বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশে এমন বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীব বাস করে যা খালি চোখে দেখা যায় না। তাদের দেখার জন্য অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন হয়। এই ক্ষুদ্র জীবদের আমরা অণুজীব বা মাইক্রোবস (Microorganisms) বলে থাকি। এনসিইআরটি (NCERT) অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে এই অণুজীবদের আমাদের জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিছু অণুজীব আমাদের অত্যন্ত উপকারী বন্ধু, আবার কিছু অণুজীব মারাত্মক ক্ষতিকর শত্রু। এই অধ্যায়ে আমরা বিস্তারিত জানবো কীভাবে এই অদৃশ্য জীবেরা আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
অণুজীবদের প্রধানত চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: ব্যাকটেরিয়া (Bacteria), ছত্রাক (Fungi), প্রোটোজোয়া (Protozoa) এবং কিছু শৈবাল (Algae)। এছাড়া ভাইরাস (Virus) নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলাদা মত থাকলেও তাদেরও অণুজীব হিসেবেই গণ্য করা হয়, যদিও তারা কেবল পোষক দেহের ভেতরেই বংশবিস্তার করতে পারে। নিচে এদের বিশদ আলোচনা করা হলো:
১. উপকারী অণুজীব বা আমাদের বন্ধু
সব অণুজীব যে আমাদের ক্ষতি করে তা নয়। বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহু কাজে এদের অবদান অনস্বীকার্য:
- দই ও পাউরুটি তৈরি: ল্যাকটোব্যাসিলাস নামক ব্যাকটেরিয়া দুধকে দইয়ে পরিণত করে। এছাড়া ইস্ট (Yeast) নামক ছত্রাক পাউরুটি ও কেক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি অবাত শ্বসনের মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন করে কেক ফোলাতে সাহায্য করে।
- বাণিজ্যিক ব্যবহার: অ্যালকোহল, ওয়াইন এবং এসিটিক অ্যাসিড (ভিনেগার) উৎপাদনে ইস্ট ব্যবহার করা হয়।
- চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবদান: ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক থেকে অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotic) তৈরি হয়, যেমন পেনিসিলিন। এটি রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে।
- মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি: রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া এবং কিছু নীল-সবুজ শৈবাল বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সংবদ্ধ করে মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়ায়, যা উদ্ভিদের পুষ্টিতে সাহায্য করে।
- পরিবেশ পরিষ্কার রাখা: মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহ পচিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অণুজীবেরা প্রাকৃতির ঝাড়ুদার হিসেবে কাজ করে।
২. ক্ষতিকর অণুজীব বা আমাদের শত্রু
কিছু অণুজীব মানবদেহ, অন্যান্য প্রাণী এবং উদ্ভিদে নানা রোগ সৃষ্টি করে। এদের প্যাথোজেন (Pathogen) বা রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব বলা হয়।
- মানবদেহের রোগ: হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের কারণে সাধারণ সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়। এছাড়া কলেরা, টাইফয়েড, যক্ষ্মা (TB) ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এবং ম্যালেরিয়া প্রোটোজোয়া দ্বারা হয়ে থাকে।
- উদ্ভিদের রোগ: লেবুর ক্যাঙ্কার, গমের মরচে রোগ এবং ভিন্ডি বা ঢেঁড়সের পীত রোগ বিভিন্ন অণুজীবের কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে।
- খাদ্য বিষাক্তকরণ (Food Poisoning): ক্ষতিকর অণুজীব খাদ্যের ওপর বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্ন করে খাদ্য নষ্ট করে, যা খেলে মানুষ গুরুতর অসুস্থ হতে পারে।
- খাদ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি: খাবার নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে আমরা রাসায়নিক সংরক্ষণকারী (লবণ, চিনি, তেল, ভিনেগার), তাপ ও শীতলীকরণ (পেশুরাইজেশন) পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকি।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ল্যাকটোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়া কী কাজ করে?
উত্তর: ল্যাকটোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়া দুধের মধ্যে বংশবৃদ্ধি করে এবং দুধকে দইয়ে রূপান্তরিত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
প্রশ্ন ২: অ্যান্টিবায়োটিক কী এবং এর কাজ কী?
উত্তর: অ্যান্টিবায়োটিক হলো এমন ওষুধ যা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীবদের মেরে ফেলে বা তাদের বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। যেমন—পেনিসিলিন ও স্ট্রেপটোমাইসিন। তবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়।
প্রশ্ন ৩: সংক্রামক রোগ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: যে সমস্ত রোগ একজন আক্রান্ত রোগীর শরীর থেকে সুস্থ মানুষের দেহে বাতাস, জল, খাদ্য বা শারীরিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তাদের সংক্রামক রোগ (Communicable diseases) বলে। যেমন—কলেরা, যক্ষ্মা, চিকেনপক্স ইত্যাদি।
সারসংক্ষেপ
অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের এই অধ্যায় থেকে আমরা শিখলাম যে অণুজীবেরা আমাদের পৃথিবীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এরা একদিকে যেমন দই, পাউরুটি, ওষুধ তৈরি ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে আমাদের পরম বন্ধু হয়ে ওঠে, অন্যদিকে তেমনি বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে এবং খাদ্য নষ্ট করে আমাদের মারাত্মক ক্ষতিও করে। তাই অণুজীব সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং খাদ্য সংরক্ষণ করা আমাদের সকলের জন্যই অত্যন্ত জরুরি।