বিষয়ের ভূমিকা
জীববিজ্ঞান অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক ধারণা হলো 'কোষ' বা Cell। আমাদের শরীর হোক বা কোনো বিশাল আকারের গাছপালা, প্রতিটি জীবই অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু একক দিয়ে গঠিত, যাকে আমরা কোষ বলে থাকি। নবম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে এই কোষ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে কোষ আবিষ্কৃত হয়েছিল, কোষের বিভিন্ন অংশ এবং উদ্ভিদ কোষ ও প্রাণী কোষের মধ্যে মূল পার্থক্য কী। বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি পরবর্তী সমস্ত উচ্চতর জীববিদ্যা পাঠের ভিত্তি স্থাপন করে। কোষের আবিষ্কারের ইতিহাস থেকে শুরু করে এর জটিল অভ্যন্তরীণ গঠন সবই আমরা এই নিবন্ধে খুব সহজ এবং সাবলীল বাংলায় আলোচনা করব।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
কোষ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা লাভ করতে হলে আমাদের বেশ কিছু উপ-বিষয়ে প্রবেশ করতে হবে। নিচে বিস্তারিতভাবে প্রতিটি পয়েন্ট আলোচনা করা হলো:
১. কোষের আবিষ্কার
কোষ প্রথম কে আবিষ্কার করেছিলেন তা জানা বিজ্ঞানপ্রেমী প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য রোমাঞ্চকর। ১৬৬৫ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (Robert Hooke) নিজের তৈরি একটি সাধারণ মাইক্রোস্কোপ বা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে কর্কের (গাছের ছালের অংশ) পাতলা স্লাইস পরীক্ষা করছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে কর্কটির মধ্যে মৌচাকের মতো অনেকগুলো ছোট ছোট খোপ বা প্রকোষ্ঠ রয়েছে। তিনি এই প্রকোষ্ঠগুলোর নাম দেন 'Cell' বা কোষ, যার ল্যাটিন অর্থ হলো একটি ছোট কামরা। তবে তিনি মৃত কোষ দেখেছিলেন। পরবর্তীতে ১৬৭৪ সালে লিউভেনহুক (Leeuwenhoek) উন্নত মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে পুকুরের জলে প্রথম সজীব কোষ বা প্রোটোজোয়া আবিষ্কার করেন।
২. কোষ তত্ত্ব (Cell Theory)
উনিশ শতকে দুইজন বিজ্ঞানী, এম. জে. স্লাইডেন (১৮৩৮) এবং থিওডোর শোয়ান (১৮৩৯) কোষ তত্ত্ব প্রদান করেন। পরবর্তীতে রুডল্ফ ভিরচাও (১৮৫৫) এই তত্ত্বটিকে আরও প্রসারিত করেন। কোষ তত্ত্বের মূল কথাগুলো হলো:
- সমস্ত জীবদেহ এক বা একাধিক কোষ দ্বারা গঠিত।
- কোষ হলো জীবের গঠনগত এবং কার্যগত একক।
- সমস্ত কোষ পূর্ব-উৎপন্ন কোনো সজীব কোষ থেকেই তৈরি হয়।
৩. কোষের গঠন এবং প্রধান অংশসমূহ
একটি আদর্শ কোষের মূলত তিনটি প্রধান অংশ থাকে:
- কোষপর্দা (Plasma Membrane): এটি কোষের সবচেয়ে বাইরের পাতলা এবং সজীব পর্দা যা উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় কোষেই থাকে। এটি অর্ধভেদ্য পর্দা হিসাবে কাজ করে এবং প্রয়োজনীয় পদার্থ ভেতরে ঢুকতে ও বর্জ্য পদার্থ বের হতে সাহায্য করে।
- নিউক্লিয়াস (Nucleus): এটিকে কোষের মস্তিষ্ক বলা হয়। এর ভেতরে ক্রোমোজোম থাকে যা জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করে।
- সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm): কোষপর্দা ও নিউক্লিয়াসের মাঝখানে জেলের মতো থকথকে যে তরল অংশ থাকে, তাকে সাইটোপ্লাজম বলে। এর মধ্যেই বিভিন্ন কোষাণু বা organelles অবস্থান করে।
৪. কোষের বিভিন্ন অঙ্গাণু ও তাদের কাজ
সাইটোপ্লাজমের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কোষীয় অঙ্গাণু থাকে:
- মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondria): একে কোষের 'পাওয়ার হাউস' বা শক্তিঘর বলা হয়। এখানে শসনের মাধ্যমে শক্তি (ATP) উৎপন্ন হয়।
- রাইবোসোম (Ribosomes): প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে।
- গলগি বডি (Golgi Apparatus): কোষের ক্ষরণ এবং পদার্থ পরিবহনে সাহায্য করে।
- লাইসোজোম (Lysosomes): একে কোষের 'আত্মঘাতী থলি' বলা হয় কারণ এর ভেতরের হাইড্রোলাইটিক এনজাইম প্রয়োজনে নিজের কোষকেই ধ্বংস করে ফেলতে পারে।
- প্লাস্টিড (Plastids): এটি শুধুমাত্র উদ্ভিদ কোষে থাকে। ক্লোরোপ্লাস্ট নামক প্লাস্টিড সালোকসংশ্লেষণে সাহায্য করে।
৫. উদ্ভিদ কোষ ও প্রাণী কোষের পার্থক্য
উদ্ভিদ কোষ এবং প্রাণী কোষের গঠনে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে:
- উদ্ভিদ কোষে কোষপর্দার বাইরে একটি শক্ত সেলুলোজ নির্মিত কোষপ্রাচীর থাকে, যা প্রাণী কোষে থাকে না।
- উদ্ভিদ কোষে বড় আকারের ভ্যাকুওল বা গহ্বর থাকে, অন্যদিকে প্রাণী কোষে ছোট আকারের বা না থাকলেই চলে এমন ভ্যাকুওল থাকে।
- উদ্ভিদ কোষে প্লাস্টিড থাকে যার কারণে তারা খাদ্য প্রস্তুত করতে পারে, কিন্তু প্রাণী কোষে প্লাস্টিড থাকে না।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: কোষকে জীবনের মৌলিক গঠনগত ও কার্যগত একক বলা হয় কেন?
উত্তর: একটি জীবদেহের সমস্ত শারীরিক কাজ যেমন পরিপাক, শ্বসন, রেচন ইত্যাদি কোষের ভেতরেই সংঘটিত হয়। পাশাপাশি একটি জীবদেহের গঠনও কোষ দিয়েই শুরু হয়। তাই কোষকে জীবনের মৌলিক গঠনগত ও কার্যগত একক বলা হয়।
প্রশ্ন ২: মাইটোকন্ড্রিয়াকে কেন কোষের শক্তিঘর বলা হয়?
উত্তর: মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরে কোষীয় শ্বসনের মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন হয় এবং তা ATP (Adenosine Triphosphate) রূপে সঞ্চিত থাকে। এই শক্তি শরীরের বিভিন্ন কার্যকলাপে ব্যবহৃত হয় বলে মাইটোকন্ড্রিয়াকে শক্তিঘর বলা হয়।
প্রশ্ন ৩: লাইসোজোমকে কেন 'আত্মঘাতী থলি' বলা হয়?
উত্তর: লাইসোজোমের মধ্যে শক্তিশালী পাচক রস বা এনজাইম থাকে। কোনো কারণে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা রোগাক্রান্ত হলে এই থলি ফেটে যায় এবং এর ভেতরের এনজাইম পুরো কোষটিকে হজম বা ধ্বংস করে দেয়। তাই একে আত্মঘাতী থলি বলা হয়।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়ে আমরা যা শিখলাম তার মূল বিষয়গুলো নিচে সংক্ষেপে দেওয়া হলো:
- রবার্ট হুক ১৬৬৫ সালে প্রথম কোষ আবিষ্কার করেন।
- কোষ হলো জীবনের গঠন ও কাজের একক।
- কোষের প্রধান অংশগুলো হলো কোষপর্দা, সাইটোপ্লাজম এবং নিউক্লিয়াস।
- মাইটোকন্ড্রিয়া শক্তি উৎপন্ন করে এবং রাইবোসোম প্রোটিন তৈরি করে।
- উদ্ভিদ কোষে কোষপ্রাচীর ও প্লাস্টিড থাকে যা প্রাণী কোষে অনুপস্থিত।