বিষয়ের ভূমিকা

জীবজগতের প্রতিটি জীব, তা সে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এককোষী অ্যামিবাই হোক বা বিশালকায় নীল তিমি অথবা বটগাছ, সবাই তাদের জীবন শুরু করে মাত্র একটি একক কোষ থেকে। কিন্তু কিভাবে এই একটিমাত্র কোষ থেকে কোটি কোটি কোষের সমন্বয়ে গঠিত বিশাল দেহের সৃষ্টি হয়? এই অলৌকিক ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে কোষ চক্র (Cell Cycle) এবং কোষ বিভাজন (Cell Division)

NCERT একাদশ শ্রেণির জীববিদ্যার ১০ম অধ্যায়ে কোষ চক্র এবং এর বিভিন্ন দশা, মাইটোসিস ও মিওসিস নামক দুটি প্রধান কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া এবং জীবদেহে এদের গুরুত্ব অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা যেমন NEET এবং বোর্ডের পরীক্ষার জন্য এই অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নিবন্ধে আমরা কোষ চক্র ও কোষ বিভাজনের সমস্ত মূল বিষয়গুলো সহজ বাংলা ভাষায় আলোচনা করব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. কোষ চক্র (Cell Cycle) কী?

একটি কোষের সৃষ্টি থেকে শুরু করে তার বৃদ্ধি, ডিএনএ (DNA) এর প্রতিলিপিকরণ (Replication) এবং পরিশেষে বিভাজিত হয়ে দুটি নতুন অপত্য কোষ গঠনের সমগ্র পর্যায়ক্রমিক ঘটনাকে কোষ চক্র বলা হয়। কোষ চক্র মূলত দুটি প্রধান দশায় বিভক্ত:

  • ইন্টারফেজ (Interphase): এটি কোষ চক্রের প্রস্তুতিমূলক দশা। কোষ চক্রের প্রায় ৯৫% সময় এই দশাতেই ব্যয় হয়। এই দশায় কোষ বিভাজনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান গঠন করে এবং আকার বৃদ্ধি পায়।
  • এম-ফেজ বা মাইটোটিক ফেজ (M-Phase): এটি প্রকৃত বিভাজন দশা, যেখানে নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম বিভাজিত হয়ে অপত্য কোষ গঠন করে।

২. ইন্টারফেজের বিভিন্ন পর্যায়

ইন্টারফেজ দশাকে পুনরায় তিনটি উপ-দশায় ভাগ করা যায়:

  • G1 ফেজ (First Gap Phase): এই দশায় কোষ শারীরবৃত্তীয়ভাবে সক্রিয় থাকে, বৃদ্ধি পায় কিন্তু DNA এর দ্বিগুণ ভবন হয় না।
  • S ফেজ (Synthesis Phase): এই দশায় DNA এর প্রতিলিপিকরণ ঘটে। অর্থাৎ, কোষের DNA এর পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যায় (যদি শুরুতে $2C$ থাকে তবে তা $4C$ হয়)। তবে ক্রোমোসোম সংখ্যা একই থাকে ($2n$)।
  • G2 ফেজ (Second Gap Phase): এই দশায় মাইটোসিস বিভাজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংশ্লেষিত হয় এবং কোষের বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে।
  • G0 ফেজ (Quiescent Stage): কিছু প্রাপ্তবয়স্ক কোষ (যেমন- হৃদকোষ, স্নায়ুকোষ) বিভাজিত হয় না। এরা G1 দশা থেকে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় প্রবেশ করে, যাকে G0 দশা বলা হয়।

৩. মাইটোসিস (Mitosis) বিভাজন

মাইটোসিস হলো সমবিভাজন প্রক্রিয়া, কারণ এই বিভাজনে অপত্য কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা ও গুণাবলী মাতৃকোষের সমান থাকে। এটি মূলত দুটি ভাগে ঘটে: ক্যারিওকাইনেসিস (Karyokinesis) বা নিউক্লিয়াসের বিভাজন এবং সাইটোকাইনেসিস (Cytokinesis) বা সাইটোপ্লাজমের বিভাজন।

ক্যারিওকাইনেসিস চারটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয়:

  • প্রোফেজ (Prophase): ক্রোমাটিন সুতো ঘনীভূত হয়ে ক্রোমোসোমে পরিণত হয়। নিউক্লীয় পর্দা ও নিউক্লিওলাস অদৃশ্য হতে শুরু করে।
  • মেটাফেজ (Metaphase): ক্রোমোসোমগুলি কোষের বিষুবীয় অঞ্চলে (Equatorial Plane) সাজানো হয়। এই দশায় ক্রোমোসোমের গঠন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
  • অ্যানাফেজ (Anaphase): সিস্টার ক্রোমাটিডগুলি পৃথক হয়ে স্পিন্ডল তন্তুর সাহায্যে বিপরীত মেরুর দিকে গমন করে।
  • টেলোফেজ (Telophase): বিপরীত মেরুতে পৌঁছানো ক্রোমোসোমগুলির চারপাশে পুনরায় নিউক্লীয় পর্দা ও নিউক্লিওলাস গঠিত হয়।

৪. মিওসিস (Meiosis) বিভাজন

মিওসিস হলো হ্রাসবিভাজন, যা যৌন জননকারী জীবের জনন মাতৃকোষে ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় একটি দ্বিগুণের ($2n$) মাতৃকোষ থেকে চারটি একগুণের ($n$) অপত্য কোষ গঠিত হয়। এটি মিওসিস-I এবং মিওসিস-II এই দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত।

  • মিওসিস-I এর বিশেষত্ব: প্রফেজ-I দশায় ক্রসিং ওভার (Crossing Over) ঘটে, যার ফলে অ-সিস্টার ক্রোমাটিডের মধ্যে জিনের বিনিময় ঘটে এবং জীবে নতুন বৈশিষ্ট্যের (Variation) বিকাশ ঘটে।
  • মিওসিস-II: এটি সাধারণ মাইটোসিস বিভাজনের মতোই ঘটে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: মাইটোসিস এবং মিওসিস বিভাজনের প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: মাইটোসিস হলো সমবিভাজন যেখানে একটি মাতৃকোষ থেকে সমান ক্রোমোসোম বিশিষ্ট দুটি অপত্য কোষ গঠিত হয় (দেহে ঘটে)। অন্যদিকে, মিওসিস হলো হ্রাসবিভাজন যেখানে ক্রোমোসোম সংখ্যা অর্ধেক হয়ে যায় এবং একটি মাতৃকোষ থেকে চারটি অপত্য কোষ গঠিত হয় (জনন কোষে ঘটে)।

প্রশ্ন ২: 'ক্রসিং ওভার' কী এবং এটি কোন দশায় ঘটে?

উত্তর: মিওসিস-I এর প্রফেজ-I এর প্যাকাইটিন উপ-দশায় দুটি সমসংস্থ ক্রোমোসোমের অ-সিস্টার ক্রোমাটিডদ্বয়ের মধ্যে ডিএনএ খণ্ডের বিনিময়কে ক্রসিং ওভার বলে। এটি জীবের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে।

প্রশ্ন ৩: G0 দশা বলতে কী বোঝো?

উত্তর: যে দশায় কোষ চক্র সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে স্থগিত থাকে এবং কোষ আর বিভাজিত হয় না, কিন্তু শারীরবৃত্তীয়ভাবে সক্রিয় থাকে, তাকে G0 দশা বা শান্ত দশা (Quiescent Stage) বলে। যেমন- মানবদেহের স্নায়ুকোষ।

সারসংক্ষেপ

  • কোষ চক্র হলো একটি কোষের জন্ম থেকে বিভাজন পর্যন্ত পর্যায়ক্রমিক ঘটনাবলি।
  • ইন্টারফেজ (G1, S, G2) হলো প্রস্তুতি দশা এবং এম-ফেজ হলো বিভাজন দশা।
  • S-দশায় DNA এর প্রতিলিপিকরণ ঘটে কিন্তু ক্রোমোসোম সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে।
  • মাইটোসিস হলো সমবিভাজন, যা জীবদেহের বৃদ্ধি ও ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে।
  • মিওসিস হলো হ্রাসবিভাজন, যা জনন কোষ তৈরি করে এবং প্রজাতিতে ক্রোমোসোম সংখ্যা ধ্রুবক রাখে।