বিষয়ের ভূমিকা
আমরা যখন আমাদের চারপাশের জগৎ দেখি, তখন আমাদের মনে একটি মৌলিক প্রশ্ন জাগে: কোনো বস্তু জীবন্ত নাকি মৃত, তা আমরা কীভাবে নির্ধারণ করি? একটি কুকুর দৌড়াচ্ছে, একটি গরু চিবোচ্ছে বা একজন মানুষ চিৎকার করছে – এগুলো দেখে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে তারা জীবন্ত। কিন্তু তারা যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখনও কি তারা জীবন্ত? অবশ্যই। কিন্তু কীভাবে বুঝব? আমরা তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে দেখি। গাছের ক্ষেত্রে কী হবে? তারা তো দৌড়ায় না বা চিৎকার করে না। কিন্তু তারা জীবন্ত, কারণ সময়ের সাথে সাথে তারা বড় হয়, তাদের পাতার রঙ বদলায়। সুতরাং, কিছু দৃশ্যমান গতিবিধি জীবনের পরিচায়ক।
কিন্তু এমন অনেক জীব আছে যাদের গতিবিধি খালি চোখে দেখা যায় না, যেমন ভাইরাস বা অণুজীব। তাদের ক্ষেত্রে জীবনের সংজ্ঞা কী? আসলে, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো আণবিক স্তরের গতিবিধি। আমাদের শরীরের কোষগুলো প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে, অণুগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছে, পুরোনো কোষ ভেঙে নতুন কোষ তৈরি হচ্ছে। এই আণবিক গতিবিধিই জীবনকে সচল রাখে।
জীবন্ত থাকার জন্য এবং শরীরের বিভিন্ন কার্য সম্পাদন করার জন্য জীবদের প্রতিনিয়ত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। এই রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি যে প্রক্রিয়াগুলির মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে সম্পন্ন হয়, তাদেরকেই জীবন প্রক্রিয়া (Life Processes) বলা হয়। এই অধ্যায়ে, আমরা প্রধান চারটি জীবন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব:
- পুষ্টি (Nutrition): শক্তি অর্জনের জন্য খাদ্য গ্রহণ এবং তাকে ব্যবহারযোগ্য রূপে পরিবর্তন করার প্রক্রিয়া।
- শ্বসন (Respiration): খাদ্য থেকে শক্তি নির্গত করার প্রক্রিয়া।
- সংবহন (Transportation): শরীরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে প্রয়োজনীয় পদার্থ (যেমন খাদ্য, অক্সিজেন) এবং বর্জ্য পদার্থ পরিবহন করার প্রক্রিয়া।
- রেচন (Excretion): শরীর থেকে বিপাকীয় বর্জ্য পদার্থ দূর করার প্রক্রিয়া।
আসুন, এই প্রক্রিয়াগুলি কীভাবে আমাদের এবং অন্যান্য জীবদের জীবন্ত রাখে, তার গভীরে প্রবেশ করি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. পুষ্টি (Nutrition)
আমরা যখন হাঁটি, সাইকেল চালাই বা এমনকি যখন কোনো কাজ না করে বসে থাকি, তখনও আমাদের শরীরের কাজ করার জন্য শক্তির প্রয়োজন হয়। এই শক্তি আসে খাবার থেকে। পুষ্টি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জীব খাদ্য গ্রহণ করে এবং সেই খাদ্যকে শরীরের বৃদ্ধি, মেরামত এবং বিভিন্ন জৈবনিক কাজ সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিতে রূপান্তরিত করে।
পুষ্টির দুটি প্রধান ধরণ রয়েছে:
- স্বভোজী পুষ্টি (Autotrophic Nutrition): যে প্রক্রিয়ায় জীব পরিবেশ থেকে সরল অজৈব পদার্থ (যেমন কার্বন ডাই অক্সাইড ও জল) ব্যবহার করে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে, তাকে স্বভোজী পুষ্টি বলে। সমস্ত সবুজ উদ্ভিদ এবং কিছু ব্যাকটেরিয়া এই পদ্ধতিতে পুষ্টি সম্পন্ন করে।
- পরভোজী পুষ্টি (Heterotrophic Nutrition): যে প্রক্রিয়ায় জীব নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না এবং খাদ্যের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্য জীবের উপর নির্ভর করে, তাকে পরভোজী পুষ্টি বলে। সমস্ত প্রাণী এবং ছত্রাক এই শ্রেণীর অন্তর্গত।
স্বভোজী পুষ্টি: উদ্ভিদের খাদ্য তৈরি
সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis) নামক একটি অসাধারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের খাদ্য (গ্লুকোজ) তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂), মাটি থেকে জল (H₂O) শোষণ করে এবং পাতার ক্লোরোফিলের সাহায্যে সূর্যালোককে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করে।
সালোকসংশ্লেষের রাসায়নিক সমীকরণটি হলো:
6CO₂ (কার্বন ডাই অক্সাইড) + 12H₂O (জল) → (সূর্যালোক ও ক্লোরোফিলের উপস্থিতিতে) → C₆H₁₂O₆ (গ্লুকোজ) + 6O₂ (অক্সিজেন) + 6H₂O (জল)
সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় নিম্নলিখিত ঘটনাগুলি ঘটে:
- ক্লোরোফিল দ্বারা আলোক শক্তি শোষণ: পাতার সবুজ কণা ক্লোরোফিল সূর্যালোক শোষণ করে।
- আলোক শক্তির রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর: শোষিত আলোক শক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং জল অণুকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে ভেঙে দেয়।
- কার্বন ডাই অক্সাইডের বিজারণ: কার্বন ডাই অক্সাইড বিজারিত হয়ে কার্বোহাইড্রেট বা গ্লুকোজে পরিণত হয়।
উদ্ভিদের পাতায় পত্ররন্ধ্র (Stomata) নামক অসংখ্য ক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে। এই ছিদ্রগুলির মাধ্যমে উদ্ভিদ গ্যাসীয় আদান-প্রদান (CO₂ গ্রহণ এবং O₂ ত্যাগ) করে। প্রতিটি পত্ররন্ধ্র দুটি রক্ষীকোষ (Guard Cells) দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে, যা জলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে পত্ররন্ধ্রের খোলা ও বন্ধ হওয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
পরভোজী পুষ্টি: প্রাণীদের খাদ্য গ্রহণ
পরভোজী জীবেরা খাদ্যের জন্য স্বভোজীদের উপর নির্ভরশীল। এদের পুষ্টি পদ্ধতি বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে, যেমন:
- পূর্ণাঙ্গ পুষ্টি (Holozoic Nutrition): এই প্রক্রিয়ায় জীব কঠিন বা তরল খাদ্য গ্রহণ করে এবং দেহের অভ্যন্তরে তা পরিপাক করে। উদাহরণ: মানুষ, অ্যামিবা, বাঘ।
- মৃতজীবী পুষ্টি (Saprophytic Nutrition): এই প্রক্রিয়ায় জীব মৃত ও পচা জৈব বস্তু থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে। উদাহরণ: ছত্রাক (যেমন মাশরুম), ব্যাকটেরিয়া।
- পরজীবী পুষ্টি (Parasitic Nutrition): এই প্রক্রিয়ায় জীব অন্য কোনো সজীব পোষকের দেহ থেকে পুষ্টি শোষণ করে এবং পোষকের ক্ষতি করে। উদাহরণ: উকুন, গোলকৃমি, স্বর্ণলতা।
মানুষের পুষ্টি (Nutrition in Human Beings)
মানুষের পুষ্টি একটি জটিল প্রক্রিয়া যা পৌষ্টিকতন্ত্রের (Digestive System) মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এটি একটি দীর্ঘ নালী, যা মুখ থেকে পায়ু পর্যন্ত বিস্তৃত, এবং এর সাথে কিছু গ্রন্থি যুক্ত থাকে।
খাদ্য পরিপাকের ধাপগুলি:
- মুখগহ্বর (Mouth): এখানে খাদ্য গৃহীত হয়। দাঁত খাদ্যকে ছোট ছোট টুকরোতে পরিণত করে। লালা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত লালারসে উপস্থিত স্যালাইভারি অ্যামাইলেজ (Salivary Amylase) নামক উৎসেচক শ্বেতসারকে (Starch) ভেঙে শর্করাতে পরিণত করে।
- গ্রাসনালী (Oesophagus): চিবানো খাদ্য গ্রাসনালীর মধ্য দিয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছায়। এই নালীর পেশীগুলির ছন্দোবদ্ধ সংকোচন ও প্রসারণকে পেরিস্টলসিস (Peristalsis) বলে, যা খাদ্যকে নিচে নামতে সাহায্য করে।
- পাকস্থলী (Stomach): এটি একটি বড় অঙ্গ যা খাদ্য গ্রহণ করে এবং তাকে মিশ্রিত করে। পাকস্থলীর প্রাচীরে উপস্থিত গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থি থেকে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl), পেপসিন (Pepsin) নামক উৎসেচক এবং মিউকাস (Mucus) ক্ষরিত হয়। HCl একটি অম্লীয় মাধ্যম তৈরি করে যা পেপসিনের কাজকে সহজ করে এবং খাদ্যের সাথে থাকা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে। পেপসিন প্রোটিন পরিপাক শুরু করে। মিউকাস পাকস্থলীর ভেতরের আস্তরণকে অ্যাসিডের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
- ক্ষুদ্রান্ত্র (Small Intestine): এটি পরিপাক নালীর দীর্ঘতম অংশ এবং এখানে শর্করা, প্রোটিন ও ফ্যাটের সম্পূর্ণ পরিপাক ঘটে। এখানে যকৃত (Liver) থেকে পিত্তরস (Bile) এবং অগ্ন্যাশয় (Pancreas) থেকে অগ্ন্যাশয় রস আসে।
- পিত্তরস: এটি ফ্যাটকে ছোট ছোট কণায় ভেঙে দেয়, যাকে ইমালসিফিকেশন (Emulsification) বলে। এটি উৎসেচকের কাজ করার জন্য একটি বৃহত্তর ক্ষেত্র তৈরি করে।
- অগ্ন্যাশয় রস: এতে ট্রিপসিন (Trypsin) ও লাইপেজ (Lipase) এর মতো উৎসেচক থাকে। ট্রিপসিন প্রোটিন পরিপাক করে এবং লাইপেজ ফ্যাট পরিপাক করে।
- আন্ত্রিক রস: ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রাচীর থেকে নিঃসৃত রসে উপস্থিত উৎসেচকগুলি জটিল কার্বোহাইড্রেটকে গ্লুকোজে, প্রোটিনকে অ্যামিনো অ্যাসিডে এবং ফ্যাটকে ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারলে পরিণত করে।
- বৃহদন্ত্র (Large Intestine): অপাচ্য খাদ্য বৃহদন্ত্রে প্রবেশ করে। এখানে প্রধানত জল শোষিত হয়। বাকি বর্জ্য পদার্থ মলাশয়ে (Rectum) জমা হয়।
- পায়ু (Anus): মলাশয়ে জমা থাকা বর্জ্য পদার্থ (মল) পায়ু দিয়ে দেহ থেকে নির্গত হয়।
২. শ্বসন (Respiration)
পুষ্টি প্রক্রিয়ায় গৃহীত খাদ্য থেকে শক্তি উৎপাদন করার প্রক্রিয়াকে শ্বসন বলে। এটি সাধারণত কোষের অভ্যন্তরে ঘটে, তাই একে কোষীয় শ্বসন (Cellular Respiration) বলা হয়। শ্বাস-প্রশ্বাস (Breathing) এবং শ্বসন এক জিনিস নয়। শ্বাস-প্রশ্বাস হলো গ্যাসীয় আদান-প্রদান (অক্সিজেন গ্রহণ ও কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ), যা শ্বসন প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র।
শ্বসনের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্লুকোজ (C₆H₁₂O₆) ভেঙে শক্তি (ATP - Adenosine Triphosphate) উৎপাদন করা। ATP হলো কোষের 'এনার্জি কারেন্সি' বা শক্তি মুদ্রা।
শ্বসন প্রধানত দুই প্রকারের:
- সবাত শ্বসন (Aerobic Respiration): যে শ্বসন প্রক্রিয়া অক্সিজেনের উপস্থিতিতে ঘটে এবং এতে গ্লুকোজ সম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড, জল ও বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে। এটি বেশিরভাগ উন্নত জীবের কোষে ঘটে।
- অবাত শ্বসন (Anaerobic Respiration): যে শ্বসন প্রক্রিয়া অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে ঘটে এবং এতে গ্লুকোজ অসম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে ইথাইল অ্যালকোহল বা ল্যাকটিক অ্যাসিড এবং সামান্য পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে। এটি ইস্ট এবং কিছু ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে দেখা যায়।
গ্লুকোজের ভাঙনের বিভিন্ন পথ:
সমস্ত ধরণের শ্বসনের প্রথম ধাপটি কোষের সাইটোপ্লাজমে ঘটে। এখানে ৬-কার্বনযুক্ত গ্লুকোজ অণু ভেঙে ৩-কার্বনযুক্ত পাইরুভেট (Pyruvate) অণুতে পরিণত হয় এবং কিছু শক্তি নির্গত হয়।
এরপর পাইরুভেটের পরিণতি বিভিন্ন জীবের ক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন হয়:
- ইস্টের ক্ষেত্রে (অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে): পাইরুভেট ভেঙে ইথানল (Ethanol), কার্বন ডাই অক্সাইড এবং শক্তি উৎপন্ন হয়। এই প্রক্রিয়াকে সন্ধান (Fermentation) বলে।
- পেশী কোষে (অক্সিজেনের অভাব হলে): অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের সময়, আমাদের পেশী কোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। তখন পাইরুভেট ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড (Lactic Acid) ও শক্তি উৎপন্ন করে। এই ল্যাকটিক অ্যাসিড জমা হওয়ার কারণেই আমাদের পেশীতে ব্যথা বা টান ধরে।
- মাইটোকন্ড্রিয়াতে (অক্সিজেনের উপস্থিতিতে): কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াতে, পাইরুভেট সম্পূর্ণরূপে ভেঙে কার্বন ডাই অক্সাইড, জল এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি (প্রায় ৩৮টি ATP অণু) উৎপন্ন করে। এটিই হলো সবাত শ্বসন।
মানুষের শ্বসনতন্ত্র (Human Respiratory System)
মানুষের শ্বসনতন্ত্র বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে রক্তে পৌঁছে দেয় এবং রক্ত থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ত্যাগ করে।
শ্বসনতন্ত্রের অঙ্গগুলি:
- নাসারন্ধ্র (Nostrils): বাতাস এই পথ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। নাকের ভেতরের লোম এবং শ্লেষ্মা বাতাসের ধূলিকণা ও জীবাণু আটকে দেয়।
- গলবিল (Pharynx) ও স্বরযন্ত্র (Larynx): বাতাস গলবিল হয়ে স্বরযন্ত্রের মধ্য দিয়ে শ্বাসনালীতে পৌঁছায়।
- শ্বাসনালী (Trachea): এটি তরুণাস্থি নির্মিত রিং দ্বারা গঠিত, যা বাতাস চলাচলের পথকে সংকুচিত হতে বাধা দেয়।
- ক্লোমশাখা (Bronchi) ও উপক্লোমশাখা (Bronchioles): শ্বাসনালী দুটি শাখায় (ব্রঙ্কাই) বিভক্ত হয়ে দুটি ফুসফুসে প্রবেশ করে। ফুসফুসের ভেতরে এগুলি আরও অসংখ্য সূক্ষ্ম শাখায় (ব্রঙ্কিওলস) বিভক্ত হয়।
- বায়ুথলি (Alveoli): প্রতিটি ব্রঙ্কিওলের শেষে বেলুনের মতো বায়ুথলি থাকে। এই বায়ুথলিগুলির প্রাচীর খুব পাতলা হয় এবং কৈশিক জালক (Capillaries) দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। এখানেই গ্যাসীয় আদান-প্রদান ঘটে।
ফুসফুসের মধ্যে লক্ষ লক্ষ বায়ুথলি থাকার কারণে গ্যাসীয় বিনিময়ের জন্য একটি বিশাল পৃষ্ঠতল (প্রায় ৮০ বর্গমিটার) পাওয়া যায়। অক্সিজেন বায়ুথলি থেকে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় রক্তে প্রবেশ করে এবং রক্ত থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুথলিতে আসে, যা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে যায়। রক্তে উপস্থিত হিমোগ্লোবিন (Haemoglobin) নামক রঞ্জক পদার্থ অক্সিজেন পরিবহনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
৩. সংবহন (Transportation)
এককোষী জীবদের (যেমন অ্যামিবা) ক্ষেত্রে পুষ্টি, গ্যাসীয় বিনিময় বা রেচনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট পরিবহন তন্ত্রের প্রয়োজন হয় না, কারণ তাদের সমগ্র কোষতল পরিবেশের সংস্পর্শে থাকে এবং ব্যাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পদার্থের আদান-প্রদান ঘটে। কিন্তু বহুকোষী জীবদের ক্ষেত্রে, শরীরের সমস্ত কোষ পরিবেশের সরাসরি সংস্পর্শে থাকে না। তাই খাদ্য, অক্সিজেন, হরমোন ইত্যাদি প্রয়োজনীয় পদার্থ প্রতিটি কোষে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এবং কোষ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য পদার্থগুলিকে নির্দিষ্ট অঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সুসংগঠিত পরিবহন তন্ত্র বা সংবহন তন্ত্রের প্রয়োজন হয়।
মানুষের সংবহন তন্ত্র (Human Circulatory System)
মানুষের সংবহন তন্ত্র প্রধানত রক্ত, রক্তবাহ এবং হৃৎপিণ্ড নিয়ে গঠিত।
১. রক্ত (Blood): এটি একটি তরল যোগকলা। এর দুটি প্রধান উপাদান হলো রক্তরস (Plasma) এবং রক্তকণিকা (Blood Corpuscles)।
- রক্তরস: এটি রক্তের তরল অংশ। এর মাধ্যমে খাদ্য, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য পদার্থ পরিবাহিত হয়।
- রক্তকণিকা:
- লোহিত রক্তকণিকা (RBC): এতে হিমোগ্লোবিন থাকে, যা অক্সিজেন পরিবহন করে।
- শ্বেত রক্তকণিকা (WBC): এরা জীবাণু ধ্বংস করে এবং শরীরকে রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
- অণুচক্রিকা (Platelets): এরা রক্ত তঞ্চনে বা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
২. রক্তবাহ (Blood Vessels): রক্ত যে নালীগুলির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এগুলি তিন প্রকার:
- ধমনী (Artery): এরা হৃৎপিণ্ড থেকে বিশুদ্ধ রক্ত (অক্সিজেনযুক্ত) শরীরের বিভিন্ন অংশে বহন করে। এদের প্রাচীর পুরু ও স্থিতিস্থাপক হয় কারণ হৃৎপিণ্ড থেকে উচ্চ চাপে রক্ত নির্গত হয়।
- শিরা (Vein): এরা শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে দূষিত রক্ত (কার্বন ডাই অক্সাইডযুক্ত) হৃৎপিণ্ডে ফিরিয়ে আনে। এদের প্রাচীর ধমনীর চেয়ে পাতলা হয়।
- কৈশিক জালক (Capillaries): ধমনীগুলি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর নালীতে বিভক্ত হয়ে কৈশিক জালক তৈরি করে, যা প্রতিটি কোষের সংস্পর্শে থাকে। এখানেই রক্ত এবং কোষের মধ্যে পদার্থের বিনিময় ঘটে। কৈশিক জালকগুলি আবার মিলিত হয়ে শিরা গঠন করে।
৩. হৃৎপিণ্ড (Heart): এটি একটি পেশীবহুল পাম্প যা সারা দেহে রক্ত সঞ্চালন করে। মানুষের হৃৎপিণ্ড চারটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত: ডান অলিন্দ (Right Atrium), বাম অলিন্দ (Left Atrium), ডান নিলয় (Right Ventricle) এবং বাম নিলয় (Left Ventricle)।
দ্বি-সংবহন (Double Circulation):
মানুষের দেহে রক্ত প্রতিটি চক্রে দুবার হৃৎপিণ্ডের মধ্যে দিয়ে যায়। একে দ্বি-সংবহন বলে।
- ফুসফুসীয় সংবহন (Pulmonary Circulation): ডান নিলয় থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডযুক্ত রক্ত ফুসফুসীয় ধমনীর মাধ্যমে ফুসফুসে যায়। ফুসফুসে রক্ত অক্সিজেনযুক্ত হয়ে ফুসফুসীয় শিরার মাধ্যমে বাম অলিন্দে ফিরে আসে।
- সিস্টেমিক সংবহন (Systemic Circulation): বাম নিলয় থেকে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত মহাধমনীর মাধ্যমে সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে। কোষগুলিতে অক্সিজেন সরবরাহ করার পর কার্বন ডাই অক্সাইডযুক্ত রক্ত মহাশিরার মাধ্যমে ডান অলিন্দে ফিরে আসে।
এই দ্বি-সংবহন ব্যবস্থা অক্সিজেনযুক্ত এবং কার্বন ডাই অক্সাইডযুক্ত রক্তের মিশ্রণকে বাধা দেয়, যা দক্ষ অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে। এটি উচ্চ শক্তির চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে, যা উষ্ণরক্তের প্রাণীদের (যেমন মানুষ) শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।
উদ্ভিদের সংবহন (Transportation in Plants)
উদ্ভিদেরও জল, খনিজ লবণ এবং খাদ্য পরিবহনের জন্য একটি সংবহন তন্ত্র রয়েছে। এটি প্রধানত জাইলেম (Xylem) এবং ফ্লোয়েম (Phloem) নামক দুটি সংবহন কলার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
- জলের পরিবহন (জাইলেম): মূলরোমের সাহায্যে মাটি থেকে শোষিত জল এবং খনিজ লবণ জাইলেম কলার মাধ্যমে ঊর্ধ্বমুখে বাহিত হয়ে পাতা পর্যন্ত পৌঁছায়। এই পরিবহন দুটি প্রধান শক্তির দ্বারা ঘটে: (ক) মূলজ চাপ (Root Pressure) এবং (খ) বাষ্পমোচন টান (Transpiration Pull)। দিনের বেলায় বাষ্পমোচন বা পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে জল বাষ্পাকারে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে একটি চোষণ টানের সৃষ্টি হয়, যা জলকে গাছের শীর্ষ পর্যন্ত টেনে তুলতে সাহায্য করে।
- খাদ্যের পরিবহন (ফ্লোয়েম): পাতায় সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন খাদ্য (সুক্রোজ) ফ্লোয়েম কলার মাধ্যমে গাছের বিভিন্ন অংশে, যেমন মূল, কাণ্ড এবং ফলের মতো সঞ্চয়ী অঙ্গে পরিবাহিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে ট্রান্সলোকেশন (Translocation) বলে এবং এর জন্য শক্তির (ATP) প্রয়োজন হয়।
৪. রেচন (Excretion)
বিভিন্ন বিপাকীয় ক্রিয়ার ফলে জীবদেহে কিছু বর্জ্য পদার্থ উৎপন্ন হয় যা শরীরের জন্য বিষাক্ত হতে পারে। এই ক্ষতিকারক বিপাকীয় বর্জ্য পদার্থগুলিকে শরীর থেকে निष्कासित করার প্রক্রিয়াকে রেচন বলে।
মানুষের রেচনতন্ত্র (Human Excretory System)
মানুষের প্রধান রেচন অঙ্গ হলো বৃক্ক (Kidney)। রেচনতন্ত্রের অঙ্গগুলি হলো:
- একজোড়া বৃক্ক (A pair of Kidneys): এগুলি শিমের বীজের মতো দেখতে অঙ্গ যা পেটের নিচের দিকে মেরুদণ্ডের দুই পাশে অবস্থিত। বৃক্ক রক্ত থেকে নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য পদার্থ (যেমন ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড) ছেঁকে মূত্র তৈরি করে।
- একজোড়া গবিনী (A pair of Ureters): প্রতিটি বৃক্ক থেকে একটি করে নল বেরিয়ে মূত্রাশয় পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মাধ্যমে মূত্র বৃক্ক থেকে মূত্রাশয়ে পৌঁছায়।
- মূত্রাশয় (Urinary Bladder): এটি একটি পেশীবহুল থলি যেখানে মূত্র সাময়িকভাবে জমা থাকে।
- মূত্রনালী (Urethra): এর মাধ্যমে মূত্রাশয় থেকে মূত্র দেহের বাইরে নির্গত হয়।
নেফ্রন (Nephron): প্রতিটি বৃক্ক প্রায় দশ লক্ষ সূক্ষ্ম পরিস্রাবণ একক নিয়ে গঠিত, যাদের নেফ্রন বলে। নেফ্রনই হলো বৃক্কের গঠনগত ও কার্যগত একক। প্রতিটি নেফ্রনের দুটি প্রধান অংশ থাকে:
- বোম্যান'স ক্যাপসুল (Bowman's Capsule): এটি একটি কাপের মতো অংশ যার মধ্যে কৈশিক জালকের একটি গুচ্ছ থাকে, যাকে গ্লোমেরুলাস (Glomerulus) বলে।
- বৃক্কীয় নালিকা (Renal Tubule): এটি একটি লম্বা, প্যাঁচানো নল যা বোম্যান'স ক্যাপসুল থেকে শুরু হয়ে সংগ্রাহী নালীতে শেষ হয়।
মূত্র উৎপাদন প্রক্রিয়া:
- গ্লোমেরুলার পরিস্রাবণ: গ্লোমেরুলাসে উচ্চ চাপে রক্ত পরিশ্রুত হয়। জল, গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, লবণ এবং ইউরিয়ার মতো ছোট অণুগুলি বোম্যান'স ক্যাপসুলে প্রবেশ করে।
- পুনঃশোষণ: পরিশ্রুত তরলটি বৃক্কীয় নালিকার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় শরীরর জন্য প্রয়োজনীয় পদার্থ, যেমন গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, লবণ এবং বেশিরভাগ জল, আবার রক্তে শোষিত হয়।
- ক্ষরণ: কিছু অপ্রয়োজনীয় পদার্থ (যেমন পটাশিয়াম, হাইড্রোজেন আয়ন) রক্ত থেকে সরাসরি নালিকায় ক্ষরিত হয়।
অবশিষ্ট তরলটিই হলো মূত্র, যা সংগ্রাহী নালীর মাধ্যমে গবিনীতে প্রবেশ করে।
যদি কোনো কারণে বৃক্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তবে রক্তে বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ জমা হতে শুরু করে, যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এই অবস্থায়, কৃত্রিম বৃক্ক বা ডায়ালাইসিস (Dialysis) মেশিনের সাহায্যে রক্তকে পরিশ্রুত করা হয়।
উদ্ভিদের রেচন (Excretion in Plants)
উদ্ভিদের রেচন প্রক্রিয়া প্রাণীদের মতো জটিল নয়। উদ্ভিদ বিভিন্ন উপায়ে বর্জ্য পদার্থ ত্যাগ করে:
- সালোকসংশ্লেষের উপজাত অক্সিজেন এবং শ্বসনের উপজাত কার্বন ডাই অক্সাইড পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে বাতাসে নির্গত হয়।
- অতিরিক্ত জল বাষ্পমোচন প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে যায়।
- অনেক বর্জ্য পদার্থ কোষের ভ্যাকুওলে জমা থাকে।
- কিছু বর্জ্য পদার্থ পাতা বা বাকলে জমা হয়, যা পরে ঝরে পড়ে।
- উদ্ভিদ কিছু বর্জ্য পদার্থকে আঠা (gum) এবং রজন (resin) হিসেবে ত্যাগ করে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ধমনী ও শিরার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি কী কী?
উত্তর:
- প্রবাহের দিক: ধমনী হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত বহন করে শরীরের বিভিন্ন অংশে নিয়ে যায়, অন্যদিকে শিরা শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত হৃৎপিণ্ডে ফিরিয়ে আনে।
- রক্তের প্রকৃতি: ফুসফুসীয় ধমনী ছাড়া সমস্ত ধমনী অক্সিজেনযুক্ত (বিশুদ্ধ) রক্ত বহন করে। ফুসফুসীয় শিরা ছাড়া সমস্ত শিরা কার্বন ডাই অক্সাইডযুক্ত (দূষিত) রক্ত বহন করে।
- প্রাচীরের গঠন: ধমনীর প্রাচীর পুরু, পেশীবহুল এবং স্থিতিস্থাপক হয়, কারণ রক্ত উচ্চ চাপে প্রবাহিত হয়। শিরার প্রাচীর পাতলা এবং কম স্থিতিস্থাপক হয়।
- কপাটিকা: ধমনীতে কপাটিকা (valve) থাকে না (ব্যতিক্রম: মহাধমনীর শুরুতে)। শিরার মধ্যে কপাটিকা থাকে যা রক্তের বিপরীত প্রবাহকে বাধা দেয়।
প্রশ্ন ২: সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি কী কী এবং এর ফলে কী উৎপন্ন হয়?
উত্তর: সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার জন্য প্রধান চারটি প্রয়োজনীয় উপাদান হলো:
- সূর্যালোক: শক্তির প্রধান উৎস।
- ক্লোরোফিল: পাতার সবুজ রঞ্জক যা সূর্যালোক শোষণ করে।
- কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂): বাতাস থেকে পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে গৃহীত হয়।
- জল (H₂O): মূল দ্বারা মাটি থেকে শোষিত হয়।
এই প্রক্রিয়ার ফলে প্রধানত গ্লুকোজ (C₆H₁₂O₆) নামক শর্করা জাতীয় খাদ্য এবং উপজাত হিসেবে অক্সিজেন (O₂) ও জল (H₂O) উৎপন্ন হয়।
প্রশ্ন ৩: আমাদের পাকস্থলীতে অ্যাসিডের (HCl) ভূমিকা কী?
উত্তর: আমাদের পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের (HCl) তিনটি প্রধান ভূমিকা রয়েছে:
- এটি একটি শক্তিশালী অম্লীয় মাধ্যম তৈরি করে, যা পেপসিন নামক প্রোটিন-পরিপাককারী উৎসেচকের কার্যকারিতার জন্য অপরিহার্য।
- এটি খাদ্যের সাথে প্রবেশ করা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণুকে ধ্বংস করে।
- এটি খাদ্যের কঠিন অংশকে নরম করে পরিপাকে সাহায্য করে।
প্রশ্ন ৪: সবাত এবং অবাত শ্বসনের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর:
- অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা: সবাত শ্বসন অক্সিজেনের উপস্থিতিতে ঘটে, অন্যদিকে অবাত শ্বসন অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে ঘটে।
- উৎপন্ন পদার্থ: সবাত শ্বসনে গ্লুকোজ সম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড ও জল উৎপন্ন করে। অবাত শ্বসনে গ্লুকোজ অসম্পূর্ণরূপে জারিত হয়ে ইথানল ও কার্বন ডাই অক্সাইড (ইস্টের ক্ষেত্রে) বা ল্যাকটিক অ্যাসিড (পেশী কোষের ক্ষেত্রে) উৎপন্ন করে।
- শক্তি উৎপাদন: সবাত শ্বসনে অনেক বেশি পরিমাণে শক্তি (প্রায় 38 ATP) উৎপন্ন হয়। অবাত শ্বসনে খুব সামান্য পরিমাণে শক্তি (প্রায় 2 ATP) উৎপন্ন হয়।
- সংঘটন স্থান: সবাত শ্বসনের প্রক্রিয়া সাইটোপ্লাজম ও মাইটোকন্ড্রিয়া উভয় স্থানেই ঘটে। অবাত শ্বসন শুধুমাত্র সাইটোপ্লাজমে ঘটে।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা জীবন্ত থাকার জন্য অপরিহার্য চারটি মৌলিক জীবন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানলাম। আসুন মূল বিষয়গুলি একবার মনে করে নিই:
- জীবন প্রক্রিয়া: জীবদের বেঁচে থাকার জন্য এবং শরীরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে সমস্ত জৈবনিক প্রক্রিয়া সম্মিলিতভাবে কাজ করে, তাই হলো জীবন প্রক্রিয়া।
- পুষ্টি: এটি খাদ্য গ্রহণ এবং তা থেকে শক্তি ও দেহের প্রয়োজনীয় উপাদান আহরণের প্রক্রিয়া। উদ্ভিদ স্বভোজী (সালোকসংশ্লেষ) এবং প্রাণী পরভোজী।
- শ্বসন: এটি খাদ্যকে ভেঙে শক্তি (ATP) নির্গত করার প্রক্রিয়া। এটি সবাত (অক্সিজেনের উপস্থিতিতে) বা অবাত (অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে) হতে পারে।
- সংবহন: এটি শরীরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে প্রয়োজনীয় পদার্থ পরিবহন এবং বর্জ্য পদার্থ অপসারণের ব্যবস্থা। মানুষের ক্ষেত্রে রক্ত, হৃৎপিণ্ড ও রক্তবাহ এবং উদ্ভিদের ক্ষেত্রে জাইলেম ও ফ্লোয়েম এই কাজটি করে।
- রেচন: এটি শরীর থেকে বিপাকীয় ক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন ক্ষতিকারক বর্জ্য পদার্থ দূর করার প্রক্রিয়া। মানুষের প্রধান রেচন অঙ্গ হলো বৃক্ক।
এই চারটি প্রক্রিয়া একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং সম্মিলিতভাবে একটি জীবকে সচল ও জীবন্ত রাখে। এই প্রক্রিয়াগুলির যেকোনো একটির অনুপস্থিতি জীবনের সমাপ্তি ঘটাতে পারে।