বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের পরিবেশের প্রতিটি উপাদান যা মানুষের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে ব্যবহৃত হতে পারে এবং যা রূপান্তরের জন্য প্রযুক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, তাকেই সম্পদ (Resource) বলা হয়। NCERT দশম শ্রেণির ভূগোল বিষয়ের প্রথম অধ্যায় 'সম্পদ ও উন্নয়ন' (Resources and Development) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এই অধ্যায়ে সম্পদের প্রকৃতি, সম্পদের শ্রেণিবিভাগ, সম্পদের পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন এবং ভারতের মৃত্তিকা সম্পদ ও ভূ-ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। এই নিবন্ধটিতে আমরা সমগ্র অধ্যায়টিকে অত্যন্ত সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব যাতে শিক্ষার্থীরা সহজে বুঝতে ও মনে রাখতে পারে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. সম্পদের সংজ্ঞা ও তার রূপান্তর প্রক্রিয়া
প্রকৃতিতে প্রাপ্ত যেকোনো বস্তু নিজে থেকেই সম্পদ হয়ে ওঠে না। মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো বস্তুকে সম্পদে পরিণত করা হয়। সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় তিনটি উপাদান পরস্পর সম্পর্কযুক্ত:
- প্রকৃতি (Physical Environment): যেখান থেকে কাঁচামাল পাওয়া যায়।
- প্রযুক্তি (Technology): যার সাহায্যে কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
- প্রতিষ্ঠান (Institutions): যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের গতি বৃদ্ধি করে।
মানুষ এই তিনটি উপাদানের মূল কেন্দ্রবিন্দু। মানুষ প্রযুক্তির সাহায্যে প্রকৃতির বস্তুকে দরকারী পণ্যে রূপান্তরিত করে।
২. সম্পদের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Resources)
সম্পদকে প্রধানত চার ধরনের ভিত্তিতে ভাগ করা যায়:
(ক) উৎপত্তির ভিত্তিতে (On the Basis of Origin):
- জৈব সম্পদ (Biotic Resources): যেসব সম্পদ জীবমণ্ডল থেকে পাওয়া যায় এবং যাদের প্রাণ আছে। উদাহরণ: মানুষ, উদ্ভিদ, প্রাণী, মৎস্য ইত্যাদি।
- অজৈব সম্পদ (Abiotic Resources): যেসব বস্তু জড় উপাদান দ্বারা গঠিত। উদাহরণ: শিলা, ধাতু, খনিজ পদার্থ ইত্যাদি।
(খ) স্থায়িত্ব বা সামর্থ্যের ভিত্তিতে (On the Basis of Exhaustibility):
- পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা নবায়নযোগ্য সম্পদ (Renewable Resources): যেসব সম্পদ ব্যবহারের পরও প্রাকৃতিক উপায়ে পুনরায় সৃষ্টি হয় এবং শেষ হয়ে যায় না। উদাহরণ: সৌরশক্তি, বায়ুমণ্ডলীয় শক্তি, জল, বনভূমি।
- অপুনর্ব্যবহারযোগ্য বা অনবায়নযোগ্য সম্পদ (Non-Renewable Resources): যেসব সম্পদ দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয় এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে নিঃশেষিত হয়ে যায়। উদাহরণ: কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস।
(গ) মালিকানার ভিত্তিতে (On the Basis of Ownership):
- ব্যক্তিগত সম্পদ (Individual Resources): কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের নিজস্ব মালিকানাধীন সম্পদ। উদাহরণ: নিজের বাড়ি, জমি, পুকুর।
- গোষ্ঠীগত সম্পদ (Community Owned Resources): সমাজের সমস্ত সদস্যের সমান ব্যবহারের অধিকার থাকা সম্পদ। উদাহরণ: পার্ক, খেলার মাঠ, শ্মশান, গণ-পুকুর।
- জাতীয় সম্পদ (National Resources): প্রযুক্তিগত ও আইনিভাবে দেশের সীমানার ভেতরের সমস্ত সম্পদ এবং উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ১২ সামুদ্রিক মাইল (প্রায় ২২.২ কিমি) পর্যন্ত সমুদ্রের জলভাগ ও খনিজ।
- আন্তর্জাতিক সম্পদ (International Resources): যেসব সামুদ্রিক এলাকা দেশের ২০০ সামুদ্রিক মাইলের বাইরে (Exclusive Economic Zone) অবস্থিত এবং যা আন্তর্জাতিক সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকে।
(ঘ) বিকাশের স্তরের ভিত্তিতে (On the Basis of Status of Development):
- সম্ভাবনাময় সম্পদ (Potential Resources): যে সম্পদ অঞ্চলে বিদ্যমান কিন্তু সঠিক ব্যবহারের উপযুক্ত প্রযুক্তি বা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। উদাহরণ: রাজস্থান ও গুজরাটের বাতাস ও সৌরশক্তি।
- বিকশিত সম্পদ (Developed Resources): যেসব সম্পদ জরিপ করা হয়েছে এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনে কাজে লাগানো হচ্ছে।
- ভাণ্ডার (Stock): যেসব উপাদানের মানবিক প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতা আছে কিন্তু উপযুক্ত প্রযুক্তির অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। উদাহরণ: জলকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে আলাদা করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার।
- সঞ্চিত সম্পদ (Reserve): এটি ভাণ্ডারের একটি অংশ যা বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে ব্যবহার করা সম্ভব কিন্তু ভবিষ্যতের প্রয়োজনের জন্য গচ্ছিত রাখা হয়েছে। উদাহরণ: বাঁধের জল, বনাঞ্চল।
৩. সম্পদের অবক্ষয় এবং টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development)
মানুষের অনিয়ন্ত্রিত ভোগ ও সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বিশ্বব্যাপী নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে:
- অল্প কিছু মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়া।
- সম্পদের দ্রুত ক্ষয় ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা (যেমন: গ্লোবাল ওয়ার্মিং, ওজোন স্তর ক্ষয়, পরিবেশ দূষণ)।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন ধারণযোগ্য বা টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development)। এর অর্থ হলো — পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে বর্তমানের প্রয়োজন মেটানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদার কথাও মাথায় রাখা।
রিয়ো ডি জেনেইরো আর্থ সামিট, ১৯৯২ এবং এজেন্ডা ২১ (Agenda 21):
১৯৯২ সালের জুনে ব্রাজিলের রিয়ো ডি জেনেইরো শহরে ১০০টিরও বেশি দেশের প্রধান একত্রিত হন। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এই সম্মেলনে Agenda 21 গৃহীত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করা।
৪. ভারতে সম্পদ পরিকল্পনা (Resource Planning in India)
ভারতে সম্পদের বণ্টন অত্যন্ত বিষম। কোনো অঞ্চলে একটি সম্পদের প্রাচুর্য থাকলে অন্য সম্পদের ঘাটতি দেখা যায়। যেমন: ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড়ে খনিজের প্রাচুর্য থাকলেও অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে; আবার অরুণাচল প্রদেশে প্রচুর জল সম্পদ থাকলেও পরিকাঠামো দুর্বল। তাই ভারতে তিন ধাপে সম্পদ পরিকল্পনা করা হয়:
- সম্পদ চিহ্নিতকরণ ও তালিকা তৈরি: পুরো দেশে জরিপ, মানচিত্র তৈরি ও অনুমানের কাজ করা।
- পরিকল্পনা রূপায়ন অবকাঠামো: উপযুক্ত প্রযুক্তি, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা।
- জাতীয় উন্নয়নের সাথে মেলানো: সম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সমন্বিত করা।
৫. মৃত্তিকা সম্পদ ও তার শ্রেণিবিভাগ (Soil Classification in India)
মাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। ভারতে গঠিত মৃত্তিকাকে প্রধানত ৬টি ভাগে ভাগ করা হয়:
- ১. পলি মাটি (Alluvial Soil): ভারতের সবচেয়ে বিস্তৃত ও উর্বর মাটি। সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীবাহিকা এলাকায় অবস্থিত। পুরোনো পলি মাটিকে বাঙ্গর এবং নতুন উর্বর পলি মাটিকে খাদর বলা হয়। ধান, গম, আখের জন্য এটি অত্যন্ত উপযোগী।
- ২. কালো মাটি (Black / Regur Soil): ব্যাসল্ট শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গঠিত হয়। এতে আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা খুব বেশি। তুলো চাষের জন্য আদর্শ হওয়ায় একে 'কালো তুলো মাটি' বলা হয়। মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশে পাওয়া যায়।
- ৩. লাল ও হলুদ মাটি (Red and Yellow Soil): কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে ক্রিস্টালাইন আগ্নেয় শিলা থেকে তৈরি। আয়রন অক্সাইডের উপস্থিতির কারণে লাল দেখায় এবং জল যোজন হলে হলুদ বর্ণ ধারণ করে।
- ৪. ল্যাটেরাইট মাটি (Laterite Soil): উচ্চ তাপমাত্রা ও ভারী বৃষ্টিপাতযুক্ত এলাকায় গঠিত হয়। এই মাটিতে 'লিচিং' (Leaching) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষারকীয় উপাদান ধুয়ে যায়। চা, কফি ও কাজুবাদাম চাষের জন্য ভালো।
- ৫. মরুভূমির মাটি (Arid Soil): শুষ্ক অঞ্চলে পাওয়া যায়, রঙ লাল থেকে বাদামী। এতে বালির পরিমাণ বেশি এবং লবণের মাত্রা অত্যাধিক।
- ৬. পার্বত্য মাটি (Forest Soil): হিমালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে পাওয়া যায়। উঁচুতে এটি আম্লিক এবং হিউমাস কম থাকে, তবে উপত্যকা অঞ্চলে এটি বেশ উর্বর।
৬. মৃত্তিকাক্ষয় ও মৃত্তিকা সংরক্ষণ (Soil Erosion and Conservation)
বায়ু, জল বা মানুষের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে মাটির ওপরের উর্বর স্তর ধুয়ে বা উড়ে যাওয়াকে মৃত্তিকাক্ষয় (Soil Erosion) বলা হয়।
- মৃত্তিকাক্ষয়ের কারণ: বনভূমি ধ্বংস, অতিরিক্ত পশুচারণ, অনিয়ন্ত্রিত খননকাজ এবং ভুল চাষাবাদ পদ্ধতি।
- সংরক্ষণের উপায়: ধাপ চাষ (Terrace Farming), ফালি চাষ (Strip Cropping), সমন্বয়রেখা বরাবর চাষ (Contour Ploughing), রক্ষাকবচ বৃক্ষরোপণ (Shelter Belts) এবং পশুচারণ নিয়ন্ত্রণ করা।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: 'বাঙ্গর' ও 'খাদর' পলি মাটির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: 'বাঙ্গর' হলো প্রাচীন পলি মাটি যা নদী অববাহিকার উচ্চ স্থানে অবস্থিত, এতে কঙ্করের পরিমাণ বেশি এবং উর্বরতা কিছুটা কম। অন্যদিকে 'খাদর' হলো নবীন পলি মাটি যা প্রতি বছর প্লাবনের ফলে গঠিত হয়, এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম পলিকণাযুক্ত এবং বেশি উর্বর।
প্রশ্ন ২: এজেন্ডা ২১ (Agenda 21) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিয়ো ডি জেনেইরো শহরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলনে (UNCED) বিশ্বনেতাদের দ্বারা স্বাক্ষরিত ২১ দফা ঘোষণা পত্রকে এজেন্ডা ২১ বলা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development) নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন ৩: কালো মাটির প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য লিখুন।
উত্তর: (১) কালো মাটি কাদাটে প্রকৃতির এবং এতে দীর্ঘক্ষণ আর্দ্রতা ধরে রাখার চমৎকার ক্ষমতা থাকে। (২) এটি শুকিয়ে গেলে এতে গভীর ফাটল সৃষ্টি হয় যা মাটির বায়ু চলাচলে সাহায্য করে। এটি তুলো চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
সারসংক্ষেপ
- সম্পদ বলতে প্রকৃতিতে পাওয়া সেইসব বস্তুকে বোঝায় যা মানুষের প্রয়োজন মেটায় এবং প্রযুক্তিগতভাবে ব্যবহারযোগ্য।
- সম্পদ স্থায়িত্বের ভিত্তিতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও অপুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং মালিকানার ভিত্তিতে ৪টি ভাগে বিভক্ত।
- ভবিষ্যতের কথা ভেবে সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও সংরক্ষণকে টেকসই উন্নয়ন বলা হয়।
- ভারতের উর্বরতম ও সর্বাধিক পাওয়া মাটি হলো পলি মাটি; আর তুলো চাষের জন্য সেরা হলো কালো বা রেগুর মাটি।
- ধাপ চাষ, ফালি চাষ ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ভূমিক্ষয় ও মৃত্তিকাক্ষয় রোধ করা সম্ভব।