বিষয়ের ভূমিকা
অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় 'বাণিজ্য থেকে সাম্রাজ্য: কোম্পানির ক্ষমতা স্থাপন' ভারতীয় ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে আমরা জানতে পারি কীভাবে একটি সাধারণ বনিক দল অর্থাৎ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে বাণিজ্য করতে এসে ধীরে ধীরে সমগ্র দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং ভারতের শাসক হয়ে ওঠে। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশরা কীভাবে ধাপে ধাপে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল, তা এই অধ্যায়ের মূল আলোচনার বিষয়। বাংলা জয়ের মধ্য দিয়ে এই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূচনা হয়েছিল। এই অধ্যায়টি পড়লে ছাত্রছাত্রীরা বুঝতে পারবে কীভাবে অর্থনৈতিক স্বার্থ রাজনৈতিক আধিপত্যে রূপান্তরিত হয়েছিল।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
এই অধ্যায়ের মূল ধারণাগুলিকে স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
১. মুঘল ক্ষমতার অবক্ষয় এবং আঞ্চলিক শক্তির উত্থান
ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। দিল্লির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আঞ্চলিক শক্তিগুলি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাংলা, হায়দ্রাবাদ, অযোধ্যা এবং মহীশূরের মতো রাজ্যগুলি নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ইউরোপীয় বনিকরা ভারতের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পায়।
২. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলায় আগমন ও বাণিজ্য
১৬০০ সালে ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পূর্ব দিকের সঙ্গে বাণিজ্য করার একাধিকার বা চার্টার প্রদান করেন। ১৬৫১ সালে বাংলার হুগলি নদীর তীরে কোম্পানির প্রথম কারখানা বা কুঠি স্থাপিত হয়। কোম্পানি বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার পেলেও, তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা করা কর্মচারীরা শুল্ক দিতে অস্বীকার করতেন, যার ফলে বাংলার নবাবদের সঙ্গে কোম্পানির বিরোধ শুরু হয়।
৩. পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭)
বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে কোম্পানির বিরোধ চরমে পৌঁছায়। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন নদীলার পলাশীর আমবাগানে সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের মধ্যে যুদ্ধ হয়। নবাবের সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। এটি ছিল ভারতে ব্রিটিশদের প্রথম বড় রাজনৈতিক বিজয়, যা তাদের ভারতের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের পথ প্রশস্ত করে।
৪. বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) এবং দেওয়ানি লাভ
পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফরকে নবাব করা হলেও প্রকৃত ক্ষমতা ব্রিটিশদের হাতেই ছিল। এরপর মীর কাশিম কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বাংলার নবাব, অবধের নবাব এবং মুঘল সম্রাট শাহ আলম যৌথভাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েও পরাজিত হন। ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট ব্রিটিশ কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায় করার অধিকার) প্রদান করেন। এর ফলে কোম্পানি বাংলার আর্থিক ক্ষমতার সম্পূর্ণ অধিকারী হয়।
৫. কোম্পানির সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি
সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি কোম্পানি নানা কূটকৌশল প্রয়োগ করে রাজ্য বিস্তার করে:
- সাহায্যকারী জোট নীতি (Subsidiary Alliance): লর্ড ওয়েলেসলি এই নীতি প্রবর্তন করেন। এর মাধ্যমে ভারতীয় রাজারা নিজেদের খরচে ইংরেজ সেনা রাখতে বাধ্য হতেন এবং কোম্পানির অনুমতি ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারতেন না।
- ডালহৌসির সত্যবিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse): লর্ড ডালহৌসি ঘোষণা করেন যে কোনো ভারতীয় শাসকের নিজস্ব পুত্রসন্তান না থাকলে তাঁর রাজ্য কোম্পানির অধিকারে চলে যাবে। ঝাঁসি, সাতারা ইত্যাদি রাজ্য এই নীতির শিকার হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কবে এবং কার কাছ থেকে দেওয়ানি লাভ করেছিল?
উত্তর: ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি প্রদান করেছিলেন। এর ফলে কোম্পানি ওই অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের পূর্ণ অধিকার লাভ করে।
প্রশ্ন ২: পলাশীর যুদ্ধ কবে এবং কাদের মধ্যে হয়েছিল?
উত্তর: ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের মধ্যে পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
প্রশ্ন ৩: সত্যবিলোপ নীতি কে প্রবর্তন করেন এবং এর মূল শর্ত কী ছিল?
উত্তর: সত্যবিলোপ নীতি প্রবর্তন করেন গভর্নর-জেনারেল লর্ড ডালহৌসি। এই নীতির মূল শর্ত ছিল যে কোনো রাজা অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে তাঁর দত্তক পুত্র রাজ্যের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না এবং সেই রাজ্য সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হবে।
সারসংক্ষেপ
- বাণিজ্য করতে আসা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভারতের শাসক হয়ে ওঠে।
- ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ এবং ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধ ব্রিটিশদের ভারতের ক্ষমতার শিখরে পৌঁছে দেয়।
- ১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে কোম্পানি ভারতের অর্থনীতি ও রাজস্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে।
- যুদ্ধের পাশাপাশি 'সাহায্যকারী জোট নীতি' এবং 'সত্যবিলোপ নীতি'র মাধ্যমে ব্রিটিশরা ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলিও দখল করে নেয়।