ভালোবাসার মানুষ দূরে চলে গেলে মন কেমন করে, তাই না? আমরা আজকাল হোয়াটস্যাপে ভিডিও কল করি, সারাদিন টেক্সট চালাচালি করি, কিংবা মানিব্যাগে প্রিয়জনের ছবি রেখে দিই। প্রযুক্তির কল্যাণে ভালোবাসার মানুষকে কাছে রাখার হাজারো উপায় আজ আমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু একবার ভাবুন তো, এমন একটা সময়ের কথা যখন না ছিল স্মার্টফোন, না ছিল ক্যামেরা। তখন প্রেমিক-প্রেমিকারা কীভাবে একে অপরের স্মৃতি আগলে রাখত? উত্তরটা শুনলে আপনি একটু অবাক হবেন, আবার একটু মজাও পাবেন। কারণ তখন প্রিয়জনের ছবি নয়, বরং তার একখানা চোখ পকেটে বা গলায় ঝুলিয়ে ঘুরতেন তাঁরা!

বিশ্বাস হচ্ছে না? চলুন ডুব দেওয়া যাক ভালোবাসার এক অদ্ভুত সুন্দর ইতিহাসে।

যখন প্রেমিকের চোখ থাকতো আপনার আংটিতে!

আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে, যখন ইংল্যান্ডের আকাশ-বাতাসে রোমান্টিকতার হাওয়া, তখন সমাজের উঁচু স্তরের প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে এক নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছিল। আজকের ভাষায় যাকে বলে 'ভাইরাল ফ্যাশন'। আর সেই ফ্যাশনটি ছিল একে অপরের চোখের মিনিয়েচার বা ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি তৈরি করে গয়নার মধ্যে লুকিয়ে রাখা। এই অদ্ভুত সুন্দর গয়নাগুলোর নাম দেওয়া হয়েছিল 'লাভার্স আই' (Lover's Eye)।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অপরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের এক অদ্ভুত উপায় বের করেছিল। তারা একে অপরের চোখের মিনিয়েচার বা ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি তৈরি করে তা লকেট, আংটি, ব্রোচ বা ব্রেসলেটের মধ্যে লুকিয়ে রাখত। আর এই অদ্ভুত ফ্যাশনের নাম ছিল ‘লাভার্স আই’!

ভাবুন একবার, আপনার ভালোবাসার মানুষটির নিষ্পাপ দুটি চোখের একটি ছোট্ট ছবি সবসময় আপনার সাথে রয়েছে। কী অসাধারণ অনুভূতি, তাই না? এই 'লাভার্স আই' শুধু একটি গয়নাই ছিল না, এটি ছিল একটি গোপন বার্তা, এক টুকরো ব্যক্তিগত ভালোবাসা যা কেবল দুজন মানুষই বুঝত।

এক রাজকীয় প্রেমের গল্প থেকে শুরু

এই অদ্ভুত ফ্যাশনের পেছনের গল্পটাও কিন্তু বেশ সিনেম্যাটিক। এর শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডের এক রাজপুত্রকে দিয়ে, যিনি পরে রাজা চতুর্থ জর্জ হয়েছিলেন। ১৭৮৪ সালে প্রিন্স জর্জ মারিয়া ফিটজহারবার্ট নামে এক সাধারণ বিধবা মহিলার প্রেমে পড়েন। কিন্তু রাজপরিবারের কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, একজন ক্যাথলিক বিধবাকে বিয়ে করা তার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু প্রেম কি আর নিয়ম মানে? প্রিন্স জর্জ মরিয়া হয়ে ওঠেন।

অনেক চেষ্টার পর, ১৭৮৫ সালে তিনি মারিয়াকে একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠির সাথে ছিল এক অভিনব উপহার – একটি ছোট্ট ফ্রেমে বাঁধানো তার নিজের ডান চোখের একটি ছবি। পুরো মুখের ছবি দিলে সবাই চিনে ফেলবে, তাই পরিচয় গোপন রাখতেই এই ব্যবস্থা। এই উপহার পেয়ে মারিয়ার মন গলে যায় এবং তাঁরা গোপনে বিয়ে করেন। এরপর মারিয়াও প্রিন্সকে নিজের চোখের একটি মিনিয়েচার উপহার দেন, যা তিনি সারাজীবন তার কোটের নিচে লুকিয়ে রাখতেন। আর এভাবেই এক নিষিদ্ধ রাজকীয় প্রেম জন্ম দিয়েছিল ভালোবাসার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ট্রেন্ডের।

শুধু চোখ কেন?

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, পুরো মুখের ছবি না এঁকে শুধু চোখ কেন? এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো গোপনীয়তা। যেহেতু কেবল একটি চোখ আঁকা হতো, তাই প্রেমিক বা প্রেমিকার পরিচয় গোপন থাকতো। সমাজের চোখে ধুলো দিয়ে নিজের ভালোবাসার স্মৃতি কাছে রাখার এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে?

দ্বিতীয়ত, চোখকে সবসময় আত্মার জানালা বলা হয়। এটি ছিল ভালোবাসার গভীরতার প্রতীক। পুরো চেহারার চেয়ে একটি মায়াবী চোখের চাহনি অনেক বেশি কথা বলতে পারে। তাই এই 'লাভার্স আই' ছিল এক intenso বা তীব্র ভালোবাসার প্রকাশ।

এই মিনিয়েচারগুলো সাধারণত হাতির দাঁতের ওপর জলরং দিয়ে আঁকা হতো এবং সেগুলোকে সোনা বা রুপোর ফ্রেমে বাঁধা হতো। ফ্রেমের চারপাশে মুক্তো বা অন্যান্য মূল্যবান পাথর দিয়ে কারুকার্য করা থাকতো। মুক্তোকে অনেক সময় অশ্রুর প্রতীক হিসেবেও ব্যবহার করা হতো, যা ভালোবাসার বিচ্ছেদের বেদনাকে বোঝাত।

একটি যুগের অবসান

১৭৯০ থেকে ১৮৩০ সাল পর্যন্ত এই 'লাভার্স আই' জুয়েলারির জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। তবে সময়ের সাথে সাথে এবং বিশেষ করে ফটোগ্রাফির আবিষ্কারের পর ধীরে ধীরে এই প্রথা হারিয়ে যায়। মানুষ তখন পুরো মুখের ছবিই পেতে শুরু করল, তাই চোখের রহস্যময় আবেদন ফিকে হয়ে আসে। আজ বিশ্বজুড়ে মাত্র হাজারখানেক আসল 'লাভার্স আই' জুয়েলারি টিকে আছে বলে মনে করা হয়, যা সেগুলোকে সংগ্রাহকদের কাছে অমূল্য করে তুলেছে।

ভালোবাসা প্রকাশের ধরন হয়তো যুগে যুগে বদলায়, কিন্তু এর পেছনের অনুভূতিটা সবসময় একই থাকে। সেদিন প্রিন্স জর্জ যা করেছিলেন, তা ছিল তাঁর সময়ের সবচেয়ে রোমান্টিক কাজ। আজ হয়তো আমরা প্রিয়জনকে 'আই লাভ ইউ' লেখা একটা টেক্সট পাঠাই। মাধ্যম আলাদা, কিন্তু আবেগটা একই। ভালোবাসা চিরকালই এমন অদ্ভুত, সুন্দর আর রহস্যময়।