বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের চারপাশে অজস্র পদার্থ রয়েছে। এই পর্যন্ত আবিষ্কৃত মৌলের সংখ্যা ১১৮টিরও বেশি। এত বিপুল সংখ্যক মৌল এবং তাদের যৌগগুলির ধর্ম আলাদাভাবে মনে রাখা বা তাদের নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। এই সমস্যার সমাধান করার জন্য বিজ্ঞানবিদেরা মৌলগুলিকে তাদের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শ্রেণীবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে বিভিন্ন বিজ্ঞানী মৌলগুলিকে একটি সুশৃঙ্খল ছকে সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং বর্তমানে আমরা যে আধুনিক পর্যায় সারণি (Modern Periodic Table) ব্যবহার করি তা কীভাবে গঠিত হয়েছে। এটি রসায়ন বিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

মৌলের শ্রেণীবিন্যাসের ইতিহাস এবং বর্তমান রূপটি বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটি প্রধান ধাপ বা তত্ত্বের উপর নজর দিতে হবে:

  • ডয়োবার্নারের ত্রয়ী সূত্র (Dobereiner's Triads): জার্মান রসায়নবিদ উলফগ্যাং ডয়োবার্নর প্রথম মৌলগুলিকে ধর্মের ভিত্তিতে সাজানোর চেষ্টা করেন। তিনি সমধর্মী তিনটি মৌলকে তাদের পারমাণবিক ভরের ঊর্ধ্বক্রমানুসারে সাজিয়ে দেখেন যে, প্রথম ও তৃতীয় মৌলের পারমাণবিক ভরের গড় মান মাঝের মৌলটির পারমাণবিক ভরের প্রায় সমান হয়। একে ত্রয়ী সূত্র বলে। উদাহরণস্বরূপ— লিথিয়াম (Li), সোডিয়াম (Na) এবং পটাশিয়াম (K)।
  • নিউল্যান্ডের অষ্টক সূত্র (Newlands' Law of Octaves): জন আলেকজান্ডার নিউল্যান্ডস মৌলগুলিকে তাদের পারমাণবিক ভরের ঊর্ধ্বক্রমে সাজিয়ে দেখেন যে, যেকোনো মৌল থেকে শুরু করলে অষ্টম মৌলের ধর্ম প্রথম মৌলের ধর্মের সাথে হুবহু মিল থাকে। তিনি একে সঙ্গীতের সাতটি সুরের (সা রে গা মা পা ধা নি) সাথে তুলনা করেছিলেন। তবে এই নিয়মটি কেবল হালকা মৌলগুলির (ক্যালসিয়াম পর্যন্ত) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।
  • মেন্ডেলিভের পর্যায় সারণি (Mendeleev's Periodic Table): রুশ রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্ডেলিভ মৌলগুলির শ্রেণীবিন্যাসে সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন। তাঁর পর্যায় সূত্রের মূল কথা ছিল— মৌলগুলির ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মগুলি তাদের পারমাণবিক ভরের পর্যায়গত ধর্ম। তিনি সেসময় আবিষ্কৃত সমস্ত মৌলকে একটি সারণিতে সাজান এবং ভবিষ্যতের কিছু অজানা মৌলের জন্য জায়গা খালি রেখে গিয়েছিলেন।
  • আধুনিক পর্যায় সারণি (Modern Periodic Table): ১৯১৩ সালে হেনরি মোসলে প্রমাণ করেন যে, মৌলের পারমাণবিক ভরের চেয়ে তার পারমাণবিক সংখ্যা বা প্রোটন সংখ্যা (Atomic Number) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তাই আধুনিক পর্যায় সূত্র অনুসারে— মৌলগুলির ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মগুলি তাদের পারমাণবিক সংখ্যার পর্যায়গত ধর্ম। আধুনিক পর্যায় সারণিতে ৭টি অনুভূমিক সারি বা পর্যায় (Periods) এবং ১৮টি উল্লম্ব স্তম্ভ বা শ্রেণী (Groups) রয়েছে।
  • পর্যায় সারণিতে ধর্মের পরিবর্তন (Trends in Periodic Table): সারণিতে বাম থেকে ডানে গেলে এবং ওপর থেকে নিচে নামলে মৌলগুলির কিছু ধর্মে নির্দিষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন— পরমাণুর আকার, ধাতব ও অধাতব ধর্ম, তড়িৎ ঋণাত্মকতা ইত্যাদি। সারণির বাঁদিকে ধাতু এবং ডানদিকে অধাতু ও নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলি অবস্থান করে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: মেন্ডেলিভের পর্যায় সূত্রটি কী?
উত্তর: মেন্ডেলিভের পর্যায় সূত্র অনুযায়ী, মৌলগুলির ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মগুলি তাদের পারমাণবিক ভরের ওপর নির্ভর করে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ, মৌলগুলিকে পারমাণবিক ভরের ঊর্ধ্বক্রমানুসারে সাজালে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর একই ধর্মের মৌলের পুনরাবৃত্তি ঘটে।

প্রশ্ন ২: আধুনিক পর্যায় সারণিতে কয়টি পর্যায় এবং শ্রেণী আছে?
উত্তর: আধুনিক পর্যায় সারণিতে ৭টি অনুভূমিক সারি বা পর্যায় এবং ১৮টি উল্লম্ব স্তম্ভ বা শ্রেণী রয়েছে।

প্রশ্ন ৩: নিউল্যান্ডের অষ্টক সূত্রের সীমাবদ্ধতা কী ছিল?
উত্তর: নিউল্যান্ডের অষ্টক সূত্র শুধুমাত্র ক্যালসিয়াম পর্যন্ত হালকা মৌলগুলির ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল। ক্যালসিয়ামের পর এই নিয়ম আর খাটত না। তাছাড়া তিনি বিশ্বাস করেছিলেন ভবিষ্যতে আর নতুন কোনো মৌল আবিষ্কৃত হবে না, যা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়ে আমরা যা শিখলাম:

  • বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে মৌলগুলিকে সাজানোর জন্য ডয়োবার্নারের ত্রয়ী, নিউল্যান্ডের অষ্টক এবং মেন্ডেলিভের সারণি তৈরি করেছিলেন।
  • মেন্ডেলিভ পারমাণবিক ভরকে ভিত্তি করলেও আধুনিক পর্যায় সারণি পারমাণবিক সংখ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
  • আধুনিক পর্যায় সারণিতে ৭টি পর্যায় এবং ১৮টি শ্রেণী রয়েছে।
  • পর্যায় সারণি আমাদের রসায়ন অধ্যয়নকে অত্যন্ত সহজ ও শৃঙ্খলিত করেছে।