বিষয়ের ভূমিকা
কৃষি আমাদের জীবনের এক অপরিহার্য অঙ্গ। আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, যে পোশাক পরি বা যে শিল্পজাত পণ্য ব্যবহার করি, তার সিংহভাগই আসে কৃষি থেকে। অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পাঠ্যবইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে 'কৃষি' (Agriculture) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে জমি চাষ করা হয়, কেন বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরণের ফসল জন্মায় এবং আধুনিক বিশ্বে কৃষির গুরুত্ব কতখানি। মূলত, কৃষি একটি প্রাথমিক ক্রিয়াকলাপ যা প্রকৃতি থেকে সরাসরি সম্পদ আহরণের সাথে যুক্ত। ভারতের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশে এই বিষয়টি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এদেশের জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের প্রকারভেদ
মানুষ তাদের জীবনধারণের জন্য বিভিন্ন ধরণের কাজে নিযুক্ত থাকে। এই কাজগুলোকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- প্রাথমিক ক্রিয়াকলাপ (Primary Activities): প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও উৎপাদনের সাথে যুক্ত কাজ। যেমন: কৃষি, মাছ ধরা, পশুপালন ও খনিজ উত্তোলন।
- গৌণ ক্রিয়াকলাপ (Secondary Activities): প্রাকৃতিক সম্পদকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা। যেমন: ইস্পাত উৎপাদন, কাপড় বোনা বা খাবার প্রক্রিয়াকরণ।
- প্রগৌণ বা তৃতীয় স্তরের ক্রিয়াকলাপ (Tertiary Activities): প্রাথমিক ও গৌণ ক্ষেত্রকে সহায়তা প্রদান করা। যেমন: পরিবহন, বাণিজ্য, ব্যাংকিং, বিমা এবং বিজ্ঞাপন।
২. কৃষি একটি খামার ব্যবস্থা
কৃষিকে একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা বা 'System' হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই ব্যবস্থায় তিনটি প্রধান পর্যায় রয়েছে:
- নিবেশ (Inputs): বীজ, সার, যন্ত্রপাতি, শ্রম এবং জলসেচ।
- প্রক্রিয়া (Processes): জমি চাষ, বীজ বপন, আগাছা দমন, জলসেচ এবং ফসল কাটা।
- নির্গম বা ফলন (Outputs): এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত ফল হলো শস্য, পশম, দুগ্ধজাত পণ্য বা পোল্ট্রি পণ্য।
৩. কৃষির ধরণ
ভৌগোলিক অবস্থা, চাহিদার ধরণ, শ্রম এবং প্রযুক্তির স্তরের ওপর ভিত্তি করে কৃষিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
(ক) জীবনধারণ ভিত্তিক কৃষি (Subsistence Farming)
এই ধরণের কৃষিতে কৃষক মূলত নিজের পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য চাষ করেন। এটি আবার দুই প্রকার:
- নিবিড় জীবনধারণ ভিত্তিক কৃষি: ছোট জমিতে সাধারণ যন্ত্রপাতি ও বেশি শ্রম ব্যবহার করে চাষ করা হয়। ধান এখানকার প্রধান ফসল। এটি মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে দেখা যায়।
- আদিম জীবনধারণ ভিত্তিক কৃষি: এর মধ্যে পড়ে 'যাযাবর পশুপালন' এবং 'স্থানান্তরিত কৃষি' (Shifting Cultivation)। স্থানান্তরিত কৃষিতে বনের একটি অংশ পুড়িয়ে চাষ করা হয় এবং মাটির উর্বরতা কমলে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া হয়। একে 'ঝুম চাষ'ও বলা হয়।
(খ) বাণিজ্যিক কৃষি (Commercial Farming)
যখন ফসল উৎপাদন এবং পশুপালন মূলত বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে করা হয়, তখন তাকে বাণিজ্যিক কৃষি বলে। এতে প্রচুর মূলধন ও আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়।
- বাণিজ্যিক শস্য চাষ: যেমন গম বা ভুট্টা চাষ। আমেরিকা বা ইউরোপের বিশাল প্রান্তরে এটি দেখা যায়।
- মিশ্র কৃষি: এখানে একই জমিতে খাদ্যশস্য চাষের পাশাপাশি পশুপালনও করা হয়।
- বাগিচা কৃষি (Plantation): চা, কফি, রাবার, কাজু বা কলার মতো কোনো একটি নির্দিষ্ট ফসলের বিশাল বাগান তৈরি করে চাষ করা।
৪. প্রধান শস্যসমূহ
বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটানোর জন্য বিভিন্ন ধরণের ফসল চাষ করা হয়। যেমন:
- ধান: এটি বিশ্বের প্রধান খাদ্যশস্য। উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু এবং পলিমাটি ধানের জন্য আদর্শ। চীন ও ভারত ধান উৎপাদনে শীর্ষে।
- গম: নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু এবং জলনিকাশি ব্যবস্থা ভালো এমন দোআঁশ মাটিতে গম ভালো হয়।
- মিলেট (Millets): জোয়ার, বাজরা ও রাগি—এগুলো কম বৃষ্টিপাত ও কম উর্বর মাটিতেও জন্মায়।
- তুলা ও পাট: এগুলো হলো তন্তু ফসল। পাটকে 'সোনালী তন্তু' বলা হয়।
- পানীয় ফসল: চা এবং কফি বিশ্বের জনপ্রিয় পানীয়। ভারতের অসম ও পশ্চিমবঙ্গ (দার্জিলিং) চা উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: স্থানান্তরিত কৃষি বা ঝুম চাষের একটি বড় অসুবিধা কী?
উত্তর: স্থানান্তরিত কৃষির ফলে ব্যাপক হারে বনভূমি ধ্বংস হয় এবং মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
প্রশ্ন ২: বাণিজ্যিক কৃষি এবং জীবনধারণ ভিত্তিক কৃষির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: জীবনধারণ ভিত্তিক কৃষিতে চাষ করা হয় নিজের পরিবারের প্রয়োজনে, যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার কম। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক কৃষিতে বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে বিশাল জমিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রচুর মূলধন ব্যবহার করে চাষ করা হয়।
প্রশ্ন ৩: 'সোনালী তন্তু' কাকে বলা হয় এবং কেন?
উত্তর: পাটকে 'সোনালী তন্তু' বলা হয়। কারণ এর রঙ সোনালী এবং এটি অত্যন্ত মূল্যবান তন্তু ফসল যা দড়ি, চট ও ব্যাগ তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
সারসংক্ষেপ
- কৃষি একটি প্রাথমিক অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ।
- কৃষি ব্যবস্থা নিবেশ, প্রক্রিয়া এবং ফলনের সমন্বয়ে গঠিত।
- ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে কৃষির বিভিন্ন ধরণ (যেমন—নিবিড়, বাণিজ্যিক, বাগিচা) দেখা যায়।
- ধান, গম, তুলা, চা ও কফি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফসল।
- আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও উন্নত বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়ন সম্ভব, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।