বিষয়ের ভূমিকা

জীববিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় অধ্যায় হলো দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের অষ্টম অধ্যায় – 'জীব কীভাবে বংশ বিস্তার করে?' (How do Organisms Reproduce?)। পৃথিবীতে প্রতিটি জীবের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রজনন বা বংশ বিস্তার একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া। পুষ্টি, শ্বসন বা রেচনের মতো বিপাকীয় ক্রিয়াগুলি কোনো একটি জীবের বেঁচে থাকার জন্য সরাসরি প্রয়োজন না হলেও, বংশ বিস্তার ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব কীভাবে এককোষী ও বহুকোষী জীবেরা তাদের নিজেদের মতো দেখতে অপত্য জীবের সৃষ্টি করে। এখানে আমরা কোষ বিভাজন, ডিএনএ-এর ভূমিকা এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিভিন্ন ধরনের প্রজনন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। এটি কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, বরং আমাদের চারপাশের জীবজগৎকে বোঝার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

জীবজগতে প্রজনন প্রক্রিয়াকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: অযৌন জনন (Asexual Reproduction) এবং যৌন জনন (Sexual Reproduction)। নিচে এই প্রক্রিয়াগুলি এবং তাদের বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ডিএনএ (DNA) প্রতিলিপিকরণ এবং প্রজননের মূল ভিত্তি

প্রজননের সবচেয়ে মৌলিক ঘটনা হলো ডিএনএ (Deoxyribonucleic Acid)-এর কপি বা প্রতিলিপি তৈরি করা। কোষের নিউক্লিয়াসে থাকা ক্রোমোজোমে ডিএনএ অনু থাকে, যা পিতামাতার শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলি পরবর্তী প্রজন্মে বহন করে নিয়ে যায়। যখন একটি কোষ বিভাজিত হয়, তখন প্রথমে তার ডিএনএ-এর একটি নিখুঁত প্রতিলিপি তৈরি হয়। এর ফলে দুটি নতুন কোষ তৈরি হয় যেগুলির জিনগত গঠন প্রায় একই রকম থাকে। তবে এই প্রতিলিপি তৈরির সময় সামান্য ত্রুটি বা প্রকরণ (Variation) ঘটতে পারে, যা জৈব বিবর্তনের (Evolution) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকরণ না থাকলে কোনো প্রজাতি পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারত না।

২. অযৌন জননের বিভিন্ন পদ্ধতি

যে প্রক্রিয়ায় কেবল একটিমাত্র জীব অংশ নেয় এবং কোনো গ্যামেট (যৌন কোষ) তৈরি হয় না, তাকে অযৌন জনন বলে। এর ফলে উৎপন্ন অপত্য জীবগুলি তাদের জনিতৃ জীবের হুবহু অনুরূপ হয়, যাদের ক্লোন (Clone) বলা হয়। অযৌন জননের বিভিন্ন পদ্ধতিগুলি হলো:

  • বিভাজন (Fission): এককোষী জীব যেমন অ্যামিবা বা লিশমানিয়া এই পদ্ধতিতে বংশ বিস্তার করে। অ্যামিবা সাধারণত দ্বিখণ্ডন (Binary Fission)-এর মাধ্যমে একটি কোষ থেকে দুটি সমান ভাগে বিভক্ত হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কিছু জীব বহুবিভাজন (Multiple Fission)-এর মাধ্যমে অনেকগুলি অপত্য কোষ তৈরি করে।
  • বডিং বা কোরকোদগম (Budding): ইস্ট (Yeast) বা হাইড্রার মতো জীবে দেহের কোনো অংশে একটি ছোট মুকুল বা কোরক তৈরি হয়, যা পরে বৃদ্ধি পেয়ে মূল দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন জীভে পরিণত হয়।
  • খণ্ডীভবন (Fragmentation): স্পাইরোগাইরার মতো সরল বহুকোষী জীবের দেহ দুর্ঘটনা বা অন্য কারণে টুকরো টুকরো হয়ে গেলে প্রতিটি টুকরো বা খণ্ড নতুন পূর্ণাঙ্গ জীভে পরিণত হয়।
  • পুনরুৎপাদন (Regeneration): প্ল্যানারিয়ার মতো জীবের দেহ যদি কেটে একাধিক টুকরো হয়ে যায়, তবে প্রতিটি টুকরো তার হারিয়ে যাওয়া অঙ্গ পুনরুদ্ধার করে সম্পূর্ণ নতুন জীব হিসেবে বেঁচে থাকে।
  • রেণু উৎপাদন (Spore Formation): রাইজোবাস বা ব্রেড মোল্ডের মতো ছত্রাক অণুবীজ বা রেণু (Spores) উৎপাদনের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করে। রেণুগুলি হালকা হওয়ায় বাতাসে ভেসে দূরে ছড়িয়ে পড়ে এবং উপযুক্ত পরিবেশে অঙ্কুরিত হয়।
  • অঙ্গজ বংশবিস্তার (Vegetative Propagation): উদ্ভিদের মূল, কাণ্ড বা পাতার মাধ্যমে নতুন উদ্ভিদ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে অঙ্গজ বংশবিস্তার বলে। যেমন—আলুর কন্দ, আদার রাইজোম বা গোলাপের কাটিং।

৩. উদ্ভিদের যৌন জনন

উদ্ভিদের যৌন জননের প্রধান অঙ্গ হলো ফুল। একটি সম্পূর্ণ ফুলে সাধারণত চারটি স্তবক থাকে: বৃত্তি (Calyx), দলমণ্ডল (Corolla), পুংকেশর (Androecium) এবং গর্ভকেশর (Gynoecium)। এর মধ্যে পুংকেশর হলো পুংরেণু বা পরাগরেণু উৎপাদনকারী অংশ এবং গর্ভকেশর হলো স্ত্রী জনন অঙ্গ।

  • পরাগায়ন (Pollination): ফুলের পরাগধানী থেকে পরাগরেণু যখন ওই ফুলের বা একই প্রজাতির অন্য ফুলের গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হয়, তখন তাকে পরাগায়ন বলে। এটি বায়ু, জল বা কীটপতঙ্গের দ্বারা ঘটে থাকে।
  • নিষেক (Fertilization): পরাগরেণু গর্ভমুণ্ডে পড়ার পর সেখান থেকে পরাগনালী বেয়ে পুংগ্যামেট ডিম্বাণুর দিকে এগিয়ে যায়। পুংগ্যামেট ও স্ত্রী গ্যামেটের মিলনের ফলে জাইগোট (Zygote) গঠিত হয়, যাকে নিষেক বলে।
  • নিষেকের পর ডিম্বাণু বীজ এবং গর্ভাশয় ফলে পরিণত হয়।

৪. মানব প্রজনন সিস্টেম

মানুষ হলো একলিঙ্গ প্রাণী এবং এরা যৌন জনন সম্পন্ন করে। মানবদেহের প্রজননতন্ত্রকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: পুং প্রজননতন্ত্র এবং স্ত্রী প্রজননতন্ত্র।

  • পুং প্রজননতন্ত্র: প্রধান অঙ্গ হলো একজোড়া শুক্রাশয় (Testis), যা স্ক্রোটামের মধ্যে অবস্থান করে। শুক্রাশয় টেস্টোস্টেরন হরমোন এবং শুক্রাণু (Sperm) উৎপন্ন করে। শুক্রনালী ও মূত্রনালীর মাধ্যমে শুক্রাণু দেহের বাইরে নীত হয়।
  • স্ত্রী প্রজননতন্ত্র: প্রধান অঙ্গ হলো একজোড়া ডিম্বাশয় (Ovary), যা ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোন এবং ডিম্বাণু (Ovum/Egg) উৎপন্ন করে। প্রতি মাসে একটি করে ডিম্বাণু ডিম্বাশয় থেকে নির্গত হয় এবং ফ্যালোপিয়ান টিউবে এসে পৌঁছায়।
  • গর্ভধারণ ও ভ্রূণ বিকাশ: ফ্যালোপিয়ান টিউবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে নিষেক ঘটে এবং জাইগোট তৈরি হয়। জাইগোট বিভক্ত হয়ে ভ্রূণে পরিণত হয় এবং জরায়ুর দেওয়ালে সংস্থাপিত হয় (Implantation)। প্লাসেন্টা (Placenta) নামক কলার মাধ্যমে ভ্রূণ মায়ের শরীর থেকে পুষ্টি ও অক্সিজেন গ্রহণ করে। প্রায় ৯ মাস পর শিশুর জন্ম হয়।
  • প্রজনন স্বাস্থ্য: এইচআইভি/এইডস, সিফিলিস, গনোরিয়ার মতো যৌন সংক্রামিত রোগ (STDs) থেকে বাঁচার জন্য এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিবার পরিকল্পনা ও গর্ভনিরোধক পদ্ধতি (যেমন কনডম, কপার-টি, ওরাল পিল) সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১. অযৌন জনন ও যৌন জননের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

উত্তর: অযৌন জননে শুধুমাত্র একজন জনিতৃ জীব অংশগ্রহণ করে এবং কোনো গ্যামেট তৈরি হয় না, ফলে অপত্য জীবগুলি জিনগতভাবে হুবহু এক হয়। অন্যদিকে, যৌন জননে সাধারণত দুজন (পুং ও স্ত্রী) জনিতৃ জীব অংশগ্রহণ করে এবং গ্যামেটের মিলনের ফলে নতুন জীবের সৃষ্টি হয়, যেখানে জিনগত প্রকরণ বা বৈচিত্র্য দেখা যায়।

২. ডিএনএ প্রতিলিপিকরণের গুরুত্ব কী?

উত্তর: ডিএনএ প্রতিলিপিকরণ কোষ বিভাজনের সময় পিতামাতার জিনগত বৈশিষ্ট্যগুলিকে অপত্য কোষে নিখুঁতভাবে পৌঁছে দেয়। এটি জীবের শারীরিক গঠন এবং ক্রিয়াকলাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, প্রতিলিপিকরণের সময় সামান্য ত্রুটি জীবের মধ্যে প্রকরণ তৈরি করে, যা পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে এবং জৈব বিবর্তনে সাহায্য করে।

৩. উদ্ভিদের কৃত্রিম অঙ্গজ বংশবিস্তারের দুটি পদ্ধতির নাম লেখো।

উত্তর: উদ্ভিদের কৃত্রিম অঙ্গজ বংশবিস্তারের দুটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো কলম করা (Grafting) এবং শাখা কলম বা কাটিং (Cutting)।

৪. ঋতুচক্র বা মেনস্ট্রুয়েশন (Menstruation) কী?

উত্তর: স্ত্রী মানবদেহে প্রতি ২৮ দিন অন্তর ডিম্বাশয় থেকে একটি করে ডিম্বাণু নির্গত হয় এবং জরায়ুর দেওয়াল ভ্রূণ গ্রহণের জন্য পুরু হয়ে ওঠে। যদি নিষেক না ঘটে, তবে জরায়ুর এই পুষ্ট আস্তরণ রক্ত ও শ্লেষ্মা সহ যোনিপথ দিয়ে প্রতি মাসে দেহ থেকে বেরিয়ে আসে। এই চক্রকে ঋতুচক্র বা মাসিক বলা হয়।

সারসংক্ষেপ

  • প্রজনন প্রজাতির অস্তিত্ব বজায় রাখতে এবং ধারাবাহিকতা রক্ষায় সাহায্য করে।
  • ডিএনএ কপি করার সময় ঘটা প্রকরণ বিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে।
  • এককোষী ও সরল বহুকোষী জীবেরা প্রধানত বিভাজন, কোরকোদগম, খণ্ডীভবন ইত্যাদির মাধ্যমে অযৌন জনন সম্পন্ন করে।
  • সপুষ্পক উদ্ভিদে পরাগায়ন ও নিষেকের মাধ্যমে ফল ও বীজ উৎপন্ন হয়।
  • মানব প্রজননে পুং ও স্ত্রী গ্যামেটের মিলনে জাইগোট গঠিত হয় এবং জরায়ুতে ভ্রূণের বিকাশ ঘটে।
  • প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষা এবং যৌন রোগ সম্পর্কে সচেতনতা মানব সমাজের সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।