বিষয়ের ভূমিকা

নমস্কার বন্ধুরা! আজ আমরা দশম শ্রেণির অর্থনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করব - অধ্যায় ৩: মুদ্রা ও ঋণ (Money and Credit)। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে টাকা-পয়সার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা দোকানে জিনিস কিনি, বাসে বা ট্রেনে যাতায়াত করি, স্কুলের ফি দিই - সবক্ষেত্রেই মুদ্রার প্রয়োজন হয়। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছো, এই মুদ্রা বা টাকা কীভাবে কাজ করে? প্রাচীনকালে যখন টাকা ছিল না, তখন মানুষ কীভাবে লেনদেন করত? আবার, যখন আমাদের বড় কোনো কাজের জন্য টাকার প্রয়োজন হয়, যেমন বাড়ি তৈরি করা বা ব্যবসা শুরু করা, তখন আমরা ঋণ বা লোন নিই। এই ঋণ কীভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারে, আবার কখনও কখনও কীভাবে সমস্যার কারণ হতে পারে?

এই অধ্যায়ে আমরা এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজব। আমরা জানব মুদ্রার বিবর্তনের ইতিহাস, আধুনিক মুদ্রার বিভিন্ন রূপ, ব্যাঙ্কগুলির কার্যকারিতা এবং অর্থনীতিতে ঋণের ভূমিকা। এই অধ্যায়টি কেবল পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আমাদের বাস্তব জীবনের আর্থিক লেনদেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতেও সাহায্য করবে। তাহলে চলুন, মুদ্রা ও ঋণের এই увлекательный জগতে প্রবেশ করা যাক এবং অর্থনীতির এই মৌলিক ধারণাগুলি সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

মুদ্রা: বিনিময়ের একটি মাধ্যম (Money as a Medium of Exchange)

মুদ্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করা। কিন্তু এর অর্থ কী? এটি বোঝার জন্য, আমাদের এমন একটি সময়ের কথা ভাবতে হবে যখন মুদ্রার অস্তিত্ব ছিল না।

পণ্য বিনিময় প্রথা (Barter System):

প্রাচীনকালে, যখন মুদ্রার প্রচলন হয়নি, তখন মানুষ সরাসরি পণ্যের বিনিময়ে পণ্য লেনদেন করত। এই পদ্ধতিকে বলা হয় পণ্য বিনিময় প্রথা। উদাহরণস্বরূপ, একজন কৃষকের কাছে অতিরিক্ত ধান আছে এবং তার জুতো দরকার। অন্যদিকে, একজন মুচির কাছে অতিরিক্ত জুতো আছে এবং তার ধান দরকার। এক্ষেত্রে, তারা সহজেই একে অপরের সাথে ধান ও জুতো বিনিময় করতে পারে।

পণ্য বিনিময় প্রথার সমস্যা: চাহিদার দ্বিমুখী সংযোগের অভাব

উপরের উদাহরণটি খুব সরল মনে হলেও, বাস্তব জীবনে এই ব্যবস্থাটি ছিল অত্যন্ত জটিল। এর প্রধান সমস্যাটি হলো চাহিদার দ্বিমুখী সংযোগের অভাব (Lack of Double Coincidence of Wants)। এর অর্থ হলো, বিনিময়ের জন্য উভয় পক্ষকে একে অপরের পণ্য কিনতে এবং বিক্রি করতে ইচ্ছুক হতে হবে।

  • উদাহরণ: ধরা যাক, একজন জুতো প্রস্তুতকারকের জুতো বিক্রি করে গম কেনার ইচ্ছা আছে। কিন্তু তিনি এমন একজন কৃষককে খুঁজে পেলেন যার গম বিক্রি করার ইচ্ছা থাকলেও জুতো কেনার কোনো ইচ্ছা নেই, তার হয়তো কাপড় প্রয়োজন। এক্ষেত্রে, জুতো প্রস্তুতকারককে প্রথমে এমন কাউকে খুঁজতে হবে যে তার জুতো কিনে কাপড় দেবে, এবং তারপর সেই কাপড় দিয়ে কৃষকের কাছ থেকে গম কিনতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং অসুবিধাজনক।

এই বিশাল সমস্যাটির সমাধান করতেই মুদ্রার আগমন। মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে একটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। এখন জুতো প্রস্তুতকারককে এমন কৃষক খুঁজতে হবে না যে তার জুতো কিনবে। তিনি তার জুতো মুদ্রার বিনিময়ে বাজারে বিক্রি করতে পারেন এবং সেই মুদ্রা দিয়ে যেকোনো জায়গা থেকে গম কিনে নিতে পারেন। একইভাবে, কৃষকও তার গম মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করে সেই মুদ্রা দিয়ে তার প্রয়োজনীয় যেকোনো জিনিস কিনতে পারে। এইভাবে, মুদ্রা চাহিদার দ্বিমুখী সংযোগের প্রয়োজনীয়তা দূর করে এবং বিনিময় প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ ও কার্যকর করে তোলে।

মুদ্রার আধুনিক রূপ (Modern Forms of Money)

সময়ের সাথে সাথে মুদ্রার রূপেরও পরিবর্তন ঘটেছে। প্রাচীনকালে শস্য, গবাদি পশু ইত্যাদি পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তারপর এলো সোনা, রুপা, তামার মতো ধাতব মুদ্রা। আর আজ আমরা যে আধুনিক মুদ্রা ব্যবহার করি, তার দুটি প্রধান রূপ রয়েছে:

  1. কারেন্সি (Currency): কাগজের নোট এবং ধাতব মুদ্রা।
  2. ব্যাঙ্কে জমা (Deposits with Banks): ব্যাঙ্কে গচ্ছিত অর্থ।

১. কারেন্সি (কাগজের নোট ও মুদ্রা):

আধুনিক মুদ্রা, যেমন ভারতের টাকা, সোনা বা রুপার মতো মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি নয়। এর নিজস্ব কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই (যেমন শস্য বা গবাদি পশুর ছিল)। তাহলে প্রশ্ন হলো, কেন আমরা এটিকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করি?

এর কারণ হলো, এটি দেশের সরকার দ্বারা অনুমোদিত। ভারতে, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (Reserve Bank of India - RBI) কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কারেন্সি নোট জারি করে। ভারতীয় আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ভারতে টাকা দিয়ে করা লেনদেন প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। যেহেতু সরকার এটিকে বৈধতা দিয়েছে, তাই এটি সর্বত্র বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয়। এই ধরনের মুদ্রাকে 'ফিয়াট মানি' (Fiat Money) বলা হয়।

২. ব্যাঙ্কে জমা (Demand Deposits):

মানুষের হাতে যে অতিরিক্ত অর্থ থাকে, তা তারা নিরাপত্তার জন্য এবং সুদ অর্জনের জন্য ব্যাঙ্কে জমা রাখে। ব্যাঙ্ক সেই টাকা আমানত হিসেবে গ্রহণ করে এবং তার উপর একটি নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করে। এই জমাকৃত অর্থকে আমানত (Deposit) বলা হয়।

এই আমানতের একটি বড় সুবিধা হলো, মানুষ প্রয়োজনে যেকোনো সময় এই টাকা তুলতে পারে। যেহেতু এই টাকা চাহিদামাত্রই (on demand) তোলা যায়, তাই এই ধরনের আমানতকে চাহিদা আমানত (Demand Deposits) বলা হয়।

চাহিদা আমানত মুদ্রার একটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য প্রদান করে - চেকের মাধ্যমে অর্থ প্রদানের সুবিধা।

  • চেক (Cheque): চেক হলো একটি কাগজ যা ব্যাঙ্ককে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে চেকের উপর উল্লিখিত পরিমাণ অর্থ প্রদান করার নির্দেশ দেয়। ধরা যাক, আপনাকে কাউকে ৫০,০০০ টাকা দিতে হবে। নগদ টাকা দেওয়ার পরিবর্তে, আপনি তাকে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের একটি চেক লিখে দিতে পারেন। সেই ব্যক্তি চেকটি তার নিজের ব্যাঙ্কে জমা দিলে, আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তার অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। এইভাবে, নগদ ব্যবহার না করেই সরাসরি লেনদেন সম্পন্ন করা যায়।

যেহেতু চাহিদা আমানতকে চেকের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায় এবং এটি বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যাপকভাবে গৃহীত, তাই আধুনিক অর্থনীতিতে এটিকে মুদ্রার একটি রূপ হিসেবেই গণ্য করা হয়।

ব্যাঙ্কগুলির ঋণ কার্যক্রম (Loan Activities of Banks)

ব্যাঙ্কগুলি কীভাবে কাজ করে? তাদের আয়ের উৎস কী? ব্যাঙ্কগুলি মূলত আমানতকারী (যাঁরা টাকা জমা রাখেন) এবং ঋণগ্রহীতা (যাঁরা টাকা ধার করেন) - এই দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।

ব্যাঙ্কগুলির কার্যপ্রণালী খুবই সহজ কিন্তু কার্যকর:

  1. আমানত গ্রহণ: ব্যাঙ্কগুলি জনগণের কাছ থেকে তাদের অতিরিক্ত অর্থ আমানত হিসেবে গ্রহণ করে। এই আমানতের উপর ব্যাঙ্ক আমানতকারীদের একটি নির্দিষ্ট হারে সুদ দেয়।
  2. নগদ সংরক্ষণ: ব্যাঙ্কগুলি তাদের কাছে জমা হওয়া সমস্ত টাকা ঋণ হিসেবে দিয়ে দেয় না। তারা আমানতের একটি ছোট অংশ (যেমন, ভারতে প্রায় ১৫%) নগদ হিসেবে নিজেদের কাছে রাখে। এটি করা হয় কারণ কোনো দিনে আমানতকারীরা টাকা তুলতে এলে তাদের যেন খালি হাতে ফিরতে না হয়।
  3. ঋণ প্রদান: নগদ সংরক্ষণের পর যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাঙ্কের কাছে থাকে, তা তারা ঋণ হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেয়। ঋণগ্রহীতারা এই টাকা বাড়ি তৈরি, গাড়ি কেনা, ব্যবসা বাড়ানো, পড়াশোনা ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে।
  4. আয় উপার্জন: ব্যাঙ্কগুলি ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে আমানতকারীদের দেওয়া সুদের হারের চেয়ে বেশি হারে সুদ আদায় করে। এই দুই সুদের হারের মধ্যে যে পার্থক্য, সেটিই হলো ব্যাঙ্কের আয়ের প্রধান উৎস। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাঙ্ক যদি আমানতের উপর ৪% সুদ দেয় এবং ঋণের উপর ১০% সুদ নেয়, তাহলে মাঝের ৬% হলো ব্যাঙ্কের আয় বা 'স্প্রেড' (spread)।

এইভাবে, ব্যাঙ্কগুলি একদিকে যেমন মানুষের সঞ্চয়কে সুরক্ষিত রাখে, তেমনই অন্যদিকে যাদের অর্থের প্রয়োজন, তাদের ঋণের যোগান দিয়ে অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে গতিশীল রাখে।

ঋণের দুটি ভিন্ন পরিস্থিতি (Two Different Credit Situations)

ঋণ বা ক্রেডিট কি সবসময় ভালো? এটি কি সবসময় মানুষের আয় বাড়াতে সাহায্য করে? উত্তরটি হলো, পরিস্থিতি অনুযায়ী ঋণ উপকারী বা ক্ষতিকর উভয়ই হতে পারে। আসুন দুটি ভিন্ন পরিস্থিতির মাধ্যমে বিষয়টি বুঝি।

পরিস্থিতি ১: ঋণের ইতিবাচক ভূমিকা (উৎসবের মরসুম)

ধরা যাক, একজন জুতো প্রস্তুতকারক উৎসবের মরসুমের আগে শহর থেকে ৩,০০০ জোড়া জুতো তৈরির একটি বড় অর্ডার পেলেন। এই অর্ডারটি সম্পন্ন করার জন্য তার কাঁচামাল (চামড়া) কিনতে হবে এবং অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে। এর জন্য তার কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন। তিনি দুটি উৎস থেকে ঋণ নিলেন - চামড়া ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ধারে চামড়া নিলেন (পরে টাকা দেবেন) এবং অগ্রিম হিসেবে ১,০০০ জোড়া জুতোর টাকা নিলেন। মাসের শেষে তিনি অর্ডারটি সরবরাহ করতে পারলেন, ভালো লাভ করলেন এবং সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে দিলেন।

এই ক্ষেত্রে, ঋণ তাকে সময়মতো উৎপাদন সম্পন্ন করতে সাহায্য করেছে এবং তার আয় বাড়িয়েছে। এখানে ঋণ একটি ইতিবাচক এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

পরিস্থিতি ২: ঋণের নেতিবাচক ভূমিকা (ঋণ ফাঁদ)

এবার একজন ছোট কৃষকের কথা ভাবা যাক। তিনি তার জমিতে চাষ করার জন্য একজন মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিলেন। তিনি আশা করেছিলেন যে ফসল ভালো হলে তিনি ঋণ শোধ করে দেবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, পোকামাকড়ের আক্রমণে তার সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে গেল। ফলে তিনি ঋণ শোধ করতে পারলেন না। পরবর্তী বছরে, তাকে আবার চাষের জন্য নতুন করে ঋণ নিতে হলো, কিন্তু আগের ঋণটিও বকেয়া রয়ে গেল এবং তার উপর সুদ বাড়তে থাকল। একসময় ঋণের বোঝা এতটাই বেড়ে গেল যে, তাকে ঋণ পরিশোধ করার জন্য তার জমির একটি অংশ বিক্রি করে দিতে হলো।

এই পরিস্থিতিতে, ঋণ কৃষককে সাহায্য করার পরিবর্তে তাকে আরও গভীর সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। এই অবস্থাকেই ঋণ ফাঁদ (Debt Trap) বলা হয়। ঋণগ্রহীতা এমন একটি অবস্থায় পড়েন যেখান থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন হয়ে যায়। তার পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হয়ে যায়। ঋণ উপকারী হবে কি না, তা নির্ভর করে ঝুঁকির মাত্রা এবং লোকসান হলে সহায়তার ব্যবস্থার উপর।

ঋণের শর্তাবলী (Terms of Credit)

যখন আমরা কোনো ব্যাঙ্ক বা প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিই, তখন কিছু নির্দিষ্ট শর্তাবলী মেনে চলতে হয়। এই শর্তাবলীকে সম্মিলিতভাবে 'ঋণের শর্তাবলী' (Terms of Credit) বলা হয়। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:

  • সুদের হার (Interest Rate): ঋণগ্রহীতাকে মূলধনের (principal) সাথে অতিরিক্ত যে অর্থ প্রদান করতে হয়, তাকে সুদ বলে। এটি সাধারণত শতাংশে প্রকাশ করা হয়। এটিই ঋণ নেওয়ার প্রধান খরচ।
  • জামানত (Collateral): জামানত হলো এমন একটি সম্পদ (যেমন জমি, বাড়ি, গাড়ি, গবাদি পশু, ব্যাঙ্কে জমানো টাকা) যা ঋণগ্রহীতার মালিকানাধীন এবং ঋণ পরিশোধের গ্যারান্টি হিসেবে ঋণদাতার কাছে বন্ধক রাখা হয়। যদি ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে ঋণদাতার সেই সম্পদ বিক্রি করে তার অর্থ উসুল করার অধিকার থাকে। জামানতের কারণেই ব্যাঙ্ক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ঋণ দিতে সুরক্ষিত বোধ করে।
  • প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (Documentation Required): ঋণ নেওয়ার জন্য পরিচয়পত্র, ঠিকানার প্রমাণ, আয়ের প্রমাণপত্র ইত্যাদি বিভিন্ন কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়।
  • পরিশোধের পদ্ধতি (Mode of Repayment): ঋণটি কীভাবে পরিশোধ করা হবে (যেমন মাসিক কিস্তিতে বা এককালীন) এবং কত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে, তা আগে থেকেই নির্দিষ্ট করা থাকে।

এই শর্তাবলী বিভিন্ন ঋণদাতা এবং বিভিন্ন ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে।

ভারতে ঋণের বিভিন্ন উৎস (Sources of Credit in India)

ভারতে ঋণের উৎসগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের ঋণ (Formal Sector Loans):

  • উৎস: বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক এবং সমবায় সমিতি (cooperatives)।
  • বৈশিষ্ট্য:
  • এই ক্ষেত্রটি ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও তত্ত্বাবধান করা হয়। RBI নিশ্চিত করে যে ব্যাঙ্কগুলি শুধুমাত্র লাভজনক ব্যবসায়ী নয়, বরং ছোট কৃষক, ছোট শিল্প ইত্যাদিকেও ঋণ দেয়।
  • সুদের হার সাধারণত কম এবং নির্দিষ্ট থাকে।
  • ঋণের শর্তাবলী স্বচ্ছ এবং আইনসম্মত হয়।
  • এর মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র মুনাফা অর্জন নয়, সামাজিক কল্যাণও।

২. অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের ঋণ (Informal Sector Loans):

  • উৎস: মহাজন, ব্যবসায়ী, নিয়োগকর্তা, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব।
  • বৈশিষ্ট্য:
  • এই ক্ষেত্রটিকে নিয়ন্ত্রণ বা তত্ত্বাবধান করার জন্য কোনো সংস্থা নেই।
  • ঋণদাতারা তাদের ইচ্ছামতো সুদের হার নির্ধারণ করতে পারে, যা সাধারণত অনেক বেশি হয়।
  • ঋণ আদায়ের জন্য তারা অনেক সময় অন্যায় পথ অবলম্বন করে।
  • উচ্চ সুদের হারের কারণে ঋণগ্রহীতার আয় প্রায়শই ঋণ পরিশোধেই চলে যায়, যা তাদের ঋণ ফাঁদে ফেলে দেয়।

শহরের দরিদ্র পরিবারগুলির তুলনায় গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলি অনানুষ্ঠানিক উৎসের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তাই, দেশের উন্নয়নের জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি যে ব্যাঙ্ক এবং সমবায়ের মতো আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের ঋণ ব্যবস্থা গ্রামীণ এলাকায় আরও প্রসারিত হোক। সস্তা এবং সহজলভ্য ঋণ দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

দরিদ্রদের জন্য স্বনির্ভর গোষ্ঠী (Self-Help Groups for the Poor)

দরিদ্র মানুষদের, বিশেষ করে গ্রামীণ মহিলাদের, আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্র থেকে ঋণ পেতে একটি বড় বাধা হলো জামানতের অভাব। এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি নতুন ধারণা হলো স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা Self-Help Group (SHG)

স্বনির্ভর গোষ্ঠী কীভাবে কাজ করে?

  1. সংগঠন গঠন: সাধারণত ১৫-২০ জন সদস্য, যারা প্রতিবেশী এবং বেশিরভাগই মহিলা, একত্রিত হয়ে একটি গোষ্ঠী তৈরি করেন।
  2. নিয়মিত সঞ্চয়: সদস্যরা নিয়মিতভাবে (সাপ্তাহিক বা মাসিক) অল্প পরিমাণে টাকা সঞ্চয় করেন। সঞ্চয়ের পরিমাণ সদস্যদের সামর্থ্য অনুযায়ী ২৫ টাকা থেকে ১০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে।
  3. অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রদান: এই সঞ্চিত অর্থ থেকে গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রয়োজনে ছোটখাটো ঋণ নিতে পারেন। এই ঋণের উপর সুদ নেওয়া হয়, তবে তা মহাজনদের সুদের হারের চেয়ে অনেক কম থাকে।
  4. ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ: যদি কোনো গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে এক বা দুই বছর সঞ্চয় করে, তবে তারা ব্যাঙ্কের কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠে। ব্যাঙ্ক গোষ্ঠীর নামে ঋণ মঞ্জুর করে। এই ঋণটি গোষ্ঠীর সদস্যদের জন্য ছোট ছোট কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে (যেমন সেলাই মেশিন কেনা, গবাদি পশু পালন, ছোট দোকান খোলা) ব্যবহৃত হয়।
  5. যৌথ দায়বদ্ধতা: ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব গোষ্ঠীর সমস্ত সদস্যের উপর সম্মিলিতভাবে বর্তায়। যদি কোনো একজন সদস্য ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তবে গোষ্ঠীর অন্য সদস্যরা বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখেন। এই সম্মিলিত দায়বদ্ধতার কারণেই ব্যাঙ্কগুলি জামানত ছাড়াই SHG-কে ঋণ দিতে ইচ্ছুক হয়।

SHG গুলি শুধুমাত্র আর্থিক সমস্যাই সমাধান করে না, এটি দরিদ্র মহিলাদের একটি সামাজিক মঞ্চও প্রদান করে। এখানে তারা স্বাস্থ্য, পুষ্টি, গার্হস্থ্য হিংসা ইত্যাদি বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে এবং একসাথে কাজ করতে পারে। এটি মহিলাদের ক্ষমতায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: কেন আধুনিক মুদ্রা (কারেন্সি) তার নিজস্ব কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য না থাকা সত্ত্বেও বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয়?

উত্তর: আধুনিক মুদ্রা তার নিজস্ব কোনো মূল্য (যেমন সোনা বা রুপার মুদ্রার মতো) ছাড়াই বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয় কারণ এটি দেশের সরকার দ্বারা অনুমোদিত। ভারতে, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) এই মুদ্রা জারি করে এবং দেশের আইন অনুযায়ী কোনো লেনদেনে এটিকে গ্রহণ করতে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। সরকারের এই অনুমোদন বা আদেশের কারণেই এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, যা এটিকে 'ফিয়াট মানি' হিসেবে পরিচিত করেছে।

প্রশ্ন ২: জামানত (Collateral) কী এবং ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাঙ্ক বা ঋণদাতারা কেন এটি চায়?

উত্তর: জামানত হলো এমন একটি সম্পদ (যেমন জমি, বাড়ি, গাড়ি) যা ঋণগ্রহীতার মালিকানাধীন এবং যা ঋণ পরিশোধের গ্যারান্টি হিসেবে ঋণদাতার কাছে বন্ধক রাখা হয়। যদি ঋণগ্রহীতা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে ঋণদাতার আইনগত অধিকার থাকে সেই সম্পদ বিক্রি করে তার অর্থ পুনরুদ্ধার করার। ঋণদাতারা জামানত চায় কারণ এটি তাদের ঋণের টাকা ফেরত পাওয়ার একটি নিশ্চয়তা প্রদান করে এবং ঋণের ঝুঁকি কমায়।

প্রশ্ন ৩: আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক ঋণের উৎসের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি কী কী?

উত্তর: আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক ঋণের উৎসের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:

  • নিয়ন্ত্রণ: আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্র (ব্যাঙ্ক, সমবায়) ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, কিন্তু অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্র (মহাজন, বন্ধু) কোনো সংস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না।
  • সুদের হার: আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সুদের হার সাধারণত কম এবং নির্দিষ্ট থাকে। অন্যদিকে, অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সুদের হার অনেক বেশি এবং পরিবর্তনশীল হতে পারে।
  • উদ্দেশ্য: আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র মুনাফা অর্জন নয়, সামাজিক কল্যাণও বটে। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতাদের মূল উদ্দেশ্য হলো সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা।
  • ঝুঁকি: অনানুষ্ঠানিক ঋণ প্রায়শই ঋণগ্রহীতাকে ঋণ ফাঁদে ফেলে দেয়, যা আনুষ্ঠানিক ঋণের ক্ষেত্রে কম হয়।

সারসংক্ষেপ

আসুন, এই অধ্যায়ের মূল বিষয়গুলি একবার মনে করে নিই:

  • মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং পণ্য বিনিময় প্রথার 'চাহিদার দ্বিমুখী সংযোগের অভাব' জনিত সমস্যা দূর করে।
  • আধুনিক মুদ্রার দুটি প্রধান রূপ হলো কারেন্সি (নোট ও কয়েন) এবং ব্যাঙ্কে রাখা চাহিদা আমানত (Demand Deposits)।
  • ব্যাঙ্কগুলি আমানতকারী এবং ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। তারা আমানতের উপর দেওয়া সুদের চেয়ে ঋণের উপর বেশি সুদ নিয়ে আয় করে।
  • ঋণ পরিস্থিতি অনুযায়ী উপকারী বা ক্ষতিকর উভয়ই হতে পারে। এটি যেমন আয় বাড়াতে পারে, তেমনই ঋণগ্রহীতাকে ঋণ ফাঁদেও ফেলতে পারে।
  • ঋণের উৎস প্রধানত দুই প্রকার: আনুষ্ঠানিক (ব্যাঙ্ক, সমবায়) এবং অনানুষ্ঠানিক (মহাজন, ব্যবসায়ী)। আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের ঋণ বেশি নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী।
  • স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHG) দরিদ্রদের, বিশেষ করে মহিলাদের, জামানতের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে এবং সহজে ঋণ পেতে সাহায্য করে, যা তাদের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।