বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা চারপাশে নানা ধরনের শব্দ শুনতে পাই—মানুষের কথাবার্তা, পাখির কিচিরমিচির, যানবাহনের হর্ন, গানের সুর কিংবা বাতাসের দোলা। শব্দ হল এক প্রকার শক্তি (Energy), যা আমাদের কানে শোনার অনুভূতি জাগায়। এনসিইআরটি (NCERT) নবম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের ১২তম অধ্যায়ে 'শব্দ' (Sound) বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দর ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা অত্যন্ত সহজ ভাষায় শব্দের বিজ্ঞান, এর সঞ্চালন, বৈশিষ্ট্য, প্রতিফলন, সোনার (SONAR) প্রযুক্তি এবং মানুষের কানের গঠন সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. শব্দের উৎপত্তি (Production of Sound)

শব্দ কীভাবে সৃষ্টি হয়? এক কথায় উত্তর হল—কম্পনের (Vibration) মাধ্যমে। কোনো বস্তু যখন দ্রুত গতিতে সামনে-পেছনে স্পন্দিত হয়, তখন শব্দ উৎপন্ন হয়।

  • টিউনিং ফোর্ক (Tuning Fork): একটি টিউনিং ফোর্ককে রাবারের প্যাডে আঘাত করলে এর বাহু দুটি কাঁপতে থাকে এবং শব্দ উৎপন্ন হয়।
  • সঙ্গীত যন্ত্র: সেতার বা গিটারের তার টানলে তা কাঁপে, ঢোলের চামড়ায় আঘাত করলে কাঁপে, আবার বাঁশিতে বায়ুর স্তম্ভ কাঁপলে সুর তৈরি হয়।
  • মানুষের কণ্ঠস্বর: আমাদের গলায় থাকা স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংসের (Larynx) ভেতরে অবস্থিত ভোকাল কর্ডের (Vocal Cords) কম্পনের ফলে আমরা কথা বলতে পারি।

২. শব্দের সঞ্চালন এবং তরঙ্গের প্রকৃতি (Propagation of Sound)

শব্দ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কীভাবে যাত্রা করে? শব্দ সঞ্চালিত হওয়ার জন্য একটি জড় মাধ্যম (Medium) প্রয়োজন। এটি কঠিন, তরল বা গ্যাসীয় মাধ্যম হতে পারে। শূন্যস্থানে (Vacuum) শব্দ চলাচল করতে পারে না, কারণ সেখানে কম্পন সঞ্চালিত করার মতো কোনো কণা থাকে না।

শব্দ মাধ্যমে অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ (Longitudinal Wave) হিসেবে সঞ্চালিত হয়। যখন কোনো বস্তু কাঁপে, তখন সেটি তার চারপাশের বায়ুর কণাকে ধাক্কা দেয়। এর ফলে দুটি ঘনত্বের অঞ্চল তৈরি হয়:

  • সংপীড়ন (Compression): যেখানে বায়ুর কণাগুলি খুব কাছাকাছি চলে আসে এবং উচ্চ চাপ ও ঘনত্বের সৃষ্টি হয়।
  • তনুভবন (Rarefaction): যেখানে কণাগুলি দূরে সরে যায় এবং নিম্ন চাপ ও ঘনত্বের সৃষ্টি হয়।

৩. শব্দ তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Sound Waves)

একটি শব্দ তরঙ্গকে মূলত কয়েকটি ভৌত রাশির সাহায্যে বর্ণনা করা যায়:

  • কম্পাঙ্ক (Frequency - $f$): প্রতি সেকেন্ডে যতগুলি পূর্ণ কম্পন বা তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, তাকে কম্পাঙ্ক বলে। এর একক হল হার্টজ (Hz)।
  • তরঙ্গদৈর্ঘ্য (Wavelength - $ an$ বা $\frac{1}{T}$): দুটি পরপর সংপীড়ন বা দুটি পরপর তনুভবনের মধ্যকার দূরত্বকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বলে। এটিকে লা্যামডা ($\frac{1}{T}$) দ্বারা প্রকাশ করা হয় এবং এর একক মিটার (m)।
  • বিস্তার (Amplitude - $A$): মূল অবস্থান থেকে কণাগুলির সর্বাধিক বিচ্যুতিকে বিস্তার বলে। বিস্তারের ওপর শব্দের তীব্রতা বা জোরালো ভাব (Loudness) নির্ভর করে।
  • পর্যায়কাল (Time Period - $T$): একটি পূর্ণ তরঙ্গ সম্পন্ন হতে যে সময় লাগে, তাকে পর্যায়কাল বলে। কম্পাঙ্ক ও পর্যায়কালের সম্পর্ক হল: $f = \frac{1}{T}$।
  • শব্দের বেগ (Velocity of Sound - $v$): শব্দ তরঙ্গ এক সেকেন্ডে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকে শব্দের বেগ বলে। সূত্রের সাহায্যে লেখা যায়: $v = f \times an$ (বেগ = কম্পাঙ্ক $ \times$ তরঙ্গদৈর্ঘ্য)।

সাধারণ উষ্ণতায় (২০°C) বায়ুতে শব্দের বেগ প্রায় $343 \text{ m/s}$। বায়ুর উষ্ণতা বাড়লে শব্দের বেগ বৃদ্ধি পায়। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কঠিন মাধ্যমে শব্দের বেগ সবচেয়ে বেশি, তরলে তার চেয়ে কম এবং গ্যাসীয় মাধ্যমে সবচেয়ে কম।

৪. শব্দের প্রতিফলন এবং প্রতিধ্বনি (Reflection of Sound & Echo)

আলোর মতোই শব্দও কোনো কঠিন বা তরল প্রতিফলক তলে বাধা পেয়ে ফিরে আসে। একে শব্দের প্রতিফলন বলে। শব্দের প্রতিফলনের প্রধান দুটি ব্যবহারিক উদাহরণ হল:

  • প্রতিধ্বনি (Echo): কোনো দূরবর্তী পর্বত বা দেওয়ালে মূল শব্দ বাধা পেয়ে পুনরায় কানে ফিরে আসলে যে স্পষ্ট পুনরাবৃত্তি শোনা যায়, তাকে প্রতিধ্বনি বলে। মানুষের মস্তিষ্কে শব্দের অনুভূতি প্রায় $0.1 \text{ s}$ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তাই স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শুনতে হলে উৎস ও প্রতিফলক পৃষ্ঠের মধ্যে ন্যূনতম দূরত্ব হতে হবে: $ \text{দূরত্ব} = \frac{344 \text{ m/s} \times 0.1 \text{ s}}{2} = 17.2 \text{ meter}$।
  • অনুরণন (Reverberation): কোনো বড় হলঘরে বা প্রেক্ষাগৃহে বারবার প্রতিফলনের কারণে শব্দ কিছুক্ষণ ধরে স্থায়ী হয়। একে অনুরণন বলে। প্রেক্ষাগৃহের ছাদ ও দেওয়ালে শব্দশোষক পদার্থ (যেমন ফাইবারবোর্ড, পর্দা) ব্যবহার করে অনুরণন কমানো হয়।

৫. শ্রাব্যতার সীমা (Range of Hearing)

মানুষের কান সব কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায় না। কম্পাঙ্কের ভিত্তিতে শব্দকে তিনভাগে ভাগ করা হয়:

  • শ্রাব্য শব্দ (Audible Sound): $20 \text{ Hz}$ থেকে $20,000 \text{ Hz}$ (বা $20 \text{ kHz}$) কম্পাঙ্কের শব্দ মানুষ শুনতে পায়।
  • শব্দেতর শব্দ (Infrasound): $20 \text{ Hz}$-এর কম কম্পাঙ্কের শব্দ। হাতি, তিমি এবং গণ্ডার এই ধরনের শব্দ তৈরি ও শুনতে পায়। ভূমিকম্পের ঠিক আগে শব্দেতর তরঙ্গ তৈরি হয়।
  • শব্দোত্তর বা আল্ট্রাসাউন্ড (Ultrasound): $20,000 \text{ Hz}$-এর বেশি কম্পাঙ্কের শব্দ। বাদুড়, ডলফিন ও কুকুর এই শব্দ শুনতে পায়।

আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার: চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইউএসজি (USG) ও ইসিজি (ECG)-তে, ধাতব ব্লকের ভেতরের ফাটল সনাক্ত করতে এবং 'সোনার' (SONAR - Sound Navigation and Ranging) প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রের গভীরতা ও ডুবোজাহাজের অবস্থান নির্ণয়ে আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করা হয়।

৬. মানব কর্ণের গঠন (Structure of Human Ear)

আমাদের কান বায়ুর চাপের পরিবর্তনকে স্নায়ু সংকেতে রূপান্তর করে মস্তিষ্কে পাঠায়। কানের প্রধান তিনটি অংশ রয়েছে:

  • বহিঃকর্ণ (Outer Ear): পিন্না (Pinna) চারপাশ থেকে শব্দ তরঙ্গ সংগ্রহ করে কর্ণকুহরে পাঠায়।
  • মধ্যকর্ণ (Middle Ear): কানের পর্দা (Eardrum বা Tympanic Membrane) এবং তিনটি ক্ষুদ্র অস্থি (হ্যামার, অ্যানভিল ও স্টারাপ) শব্দ কম্পনকে বহুগুণ বিবর্ধিত করে।
  • অন্তঃকর্ণ (Inner Ear): ককলিয়া (Cochlea) তরলপূর্ণ একটি অংশ, যা তরঙ্গের স্পন্দনকে তড়িৎ সংকেতে রূপান্তরিত করে এবং শ্রবণ স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পাঠায়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: মহাশূন্যে বা চাঁদে দুজন অ্যাস্ট্রোনট বা মহাকাশচারী কি সরাসরি মুখোমুখি কথা বলতে পারবেন?

উত্তর: না, সরাসরি কথা বলতে পারবেন না। কারণ মহাশূন্য বা চাঁদে কোনো বায়ু বা জড় মাধ্যম নেই। শব্দ চলাচলের জন্য মাধ্যম অপরিহার্য। তাই মহাকাশচারীরা কথা বলার জন্য রেডিও তরঙ্গ (যা মাধ্যম ছাড়াই চলতে পারে) ব্যবহার করেন।

প্রশ্ন ২: গর্জনকারী মেঘের আলো দেখার কিছুক্ষণ পর মেঘের ডাক শোনা যায় কেন?

উত্তর: আলো এবং শব্দের বেগের বিশাল পার্থক্যের কারণে এটি ঘটে। বায়ুতে আলোর বেগ প্রায় $3 \times 10^8 \text{ m/s}$, যেখানে শব্দের বেগ মাত্র $343 \text{ m/s}$। আলো অনেক দ্রুত পৌঁছায় বলে আমরা আগে বিদ্যুৎ চমকাতে দেখি এবং পরে শব্দের মেঘ গর্জন শুনি।

প্রশ্ন ৩: বাদুড় রাতের অন্ধকারে কোনো কিছুর সাথে না ধাক্কা খেয়ে কীভাবে উড়তে ও শিকার করতে পারে?

উত্তর: বাদুড় উচ্চ কম্পাঙ্কের আল্ট্রাসাউন্ড বা শব্দোত্তর তরঙ্গ নিঃসরণ করে। এই তরঙ্গ সামনে থাকা কোনো শিকার বা বাধায় প্রতিফলিত হয়ে বাদুড়ের কানে ফিরে আসে। ইকো-লোকেশন (Echolocation) পদ্ধতির মাধ্যমে বাদুড় বাধা বা শিকারের সঠিক দূরত্ব ও দিক নির্ধারণ করতে পারে।

প্রশ্ন ৪: একটি সুরশলাকার (Tuning Fork) কম্পাঙ্ক $500 \text{ Hz}$ এবং বায়ুতে শব্দের বেগ $340 \text{ m/s}$ হলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য কত?

উত্তর: আমরা জানি, $v = f \times an$
বা, $ an = \frac{v}{f} = \frac{340}{500} = 0.68 \text{ meter}$। অর্থাৎ, তরঙ্গদৈর্ঘ্য হবে $0.68 \text{ মিটার}$।

সারসংক্ষেপ

  • শব্দ হল এক ধরনের শক্তি যা বস্তুর কম্পনের ফলে উৎপন্ন হয় এবং অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের আকারে সঞ্চালিত হয়।
  • শব্দ চলাচলের জন্য মাধ্যম (কঠিন, তরল বা গ্যাসীয়) প্রয়োজন; শূন্যস্থানে শব্দ চলাচল করতে পারে না।
  • শব্দ তরঙ্গের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—কম্পাঙ্ক, বিস্তার, পর্যায়কাল ও তরঙ্গদৈর্ঘ্য।
  • মানুষের জন্য শ্রাব্য শব্দের সীমা $20 \text{ Hz}$ থেকে $20,000 \text{ Hz}$।
  • সোনার (SONAR) ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।