বিষয়ের ভূমিকা
স্বাধীন ভারতের সামনে সবচেয়ে কঠিন এবং গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দারিদ্র্য। নবম শ্রেণির অর্থনীতি পাঠ্যপুস্তকের এই তৃতীয় অধ্যায়টি আমাদের বোঝায় যে দারিদ্র্য কেবল অর্থের অভাব নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। যখন একজন ব্যক্তি তার মৌলিক চাহিদাগুলো যেমন—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা পূরণ করতে অক্ষম হন, তখন সেই অবস্থাকে দারিদ্র্য বলা হয়। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে দারিদ্র্যকে পরিমাপ করা হয়, ভারতে দারিদ্র্যের প্রধান কারণগুলি কী এবং সরকার এটি দূর করতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কারণ এটি আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
দারিদ্র্য একটি জটিল সমস্যা এবং এর বিভিন্ন দিক রয়েছে। নিচে এই অধ্যায়ের প্রধান আলোচিত বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. দারিদ্র্যের দুটি প্রেক্ষাপট: গ্রামীণ ও শহর অঞ্চল
দারিদ্র্যকে আরও স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য বইতে দুটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। একটি শহরের রাম শরণের কাহিনী এবং অন্যটি গ্রামের লখা সিং-এর কাহিনী।
- শহুরে দারিদ্র্য: শহরে বসবাসকারী ভূমিহীন শ্রমিক বা দিনমজুর যারা খুব অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে বাস করেন এবং যাদের আয়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটাতেও তারা হিমশিম খান।
- গ্রামীণ দারিদ্র্য: গ্রামে যারা ছোট চাষি বা ভূমিহীন শ্রমিক, তারা মূলত ঋণের জালে জড়িয়ে থাকেন। কাজের অভাব এবং শিক্ষার অভাবে তারা যুগ যুগ ধরে দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন।
২. সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে দারিদ্র্য
সমাজবিজ্ঞানীরা দারিদ্র্যকে কেবল আয়ের নিরিখে দেখেন না। তারা আরও কয়েকটি সূচক ব্যবহার করেন:
- সামাজিক বর্জন (Social Exclusion): এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে দরিদ্র ব্যক্তিরা সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তারা উন্নত সুযোগ-সুবিধা এবং উন্নত পরিবেশে থাকার সুযোগ পান না।
- অরক্ষিত অবস্থা (Vulnerability): কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী (যেমন—তফসিলি জাতি, উপজাতি বা শারীরিক প্রতিবন্ধী) যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক মন্দার সময় অন্যদের চেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তাকেই অরক্ষিত অবস্থা বলা হয়।
৩. দারিদ্র্য সীমা (Poverty Line)
দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য একটি সাধারণ পদ্ধতি হলো 'দারিদ্র্য সীমা'। ভারতে এটি আয় এবং ব্যয়ের স্তরের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়।
- ক্যালোরি গ্রহণ: ভারতে পুষ্টির প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে দারিদ্র্য সীমা নির্ধারিত হয়। গ্রামীণ এলাকায় দৈনিক ২৪০০ ক্যালোরি এবং শহর এলাকায় ২১০০ ক্যালোরি প্রয়োজন বলে ধরা হয়। যেহেতু গ্রামীণ মানুষ বেশি কায়িক পরিশ্রম করে, তাই তাদের ক্যালোরি বেশি দরকার।
- আর্থিক মানদণ্ড: ২০১১-১২ সালের তথ্য অনুসারে, গ্রামে মাথাপিছু মাসিক ৮১৬ টাকা এবং শহরে ১০০০ টাকা আয়ের নিচে থাকলে তাকে দারিদ্র্য সীমার নিচে ধরা হয়।
৪. ভারতে দারিদ্র্যের প্রবণতা এবং আন্তঃরাজ্য বৈষম্য
১৯৭৩ সাল থেকে ভারতে দারিদ্র্যের হার ধীরে ধীরে কমছে। তবে ভারতের সব রাজ্যে দারিদ্র্যের হার সমান নয়।
- ওড়িশা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি।
- অন্যদিকে পাঞ্জাব, হরিয়ানা (উন্নত কৃষি), কেরালা (মানবসম্পদ উন্নয়ন), পশ্চিমবঙ্গ (ভূমি সংস্কার) এবং অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ু (গণবণ্টন ব্যবস্থা) দারিদ্র্য কমাতে সফল হয়েছে।
৫. বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের চিত্র
বিশ্বব্যাংকের মতে, যারা দৈনিক ১.৯০ ডলারের (২০১১ সালের মানদণ্ড) কম আয়ে জীবনযাপন করে, তারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। গত কয়েক দশকে চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো দারিদ্র্য কমাতে বিশাল সাফল্য দেখিয়েছে, কিন্তু সাব-সাহারা আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় দারিদ্র্য এখনও একটি বড় সমস্যা।
৬. দারিদ্র্যের কারণসমূহ
ভারতে দারিদ্র্যের পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক এবং বর্তমান কারণ রয়েছে:
- ব্রিটিশ শাসন: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ভারতের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ধ্বংস হয়েছিল এবং শিল্পায়নকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল।
- জনসংখ্যা বৃদ্ধি: অতি দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হারকে কমিয়ে দিয়েছে।
- কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা: ভারতে গ্রিন রেভোলিউশন বা সবুজ বিপ্লব হলেও তার সুবিধা সব রাজ্যে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
- সম্পদের অসম বণ্টন: ভূমি ও অন্যান্য সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে দারিদ্র্য রয়ে গেছে।
৭. দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারি পদক্ষেপসমূহ
ভারত সরকার দারিদ্র্য দূর করতে দুটি প্রধান কৌশল গ্রহণ করেছে: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি গ্রহণ করা। কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলো:
- MGNREGA (মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন): এটি ২০০৫ সালে পাস হয়। এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারকে বছরে কমপক্ষে ১০০ দিনের নিশ্চিত কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়। এর এক-তৃতীয়াংশ কাজ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত।
- Prime Minister Rozgar Yozana (PMRY): ১৯৯৩ সালে শিক্ষিত বেকার যুবকদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে এটি শুরু হয়েছিল।
- Antyodaya Anna Yozana (AAY): এটি দরিদ্রতম মানুষের জন্য অত্যন্ত সস্তায় খাদ্যশস্য নিশ্চিত করার একটি প্রকল্প।
- PMGY (প্রধানমন্ত্রী গ্রামোদয় যোজনা): ২০০০ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামগুলোতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানীয় জল এবং বাসস্থানের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ভারতে দারিদ্র্য সীমার নিচে থাকা মানুষের ক্যালোরির চাহিদা গ্রামে বেশি কেন?
উত্তর: গ্রামীণ এলাকার মানুষ সাধারণত কায়িক পরিশ্রম বেশি করেন, যেমন—কৃষিকাজ এবং ভারী বোঝা বহন করা। তাই তাদের শারীরিক শক্তি বজায় রাখার জন্য শহরবাসীর তুলনায় বেশি ক্যালোরি (২৪০০ ক্যালোরি) প্রয়োজন হয়।
প্রশ্ন ২: 'সামাজিক বর্জন' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সামাজিক বর্জন হলো এমন এক পরিস্থিতি যেখানে সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ কেবল দরিদ্র হওয়ার কারণে সেই সুবিধা, সুযোগ এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় যা সমাজের অন্যান্য সচ্ছল অংশ ভোগ করে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের জাতিপ্রথা যেখানে নির্দিষ্ট জাতির মানুষদের সমাজের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হতো।
প্রশ্ন ৩: MGNREGA ২০০৫-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: এই প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারকে বছরে অন্তত ১০০ দিন কাজ দেওয়ার আইনি গ্যারান্টি দেওয়া। যদি সরকার ১৫ দিনের মধ্যে কাজ দিতে না পারে, তবে বেকার ভাতা দেওয়ার বিধান রয়েছে। এটি গ্রামীণ দারিদ্র্য কমাতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা পালন করে।
সারসংক্ষেপ
- দারিদ্র্য একটি বহুমাত্রিক সমস্যা যা স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং নিরাপত্তার অভাবকে নির্দেশ করে।
- ভারতে দারিদ্র্য সীমা নির্ধারণ করা হয় ক্যালোরি গ্রহণ এবং আয়ের স্তরের ওপর ভিত্তি করে।
- জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সম্পদের অসম বণ্টন এবং ঐতিহাসিক কারণগুলো ভারতে দারিদ্র্যের প্রধান উৎস।
- সরকার MGNREGA, PMRY এবং অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করার চেষ্টা করছে।
- ভবিষ্যতে কেবল 'দারিদ্র্য থেকে মুক্তি' নয়, বরং 'মর্যাদার সাথে জীবনযাপন' নিশ্চিত করাই হবে ভারতের মূল লক্ষ্য।