ঘটনার প্রেক্ষাপট
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পৃথিবীর মানচিত্রে তখনও এমন কিছু জায়গা ছিল যেখানে সভ্য মানুষের পা পড়েনি। আমাজনের গভীর অরণ্য ছিল এমনই এক রহস্যময় জগৎ—এক সুবিশাল সবুজ গোলকধাঁধা, যেখানে প্রকৃতি তার আদিম ও ভয়ঙ্কর রূপে বিরাজমান। এই ভয়ঙ্কর সুন্দর পৃথিবীর প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ অনুভব করতেন লেফটেন্যান্ট-কর্নেল পার্সি হ্যারিসন ফসেট। তিনি ছিলেন একজন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা, ভূগোলবিদ এবং দুঃসাহসিক অভিযাত্রী। তার শিরায় শিরায় বইত অভিযানের নেশা।
১৯০৬ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে ফসেট প্রায় সাতবার আমাজনে অভিযান চালান। স্থানীয় উপজাতিদের সাথে তার সম্পর্ক ছিল বেশ ভালো। কিন্তু নিছক জঙ্গল জরিপ বা মানচিত্র তৈরি তার মূল উদ্দেশ্য ছিল না। ফসেট ছিলেন এক স্বপ্নের ঘোরগ্রস্ত শিকারী। তিনি এমন এক পৌরাণিক শহরের সন্ধানে ছিলেন, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘দ্য লস্ট সিটি অফ জেড’ (The Lost City of Z)। পর্তুগিজ অভিযাত্রীদের লেখা একটি পুরনো নথি ‘ম্যানাস্ক্রিপ্ট ৫১২’-এ বর্ণিত এক হারানো শহরের কথা পড়ে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, আমাজনের গভীরে লুকিয়ে আছে এক উন্নত প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই শহরটি কোনো অংশে কম নয়, হয়তো আটলান্টিসের মতোই প্রাচীন ও ঐশ্বর্যশালী।
বারবার ব্যর্থতা সত্ত্বেও ফসেটের বিশ্বাস এতটুকু টলেনি। ১৯২৫ সালে, জীবনের শেষ অভিযানে তিনি আরও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। এবার তার সঙ্গী হলেন তার ২১ বছর বয়সী পুত্র জ্যাক ফসেট এবং জ্যাকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু র্যালে রিমেল। তাদের লক্ষ্য ছিল ব্রাজিলের মাতো গ্রোসো অঞ্চলের দুর্ভেদ্য অরণ্যে প্রবেশ করে ‘Z’-এর রহস্য উন্মোচন করা। তারা কি জানতেন, এই সবুজ নরকের গভীরে কী অপেক্ষা করছে তাদের জন্য?
রহস্যের জাল
১৯২৫ সালের ২০শে এপ্রিল, কর্নেল ফসেট তার ছোট দলটি নিয়ে কুইয়াবা থেকে যাত্রা শুরু করেন। তাদের সাথে ছিল দুটি ঘোড়া, আটটি খচ্চর এবং দুটি কুকুর। কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা সভ্য জগতের সীমানা পেরিয়ে ক্রমশ গভীরে প্রবেশ করতে থাকেন। যাত্রাপথ ছিল ভয়ঙ্কর। বিষাক্ত সাপ, ক্ষুধার্ত জাগুয়ার, রক্তচোষা পোকামাকড় এবং অজানা রোগের ভয় তাদের প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে ফিরছিল। এর সাথে ছিল বিচ্ছিন্ন আদিবাসী উপজাতিদের আক্রমণের আশঙ্কা।
২৯শে মে, ১৯২৫। ফসেট তার স্ত্রীকে শেষ চিঠিটি লেখেন। চিঠিটি একজন স্থানীয় বাহকের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। সেই চিঠির অবস্থান ছিল ‘ডেড হর্স ক্যাম্প’ নামের একটি জায়গা, যেখানে তার আগের একটি অভিযানে তার ঘোড়াটি মারা গিয়েছিল। চিঠিতে ফসেট লিখেছিলেন, তারা আপার জিঙ্গু নদী পার হচ্ছেন, যা আমাজনের একটি শাখা নদী। এরপরই তারা সম্পূর্ণ unexplored বা অনাবিষ্কৃত অঞ্চলে প্রবেশ করবেন। তার লেখার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস আর উত্তেজনা। তিনি লিখেছিলেন, "ব্যর্থতার কোনো ভয় কোরো না..."। এটাই ছিল সভ্য জগতের সাথে কর্নেল ফসেট, জ্যাক এবং র্যালে রিমেলের শেষ যোগাযোগ।
এরপর নেমে এল এক দীর্ঘ, জমাট বাঁধা নীরবতা। সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর গেল। ফসেট এবং তার সঙ্গীদের কোনো খবর এল না। প্রথমে সবাই ভেবেছিল, আমাজনের মতো বিশাল অরণ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুই বছর পরেও যখন তাদের কোনো সন্ধান মিলল না, তখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ল। কী হলো তাদের? তারা কি ‘Z’ শহরের সন্ধান পেয়েছিলেন? নাকি আমাজনের সবুজ অন্ধকার তাদের চিরতরে গ্রাস করে নিয়েছে?
কর্নেল ফসেট তার শেষ চিঠিতে স্পষ্ট করে বলে গিয়েছিলেন যে, যদি তারা হারিয়ে যান, তবে যেন কোনো উদ্ধারকারী দল পাঠানো না হয়, কারণ এই পথ অত্যন্ত বিপজ্জনক। কিন্তু তার এই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অনুসন্ধান অভিযান। পরবর্তী কয়েক দশকে প্রায় এক ডজনেরও বেশি অভিযান চালানো হয় এবং অনুমান করা হয় যে, ফসেটকে খুঁজতে গিয়ে প্রায় ১০০ জন মানুষ প্রাণ হারান বা নিজেরাই চিরতরে হারিয়ে যান। কিন্তু ফসেট বা তার সঙ্গীদের কোনো চিহ্ন—তাদের ডায়েরি, সরঞ্জাম বা দেহাবশেষ—কিছুই পাওয়া যায়নি। যেন তারা বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিলেন।
সত্যের উন্মোচন
ফসেটের অন্তর্ধান নিয়ে বছরের পর বছর ধরে নানা তত্ত্ব উঠে এসেছে। সবচেয়ে প্রচলিত এবং যুক্তিযুক্ত তত্ত্বটি হলো, তাদের কোনো হিংস্র আদিবাসী উপজাতি হত্যা করেছিল। ফসেট সাধারণত স্থানীয়দের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতেন, কিন্তু তিনি এমন এক অঞ্চলে প্রবেশ করছিলেন যেখানে বাইরের জগতের মানুষের উপস্থিতি সহ্য করা হতো না। কালাপালো নামক একটি উপজাতির মৌখিক ইতিহাসে এমন ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে তিনজন শ্বেতাঙ্গ অভিযাত্রীকে তাদের পূর্বপুরুষরা হত্যা করেছিল কারণ তারা উপজাতির প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করেছিল। ১৯৫২ সালে ব্রাজিলিয়ান অভিযাত্রী অরল্যান্ডো ভিলাস বোস কিছু হাড় খুঁজে পান যা ফসেটের বলে দাবি করা হয়েছিল, কিন্তু পরে পরীক্ষায় তা ভুল প্রমাণিত হয়।
অন্যান্য তত্ত্বের মধ্যে রয়েছে, তারা হয়তো আমাজনের ভয়ঙ্কর পরিবেশে enfermedad বা অনাহারে মারা গিয়েছিলেন। এমনও শোনা যায় যে, অভিযাত্রী দলের তরুণ সদস্যরা অসুস্থ ও খোঁড়া হয়ে পড়েছিলেন, যা তাদের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করতে পারে। আরও কিছু কল্পনাপ্রবণ তত্ত্ব অনুযায়ী, ফসেট হয়তো ‘Z’ শহরটি খুঁজে পেয়েছিলেন এবং সেখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, অথবা তিনি কোনো রহস্যময় গোষ্ঠীর প্রধান হয়ে উঠেছিলেন। তার স্ত্রী নিনা আমৃত্যু বিশ্বাস করতেন যে তার স্বামী ও পুত্র একদিন ফিরে আসবেন।
কর্নেল ফসেটের ভাগ্যে ঠিক কী ঘটেছিল, সেই রহস্যের ওপর থেকে পর্দা হয়তো কোনোদিনই পুরোপুরি সরবে না। তবে একটি চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, সাম্প্রতিককালে প্রত্নতাত্ত্বিকরা স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাজনের ঠিক সেই অঞ্চলেই প্রাচীন সভ্যতার চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন, যেখানে ফসেট তার ‘Z’ শহরের সন্ধান করছিলেন। ‘কুহিকুগু’ নামক এই প্রত্নতাত্ত্বিক स्थलটি প্রমাণ করে যে, আমাজনের গভীরে একসময় জটিল এবং জনবহুল বসতি ছিল। তাহলে কি কর্নেল ফসেটের স্বপ্ন পুরোপুরি ভিত্তিহীন ছিল না? তিনি কি সত্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন?
কর্নেল পার্সি ফসেটের গল্প শুধু এক অভিযাত্রীর হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি নয়। এটি মানুষের অদম্য কৌতূহল, দুর্নিবার স্বপ্ন এবং প্রকৃতির বিশালত্বের কাছে তার অসহায়ত্বের এক চিরন্তন উপাখ্যান। আমাজনের সবুজ চাদরের নিচে আজও হয়তো চাপা পড়ে আছে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিযাত্রীর শেষ রহস্যের উত্তর।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)