বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের পৃথিবী একটি বিশাল বায়বীয় চাদরে মোড়া, যাকে আমরা বায়ুমণ্ডল বলি। এই বায়ুমণ্ডল স্থির নয়, এটি প্রতিনিয়ত গতিশীল। কখনো শান্ত বাতাস আমাদের মন ভালো করে দেয়, আবার কখনো ভয়ংকর ঝড় সবকিছু তছনছ করে দেয়। কেন এই বাতাসের চলাচল হয়? কীভাবে তৈরি হয় এই ঝড় বা ঘূর্ণবাত? পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তাপমাত্রার ভারসাম্যই বা কীভাবে রক্ষিত হয়? এই সমস্ত আকর্ষণীয় প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালন এবং আবহাওয়া ব্যবস্থার মধ্যে।
একাদশ শ্রেণির ভূগোলের দশম অধ্যায়, 'বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালন ও আবহাওয়া ব্যবস্থা', আমাদের এই গতিশীল পৃথিবীর বায়বীয় আবরণ সম্পর্কে এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে সূর্যের অসম তাপ বন্টন বায়ুচাপের পার্থক্য তৈরি করে, এবং সেই চাপের পার্থক্যই কীভাবে বায়ুমূলের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। আমরা জানব বিভিন্ন ধরনের বায়ুপ্রবাহ, বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত বায়ুচাপ বলয়, এবং বিধ্বংসী ঘূর্ণবাতের মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলির পেছনের বিজ্ঞান। এই অধ্যায়ের জ্ঞান শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে সাহায্য করবে না, বরং আমাদের চারপাশের আবহাওয়ার পরিবর্তনকে বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে এবং তার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতেও সাহায্য করবে। চলুন, এই বায়বীয় মহাসাগরের গভীরে ডুব দেওয়া যাক এবং এর রহস্যগুলো উন্মোচন করি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (Atmospheric Pressure)
কল্পনা করুন, আপনার মাথার উপর থেকে বায়ুমণ্ডলের শেষ স্তর পর্যন্ত বাতাসের একটি বিশাল স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। এই স্তম্ভের যা ওজন, সেটিই আপনার উপর যে চাপ প্রয়োগ করছে, তাকেই বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বলে। সহজ কথায়, পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে বায়ুমণ্ডল যে পরিমাণ বল প্রয়োগ করে, তাই হলো বায়ুমণ্ডলীয় চাপ।
বায়ুমণ্ডলীয় চাপ পরিমাপ করা হয় ব্যারোমিটার যন্ত্রের সাহায্যে এবং এর একক হলো মিলিবার (mb)। সমুদ্রপৃষ্ঠে গড় বায়ুমণ্ডলীয় চাপ প্রায় ১০১৩.২৫ মিলিবার।
চাপের উল্লম্ব এবং অনুভূমিক বন্টন:- উল্লম্ব বন্টন (Vertical Distribution): আমরা যত উপরে উঠতে থাকি, বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব তত কমতে থাকে। এর ফলে বায়ুর ওজনও কমে যায়, এবং বায়ুমণ্ডলীয় চাপ দ্রুত হ্রাস পায়। প্রতি ১০ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য প্রায় ১ মিলিবার চাপ কমে যায়। একারণেই পর্বতারোহীদের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
- অনুভূমিক বন্টন (Horizontal Distribution): পৃথিবীর পৃষ্ঠের সর্বত্র চাপ সমান নয়। তাপমাত্রা, পৃথিবীর আবর্তন এবং জলীয় বাষ্পের পরিমাণের উপর নির্ভর করে কোনো স্থানে উচ্চচাপ (High Pressure) বা নিম্নচাপ (Low Pressure) বলয় তৈরি হয়।
- নিম্নচাপ (Low Pressure): যখন কোনো স্থানের বায়ু উত্তপ্ত হয়ে হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়, তখন সেখানে বায়ুর ঘনত্ব কমে যায় এবং নিম্নচাপ অঞ্চলের সৃষ্টি হয়। নিম্নচাপ অঞ্চলে আকাশ সাধারণত মেঘাচ্ছন্ন থাকে এবং ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি থাকে।
- উচ্চচাপ (High Pressure): যখন কোনো স্থানের বায়ু শীতল ও ভারী হয়ে নিচে নেমে আসে, তখন সেখানে বায়ুর ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং উচ্চচাপ অঞ্চলের সৃষ্টি হয়। উচ্চচাপ অঞ্চলে আকাশ পরিষ্কার ও আবহাওয়া শান্ত থাকে।
এই উচ্চচাপ এবং নিম্নচাপের পার্থক্যই হলো বায়ুপ্রবাহের মূল কারণ। বাতাস সব সময় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।
২. বায়ুপ্রবাহকে প্রভাবিত করার কারণসমূহ
বাতাস সরলরেখায় উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয় না। এর গতিপথ এবং গতিবেগ বেশ কিছু শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রধান শক্তিগুলো হলো:
ক) চাপ ঢাল শক্তি (Pressure Gradient Force):দুটি স্থানের মধ্যে বায়ুচাপের পার্থক্যকে চাপ ঢাল বা প্রেসার গ্রেডিয়েন্ট বলা হয়। এই পার্থক্য যত বেশি হবে, বাতাস তত দ্রুত গতিতে প্রবাহিত হবে। সমচাপরেখা (Isobars) হলো মানচিত্রে সমান চাপযুক্ত স্থানগুলোকে যুক্ত করা কাল্পনিক রেখা। সমচাপরেখাগুলো যত কাছাকাছি থাকবে, চাপ ঢাল তত বেশি হবে এবং বায়ুর গতিবেগও তত বাড়বে।
খ) কোরিয়োলিস বল (Coriolis Force):পৃথিবীর আবর্তন গতির কারণে সৃষ্ট একটি বিচ্যুতি বল হলো কোরিয়োলিস বল। এই বলের প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে যায়।
- নিরক্ষরেখায় কোরিয়োলিস বলের মান শূন্য, তাই এখানে বায়ু সরাসরি উপরে উঠে যায়।
- মেরু অঞ্চলের দিকে এই বলের প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে।
- এই বলের কারণেই ঘূর্ণবাত এবং প্রতীপ ঘূর্ণবাতের মতো ঘটনা ঘটে।
বিষয়টিকে একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। আপনি যদি একটি চলন্ত নাগরদোলার কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে একটি বল ছোড়েন, বলটি সোজা পথে না গিয়ে একপাশে বেঁকে যাবে। পৃথিবীর আবর্তনের ফলেও বায়ুপ্রবাহের ক্ষেত্রে ঠিক একই ঘটনা ঘটে।
গ) ঘর্ষণজনিত বল (Frictional Force):ভূ-পৃষ্ঠের বিভিন্ন ভূমিরূপ যেমন - পাহাড়, পর্বত, বনভূমি, অট্টালিকা ইত্যাদি বায়ুপ্রবাহের পথে বাধা সৃষ্টি করে। এই বাধাজনিত শক্তিকে ঘর্ষণজনিত বল বলে। এর প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি (প্রায় ১-৩ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত) বায়ুর গতিবেগ কমে যায়। সমুদ্রের উপর ঘর্ষণ কম হওয়ায় বায়ুর গতিবেগ বেশি থাকে।
৩. বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ (Pressure Belts and Winds)
পৃথিবী জুড়ে তাপমাত্রা এবং পৃথিবীর আবর্তনের কারণে কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থায়ী উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ বলয় তৈরি হয়েছে। এগুলি হলো:
প্রধান বায়ুচাপ বলয়সমূহ:- নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় (Equatorial Low Pressure Belt): নিরক্ষরেখার উভয় পাশে ৫° উত্তর থেকে ৫° দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে এই বলয় অবস্থিত। এখানে সূর্যরশ্মি সারাবছর লম্বভাবে পড়ে, ফলে বায়ু উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। তাই এখানে একটি স্থায়ী নিম্নচাপ বলয় তৈরি হয়েছে। এই অঞ্চলটিকে 'ডোলড্রামস' বা শান্ত বলয়ও বলা হয় কারণ এখানে অনুভূমিক বায়ুপ্রবাহ প্রায় থাকে না।
- কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় (Sub-tropical High Pressure Belts): নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে উপরে ওঠা বায়ু শীতল ও ভারী হয়ে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখার (২৫°-৩৫° উত্তর ও দক্ষিণ) কাছে নিচে নেমে আসে। এই下গামী বায়ুর কারণে এখানে দুটি স্থায়ী উচ্চচাপ বলয় তৈরি হয়েছে। এই অঞ্চলকে 'অশ্ব অক্ষাংশ' (Horse Latitudes) বলা হয়।
- সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় (Sub-polar Low Pressure Belts): ৬০°-৬৫° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে পৃথিবীর আবর্তন গতির কারণে বায়ু বিক্ষিপ্ত হয়ে উপরে উঠে যায়। এর ফলে এখানে দুটি নিম্নচাপ বলয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
- মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় (Polar High Pressure Belts): দুই মেরু অঞ্চলে (৮০°-৯০° উত্তর ও দক্ষিণ) অত্যাধিক শৈত্যের কারণে বায়ু শীতল ও ভারী হয়ে নিচে নেমে আসে। ফলে এখানে দুটি স্থায়ী উচ্চচাপ বলয়ের সৃষ্টি হয়।
এই চাপ বলয়গুলোর মধ্যে বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে একটি বিশ্বব্যাপী সঞ্চালন ব্যবস্থা বা 'General Circulation of Atmosphere' গড়ে উঠেছে, যা পৃথিবীর তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে।
৪. বিভিন্ন প্রকার বায়ুপ্রবাহ (Types of Winds)
বায়ুপ্রবাহকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
ক) নিয়ত বায়ু (Permanent/Planetary Winds):যে বায়ু সারাবছর ধরে নির্দিষ্ট দিকে নির্দিষ্ট চাপ বলয়গুলির মধ্যে প্রবাহিত হয়, তাকে নিয়ত বায়ু বলে।
- আয়ন বায়ু (Trade Winds): কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে আয়ন বায়ু বলে। কোরিয়োলিস বলের প্রভাবে উত্তর গোলার্ধে এটি উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে এটি দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু নামে পরিচিত।
- পশ্চিমা বায়ু (Westerlies): কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে পশ্চিমা বায়ু বলে। উত্তর গোলার্ধে এটি দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে এটি উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু রূপে প্রবাহিত হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগের বিশালতার কারণে এই বায়ু অত্যন্ত শক্তিশালী হয়, যাকে 'গর্জনশীল চল্লিশা' (Roaring Forties), 'ক্রুদ্ধ পঞ্চাশ' (Furious Fifties) ইত্যাদি নামে ডাকা হয়।
- মেরু বায়ু (Polar Easterlies): মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে উপ-মেরু অঞ্চলের নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে শীতল ও শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে মেরু বায়ু বলে।
যে বায়ু ঋতু পরিবর্তন বা দিন-রাত্রির উষ্ণতার তারতম্যের কারণে একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর দিক পরিবর্তন করে, তাকে সাময়িক বায়ু বলে।
- মৌসুমী বায়ু (Monsoon Winds): এটি একটি বৃহৎ আকারের সাময়িক বায়ুপ্রবাহ যা ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে তার দিক সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে পরিবর্তন করে। গ্রীষ্মকালে স্থলভাগ জলভাগের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত হওয়ায় স্থলভাগে নিম্নচাপ এবং জলভাগে উচ্চচাপ তৈরি হয়, ফলে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু সমুদ্র থেকে স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয় (দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু) এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। শীতকালে এর ঠিক বিপরীত অবস্থা দেখা যায়।
- স্থলবায়ু ও সমুদ্রবায়ু (Land and Sea Breezes): দিনের বেলায় স্থলভাগ জলভাগের চেয়ে দ্রুত উত্তপ্ত হওয়ায় স্থলভাগে নিম্নচাপ ও সমুদ্রে উচ্চচাপ তৈরি হয়। ফলে সমুদ্র থেকে স্থলভাগের দিকে শীতল বায়ু প্রবাহিত হয়, একে সমুদ্রবায়ু বলে। രാത്രിలో এর বিপরীত ঘটে, স্থলভাগ দ্রুত শীতল হওয়ায় সেখানে উচ্চচাপ ও সমুদ্রে নিম্নচাপ তৈরি হয় এবং স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে বায়ু প্রবাহিত হয়, একে স্থলবায়ু বলে।
কোনো নির্দিষ্ট ছোট অঞ্চলে স্থানীয় তাপমাত্রা ও চাপের পার্থক্যের কারণে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে স্থানীয় বায়ু বলে। যেমন:
- লু (Loo): উত্তর ভারতের গ্রীষ্মকালীন উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু।
- ফন (Foehn) ও চিনুক (Chinook): পর্বতের অনুবাত ঢালে প্রবাহিত উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু। চিনুককে 'বরফ ভক্ষক' (Snow Eater) বলা হয় কারণ এটি বরফ গলিয়ে দেয়।
- মিস্ট্রাল (Mistral): ফ্রান্সের রোন উপত্যকায় প্রবাহিত শীতল ও শুষ্ক বায়ু।
৫. বায়ুপুঞ্জ, সীমান্ত এবং ঘূর্ণবাত (Air Masses, Fronts, and Cyclones)
বায়ুপুঞ্জ (Air Mass):বায়ুমণ্ডলের একটি বিশাল অংশ যখন কোনো একটি বৃহৎ অঞ্চলের (যেমন - মহাসাগর বা মহাদেশ) উপর দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করে, তখন ওই অঞ্চলের ভৌত বৈশিষ্ট্য (উষ্ণতা ও আর্দ্রতা) ধারণ করে। এই সমধর্মী বায়ুর বিশাল স্তূপকে বায়ুপুঞ্জ বলে। উৎসের উপর ভিত্তি করে এগুলি উষ্ণ, শীতল, আর্দ্র বা শুষ্ক হতে পারে।
সীমান্ত (Front):যখন দুটি ভিন্ন প্রকৃতির (যেমন - উষ্ণ ও শীতল) বায়ুপুঞ্জ একে অপরের মুখোমুখি হয়, তারা সহজে মিশে না গিয়ে তাদের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভেদতল তৈরি করে। এই বিভেদতলকে সীমান্ত বা ফ্রন্ট বলা হয়। সীমান্তে আবহাওয়া খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। সীমান্ত চার প্রকার - উষ্ণ সীমান্ত, শীতল সীমান্ত, অচল সীমান্ত এবং অন্তর্লীন সীমান্ত।
ঘূর্ণবাত (Cyclones):ঘূর্ণবাত হলো একটি শক্তিশালী নিম্নচাপ কেন্দ্রকে ঘিরে প্রচণ্ড গতিবেগে ঘুরতে থাকা বায়ুর একটি ব্যবস্থা। কোরিয়োলিস বলের প্রভাবে এর বায়ু উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে (anticlockwise) এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে (clockwise) ঘোরে। ঘূর্ণবাত মূলত দুই প্রকার:
ক) ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত (Tropical Cyclones):এগুলি কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখার মধ্যবর্তী উষ্ণ সমুদ্রে (২৭° সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রাযুক্ত) তৈরি হয়। প্রচণ্ড তাপ এবং কোরিয়োলিস বলের প্রভাবে এগুলি শক্তি সঞ্চয় করে। এগুলি অত্যন্ত বিধ্বংসী হয় এবং এর সাথে প্রবল বাতাস, মুষলধারে বৃষ্টি এবং জলোচ্ছ্বাস ঘটে। এর কেন্দ্রে একটি শান্ত অঞ্চল থাকে, যাকে 'ঘূর্ণবাতের চোখ' (Eye of the Cyclone) বলা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত - ক্যারিবিয়ান সাগরে 'হারিকেন', চীন সাগরে 'টাইফুন', ভারত মহাসাগরে 'সাইক্লোন' এবং অস্ট্রেলিয়ায় 'উইলি-উইলি'।
খ) নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাত (Temperate/Extra-tropical Cyclones):এগুলি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে (৩০° - ৬৫° অক্ষাংশ) দুটি ভিন্নধর্মী বায়ুপুঞ্জ (উষ্ণ ও শীতল) মিলিত হওয়ার ফলে সীমান্তে তৈরি হয়। এগুলি ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতের মতো বিধ্বংসী না হলেও বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে দীর্ঘ সময় ধরে মেঘ, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটায়।
প্রতীপ ঘূর্ণবাত (Anticyclone):এটি ঘূর্ণবাতের ঠিক বিপরীত অবস্থা। এখানে কেন্দ্রে উচ্চচাপ থাকে এবং বায়ু কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে প্রবাহিত হয়। উত্তর গোলার্ধে এটি ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘোরে। প্রতীপ ঘূর্ণবাতের প্রভাবে আবহাওয়া শান্ত, মেঘমুক্ত এবং শুষ্ক থাকে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: কোরিয়োলিস বল কী এবং এটি বায়ুপ্রবাহকে কীভাবে প্রভাবিত করে?
উত্তর: কোরিয়োলিস বল হলো পৃথিবীর আবর্তন গতির কারণে সৃষ্ট একটি বিচ্যুতি বল। এই বলের কারণে কোনো গতিশীল বস্তু, যেমন বায়ুপ্রবাহ বা সমুদ্রস্রোত, তার সরলরৈখিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়। এর প্রভাবে, বায়ুপ্রবাহ উত্তর গোলার্ধে তার প্রবাহপথের ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে যায়। এই বলটিই বায়ুকে সরাসরি উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপে প্রবাহিত হতে বাধা দেয় এবং ঘূর্ণবাতের মতো বৃত্তাকার বায়ুপ্রবাহ তৈরি করতে সাহায্য করে। নিরক্ষরেখায় এর মান শূন্য এবং মেরু অঞ্চলে সর্বাধিক।
প্রশ্ন ২: 'অশ্ব অক্ষাংশ' (Horse Latitudes) কাকে বলা হয় এবং কেন এই নামকরণ?
উত্তর: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়কে (প্রায় ৩০°-৩৫° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ) 'অশ্ব অক্ষাংশ' বলা হয়। এই অঞ্চলে বায়ু উপর থেকে নিচে নামে, ফলে এখানকার বায়ুমণ্ডল খুব শান্ত থাকে এবং অনুভূমিক বায়ুপ্রবাহ প্রায় থাকে না বললেই চলে। প্রাচীনকালে পালতোলা জাহাজে করে যখন ব্যবসায়ীরা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতেন, তখন এই শান্ত আবহাওয়ার কারণে তাদের জাহাজগুলো গতিহীন হয়ে যেত। তখন জাহাজের ওজন কমানোর জন্য এবং পানীয় জল বাঁচানোর জন্য তারা তাদের সাথে থাকা ঘোড়াগুলোকে সমুদ্রে ফেলে দিতে বাধ্য হতেন। এই করুণ ঘটনা থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয়েছে 'অশ্ব অক্ষাংশ'।
প্রশ্ন ৩: ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত এবং নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাতের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: প্রধান পার্থক্যগুলো হলো:
- উৎপত্তি: ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত উষ্ণ সমুদ্রের উপর শক্তিশালী হয়, যেখানে জলীয় বাষ্পের জোগান থাকে। অন্যদিকে, নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাত দুটি ভিন্নধর্মী (উষ্ণ ও শীতল) বায়ুপুঞ্জের সীমান্তে তৈরি হয়।
- আকার ও শক্তি: ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত আকারে ছোট কিন্তু অনেক বেশি বিধ্বংসী ও শক্তিশালী হয়। নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাত আকারে অনেক বড় এলাকা জুড়ে বিস্তৃত থাকে কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী।
- কেন্দ্র: ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতের একটি শান্ত ও মেঘমুক্ত কেন্দ্র থাকে, যাকে 'চোখ' বলা হয়। নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাতের এমন কোনো নির্দিষ্ট চোখ থাকে না।
- আবহাওয়া: ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতের সাথে বজ্রবিদ্যুৎসহ মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়। নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাতে দীর্ঘ সময় ধরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিপাত হয়।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায় থেকে আমরা যা শিখলাম তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক:
- বায়ুমণ্ডলীয় চাপ হলো বায়ুর ওজনজনিত বল, যা উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে কমে।
- বায়ুচাপের অনুভূমিক পার্থক্য বা চাপ ঢালই বায়ুপ্রবাহের মূল কারণ। বাতাস সর্বদা উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।
- কোরিয়োলিস বল এবং ঘর্ষণজনিত বল বায়ুর গতি ও দিককে নিয়ন্ত্রণ করে।
- পৃথিবীতে সাতটি স্থায়ী চাপ বলয় রয়েছে: একটি নিরক্ষীয় নিম্নচাপ, দুটি উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ, দুটি উপমেরুদেশীয় নিম্নচাপ এবং দুটি মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয়।
- এই চাপ বলয়গুলির মধ্যে নিয়ত বায়ু (আয়ন, পশ্চিমা ও মেরু বায়ু) সারাবছর প্রবাহিত হয়।
- মৌসুমী বায়ু, স্থলবায়ু ও সমুদ্রবায়ু হলো সাময়িক বায়ুপ্রবাহের উদাহরণ যা একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর দিক পরিবর্তন করে।
- ঘূর্ণবাত হলো একটি শক্তিশালী নিম্নচাপ ব্যবস্থা, যা ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে আবহাওয়াকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
- প্রতীপ ঘূর্ণবাত হলো শান্ত আবহাওয়াসহ একটি উচ্চচাপ ব্যবস্থা।
বায়ুমণ্ডলের এই জটিল কিন্তু আকর্ষণীয় সঞ্চালন ব্যবস্থা পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলেছে এবং এর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ও জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই জ্ঞান আমাদের চারপাশের বিশ্বকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে।