বিষয়ের ভূমিকা
অর্থনীতিতে 'অর্থ' (Money) এবং 'ঋণ' (Credit) হলো দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা যা আমাদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে অর্থ ও ঋণের ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পর্ষদ (NCERT) পরিচালিত দশম শ্রেণির অর্থনীতি পাঠ্যবইয়ের তৃতীয় অধ্যায় 'অর্থ ও ঋণ' (Money and Credit)-এ এই বিষয়গুলি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে পণ্য বিনিময় প্রথা থেকে আধুনিক মুদ্রার উদ্ভব হয়েছে, ব্যাঙ্কের কার্যাাবলী কী, এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ঋণ ব্যবস্থার প্রভাব কী রূপ। মাধ্যমিক ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই অধ্যায়ের ধারণা স্পষ্ট থাকা অত্যন্ত জরুরি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. বিনিময় প্রথা ও চাহিদার দ্বিমুখী কাকতালীয়তা (Barter System and Double Coincidence of Wants)
মুদ্রা আবিষ্কারের আগে মানুষ তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়ার জন্য পণ্যের বদলে পণ্য বিনিময় করত। একে বলা হতো বিনিময় প্রথা (Barter System)। তবে এই ব্যবস্থার একটি প্রধান সমস্যা ছিল 'চাহিদার দ্বিমুখী কাকতালীয়তা' (Double Coincidence of Wants)। এর অর্থ হলো, একজন ব্যক্তি যা বিক্রি করতে চান, অন্য একজন ব্যক্তির ঠিক সেটাই প্রয়োজন হতে হবে এবং বিনিময়ে দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে যা আছে তা প্রথম ব্যক্তির প্রয়োজন হতে হবে।
- উদাহরণ: একজন ধান চাষি যদি জুতো কিনতে চান, তবে তাকে এমন একজন জুতো প্রস্তুতকারককে খুঁজতে হবে যার ধানের প্রয়োজন রয়েছে। যদি তা না মেলে, তবে বিনিময় সম্ভব হতো না।
- অর্থ বা মুদ্রার ভূমিকা: অর্থ বিনিময়ের মাধ্যম (Medium of Exchange) হিসেবে কাজ করে চাহিদার দ্বিমুখী কাকতালীয়তার এই জটিল সমস্যাকে সম্পূর্ণ দূর করেছে। বর্তমানে টাকা দিয়ে যেকোনো পণ্য বা সেবা সরাসরি কেনাবেচা করা যায়।
২. মুদ্রার আধুনিক রূপ (Modern Forms of Money)
সময়ের সাথে সাথে মুদ্রার রূপ বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাচীনকালে সোনা, রূপো বা তামার মুদ্রা ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে মুদ্রার আধুনিক রূপগুলির মধ্যে প্রধান হলো:
- কাগজের নোট ও মুদ্রা (Currency): সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (RBI) ভারতে নোট ও মুদ্রা জারি করে। সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন কেনাকাটায় এই মুদ্রা গ্রহণ করতে আইনিভাবে বাধ্য।
- ব্যাঙ্ক আমানত (Bank Deposits): মানুষের কাছে উদ্বৃত্ত টাকা তারা ব্যাঙ্কে জমা রাখে। এই আমানত থেকে প্রয়োজনমতো টাকা তোলা যায় বলে একে চাহিদা আমানত (Demand Deposit) বলা হয়।
- চেক (Cheque): এটি আমানতকারীর দ্বারা ব্যাঙ্ককে দেওয়া একটি লিখিত নির্দেশ, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে সরাসরি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা স্থানান্তর করা যায়।
৩. ব্যাঙ্কের ঋণদান কার্যক্রম (Loan Activities of Banks)
ব্যাঙ্কগুলি আমানতকারীদের জমানো টাকা থেকে কেবল একটি ছোট অংশ (ভারতে প্রায় ১৫%) নিজেদের কাছে নগদ হিসেবে রাখে গ্রাহকদের দৈনন্দিন উত্তোলনের জন্য। বাকি বিপুল টাকা ব্যাঙ্ক ঋণগ্রহীতাদের ঋণ হিসেবে প্রদান করে।
ব্যাঙ্ক কীভাবে লাভ করে? ব্যাঙ্ক আমানতকারীদের যে হারে সুদ দেয়, ঋণগ্রহীতাদের থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি হারে সুদ আদায় করে। এই দুই সুদের হারের পার্থক্যই হলো ব্যাঙ্কের আয়ের প্রধান উৎস।
৪. ঋণের দুটি ভিন্ন পরিস্থিতি (Two Different Credit Situations)
ঋণ বা ক্রেডিট মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্য করতে পারে আবার বিপর্যয়ও ডেকে আনতে পারে। নিচে দুটি পরিস্থিতির উদাহরণ দেওয়া হলো:
- ইতিবাচক ভূমিকা: উৎসবের মৌসুমে একজন জুতো প্রস্তুতকারক বড় অর্ডার পেয়ে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে কাঁচামাল কিনে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করলেন এবং ভালো লাভ করলেন। এখানে ঋণ তার আয় বাড়াতে সাহায্য করল।
- নেতিবাচক ভূমিকা বা ঋণের ফাঁদ (Debt-trap): একজন ক্ষুদ্র কৃষক চাষের জন্য মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিলেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়ায় তিনি ঋণ শোধ করতে পারলেন না এবং বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করতে হলো। একে বলা হয় ঋণের ফাঁদ (Debt-trap)।
৫. ঋণের শর্তাবলী (Terms of Credit)
যেকোনো ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্ত থাকে, যা যৌথভাবে 'ঋণের শর্তাবলী' নামে পরিচিত। এর প্রধান উপাদানগুলি হলো:
- সুদের হার (Interest Rate): ঋণের মূল টাকার ওপর অতিরিক্ত সুদের পরিমাণ।
- বন্ধক বা জামানত (Collateral): ঋণগ্রহীতার এমন সম্পত্তি (যেমন জমি, বাড়ি, গাড়ি বা ব্যাঙ্ক জমার রশিদ) যা ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত ঋণদাতার কাছে জামানত হিসেবে থাকে।
- নথিপত্র (Documentation): ঋণগ্রহীতার পরিচয়, আয়ের প্রমাণ ইত্যাদি কাগজপত্রের প্রয়োজন।
- পরিশোধের পদ্ধতি (Mode of Repayment): ঋণের টাকা কীভাবে এবং কত কিস্তিতে ফেরত দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা।
৬. ভারতে ঋণের উৎস: আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাত (Formal and Informal Credit)
ভারতে ঋণ প্রদানের দুটি প্রধান উৎস বা খাত রয়েছে:
- আনুষ্ঠানিক খাত (Formal Sector): এর মধ্যে রয়েছে ব্যাঙ্ক এবং সমবায় সমিতি (Cooperatives)। এই খাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:
- রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI)-এর নিয়ন্ত্রণ: RBI ব্যাঙ্কগুলির কাজের ওপর নজরদারি চালায়।
- স্বল্প সুদের হার এবং নির্দিষ্ট আইনি নিয়মকানুন।
- ধনী ও মধ্যবিত্তরা সাধারণত এই ক্ষেত্র থেকে সহজেই ঋণ পায়।
- অনানুষ্ঠানিক খাত (Informal Sector): এর মধ্যে রয়েছে মহাজন, ব্যবসায়ী, বন্ধু, আত্মীয় ও নিয়োগকর্তা।
- এখানে কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা নেই।
- সুদের হার অত্যন্ত উচ্চ এবং ঋণ আদায়ে কঠোর বা অসাধু উপায় ব্যবহার করা হয়।
- দরিদ্র মানুষেরা পর্যাপ্ত জামানত ও নথিপত্রের অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।
৭. স্বনির্ভর গোষ্ঠী (Self-Help Groups - SHGs)
দরিদ্র বিশেষ করে গ্রামীণ মহিলাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা SHG অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এতে ১৫-২০ জন সদস্য একত্রিত হয়ে নিয়মিত ক্ষুদ্র সঞ্চয় করেন এবং নিজেদের প্রয়োজনে কম সুদে নিজেদের গোষ্ঠী থেকে ঋণ নেন। নির্দিষ্ট সময় ধরে সফলভাবে পরিচালনা করলে এই গোষ্ঠীগুলি জামানত ছাড়াই ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ সুবিধা পেতে পারে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: চাহিদার দ্বিমুখী কাকতালীয়তা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: পণ্য বিনিময় প্রথায় যখন কোনো লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের চাহিদার মধ্যে হুবহু মিল থাকে—অর্থাৎ একজন যে পণ্য বিক্রি করতে চায়, অন্যজন ঠিক সেটাই কিনতে চায় এবং বিনিময়ে নিজের জিনিস দিতে রাজি থাকে—তখন তাকে চাহিদার দ্বিমুখী কাকতালীয়তা বলা হয়।
প্রশ্ন ২: কেন সাধারণ মুদ্রাকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়?
উত্তর: যেকোনো দেশের কেন্দ্র সরকার বা অনুমোদিত সংস্থাকে (যেমন ভারতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া) দেশের আইন অনুযায়ী অর্থ বা মুদ্রা জারি করার একচ্ছত্র অধিকার প্রদান করা হয়েছে। আইনিভিত্তির কারণে দেশে যেকোনো কেনাবেচা বা লেনদেনে এই মুদ্রা গ্রহণে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তাই সাধারণ মুদ্রাকে সর্বজনগ্রাহ্য বিনিময়ের মাধ্যম বলা হয়।
প্রশ্ন ৩: আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ঋণ ব্যবস্থার মধ্যে দুটি প্রধান পার্থক্য লেখ।
উত্তর:
১. নিয়ন্ত্রণ: আনুষ্ঠানিক ঋণ ব্যবস্থা ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়; কিন্তু অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
২. সুদের হার: আনুষ্ঠানিক খাতে সুদের হার অনেক কম ও নির্দিষ্ট থাকে, পক্ষান্তরে অনানুষ্ঠানিক খাতে মহাজনরা মনগড়া ও অত্যন্ত উচ্চ হারে সুদ আদায় করে।
প্রশ্ন ৪: স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHG) কীভাবে দরিদ্রদের সাহায্য করে?
উত্তর: স্বনির্ভর গোষ্ঠী দরিদ্র মানুষদের, বিশেষ করে মহিলাদের, অতি সহজে এবং নামমাত্র সুদে ঋণ প্রদান করে। এর ফলে তারা মহাজনদের চড়া সুদের হাত থেকে বাঁচে। এছাড়া, কোনো জামানত ছাড়াই ব্যাঙ্কের কাছ থেকে ব্যবসা বা স্বকর্মসংস্থানের জন্য ঋণ পেতে SHG সহায়তা করে।
সারসংক্ষেপ
অধ্যায়টির মূল বার্তাগুলি নিচে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো:
- অর্থ বা মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে পণ্য বিনিময় প্রথার জটিলতা দূর করেছে।
- ব্যাঙ্ক আমানত গ্রহণ করে এবং জমা অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করে।
- ভারতে আনুষ্ঠানিক ঋণের সুবিধা প্রধানত শহরের বিত্তশালীরা পায়, আর গ্রামীণ দরিদ্ররা চড়া সুদের অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল।
- দেশের সার্বিক সুষম উন্নয়নের জন্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে কম সুদে আনুষ্ঠানিক ঋণের সহজলভ্যতা অত্যন্ত প্রয়োজন।