বিষয়ের ভূমিকা

১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই ফ্রান্সের প্যারিস শহরে এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটেছিল। সেদিন সকালে শহরের উত্তেজিত জনতা বাস্তিল (Bastille) নামক এক কুখ্যাত দুর্গ-কারাগার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। বাস্তিল ছিল ফরাসি রাজতন্ত্রের স্বৈরাচার ও অত্যাচারের প্রতীক। এই একটি ঘটনাই শুধু ফ্রান্স নয়, সমগ্র পৃথিবীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাধারায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দেয়। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব কীভাবে ফরাসি সমাজ তৎকালীন সময়ে বিভক্ত ছিল, কী কী কারণে এই মহান বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটেছিল এবং কীভাবে এটি আধুনিক পৃথিবীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

নবম শ্রেণির ইতিহাস সিলেবাসে এই অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন একটি শক্তিশালী এবং স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রকে উৎখাত করতে পারে। স্বাধীনতা, সমতা এবং ভ্রাতৃত্ব—আজকের আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বের এই তিনটি মূল মন্ত্রের জন্ম হয়েছিল এই ফরাসি বিপ্লবের গর্ভেই।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. আঠারো শতকের শেষের দিকে ফরাসি সমাজ

১৭৭৪ সালে বুঁরবো (Bourbon) রাজবংশের ষোড়শ লুই (Louis XVI) ফ্রান্সের সিংহাসনে আরোহণ করেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি অস্ট্রিয়ার রাজকুমারী মারি আঁতোয়ানেত (Marie Antoinette)-কে বিয়ে করেন। সিংহাসনে বসার পর তিনি এক শূন্য রাজকোষের মুখোমুখি হন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, রাজপ্রাসাদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা এবং আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ফ্রান্সের আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কারণে ফ্রান্সের ঋণ প্রায় ২ বিলিয়ন লিভ্রে (Livres - তৎকালীন ফরাসি মুদ্রা) ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

এই চরম আর্থিক সংকট মেটাতে সম্রাট কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তৎকালীন ফরাসি সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত বৈষম্যমূলক ছিল। ফরাসি সমাজ মূলত তিনটি 'এস্টেট' বা সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল:

  • প্রথম এস্টেট (First Estate): যাজক সম্প্রদায় (Clergy)। এরা গির্জার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং সমাজের সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন।
  • দ্বিতীয় এস্টেট (Second Estate): অভিজাত সম্প্রদায় (Nobles)। রাজকীয় প্রশাসনের বড় পদগুলো এদের দখলে থাকত।
  • তৃতীয় এস্টেট (Third Estate): ফরাসি সমাজের বাকি ৯৭ শতাংশ মানুষ ছিলেন এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত। এদের মধ্যে ছিলেন বড় ব্যবসায়ী, আইনজীবী, সরকারি কর্মচারী, কৃষক, কারিগর, ভূমিহীন মজুর এবং সাধারণ দরিদ্র শ্রমিকেরা।

বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা: প্রথম এবং দ্বিতীয় এস্টেটের মানুষদের কোনো কর দিতে হতো না। তারা সমস্ত কর প্রদান থেকে অব্যাহতি পেয়েছিল। সমস্ত করের বোঝা চাপানো হয়েছিল তৃতীয় এস্টেটের ওপর। সাধারণ মানুষকে প্রধানত দুটি কর দিতে হতো—

  • টাইদ (Tithe): এটি ছিল একটি ধর্মীয় কর, যা গির্জাকে দিতে হতো। এটি ছিল কৃষিজাত ফসলের এক-দশমাংশ (১/১০ ভাগ)।
  • তেইল (Taille): এটি ছিল রাষ্ট্রকে সরাসরি প্রদান করা একটি প্রত্যক্ষ কর। এ ছাড়াও তামাক, লবণ ইত্যাদি দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসের ওপরও পরোক্ষ কর ধার্য ছিল।

২. বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং জীবিকা সংকট

১৭১৫ সালে ফ্রান্সের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৩ মিলিয়ন (২ কোটি ৩০ লক্ষ), যা ১৭৮৯ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৮ মিলিয়নে (২ কোটি ৮০ লক্ষ)। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্যশস্যের চাহিদা হু হু করে বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই তুলনায় ফসলের উৎপাদন বাড়েনি। ফলে প্রধান খাদ্য 'রুটি' (Bread)-র দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।

অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মজুরি ছিল নির্দিষ্ট, যা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে তাল মেলাতে পারছিল না। এর ওপর যদি কখনো খরা বা শিলাবৃষ্টি হতো, তবে ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেত। এর ফলে ফ্রান্সে এক চরম 'জীবিকা সংকট' (Subsistence Crisis) দেখা দেয়, যা মানুষকে বিপ্লবের পথে পা বাড়াতে বাধ্য করে।

৩. মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান ও দার্শনিকদের প্রভাব

আঠারো শতকে তৃতীয় এস্টেটের মধ্যে একটি নতুন সামাজিক শ্রেণীর উত্থান ঘটে, যারা 'মধ্যবিত্ত শ্রেণী' (Middle Class) নামে পরিচিত। এদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, লেখক এবং রেশম ও পশম বস্ত্রের ব্যবসায়ীরা। তারা বিশ্বাস করতেন যে, সমাজে জন্মসূত্রে কেউ বিশেষ সুবিধা পাওয়া উচিত নয়; মানুষের যোগ্যতা অনুযায়ী তার সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হওয়া উচিত।

এই সময় ফরাসি দার্শনিকদের চিন্তাধারা সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। কয়েকজন বিশিষ্ট দার্শনিক এবং তাদের আদর্শ নিচে আলোচনা করা হলো:

  • জন লক (John Locke): তাঁর বিখ্যাত বই 'Two Treatises of Government'-এ তিনি রাজার ঐশ্বরিক ও পরম ক্ষমতার তত্ত্বকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন।
  • জিন জ্যাক রুসো (Jean Jacques Rousseau): তিনি তাঁর 'The Social Contract' গ্রন্থে প্রস্তাব করেন যে, সরকার হওয়া উচিত জনগণের সাথে একটি সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে গঠিত প্রতিষ্ঠান।
  • মন্তেস্কু (Montesquieu): তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'The Spirit of the Laws'-এ তিনি সরকারের শাসনবিভাগ, আইনবিভাগ এবং বিচারবিভাগের মধ্যে ক্ষমতা বিভাজনের (Separation of Powers) প্রস্তাব দেন। আমেরিকার সংবিধান এই মডেল অনুসরণ করেই তৈরি হয়েছিল।

প্যারিসের সেলুন, কফিহাউস এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে এই বিপ্লবী ধারণাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের প্রচলিত শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলে।

৪. বিপ্লবের সূচনা: বাস্তিল দুর্গের পতন

কর বৃদ্ধির প্রস্তাব পাস করার জন্য সম্রাট ষোড়শ লুই ১৭৮৯ সালের ৫ই মে 'এস্টেটস জেনারেল' (Estates-General) বা ফরাসি সংসদের একটি সভা ডাকেন। এর আগে ১৬১৪ সালে শেষবার এই সভা ডাকা হয়েছিল।

এই সভায় প্রথম এস্টেটের ৩০০ জন, দ্বিতীয় এস্টেটের ৩০০ জন এবং তৃতীয় এস্টেটের ৬০০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। প্রথা অনুযায়ী প্রতিটি এস্টেটের মাত্র একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল। অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেট এক হয়ে সহজেই যেকোনো সিদ্ধান্ত পাস করিয়ে নিতে পারত। কিন্তু এবার তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে, ভোট প্রক্রিয়াটি 'এক ব্যক্তি, এক ভোট' (One member, one vote) নিয়মে হতে হবে। সম্রাট এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে ক্ষুব্ধ তৃতীয় এস্টেটের সদস্যরা সভা বয়কট করে বেরিয়ে যান।

১৭৮৯ সালের ২০শে জুন তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা ভার্সাইয়ের একটি ইনডোর টেনিস কোর্টে সমবেত হন এবং নিজেদের 'জাতীয় সভা' (National Assembly) হিসেবে ঘোষণা করেন। তারা শপথ নেন যে, যতক্ষণ না তারা ফ্রান্সের জন্য একটি সংবিধান রচনা করছেন যা রাজার ক্ষমতাকে সীমিত করবে, ততক্ষণ তারা ছত্রভঙ্গ হবেন না। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি 'টেনিস কোর্ট শপথ' (Tennis Court Oath) নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মিরাবো (Mirabeau) এবং অ্যাবে সিয়েস (Abbé Sieyès)।

এদিকে প্যারিসে খাদ্যাভাব ও চরম উত্তেজনার পারদ চড়ছিল। গুজব রটে যায় যে সম্রাট জনগণকে দমন করার জন্য সেনা পাঠাচ্ছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই উত্তেজিত জনতা বাস্তিল দুর্গে আক্রমণ করে এবং তা ধ্বংস করে দেয়। এই দিনটিকেই ফরাসি বিপ্লবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়।

৫. ফ্রান্স কীভাবে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হলো

জনগণের এই তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে সম্রাট ষোড়শ লুই অবশেষে জাতীয় সভাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন এবং নিজের ক্ষমতা সংবিধানের অধীনে আনতে রাজি হন। ১৭৮৯ সালের ৪ঠা আগস্ট রাতে জাতীয় সভা এক ডিক্রি জারি করে সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক কর ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে দেয়। গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়, যার ফলে রাষ্ট্রের প্রায় ২ বিলিয়ন লিভ্রে মূল্যের সম্পদ অর্জিত হয়।

১৭৯১ সালে জাতীয় সভা সংবিধানের খসড়া তৈরি সম্পন্ন করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজার একচ্ছত্র ক্ষমতাকে সীমিত করা। শাসনক্ষমতা এখন তিনটি পৃথক বিভাগের হাতে ন্যস্ত করা হয়: আইনবিভাগ, শাসনবিভাগ এবং বিচারবিভাগ

তবে এই সংবিধানে ভোট দেওয়ার অধিকার সবাইকে দেওয়া হয়নি। নাগরিকদের দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল:

  • সক্রিয় নাগরিক (Active Citizens): ২৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষ যারা কমপক্ষে ৩ দিনের শ্রমের সমপরিমাণ কর প্রদান করতেন, তারাই কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার পেয়েছিলেন।
  • নিষ্ক্রিয় নাগরিক (Passive Citizens): বাকি পুরুষ এবং সমস্ত নারী ভোটদান পর্ব থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

সংবিধানের শুরুতে 'মানুষ এবং নাগরিকের অধিকারের ঘোষণা' (Declaration of the Rights of Man and Citizen) যুক্ত করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে জীবনের অধিকার, বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের চোখে সমতাকে অলঙ্ঘনীয় অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

৬. রাজতন্ত্রের অবসান এবং প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

ফ্রান্সের পরিস্থিতি শান্ত হলেও আড়ালে সম্রাট ষোড়শ লুই প্রুশিয়ার রাজার সাথে এক গোপন চুক্তি সই করেন। অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের শাসকরাও ফ্রান্সের এই অগ্রগতি দেখে শঙ্কিত ছিলেন। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই ১৭৯২ সালের এপ্রিল মাসে ফরাসি জাতীয় সভা প্রুশিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

এই যুদ্ধের ফলে ফ্রান্সে এক চরম অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে প্যারিসের দরিদ্র ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ একটি চরমপন্থী রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হন, যার নাম ছিল জ্যাকোবিন ক্লাব (Jacobin Club)। এদের নেতা ছিলেন ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়ার (Maximilien Robespierre)। জ্যাকোবিনরা নিজেদের 'স্যাঁ-কুলোৎ' (sans-culottes) বলতেন, যার অর্থ যারা হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা দীর্ঘ প্যান্ট পরতেন না (সাধারণ শ্রমিকদের পোশাক)।

১৭৯২ সালের ১০ই আগস্ট জ্যাকোবিনদের নেতৃত্বে ক্রুদ্ধ জনতা রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে রাজপরিবারকে বন্দী করে। নবনির্বাচিত জাতীয় সভা (যার নাম দেওয়া হয়েছিল কনভেনশন) রাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ অবসান ঘটায় এবং ২১শে সেপ্টেম্বর ১৭৯২ তারিখে ফ্রান্সকে একটি প্রজাতন্ত্র (Republic) হিসেবে ঘোষণা করে। দেশদ্রোহিতার অপরাধে সম্রাট ষোড়শ লুই-কে ১৭৯৩ সালের ২১শে জানুয়ারি গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিছুদিন পর রানী মারি আঁতোয়ানেতেরও একই দশা হয়।

৭. সন্ত্রাসের রাজত্ব (Reign of Terror): ১৭৯৩ - ১৭৯৪

১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের ইতিহাস 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' (Reign of Terror) নামে পরিচিত। এই সময় রোবসপিয়ার চরম নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তিমূলক নীতি গ্রহণ করেন। প্রজাতন্ত্রের শত্রু হিসেবে যাদেরই সন্দেহ করা হতো—যেমন যাজক, অভিজাত বা অন্য রাজনৈতিক দলের সদস্য—তাদের গ্রেপ্তার করে বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হতো। দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের 'গিলোটিন' (Guillotine) নামক যন্ত্রে শিরশ্ছেদ করা হতো।

রোবসপিয়ার দৈনন্দিন জীবনেও কঠোর নিয়ম চালু করেন। রুটি ও মাংসের দাম বেঁধে দেওয়া হয়, সমতা বজায় রাখার জন্য সবাইকে সাধারণ আটার রুটি (Pain d'égalité) খাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। গির্জাগুলো বন্ধ করে সেগুলোকে সেনা ব্যারাক বা সরকারি দপ্তরে রূপান্তর করা হয়। অবশেষে ১৭৯৪ সালের জুলাই মাসে কনভেনশন রোবসপিয়ারকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাকেও গিলোটিনে হত্যা করা হয়। এর ফলে সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে।

৮. ডিরেক্টরি শাসন এবং নেপোলিয়নের উত্থান

জ্যাকোবিন সরকারের পতনের পর ফ্রান্সের শাসনভার আবার ধনী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতে চলে যায়। তারা একটি নতুন সংবিধান তৈরি করে, যেখানে সম্পত্তিহীনদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। শাসন পরিচালনায় বিশৃঙ্খলা এড়াতে পাঁচজন সদস্যের একটি নির্বাহী পরিষদ বা 'ডিরেক্টরি' (Directory) গঠন করা হয়।

কিন্তু ডিরেক্টরি এবং আইনসভার সদস্যদের মধ্যে অনবরত কোন্দল লেগেই থাকত। এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে ফ্রান্সের সামরিক জেনারেল নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (Napoleon Bonaparte) ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। ১৮০৪ সালে তিনি নিজেকে ফ্রান্সের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন।

৯. নারীদের ভূমিকা এবং দাসপ্রথা বিলোপ

ফরাসি বিপ্লবে নারীদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তারা পরিবার চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বিপ্লবী ক্লাব গঠন করেছিলেন। তাদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল পুরুষদের মতো সমান রাজনৈতিক অধিকার ও ভোটাধিকার লাভ করা। বিশিষ্ট নারী নেত্রী অলিম্পে ডি গুজেস (Olympe de Gouges) নারী অধিকারের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন। যদিও দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৪৬ সালে এসে ফরাসি নারীরা ভোটাধিকার অর্জন করেন।

ফরাসি উপনিবেশগুলোতে (যেমন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ) তামাক, নীল ও চিনির বাগানে কাজ করার জন্য আফ্রিকার দাসদের ব্যবহার করা হতো। জ্যাকোবিন সরকারের আমলে ১৭৯৪ সালে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা হলেও নেপোলিয়ন আবার তা চালু করেন। অবশেষে ১৮৪৮ সালে ফরাসি উপনিবেশগুলো থেকে দাসপ্রথা চিরতরে বিলুপ্ত করা হয়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: বাস্তিল দুর্গের পতনকে ফরাসি বিপ্লবের সূচনা বলা হয় কেন?
উত্তর: বাস্তিল দুর্গ ছিল ফরাসি রাজতন্ত্রের স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক শাসনের প্রতীক। ১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে এই দুর্গে আক্রমণ করে, বন্দীদের মুক্ত করে এবং দুর্গটিকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দেয়। এই ঘটনা প্রমাণ করেছিল যে সাধারণ মানুষ রাজার অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। তাই বাস্তিল দুর্গের পতনকে ফরাসি বিপ্লবের সূচনা বলা হয়।

প্রশ্ন ২: ফরাসি সমাজের 'তিনটি এস্টেট' বলতে কী বোঝায়? কোন শ্রেণীর উপর করের বোঝা ছিল?
উত্তর: আঠারো শতকের ফরাসি সমাজ তিনটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল, যাদের 'এস্টেট' বলা হতো। এগুলো হলো:
১. প্রথম এস্টেট (যাজক সম্প্রদায়)
২. দ্বিতীয় এস্টেট (অভিজাত সম্প্রদায়)
৩. তৃতীয় এস্টেট (কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবী)।
সমস্ত কর প্রদানের বোঝা ছিল শুধুমাত্র তৃতীয় এস্টেটের ওপর, যেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেট সম্পূর্ণ করমুক্ত ছিল।

প্রশ্ন ৩: রোবসপিয়ারের শাসনকালকে কেন 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' বলা হয়?
উত্তর: ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত রোবসপিয়ার ফ্রান্সে চরম নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর শাস্তি নীতি প্রয়োগ করেছিলেন। প্রজাতন্ত্রের আদর্শের সামান্যতম বিরোধিতা করলেও সন্দেহভাজনদের বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালে হাজির করে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। ভয় ও আতঙ্কের এই পরিবেশের কারণেই এই সময়কালকে 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' বলা হয়।

প্রশ্ন ৪: ফরাসি বিপ্লবের ফলে বিশ্বজুড়ে কোন কোন আদর্শ ছড়িয়ে পড়েছিল?
উত্তর: ফরাসি বিপ্লবের ফলে বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতা (Liberty), সমতা (Equality) এবং ভ্রাতৃত্ব (Fraternity)-র মহান আদর্শ ছড়িয়ে পড়েছিল। এই বিপ্লব সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটাতে সাহায্য করে এবং আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করে।

সারসংক্ষেপ

  • ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয় মূলত তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য এবং কর ব্যবস্থার অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
  • ১৪ই জুলাই ১৭৮৯-এ বাস্তিল দুর্গের পতনের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ত্বরান্বিত হয়।
  • ১৭৯১ সালের সংবিধান ফ্রান্সকে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত করে।
  • ১৭৯২ সালে রাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ অবসান ঘটে এবং ফ্রান্স একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
  • রোবসপিয়ারের স্বৈরাচারী 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' (১৭৯৩-৯৪) জনগণের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করে, যা তার নিজের মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে শেষ হয়।
  • পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৮০৪ সালে ফ্রান্সের সম্রাট হন।
  • এই বিপ্লবের মূল বার্তা—স্বাধীনতা, সমতা ও মানবাধিকার—আজও সারা বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের মূল চালিকাশক্তি।