্যানায়ন) পরিণত হয়। এই বিপরীত আধানযুক্ত আয়নগুলি স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বলের (electrostatic force) মাধ্যমে একে অপরের সাথে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ হয়।
- উদাহরণ: সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) গঠন
- সোডিয়াম (Na) পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস ২, ৮, ১। এটি তার যোজ্যতা কক্ষের একটি ইলেকট্রন বর্জন করে Na⁺ আয়নে (বিন্যাস ২, ৮) পরিণত হয় এবং অষ্টক পূর্ণ করে।
- ক্লোরিন (Cl) পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস ২, ৮, ৭। এটি একটি ইলেকট্রন গ্রহণ করে Cl⁻ আয়নে (বিন্যাস ২, ৮, ৮) পরিণত হয় এবং অষ্টক পূর্ণ করে।
- এরপর Na⁺ এবং Cl⁻ আয়নগুলি স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বলের মাধ্যমে একত্রিত হয়ে সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) গঠন করে।
- Na → Na⁺ + e⁻
- Cl + e⁻ → Cl⁻
- Na⁺ + Cl⁻ → NaCl
- আয়নীয় বন্ধন গঠনের শর্তাবলী:
- নিম্ন আয়নন এনথ্যালপি (Low Ionization Enthalpy): ক্যাটায়ন গঠনকারী পরমাণুর আয়নন এনথ্যালপি যত কম হবে, তত সহজে সেটি ইলেকট্রন বর্জন করতে পারবে।
- উচ্চ ইলেকট্রন আসক্তি এনথ্যালপি (High Electron Gain Enthalpy): অ্যানায়ন গঠনকারী পরমাণুর ইলেকট্রন গ্রহণ এনথ্যালপি যত বেশি (বেশি ঋণাত্মক) হবে, তত সহজে সেটি ইলেকট্রন গ্রহণ করবে।
- উচ্চ ল্যাটিস এনথ্যালপি (High Lattice Enthalpy): আয়নীয় যৌগ গঠনের সময় ক্যাটায়ন এবং অ্যানায়ন একত্রিত হয়ে যখন কেলাস গঠন করে, তখন যে শক্তি নির্গত হয়, তাকে ল্যাটিস এনথ্যালপি বলে। এই শক্তির মান যত বেশি হবে, গঠিত যৌগ তত বেশি স্থিতিশীল হবে।
৩. সমযোজী বন্ধন (Covalent Bond)
যখন দুটি পরমাণু তাদের যোজ্যতা কক্ষের ইলেকট্রনগুলি ভাগাভাগি (sharing) করে অষ্টক পূরণের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা অর্জন করে, তখন তাদের মধ্যে যে বন্ধন গঠিত হয়, তাকে সমযোজী বন্ধন বলে। এই বন্ধন সাধারণত দুটি অধাতব পরমাণুর মধ্যে গঠিত হয়।
- লুইস ডট গঠন (Lewis Dot Structure): সমযোজী অণুর গঠন দেখানোর জন্য লুইস ডট গঠন একটি অত্যন্ত কার্যকরী পদ্ধতি। এতে বন্ধনে অংশগ্রহণকারী ইলেকট্রন জোড় (bond pair) এবং বন্ধনে অংশগ্রহণ না করা নিঃসঙ্গ ইলেকট্রন জোড় (lone pair) দেখানো হয়।
- সমযোজী বন্ধনের প্রকারভেদ:
- একবন্ধন (Single Bond): যখন দুটি পরমাণু এক জোড়া (দুটি) ইলেকট্রন ভাগাভাগি করে। যেমন: হাইড্রোজেন অণু (H-H), ক্লোরিন অণু (Cl-Cl)।
- দ্বিবন্ধন (Double Bond): যখন দুটি পরমাণু দুই জোড়া (চারটি) ইলেকট্রন ভাগাভাগি করে। যেমন: অক্সিজেন অণু (O=O), কার্বন ডাই অক্সাইড (O=C=O)।
- ত্রিবন্ধন (Triple Bond): যখন দুটি পরমাণু তিন জোড়া (ছয়টি) ইলেকট্রন ভাগাভাগি করে। যেমন: নাইট্রোজেন অণু (N≡N)।
- বন্ধন সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার:
- বন্ধন দৈর্ঘ্য (Bond Length): একটি অণুতে দুটি আবদ্ধ পরমাণুর নিউক্লিয়াসের মধ্যেকার গড় দূরত্ব। একবন্ধনের চেয়ে দ্বিবন্ধন ছোট এবং দ্বিবন্ধনের চেয়ে ত্রিবন্ধন আরও ছোট হয়।
- বন্ধন কোণ (Bond Angle): একটি অণুর কেন্দ্রীয় পরমাণুর সাথে যুক্ত দুটি বন্ধনের মধ্যেকার কোণ। এটি অণুর জ্যামিতিক আকৃতি নির্ধারণ করে।
- বন্ধন এনথ্যালপি (Bond Enthalpy): গ্যাসীয় অবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট প্রকারের এক মোল বন্ধন ভাঙতে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়। বন্ধনের সংখ্যা বাড়লে (একবন্ধন < দ্বিবন্ধন < ত্রিবন্ধন) বন্ধন এনথ্যালপিও বাড়ে।
- বন্ধন ক্রম (Bond Order): দুটি পরমাণুর মধ্যে উপস্থিত বন্ধনের সংখ্যা। যেমন, H₂ তে বন্ধন ক্রম ১, O₂ তে ২ এবং N₂ তে ৩।
৪. আণবিক জ্যামিতি: VSEPR তত্ত্ব (Valence Shell Electron Pair Repulsion Theory)
সমযোজী অণুর সঠিক জ্যামিতিক আকৃতি ব্যাখ্যা করার জন্য সিজউইক ও পাওয়েল এই তত্ত্বটি প্রস্তাব করেন, যা পরে গিলেস্পি ও নাইহোম দ্বারা আরও বিকশিত হয়। এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো, একটি অণুর কেন্দ্রীয় পরমাণুর যোজ্যতা কক্ষে থাকা ইলেকট্রন জোড়গুলি (বন্ধন জোড় এবং নিঃসঙ্গ জোড় উভয়ই) একে অপরকে বিকর্ষণ করে এবং ত্রিমাত্রিক স্থানে এমনভাবে অবস্থান করার চেষ্টা করে যাতে তাদের মধ্যে বিকর্ষণ সর্বনিম্ন হয়। এর ফলেই অণুটি একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক আকৃতি লাভ করে।
- VSEPR তত্ত্বের মূল কথা:
- বিকর্ষণের ক্রম: নিঃসঙ্গ জোড়-নিঃসঙ্গ জোড় (LP-LP) > নিঃসঙ্গ জোড়-বন্ধন জোড় (LP-BP) > বন্ধন জোড়-বন্ধন জোড় (BP-BP)।
- এই বিকর্ষণের কারণে অণুর আদর্শ জ্যামিতি বিকৃত হয়। যেমন, মিথেনে (CH₄) চারটিই বন্ধন জোড় থাকায় এর আকৃতি সুষম চতুস্তলকীয় এবং বন্ধন কোণ ১০৯.৫°।
- কিন্তু অ্যামোনিয়াতে (NH₃) একটি নিঃসঙ্গ জোড় ও তিনটি বন্ধন জোড় থাকায় LP-BP বিকর্ষণ BP-BP বিকর্ষণের চেয়ে বেশি হয়, ফলে বন্ধন কোণ কমে ১০৭° হয় এবং আকৃতি হয় পিরামিডীয়।
- জলের অণুতে (H₂O) দুটি নিঃসঙ্গ জোড় ও দুটি বন্ধন জোড় থাকায় বিকর্ষণ আরও বেশি হয়। ফলে বন্ধন কোণ আরও কমে ১০৪.৫° হয় এবং আকৃতি হয় কৌণিক বা V-আকৃতির।
নিচে কিছু সাধারণ অণুর আকৃতি দেখানো হলো:
- AB₂ প্রকার (যেমন BeCl₂): রৈখিক (Linear), কোণ ১৮০°।
- AB₃ প্রকার (যেমন BF₃): ত্রিভুজাকার সমতলীয় (Trigonal Planar), কোণ ১২০°।
- AB₄ প্রকার (যেমন CH₄): চতুস্তলকীয় (Tetrahedral), কোণ ১০৯.৫°।
- AB₅ প্রকার (যেমন PCl₅): ত্রিভুজাকার দ্বিপিরামিডীয় (Trigonal Bipyramidal)।
- AB₆ প্রকার (যেমন SF₆): অষ্টতলকীয় (Octahedral)।
৫. সমযোজী বন্ধনের আধুনিক তত্ত্ব: সংকরায়ণ (Hybridization)
ভ্যালেন্স বন্ড তত্ত্ব (VBT) অনুসারে, সমযোজী বন্ধন পারমাণবিক কক্ষকগুলির অভিলেপনের (overlapping) মাধ্যমে গঠিত হয়। কিন্তু এই তত্ত্ব মিথেনের (CH₄) মতো অণুর চারটি সমতুল্য C-H বন্ধন ব্যাখ্যা করতে পারেনি। এই সমস্যা সমাধানের জন্য পলিং 'সংকরায়ণ' বা 'হাইব্রিডাইজেশন' ধারণার প্রবর্তন করেন।
- সংকরায়ণ কী? এটি হলো কোনো পরমাণুর যোজ্যতা কক্ষের প্রায় সমশক্তি সম্পন্ন বিভিন্ন পারমাণবিক কক্ষকগুলির মিশ্রণের মাধ্যমে সমশক্তি ও সম-আকৃতির নতুন কক্ষক তৈরির প্রক্রিয়া। এই নতুন কক্ষকগুলিকে সংকর কক্ষক (hybrid orbitals) বলা হয়।
- সংকরায়ণের প্রকারভেদ:
- sp সংকরায়ণ: একটি s এবং একটি p কক্ষক মিশ্রিত হয়ে দুটি সমতুল্য sp সংকর কক্ষক তৈরি করে। এগুলি রৈখিকভাবে (১৮০° কোণে) বিন্যস্ত থাকে। উদাহরণ: BeCl₂।
- sp² সংকরায়ণ: একটি s এবং দুটি p কক্ষক মিশ্রিত হয়ে তিনটি সমতুল্য sp² সংকর কক্ষক তৈরি করে। এগুলি একটি সমতলে ত্রিভুজাকারে (১২০° কোণে) বিন্যস্ত থাকে। উদাহরণ: BCl₃।
- sp³ সংকরায়ণ: একটি s এবং তিনটি p কক্ষক মিশ্রিত হয়ে চারটি সমতুল্য sp³ সংকর কক্ষক তৈরি করে। এগুলি চতুস্তলকীয়ভাবে (১০৯.৫° কোণে) বিন্যস্ত থাকে। উদাহরণ: CH₄, NH₃, H₂O।
- π (পাই) বন্ধন গঠন: সংকর কক্ষকগুলি সাধারণত σ (সিগমা) বন্ধন গঠন করে যা দুটি কক্ষকের মুখোমুখি অভিলেপনের ফলে হয়। অসংকরিত p কক্ষকগুলি পাশাপাশি অভিলেপনের মাধ্যমে π (পাই) বন্ধন গঠন করে। দ্বিবন্ধনে একটি সিগমা ও একটি পাই বন্ধন থাকে (যেমন, C₂H₄), এবং ত্রিবন্ধনে একটি সিগমা ও দুটি পাই বন্ধন থাকে (যেমন, C₂H₂)।
৬. আণবিক কক্ষক তত্ত্ব (Molecular Orbital Theory - MOT)
ভ্যালেন্স বন্ড তত্ত্বের কিছু সীমাবদ্ধতা (যেমন O₂ অণুর পরাচুম্বকীয় ধর্ম ব্যাখ্যা করতে না পারা) দূর করার জন্য হুন্ড এবং মুলিকেন এই উন্নত তত্ত্বটি প্রদান করেন।
- MOT-এর মূল ধারণা: এই তত্ত্ব অনুসারে, যখন পরমাণুগুলি একত্রিত হয়ে অণু গঠন করে, তখন তাদের পারমাণবিক কক্ষকগুলি (Atomic Orbitals - AO) তাদের নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে ফেলে এবং সম্পূর্ণ অণুর জন্য নতুন কক্ষক তৈরি করে, যেগুলিকে আণবিক কক্ষক (Molecular Orbitals - MO) বলা হয়।
- বন্ধনকারী ও প্রতিবন্ধনকারী আণবিক কক্ষক: দুটি পারমাণবিক কক্ষকের মিশ্রণে দুটি আণবিক কক্ষক তৈরি হয়।
- বন্ধনকারী আণবিক কক্ষক (Bonding Molecular Orbital - BMO): এর শক্তি মূল পারমাণবিক কক্ষকগুলির চেয়ে কম হয় এবং এটি বন্ধন গঠনে সহায়তা করে।
- প্রতিবন্ধনকারী আণবিক কক্ষক (Antibonding Molecular Orbital - ABMO): এর শক্তি মূল পারমাণবিক কক্ষকগুলির চেয়ে বেশি হয় এবং এটি বন্ধন গঠনে বাধা দেয়। একে তারকা (*) চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হয় (যেমন, σ*, π*)।
- বন্ধন ক্রম (Bond Order): MOT অনুসারে, বন্ধন ক্রম = ½ (বন্ধনকারী ইলেকট্রনের সংখ্যা - প্রতিবন্ধনকারী ইলেকট্রনের সংখ্যা)।
- বন্ধন ক্রমের মান ধনাত্মক হলে অণুটি স্থিতিশীল।
- বন্ধন ক্রম শূন্য বা ঋণাত্মক হলে অণুটি অস্থিতিশীল এবং এর অস্তিত্ব নেই (যেমন, He₂)।
- বন্ধন ক্রমের মান যত বেশি, বন্ধন তত শক্তিশালী এবং বন্ধন দৈর্ঘ্য তত কম।
- O₂ অণুর পরাচুম্বকীয় ধর্ম ব্যাখ্যা: MOT অনুসারে অক্সিজেন অণুর ইলেকট্রন বিন্যাস লেখার সময় দেখা যায় যে, এর দুটি প্রতিবন্ধনকারী π* আণবিক কক্ষকে দুটি অযুগ্ম ইলেকট্রন রয়েছে। এই অযুগ্ম ইলেকট্রনের উপস্থিতির কারণেই O₂ অণু চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা আকৃষ্ট হয়, অর্থাৎ এটি পরাচুম্বকীয় (paramagnetic)।
৭. বন্ধন মেরুতা (Bond Polarity) ও দ্বিমেরু ভ্রামক (Dipole Moment)
সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ পরমাণু দুটির তড়িৎ ঋণাত্মকতা (electronegativity) যদি ভিন্ন হয়, তবে শেয়ার করা ইলেকট্রন জোড়টি বেশি তড়িৎ ঋণাত্মক পরমাণুর দিকে কিছুটা সরে যায়। এর ফলে ওই পরমাণুটি আংশিক ঋণাত্মক (δ-) এবং অন্য পরমাণুটি আংশিক ধনাত্মক (δ+) আধান লাভ করে। এই ধরনের বন্ধনকে মেরু সমযোজী বন্ধন (Polar Covalent Bond) বলা হয়।
- দ্বিমেরু ভ্রামক (Dipole Moment, μ): এটি কোনো অণুর মেরুতার পরিমাপ। μ = q × d, যেখানে q হলো আধানের মান এবং d হলো আধান দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব। এটি একটি ভেক্টর রাশি।
- অণুর সামগ্রিক মেরুতা: একটি অণুতে একাধিক মেরু বন্ধন থাকলেও তার জ্যামিতিক গঠনের কারণে সামগ্রিক দ্বিমেরু ভ্রামক শূন্য হতে পারে। যেমন, CO₂ একটি রৈখিক অণু। এতে দুটি C=O বন্ধন মেরু হলেও, তাদের দ্বিমেরু ভ্রামক দুটি পরস্পর বিপরীত দিকে কাজ করায় একে অপরকে প্রশমিত করে দেয়। তাই CO₂ একটি অ-মেরু (non-polar) অণু। অন্যদিকে, জলের (H₂O) অণুর কৌণিক গঠনের কারণে দুটি O-H বন্ধনের দ্বিমেরু ভ্রামক প্রশমিত হয় না, ফলে জলের অণু একটি মেরু (polar) অণু এবং এর একটি স্থায়ী দ্বিমেরু ভ্রামক আছে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: আয়নীয় এবং সমযোজী বন্ধনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: প্রধান পার্থক্য হলো ইলেকট্রনের আদান-প্রদান। আয়নীয় বন্ধনে একটি পরমাণু থেকে অন্যটিতে ইলেকট্রনের সম্পূর্ণ স্থানান্তর ঘটে, যার ফলে ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন তৈরি হয়। এই আয়নগুলি স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বল দ্বারা যুক্ত থাকে। অন্যদিকে, সমযোজী বন্ধনে দুটি পরমাণু ইলেকট্রন জোড় ভাগাভাগি বা শেয়ার করে বন্ধন গঠন করে। সাধারণত ধাতু ও অধাতুর মধ্যে আয়নীয় বন্ধন এবং দুটি অধাতুর মধ্যে সমযোজী বন্ধন দেখা যায়।
প্রশ্ন ২: VSEPR তত্ত্বের মূল ভিত্তি কী এবং এটি কীভাবে আণুর আকৃতি নির্ধারণ করে?
উত্তর: VSEPR (Valence Shell Electron Pair Repulsion) তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো, একটি অণুর কেন্দ্রীয় পরমাণুর যোজ্যতা কক্ষে থাকা ইলেকট্রন জোড়গুলি (বন্ধনকারী এবং নিঃসঙ্গ উভয়ই) একে অপরকে বিকর্ষণ করে। এই বিকর্ষণ কমানোর জন্য ইলেকট্রন জোড়গুলি ত্রিমাত্রিক স্থানে যতটা সম্ভব দূরে অবস্থান করে। এই অবস্থানই অণুর জ্যামিতিক আকৃতি নির্ধারণ করে। নিঃসঙ্গ জোড়ের বিকর্ষণ বল বন্ধনকারী জোড়ের চেয়ে বেশি হওয়ায় এটি অণুর আদর্শ আকৃতিকে কিছুটা বিকৃত করে দেয়।
প্রশ্ন ৩: সংকরায়ণ (Hybridization) বলতে কী বোঝায়? একটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: সংকরায়ণ হলো একটি পরমাণুর যোজ্যতা কক্ষের প্রায় সমান শক্তি সম্পন্ন বিভিন্ন পারমাণবিক কক্ষকগুলির মিশ্রণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন, সমশক্তি ও সম-আকৃতির কক্ষক তৈরির একটি ধারণা। এই নতুন কক্ষকগুলিকে সংকর কক্ষক বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, মিথেন (CH₄) অণুতে কার্বনের একটি 2s এবং তিনটি 2p কক্ষক মিশ্রিত হয়ে চারটি সমতুল্য sp³ সংকর কক্ষক তৈরি করে। এই চারটি sp³ কক্ষক চারটি হাইড্রোজেন পরমাণুর 1s কক্ষকের সাথে অভিলেপন করে চারটি অভিন্ন C-H সিগমা বন্ধন গঠন করে, যা অণুটিকে একটি সুষম চতুস্তলকীয় আকৃতি দেয়।
প্রশ্ন ৪: অক্সিজেন (O₂) অণু পরাচুম্বকীয় (paramagnetic) কেন, যদিও এর লুইস গঠনে কোনো অযুগ্ম ইলেকট্রন নেই?
উত্তর: এই প্রশ্নের উত্তর ভ্যালেন্স বন্ড তত্ত্ব বা লুইস গঠন দিয়ে দেওয়া যায় না, এর জন্য আণবিক কক্ষক তত্ত্ব (MOT) প্রয়োজন। MOT অনুসারে, অক্সিজেন অণুর ইলেকট্রন বিন্যাস করলে দেখা যায় যে এর সর্বোচ্চ শক্তিস্তর, অর্থাৎ প্রতিবন্ধনকারী পাই আণবিক কক্ষকে (π*2py এবং π*2pz) দুটি অযুগ্ম ইলেকট্রন (unpaired electron) উপস্থিত থাকে। হুন্ডের নিয়ম অনুসারে ইলেকট্রনগুলি প্রথমে একটি করে কক্ষক দখল করে। এই দুটি অযুগ্ম ইলেকট্রনের উপস্থিতির কারণেই অক্সিজেন অণু পরাচুম্বকীয় ধর্ম প্রদর্শন করে এবং চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা আকৃষ্ট হয়।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায় থেকে আমরা যা কিছু শিখলাম তার একটি সংক্ষিপ্ত সার নিচে দেওয়া হলো:
- রাসায়নিক বন্ধন: পরমাণুগুলিকে অণুতে একসাথে ধরে রাখার শক্তি, যা অষ্টক পূরণের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য গঠিত হয়।
- আয়নীয় বন্ধন: ইলেকট্রনের সম্পূর্ণ স্থানান্তরের মাধ্যমে ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন গঠন এবং তাদের মধ্যে স্থির তড়িৎ আকর্ষণ।
- সমযোজী বন্ধন: দুই বা ততোধিক পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন জোড় ভাগাভাগির মাধ্যমে গঠিত বন্ধন (এক, দ্বি বা ত্রি-বন্ধন)।
- VSEPR তত্ত্ব: যোজ্যতা কক্ষের ইলেকট্রন জোড়গুলির মধ্যে বিকর্ষণ সর্বনিম্ন করার মাধ্যমে অণুর জ্যামিতিক আকৃতি নির্ধারণ করে। নিঃসঙ্গ জোড়ের বিকর্ষণ সবচেয়ে বেশি।
- সংকরায়ণ (Hybridization): পারমাণবিক কক্ষকগুলির মিশ্রণের মাধ্যমে সমশক্তি ও সম-আকৃতির সংকর কক্ষক তৈরি, যা বন্ধনের সমতুল্যতা ও জ্যামিতি ব্যাখ্যা করে (sp, sp², sp³)।
- আণবিক কক্ষক তত্ত্ব (MOT): পারমাণবিক কক্ষকগুলি মিলিত হয়ে আণবিক কক্ষক (বন্ধনকারী ও প্রতিবন্ধনকারী) গঠন করে। এটি অণুর স্থায়িত্ব, বন্ধন ক্রম এবং চৌম্বকীয় ধর্ম ব্যাখ্যা করতে পারে।
- বন্ধন মেরুতা: তড়িৎ ঋণাত্মকতার পার্থক্যের কারণে সমযোজী বন্ধনে আংশিক আয়নীয় চরিত্র তৈরি হয়, যা দ্বিমেরু ভ্রামকের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়।
রাসায়নিক বন্ধন এবং আণবিক গঠন বোঝা মানে পদার্থের আচরণের মূল চাবিকাঠি হাতে পাওয়া। এই জ্ঞান রসায়নের পরবর্তী অধ্যায়গুলি এবং বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাগুলি বোঝার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে দেবে।