বিষয়ের ভূমিকা

নমস্কার বন্ধুরা! আজ আমরা দশম শ্রেণির ভূগোলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মজাদার অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করব - 'সম্পদ ও উন্নয়ন' (Resources and Development)। আমাদের চারপাশে যা কিছু আমরা দেখি বা ব্যবহার করি, তার প্রায় সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে সম্পদ। যে জল আমরা পান করি, যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে জমিতে চাষ করি, এমনকি আমাদের জ্ঞান এবং দক্ষতাও এক ধরনের সম্পদ। কিন্তু এই সম্পদগুলি কীভাবে আমাদের প্রয়োজনে লাগে? এদের ব্যবহার করার সঠিক উপায় কী? আর উন্নয়নের সাথে সম্পদের সম্পর্কই বা কী? এই অধ্যায়ে আমরা এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজব।

এই অধ্যায়টি কেবল পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবন এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বোঝার জন্যও এর গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা জানব সম্পদ কী, এর কত প্রকারভেদ রয়েছে, কেন আমাদের সম্পদ পরিকল্পনা করা উচিত এবং কীভাবে আমরা পরিবেশের ক্ষতি না করে উন্নয়ন চালিয়ে যেতে পারি। চলুন, এই জ্ঞানমূলক যাত্রায় একসাথে এগিয়ে যাই এবং আমাদের পৃথিবীকে আরও ভালোভাবে চেনার চেষ্টা করি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

সম্পদ ও উন্নয়ন অধ্যায়ের মূল ধারণাগুলিকে সহজভাবে বোঝার জন্য আমরা এটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করব।

সম্পদ কী? (What is a Resource?)

সহজ কথায়, আমাদের পরিবেশে উপস্থিত যেকোনো বস্তু যা আমাদের চাহিদা পূরণ করতে পারে, তাকেই সম্পদ বলা হয়। তবে এর সাথে তিনটি শর্ত জড়িত:

  • প্রযুক্তিগতভাবে সহজলভ্য (Technologically Accessible): সেই বস্তুটি আহরণ করার বা ব্যবহার করার মতো প্রযুক্তি আমাদের কাছে থাকতে হবে। যেমন, মাটির নিচে খনিজ তেল আছে, কিন্তু তা তোলার প্রযুক্তি না থাকলে সেটি আমাদের জন্য সম্পদ নয়।
  • অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী (Economically Feasible): বস্তুটি আহরণ করতে যে খরচ হবে, তার থেকে প্রাপ্ত সুবিধা বেশি হতে হবে। যদি ১০০ টাকার কয়লা তুলতে ৫০০ টাকা খরচ হয়, তবে তা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, তাই তাকে সম্পদ বলা যাবে না।
  • সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য (Culturally Acceptable): সমাজের মানুষ যেন সেই বস্তুর ব্যবহারকে মেনে নেয়।

মানুষ নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ কারণ মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা এবং প্রযুক্তিই প্রাকৃতিক উপাদানকে সম্পদে রূপান্তরিত করে। প্রকৃতি, প্রযুক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ সম্পদের সৃষ্টি ও ব্যবহার করে।

সম্পদের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Resources)

সম্পদকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করা যেতে পারে। এই শ্রেণিবিভাগ বুঝতে পারলে সম্পদের ধারণা আরও পরিষ্কার হবে।

১. উৎপত্তির ভিত্তিতে (On the basis of Origin)

  • জৈব সম্পদ (Biotic Resources): যে সমস্ত সম্পদ জীবমণ্ডল থেকে পাওয়া যায় এবং যাদের জীবন আছে, তাদের জৈব সম্পদ বলে। যেমন: মানুষ, উদ্ভিদ, প্রাণী, মৎস্য ইত্যাদি।
  • অজৈব সম্পদ (Abiotic Resources): যে সমস্ত সম্পদ জড় বস্তু থেকে তৈরি এবং যাদের জীবন নেই, তাদের অজৈব সম্পদ বলে। যেমন: শিলা, খনিজ পদার্থ, ধাতু, জল, বায়ু ইত্যাদি।

২. সমাপ্তির ভিত্তিতে (On the basis of Exhaustibility)

  • নবীকরণযোগ্য সম্পদ (Renewable Resources): যে সম্পদগুলি ব্যবহারের পর আবার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় বা মানুষের প্রচেষ্টায় নতুন করে তৈরি করা যায়, তাদের নবীকরণযোগ্য সম্পদ বলে। এগুলিকে পুনরায় পূরণ করা সম্ভব। যেমন: সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জল, বনভূমি, বন্যপ্রাণী ইত্যাদি। এদের মধ্যে কিছু সম্পদ, যেমন জল বা বনভূমি, অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে কমে যেতে পারে বা দূষিত হতে পারে।
  • অনবীকরণযোগ্য সম্পদ (Non-renewable Resources): যে সম্পদগুলি একবার ব্যবহার করলে শেষ হয়ে যায় এবং তা পুনরায় তৈরি হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে, তাদের অনবীকরণযোগ্য সম্পদ বলে। মানুষের জীবনকালের তুলনায় এদের গঠনের সময় অনেক বেশি। যেমন: কয়লা, পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ। এই সম্পদগুলির ভান্ডার সীমিত, তাই এদের খুব ভেবেচিন্তে ব্যবহার করা উচিত।

৩. মালিকানার ভিত্তিতে (On the basis of Ownership)

  • ব্যক্তিগত সম্পদ (Individual Resources): যে সম্পদগুলি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন থাকে, তাকে ব্যক্তিগত সম্পদ বলে। যেমন: আপনার বাড়ি, জমি, গাড়ি, বই ইত্যাদি।
  • গোষ্ঠীগত সম্পদ (Community Owned Resources): যে সম্পদগুলি কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্ত মানুষের ব্যবহারের জন্য উপলব্ধ থাকে, তাকে গোষ্ঠীগত সম্পদ বলে। যেমন: গ্রামের পুকুর, খেলার মাঠ, পার্ক, শ্মশান ইত্যাদি।
  • জাতীয় সম্পদ (National Resources): প্রযুক্তিগতভাবে, একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে থাকা সমস্ত সম্পদই জাতীয় সম্পদ। এর মধ্যে রয়েছে দেশের খনিজ, জল, বন, বন্যপ্রাণী এবং রাজনৈতিক সীমানার মধ্যে থাকা সমস্ত ভূমি। এমনকি উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২২.২ কিমি) পর্যন্ত সামুদ্রিক এলাকা এবং তার সম্পদও জাতীয় সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। যেমন: ভারতের রেলপথ, সড়কপথ, খনি ইত্যাদি।
  • আন্তর্জাতিক সম্পদ (International Resources): কিছু সম্পদ আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কোনো দেশের উপকূলরেখা থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে যে খোলা মহাসাগরীয় অঞ্চল রয়েছে, তার সম্পদ কোনো একক দেশ ব্যবহার করতে পারে না। আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমতি ছাড়া এই সম্পদ ব্যবহার করা যায় না। একে Exclusive Economic Zone (EEZ) এর বাইরের এলাকা বলা হয়।

৪. উন্নয়নের স্তরের ভিত্তিতে (On the basis of the Status of Development)

  • সম্ভাব্য সম্পদ (Potential Resources): যে সম্পদগুলি কোনো একটি অঞ্চলে বিদ্যমান কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেগুলির সঠিক ব্যবহার শুরু হয়নি, তাদের সম্ভাব্য সম্পদ বলে। যেমন: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও গুজরাট উপকূলে বায়ুশক্তি এবং রাজস্থানে সৌরশক্তি উৎপাদনের 엄청 সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু এখনও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
  • উন্নত সম্পদ (Developed Resources): যে সম্পদগুলির পরিমাণ ও গুণমান জরিপ করা হয়েছে এবং বর্তমানে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, তাদের উন্নত সম্পদ বলে। এই সম্পদগুলির ব্যবহার প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উপর নির্ভর করে।
  • মজুদ সম্পদ (Stock): পরিবেশে এমন কিছু পদার্থ রয়েছে যা মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারে, কিন্তু সেগুলি ব্যবহার করার মতো উপযুক্ত প্রযুক্তি আমাদের কাছে নেই। এগুলিকে মজুদ সম্পদ বলা হয়। যেমন: জলে দুটি জ্বলনশীল গ্যাস, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন রয়েছে, যা শক্তির বিশাল উৎস হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে এমন উন্নত প্রযুক্তি নেই যা দিয়ে সাশ্রয়ীভাবে জল থেকে শক্তি উৎপাদন করা যায়।
  • সংরক্ষিত সম্পদ (Reserves): এগুলি মজুদ সম্পদেরই একটি অংশ, যা বর্তমানে উপলব্ধ প্রযুক্তির সাহায্যে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের প্রয়োজনের জন্য এগুলির ব্যবহার শুরু করা হয়নি বা খুব সীমিত পরিমাণে করা হচ্ছে। যেমন: নদীর জল ভবিষ্যতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাঁধ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা।

সম্পদের উন্নয়ন এবং সমস্যা (Development of Resources and Associated Problems)

মানুষ সম্পদকে প্রকৃতির দান বলে মনে করে এবং এর নির্বিচার ব্যবহার করেছে। এর ফলে বেশ কিছু বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে:

  1. কিছু লোভী ব্যক্তির জন্য সম্পদের ভান্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
  2. সম্পদ সমাজের কিছু মানুষের হাতে জমা হয়েছে, যার ফলে সমাজ ধনী ও দরিদ্র এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।
  3. সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত সংকট দেখা দিয়েছে, যেমন - বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming), ওজোন স্তরের ক্ষয় (Ozone Layer Depletion), পরিবেশ দূষণ এবং ভূমি ক্ষয়।

এই সমস্যাগুলি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সম্পদের সুষম বণ্টন এবং পরিকল্পিত ব্যবহার প্রয়োজন। যদি এই নির্বিচার শোষণ চলতে থাকে, তবে আমাদের গ্রহের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তাই, আমাদের 'টেকসই উন্নয়ন' (Sustainable Development)-এর পথে হাঁটতে হবে।

টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development)

টেকসই উন্নয়ন হলো এমন একটি উন্নয়ন প্রক্রিয়া যা পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা পূরণ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদার সাথে কোনো আপস করে না। অর্থাৎ, আমরা এমনভাবে উন্নয়ন করব যাতে আমাদের পরের প্রজন্মও সম্পদ ব্যবহার করার সুযোগ পায়।

এই ধারণাটিকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব দেওয়ার জন্য ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলন (UNCED) অনুষ্ঠিত হয়, যা 'রিও সম্মেলন' বা 'বসুন্ধরা সম্মেলন' (Rio Summit / Earth Summit) নামে পরিচিত। এখানে বিশ্ব নেতারা 'এজেন্ডা ২১' (Agenda 21) নামক একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন।

এজেন্ডা ২১ (Agenda 21)

এজেন্ডা ২১-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিবেশগত ক্ষতি, দারিদ্র্য এবং রোগ মোকাবিলা করা। এর একটি প্রধান লক্ষ্য হলো, প্রতিটি স্থানীয় সরকার যেন তাদের নিজস্ব স্থানীয় 'এজেন্ডা ২১' তৈরি করে এবং পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব নেয়।

ভারতে সম্পদ পরিকল্পনা (Resource Planning in India)

ভারতের মতো একটি বিশাল দেশে সম্পদ পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এখানে সম্পদের বণ্টনে ব্যাপক বৈষম্য দেখা যায়।

  • কিছু রাজ্য যেমন ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, এবং মধ্যপ্রদেশে খনিজ ও কয়লার বিশাল ভান্ডার রয়েছে, কিন্তু সেখানে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন কম।
  • অরুণাচল প্রদেশে প্রচুর জলসম্পদ রয়েছে, কিন্তু পরিকাঠামোর অভাবে তার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।
  • রাজস্থানে বায়ুশক্তি ও সৌরশক্তির সম্ভাবনা প্রচুর, কিন্তু সেখানে জলের অভাব।
  • লাদাখের মতো শীতল মরুভূমি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হলেও সেখানে জল, পরিকাঠামো এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজের অভাব রয়েছে।

এই বৈষম্য দূর করে দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য সম্পদ পরিকল্পনা অপরিহার্য।

ভারতে সম্পদ পরিকল্পনার ধাপসমূহ

সম্পদ পরিকল্পনা একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং এর তিনটি প্রধান ধাপ রয়েছে:

  1. শনাক্তকরণ এবং তালিকা তৈরি (Identification and inventory of resources): দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদের সমীক্ষা (surveying), মানচিত্র তৈরি (mapping) এবং সম্পদের গুণগত ও পরিমাণগত পরিমাপ করা।
  2. পরিকল্পনার কাঠামো তৈরি (Evolving a planning structure): উপযুক্ত প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো তৈরি করে সম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।
  3. জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে মেলানো (Matching with national development plans): সম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনাকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সমন্বয় করা।

শুধুমাত্র সম্পদের প্রাচুর্য থাকলেই কোনো অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এর সাথে প্রয়োজন উপযুক্ত প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদের গুণমান। আমাদের দেশে অনেক অঞ্চল সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে আছে। তাই সম্পদের সঠিক পরিকল্পনা ও সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, "আমাদের পৃথিবীতে প্রত্যেকের প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট আছে, কিন্তু কারো লোভের জন্য নয়।" ("There is enough for everybody's need and not for any body's greed.")

ভূমি সম্পদ (Land Resources)

ভূমি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। আমরা ভূমির উপর বসবাস করি, আমাদের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ চালাই এবং এটি প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীকে আশ্রয় দেয়। ভারতের ভূমিরূপ বৈচিত্র্যময়।

  • প্রায় ৪৩% ভূমি হলো সমভূমি, যা কৃষি ও শিল্পের জন্য উপযুক্ত।
  • প্রায় ৩০% ভূমি হলো পর্বত, যা নদীর উৎস এবং পর্যটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
  • প্রায় ২৭% ভূমি হলো মালভূমি, যা খনিজ, জীবাশ্ম জ্বালানি এবং বনভূমির ভান্ডার।

ভূমি ব্যবহারের ধরন (Land Use Pattern in India)

ভূমি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, যেমন - বনভূমি, চাষের অযোগ্য জমি (বন্ধ্যা জমি, অকৃষি কাজে ব্যবহৃত জমি), চারণভূমি, পতিত জমি এবং প্রকৃত চাষের জমি। ভারতে ভূমি ব্যবহারের ধরন বিভিন্ন ভৌত কারণ (যেমন ভূমিরূপ, জলবায়ু) এবং মানবিক কারণ (যেমন জনসংখ্যা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি) দ্বারা প্রভাবিত হয়।

ভূমি ক্ষয় ও সংরক্ষণ (Land Degradation and Conservation)

প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট কারণে জমির গুণমান যখন কমে যায়, তখন তাকে ভূমি ক্ষয় বা ভূমিক্ষয় বলে। এর প্রধান কারণগুলি হলো:

  • বন নিধন (Deforestation): গাছপালা কেটে ফেলার ফলে মাটির উপরের স্তর আলগা হয়ে যায় এবং ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
  • অতিরিক্ত পশুচারণ (Overgrazing): অতিরিক্ত পশুচারণের ফলে তৃণভূমির আচ্ছাদন নষ্ট হয়ে যায়, যা ভূমি ক্ষয়ের কারণ হয়।
  • খনি খনন (Mining): খনি অঞ্চলের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেই স্থানকে ভরাট না করে ফেলে রাখলে ভূমি ক্ষয় হয়।
  • অতিরিক্ত জলসেচ (Over-irrigation): পাঞ্জাব, হরিয়ানার মতো রাজ্যে অতিরিক্ত জলসেচের ফলে জমিতে লবণাক্ততা ও ক্ষারত্ব বৃদ্ধি পায়।
  • শিল্পবর্জ্য (Industrial effluents): কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ মাটি ও জলকে দূষিত করে।

ভূমি ক্ষয় প্রতিরোধের উপায়:

  • বৃক্ষরোপণ (Afforestation): বেশি করে গাছ লাগানো।
  • পশুচারণ নিয়ন্ত্রণ: নির্দিষ্ট চারণভূমিতে পশুচারণ নিয়ন্ত্রণ করা।
  • কাঁটাঝোপ রোপণ (Planting of shelter belts): মরু অঞ্চলে বায়ুর গতি কমাতে কাঁটাঝোপের বেড়া তৈরি করা।
  • খনি কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ: খনি খননের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনা।
  • শিল্পবর্জ্যের সঠিক নিষ্কাশন: শিল্পবর্জ্য পরিশোধন করে নিষ্কাশন করা।

মৃত্তিকা সম্পদ (Soil as a Resource)

মৃত্তিকা বা মাটি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নবীকরণযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি উদ্ভিদ জন্মানোর মাধ্যম এবং বিভিন্ন জীবের আবাসস্থল। মাটি তৈরি হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে। আবহবিকার (weathering), জলবায়ু, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং সময় - এই উপাদানগুলি মৃত্তিকা গঠনে সাহায্য করে।

ভারতের মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাগ (Classification of Soils in India)

ভারত একটি বিশাল দেশ হওয়ায় এখানে বিভিন্ন ধরণের মৃত্তিকা দেখা যায়।

  1. পলি মাটি (Alluvial Soil): এটি ভারতের সবচেয়ে বিস্তৃত এবং উর্বর মাটি। সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র - এই তিনটি নদী প্রণালীর পলি জমে উত্তর ভারতের সমভূমি তৈরি হয়েছে। এটি বালি, পলি ও কাদার মিশ্রণ। বয়সের ভিত্তিতে পলি মাটিকে দু'ভাগে ভাগ করা হয় - পুরানো পলি (বাঙ্গর) এবং নতুন পলি (খাদার)। খাদার বেশি উর্বর হয়। এই মাটিতে পটাশ, ফসফরিক অ্যাসিড ও চুন পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে, যা আখ, ধান, গম এবং ডাল চাষের জন্য আদর্শ।
  2. কৃষ্ণ মৃত্তিকা (Black Soil): এই মাটির রঙ কালো এবং এটি রেগুর মাটি নামেও পরিচিত। তুলা চাষের জন্য এই মাটি আদর্শ, তাই একে 'কৃষ্ণ কার্পাস মৃত্তিকা' (black cotton soil) বলা হয়। দাক্ষিণাত্যের লাভা গঠিত মালভূমি অঞ্চলে, যেমন মহারাষ্ট্র, সৌরাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশে এই মাটি দেখা যায়। এর জলধারণ ক্ষমতা খুব বেশি এবং গরমকালে এই মাটিতে গভীর ফাটল দেখা যায়।
  3. লোহিত ও হলুদ মাটি (Red and Yellow Soil): দাক্ষিণাত্য মালভূমির পূর্ব ও দক্ষিণ অংশে কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে আগ্নেয় শিলা থেকে এই মাটি তৈরি হয়। লোহার উপস্থিতির কারণে এর রঙ লাল হয়। যখন এই মাটি জল শোষণ করে, তখন এর রঙ হলুদ হয়ে যায়।
  4. ল্যাটেরাইট মাটি (Laterite Soil): উচ্চ তাপমাত্রা এবং ভারী বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে এই মাটি তৈরি হয়। প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে মাটির উপরের স্তরের খনিজ পদার্থ ধুয়ে নিচে চলে যায় (leaching)। এই মাটিতে হিউমাসের পরিমাণ কম থাকে। সঠিক পরিমাণে সার ও সার প্রয়োগ করলে এই মাটিতে চা, কফি এবং কাজুবাদাম চাষ করা যায়। কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ুতে এই মাটি দেখা যায়।
  5. মরু অঞ্চলের মাটি (Arid Soil): এই মাটির রঙ লাল বা বাদামী হয়। এটি সাধারণত বালুকাময় এবং লবণাক্ত হয়। শুষ্ক জলবায়ু এবং উচ্চ তাপমাত্রার কারণে বাষ্পীভবন বেশি হয়, ফলে মাটিতে হিউমাস ও আর্দ্রতার অভাব থাকে। রাজস্থানের পশ্চিমাংশে এই মাটি দেখা যায়। সঠিক জলসেচের মাধ্যমে এই মাটিকে চাষের যোগ্য করে তোলা যায়।
  6. বনভূমি অঞ্চলের মাটি (Forest Soil): পার্বত্য ও পাহাড়ি অঞ্চলে এই মাটি দেখা যায় যেখানে পর্যাপ্ত বনভূমি রয়েছে। উপত্যকা অঞ্চলে এটি দোআঁশ ও পলিযুক্ত হয়, কিন্তু উপরের ঢালে এটি মোটা দানার হয়। এই মাটি সাধারণত অম্লীয় এবং হিউমাস কম থাকে।

মৃত্তিকা ক্ষয় ও সংরক্ষণ (Soil Erosion and Conservation)

প্রাকৃতিক শক্তি বা মানুষের কার্যকলাপের দ্বারা মাটির উপরের উর্বর স্তর অপসারিত হওয়াকে মৃত্তিকা ক্ষয় (Soil Erosion) বলে। বায়ু এবং জল হলো মৃত্তিকা ক্ষয়ের প্রধান প্রাকৃতিক কারণ।

ক্ষয়ের প্রকারভেদ:

  • গালি ক্ষয় (Gully Erosion): বহমান জল যখন নরম মাটির মধ্য দিয়ে গভীর নালা তৈরি করে, তখন তাকে গালি ক্ষয় বলে। এর ফলে জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ে, যাকে 'ব্যাডল্যান্ড' (badland) বলা হয়। চম্বল উপত্যকায় এই ধরনের ক্ষয় দেখা যায়।
  • চাদর ক্ষয় (Sheet Erosion): যখন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উপর দিয়ে জল একটি চাদরের মতো বয়ে যায় এবং মাটির উপরের পাতলা স্তরকে ধুয়ে নিয়ে যায়, তখন তাকে চাদর ক্ষয় বলে।

মৃত্তিকা সংরক্ষণের পদ্ধতি:

  • কন্টুর লাঙল (Contour Ploughing): পাহাড়ের ঢালের সমোন্নতি রেখা বরাবর লাঙল দিলে জলের প্রবাহের গতি কমে যায়, ফলে ক্ষয় কম হয়।
  • ধাপ চাষ (Terrace Cultivation): পাহাড়ের ঢালে ধাপ কেটে চাষ করলে ক্ষয় রোধ করা যায়।
  • স্ট্রিপ ক্রপিং (Strip Cropping): বড় জমিকে কয়েকটি ফালিতে ভাগ করে ফসল চাষ করা হয়। দুটি ফসলের সারির মাঝে ঘাসের সারি রাখা হয়, যা বায়ুর গতিকে প্রতিহত করে।
  • শেল্টার বেল্ট (Shelter Belts): মরু অঞ্চলে জমির চারপাশে গাছের সারি তৈরি করে বায়ুর প্রবাহ থেকে মাটিকে রক্ষা করা হয়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: টেকসই উন্নয়ন বলতে কী বোঝায়? এর গুরুত্ব কী?

উত্তর: টেকসই উন্নয়ন হলো এমন একটি উন্নয়ন প্রক্রিয়া যা পরিবেশের ক্ষতি না করে বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা পূরণ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনের সাথে কোনো আপস করে না। এর মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা। এর গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এটি আমাদের সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করে, দূষণ কমায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করে।

প্রশ্ন ২: ভারতে সম্পদ পরিকল্পনার প্রয়োজন কেন?

উত্তর: ভারতে সম্পদ পরিকল্পনার প্রয়োজন বিভিন্ন কারণে। প্রথমত, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদের বণ্টনে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। কিছু রাজ্য খনিজে সমৃদ্ধ, আবার কিছু রাজ্যে জলসম্পদ বেশি। এই বৈষম্য দূর করে সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ভারতের জনসংখ্যা বিশাল এবং সম্পদের ভান্ডার সীমিত। তাই সম্পদের অপচয় রোধ করে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা অপরিহার্য। তৃতীয়ত, পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়ন চালিয়ে যাওয়ার জন্যও একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা দরকার।

প্রশ্ন ৩: এজেন্ডা ২১ কী এবং এর মূল উদ্দেশ্যগুলি কী কী?

উত্তর: এজেন্ডা ২১ হলো ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত বসুন্ধরা সম্মেলনে গৃহীত একটি ঘোষণাপত্র। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার মাধ্যমে পরিবেশগত ক্ষতি, দারিদ্র্য এবং রোগ মোকাবিলা করা। এটি টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি বিশ্বব্যাপী কার্য পরিকল্পনা। এর প্রধান লক্ষ্য হলো, প্রতিটি দেশ এবং স্থানীয় সরকার যেন পরিবেশ রক্ষা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিজস্ব পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করে।

প্রশ্ন ৪: কৃষ্ণ মৃত্তিকা এবং ল্যাটেরাইট মৃত্তিকার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি কী কী?

উত্তর: কৃষ্ণ মৃত্তিকা এবং ল্যাটেরাইট মৃত্তিকার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:

  • গঠন: কৃষ্ণ মৃত্তিকা লাভা দ্বারা গঠিত এবং কাদা কণা দিয়ে তৈরি। অন্যদিকে, ল্যাটেরাইট মাটি উচ্চ তাপমাত্রা ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে শিলা থেকে খনিজ পদার্থ ধুয়ে (leaching) যাওয়ার ফলে তৈরি হয়।
  • রঙ: কৃষ্ণ মৃত্তিকার রঙ কালো। ল্যাটেরাইট মাটির রঙ লাল বা ইটের মতো।
  • জলধারণ ক্ষমতা: কৃষ্ণ মৃত্তিকার জলধারণ ক্ষমতা খুব বেশি। ল্যাটেরাইট মাটির জলধারণ ক্ষমতা কম।
  • ফসল: কৃষ্ণ মৃত্তিকা তুলা চাষের জন্য আদর্শ। ল্যাটেরাইট মাটি চা, কফি এবং কাজুবাদাম চাষের জন্য উপযুক্ত।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা যা কিছু শিখলাম, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক:

  • সম্পদ: আমাদের পরিবেশে থাকা যেকোনো বস্তু যা প্রযুক্তিগতভাবে সহজলভ্য, অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী এবং সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং যা আমাদের চাহিদা পূরণ করে।
  • সম্পদের শ্রেণিবিভাগ: সম্পদকে উৎপত্তি, সমাপ্তি, মালিকানা এবং উন্নয়নের স্তরের ভিত্তিতে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়।
  • সম্পদের সমস্যা: সম্পদের নির্বিচার ব্যবহার পরিবেশগত সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য তৈরি করে।
  • টেকসই উন্নয়ন: পরিবেশের ক্ষতি না করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে উন্নয়ন করা।
  • সম্পদ পরিকল্পনা: দেশের সম্পদের সুষম বণ্টন ও সঠিক ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা অপরিহার্য।
  • ভূমি সম্পদ: ভূমি একটি অত্যাবশ্যক সম্পদ। এর সঠিক ব্যবহার এবং সংরক্ষণ প্রয়োজন।
  • মৃত্তিকা সম্পদ: মৃত্তিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ নবীকরণযোগ্য সম্পদ। ভারতে বিভিন্ন প্রকার মৃত্তিকা দেখা যায়, যেমন - পলি, কৃষ্ণ, লোহিত, ল্যাটেরাইট ইত্যাদি।
  • মৃত্তিকা সংরক্ষণ: কন্টুর লাঙল, ধাপ চাষ, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদির মাধ্যমে মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করা সম্ভব।

আশা করি, 'সম্পদ ও উন্নয়ন' অধ্যায়টি তোমরা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছ। মনে রাখবে, সম্পদ আমাদের উন্নয়নের চাবিকাঠি, কিন্তু এর সঠিক এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারই আমাদের এবং আমাদের পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতে পারে।