বিষয়ের ভূমিকা

স্বাধীনতার পর ভারত এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। দারিদ্র্য দূরীকরণ, নিরক্ষরতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে ভারত কোন পথ বেছে নেবে—পুঁজিবাদ নাকি সমাজতন্ত্র? এই প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে ভারত 'পরিকল্পিত উন্নয়ন'-এর পথ বেছে নেয়। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে ভারত তার সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করেছিল। এটি কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি ভারতের গণতান্ত্রিক উন্নয়নের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

পরিকল্পিত উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাম্য এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করা। নিচে এর মূল দিকগুলো আলোচনা করা হলো:

  • বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী রাজনীতি: ভারতের উন্নয়ন মডেলে বামপন্থী আদর্শ (শ্রেণিহীন সমাজ) এবং দক্ষিণপন্থী আদর্শ (ব্যক্তিগত উদ্যোগ)-এর মধ্যে এক দীর্ঘ বিতর্ক ছিল। এই বিতর্ক থেকেই 'মিশ্র অর্থনীতি' ধারণার জন্ম হয়।
  • পরিকল্পনা কমিশন: ১৯৫০ সালে ভারত সরকার 'পরিকল্পনা কমিশন' গঠন করে। এর কাজ ছিল সম্পদের সঠিক বণ্টন ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। এর প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন জওহরলাল নেহরু।
  • প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৫১-১৯৫৬): এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন। খাদ্যের অভাব মেটানোই ছিল প্রধান অগ্রাধিকার।
  • দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৫৬-১৯৬১): প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের নেতৃত্বে এই পরিকল্পনায় ভারী শিল্পের (যেমন—ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র) ওপর জোর দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় 'মহলানবিশ মডেল'।
  • সবুজ বিপ্লব: খাদ্য নিরাপত্তার প্রয়োজনে ষাটের দশকে ভারতে কৃষি প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ শুরু হয়, যা 'সবুজ বিপ্লব' নামে পরিচিত।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: পরিকল্পনা কমিশন কেন গঠন করা হয়েছিল?
উত্তর: ভারতের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের জন্য ১৯৫০ সালে পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা হয়েছিল।

প্রশ্ন ২: প্রথম ও দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মধ্যে মূল পার্থক্য কী ছিল?
উত্তর: প্রথম পরিকল্পনায় কৃষিখাতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল, অন্যদিকে দ্বিতীয় পরিকল্পনায় ভারী শিল্পের প্রসারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।

প্রশ্ন ৩: সবুজ বিপ্লবের প্রভাব কী ছিল?
উত্তর: সবুজ বিপ্লবের ফলে ভারতে উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এবং দেশ খাদ্যের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।

সারসংক্ষেপ

  • ভারত স্বাধীনতার পর পরিকল্পিত উন্নয়নের মডেল গ্রহণ করে।
  • মিশ্র অর্থনীতি ভারতের উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি ছিল।
  • পরিকল্পনা কমিশন ভারতের উন্নয়নের দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।
  • কৃষি ও শিল্পের ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমেই ভারত আধুনিক ভারতের স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিল।