ঈশিতা: স্যার, আজ সকালে যখন আমি অঙ্ক করছিলাম, একটা জিনিস আমাকে খুব ভাবাচ্ছিল। আমরা পূর্ণ সংখ্যা (integers), যেমন ১, ২, ৩ বা -৫, -৭, এসব তো জানি। আর ভগ্নাংশও (fractions) শিখেছি, যেমন ১/২ বা ৩/৪। কিন্তু এদের মধ্যে সম্পর্কটা আসলে কী? মানে, ০.৫ আর ১/২ কি একই জিনিস? আর -২/৩ এটা কী ধরনের সংখ্যা?

অঙ্ক স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন করেছ, ঈশিতা! তোমার এই কৌতূহলই গণিত শেখার আসল চাবিকাঠি। তুমি যে বিভিন্ন ধরনের সংখ্যার কথা বললে, তার মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হলো পরিমেয় সংখ্যা (Rational Numbers)। অষ্টম শ্রেণির গণিতের প্রথম অধ্যায়ে আমরা এই পরিমেয় সংখ্যা নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করব। চলো, আজ আমরা এই ধারণাটা পরিষ্কার করে নিই।

ঈশিতা: পরিমেয় সংখ্যা? নামটা শুনে বেশ নতুন লাগছে! এর মানে কি সব ভগ্নাংশই পরিমেয় সংখ্যা?

অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, অনেকটা সেরকমই। কিন্তু সংজ্ঞাটা আরেকটু সুনির্দিষ্ট। যে কোনো সংখ্যাকে যদি p/q আকারে প্রকাশ করা যায়, যেখানে p ও q উভয়ই পূর্ণ সংখ্যা এবং q শূন্য নয় (q ≠ 0), তবে তাকে পরিমেয় সংখ্যা বলে।

ঈশিতা: ওহ, তাহলে ১/২ তো p/q আকারে আছে (p=1, q=2)। তাহলে এটা একটা পরিমেয় সংখ্যা?

অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক! আর -২/৩? এখানে p=-2 এবং q=3, উভয়ই পূর্ণ সংখ্যা। তাহলে এটিও একটি পরিমেয় সংখ্যা। মজার ব্যাপার হলো, তুমি যে পূর্ণ সংখ্যাগুলোর কথা বললে, যেমন ৫ বা -৭, সেগুলোও কিন্তু পরিমেয় সংখ্যা।

ঈশিতা: কিন্তু স্যার, ৫ কে তো p/q আকারে লেখা যায় না, এটা তো শুধু ৫?

অঙ্ক স্যার: আরে কেন যাবে না! তুমি ৫ কে ৫/১ লিখতে পারো তো? এখানে p=5, q=1। দুটোই পূর্ণ সংখ্যা এবং q শূন্য নয়। একইভাবে, -৭ কে -৭/১ লেখা যায়। এমনকি ০ কেও ০/১, ০/২, ০/৩ ইত্যাদি আকারে লেখা যায়। তাই ০ও একটি পরিমেয় সংখ্যা। বুঝলে ব্যাপারটা?

ঈশিতা: হ্যাঁ স্যার! এটা তো খুব সহজ। তার মানে, সব পূর্ণ সংখ্যা এবং সব ভগ্নাংশই পরিমেয় সংখ্যা!

অঙ্ক স্যার: ঠিক ধরেছ! সব স্বাভাবিক সংখ্যা (natural numbers), সব পূর্ণ সংখ্যা এবং সব ভগ্নাংশ পরিমেয় সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত। এখন চলো, এই পরিমেয় সংখ্যাগুলোর কিছু ধর্ম (properties) নিয়ে আলোচনা করি, যা আমাদের পাটিগণিত এবং বীজগণিতে খুব কাজে দেবে।

পরিমেয় সংখ্যার ধর্ম (Properties of Rational Numbers)

১. সংবৃত ধর্ম (Closure Property)

ঈশিতা: সংবৃত ধর্ম? এটা আবার কী?

অঙ্ক স্যার: সংবৃত ধর্ম মানে হলো, যখন আমরা কোনো নির্দিষ্ট ধরণের সংখ্যার ওপর কোনো গাণিতিক ক্রিয়া (যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ) করি, তখন ফলাফলও সেই একই ধরণের সংখ্যা হয় কিনা। চলো, পরিমেয় সংখ্যার ক্ষেত্রে এটা পরীক্ষা করে দেখি।

যোগের সংবৃত ধর্ম (Closure under Addition)

অঙ্ক স্যার: তুমি দুটি পরিমেয় সংখ্যা নাও, যেমন ১/২ এবং ৩/৪। এদের যোগফল কত হয়?

ঈশিতা: ১/২ + ৩/৪ = ২/৪ + ৩/৪ = ৫/৪।

অঙ্ক স্যার: এই ৫/৪ কি একটি পরিমেয় সংখ্যা?

ঈশিতা: হ্যাঁ, অবশ্যই! কারণ ৫ এবং ৪ দুটিই পূর্ণ সংখ্যা এবং ৪ শূন্য নয়।

অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক। যেকোনো দুটি পরিমেয় সংখ্যাকে যোগ করলে ফলাফল সবসময় একটি পরিমেয় সংখ্যাই হবে। তাই আমরা বলতে পারি, পরিমেয় সংখ্যা যোগের ক্ষেত্রে সংবৃত।

বিয়োগের সংবৃত ধর্ম (Closure under Subtraction)

অঙ্ক স্যার: এবার বিয়োগের ক্ষেত্রে দেখি। তুমি ১/২ থেকে ৩/৪ বিয়োগ করো।

ঈশিতা: ১/২ - ৩/৪ = ২/৪ - ৩/৪ = -১/৪।

অঙ্ক স্যার: -১/৪ কি পরিমেয় সংখ্যা?

ঈশিতা: হ্যাঁ স্যার, -১ এবং ৪ দুটোই পূর্ণ সংখ্যা।

অঙ্ক স্যার: চমৎকার! যেকোনো দুটি পরিমেয় সংখ্যার বিয়োগফলও সবসময় একটি পরিমেয় সংখ্যা হয়। তাই পরিমেয় সংখ্যা বিয়োগের ক্ষেত্রেও সংবৃত।

গুণের সংবৃত ধর্ম (Closure under Multiplication)

অঙ্ক স্যার: গুণের ক্ষেত্রে কী হয়? ১/২ কে ৩/৪ দিয়ে গুণ করো।

ঈশিতা: ১/২ × ৩/৪ = (১×৩)/(২×৪) = ৩/৮। এটা তো পরিমেয় সংখ্যা!

অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক। দুটি পরিমেয় সংখ্যার গুণফলও সবসময় একটি পরিমেয় সংখ্যা হয়। তাই পরিমেয় সংখ্যা গুণের ক্ষেত্রেও সংবৃত।

ভাগের সংবৃত ধর্ম (Closure under Division)

অঙ্ক স্যার: এবার ভাগ। ১/২ কে ৩/৪ দিয়ে ভাগ করো।

ঈশিতা: ১/২ ÷ ৩/৪ = ১/২ × ৪/৩ = ৪/৬ = ২/৩। এটাও পরিমেয় সংখ্যা। তাহলে কি সব ক্ষেত্রেই সংবৃত?

অঙ্ক স্যার: প্রায় সব ক্ষেত্রেই! কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম আছে। যদি তুমি কোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করো, তাহলে কী হয়?

ঈশিতা: শূন্য দিয়ে ভাগ তো করা যায় না, স্যার! সেটা অসংজ্ঞাত (undefined)।

অঙ্ক স্যার: ঠিক বলেছ! শূন্য একটি পরিমেয় সংখ্যা। কিন্তু আমরা কোনো পরিমেয় সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করতে পারি না। তাই, যদি আমরা শূন্যকে বাদ দিয়ে অন্যান্য পরিমেয় সংখ্যাগুলো নিই, তাহলে ভাগের ক্ষেত্রে সংবৃত ধর্ম প্রযোজ্য। কিন্তু যেহেতু শূন্য পরিমেয় সংখ্যা, তাই আমরা বলতে পারি, সাধারণভাবে পরিমেয় সংখ্যা ভাগের ক্ষেত্রে সংবৃত নয়। এই একটা ব্যতিক্রম মনে রাখা খুব জরুরি।

২. বিনিময় ধর্ম (Commutative Property)

ঈশিতা: বিনিময় ধর্ম মানে কি, যোগ বা গুণের ক্ষেত্রে সংখ্যাগুলো নিজেদের মধ্যে স্থান পরিবর্তন করতে পারে?

অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক ধরেছ! চলো দেখি পরিমেয় সংখ্যার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য কিনা।

যোগের বিনিময় ধর্ম (Commutativity under Addition)

অঙ্ক স্যার: তুমি ১/২ + ৩/৪ করেছ, পেয়েছ ৫/৪। এবার ৩/৪ + ১/২ করে দেখো তো?

ঈশিতা: ৩/৪ + ১/২ = ৩/৪ + ২/৪ = ৫/৪। একই উত্তর!

অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, তুমি যেকোনো দুটি পরিমেয় সংখ্যা a এবং b নাও। a + b সবসময় b + a এর সমান হবে। তাই পরিমেয় সংখ্যা যোগের ক্ষেত্রে বিনিময় ধর্ম মেনে চলে।

গুণের বিনিময় ধর্ম (Commutativity under Multiplication)

অঙ্ক স্যার: গুণের ক্ষেত্রে কী হয়? ১/২ × ৩/৪ = ৩/৮। এবার ৩/৪ × ১/২ করে দেখো।

ঈশিতা: ৩/৪ × ১/২ = ৩/৮। এটাও একই!

অঙ্ক স্যার: ঠিক তাই! যেকোনো দুটি পরিমেয় সংখ্যা a এবং b এর জন্য, a × b সবসময় b × a এর সমান হবে। তাই পরিমেয় সংখ্যা গুণের ক্ষেত্রেও বিনিময় ধর্ম মেনে চলে।

বিয়োগ ও ভাগের বিনিময় ধর্ম (Commutativity under Subtraction and Division)

অঙ্ক স্যার: বিয়োগের ক্ষেত্রে কী হবে? ১/২ - ৩/৪ = -১/৪। আর ৩/৪ - ১/২ = ১/৪। দুটো কি একই?

ঈশিতা: না স্যার, একই নয়! -১/৪ আর ১/৪ তো আলাদা।

অঙ্ক স্যার: একদম! একইভাবে ভাগের ক্ষেত্রেও ১/২ ÷ ৩/৪ = ২/৩। কিন্তু ৩/৪ ÷ ১/২ = ৩/২। দুটো আলাদা। তাই পরিমেয় সংখ্যা বিয়োগ ও ভাগের ক্ষেত্রে বিনিময় ধর্ম মেনে চলে না।

৩. সংযোজন ধর্ম (Associative Property)

ঈশিতা: সংযোজন ধর্ম? এটা কি তিনটে সংখ্যার ক্ষেত্রে হয়?

অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ! যখন আমরা তিন বা তার বেশি সংখ্যা নিয়ে কাজ করি, তখন কোন দুটি সংখ্যাকে প্রথমে যোগ বা গুণ করছি, তার ওপর কি ফলাফল নির্ভর করে? এটাই সংযোজন ধর্ম।

যোগের সংযোজন ধর্ম (Associativity under Addition)

অঙ্ক স্যার: চলো তিনটি পরিমেয় সংখ্যা নিই: ১/২, ১/৩, ১/৪। প্রথমে (১/২ + ১/৩) + ১/৪ করে দেখো।

ঈশিতা: (১/২ + ১/৩) = (৩/৬ + ২/৬) = ৫/৬। তারপর ৫/৬ + ১/৪ = (১০/১২ + ৩/১২) = ১৩/১২।

অঙ্ক স্যার: খুব ভালো। এবার ১/২ + (১/৩ + ১/৪) করে দেখো।

ঈশিতা: (১/৩ + ১/৪) = (৪/১২ + ৩/১২) = ৭/১২। তারপর ১/২ + ৭/১২ = (৬/১২ + ৭/১২) = ১৩/১২। আরে, একই উত্তর!

অঙ্ক স্যার: ঠিক তাই! যেকোনো তিনটি পরিমেয় সংখ্যা a, b, c এর জন্য, (a + b) + c সবসময় a + (b + c) এর সমান হবে। তাই পরিমেয় সংখ্যা যোগের ক্ষেত্রে সংযোজন ধর্ম মেনে চলে।

গুণের সংযোজন ধর্ম (Associativity under Multiplication)

অঙ্ক স্যার: গুণের ক্ষেত্রে কী হয়? আবার সেই ১/২, ১/৩, ১/৪ নিই। (১/২ × ১/৩) × ১/৪ করে দেখো।

ঈশিতা: (১/২ × ১/৩) = ১/৬। তারপর ১/৬ × ১/৪ = ১/২৪।

অঙ্ক স্যার: এবার ১/২ × (১/৩ × ১/৪) করে দেখো।

ঈশিতা: (১/৩ × ১/৪) = ১/১২। তারপর ১/২ × ১/১২ = ১/২৪। এটাও একই!

অঙ্ক স্যার: একদম! যেকোনো তিনটি পরিমেয় সংখ্যা a, b, c এর জন্য, (a × b) × c সবসময় a × (b × c) এর সমান হবে। তাই পরিমেয় সংখ্যা গুণের ক্ষেত্রেও সংযোজন ধর্ম মেনে চলে।

বিয়োগ ও ভাগের সংযোজন ধর্ম (Associativity under Subtraction and Division)

অঙ্ক স্যার: বিয়োগ ও ভাগের ক্ষেত্রে এই ধর্মগুলো খাটে না, ঠিক যেমন বিনিময় ধর্ম খাটেনি। এর প্রমাণ তুমি বাড়িতে নিজেই করে দেখতে পারো, দুটো উদাহরণ দিয়ে।

৪. যোগের একক (Additive Identity)

ঈশিতা: স্যার, একক মানে কী?

অঙ্ক স্যার: একক মানে এমন একটি সংখ্যা, যা কোনো সংখ্যার সঙ্গে যোগ করলে, সেই সংখ্যার মানের কোনো পরিবর্তন হয় না। তুমি ০ এর কথা ভেবে দেখো। যেকোনো সংখ্যা + ০ = সেই সংখ্যা। তাই ০ কে যোগের একক বলা হয়।

ঈশিতা: তার মানে, ১/২ + ০ = ১/২। তাহলে ০ পরিমেয় সংখ্যার যোগের একক?

অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক। যেকোনো পরিমেয় সংখ্যা a এর জন্য, a + 0 = 0 + a = a।

৫. গুণের একক (Multiplicative Identity)

অঙ্ক স্যার: তাহলে গুণের ক্ষেত্রে একক কী হবে?

ঈশিতা: গুণের ক্ষেত্রে তো ১। কারণ যেকোনো সংখ্যা × ১ = সেই সংখ্যা।

অঙ্ক স্যার: খুব সুন্দর! যেকোনো পরিমেয় সংখ্যা a এর জন্য, a × 1 = 1 × a = a। তাই ১ কে গুণের একক বলা হয়।

৬. যোগের বিপরীত (Additive Inverse)

ঈশিতা: বিপরীত? মানে উল্টো?

অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, অনেকটা সেরকম। এমন একটি সংখ্যা, যাকে মূল সংখ্যার সাথে যোগ করলে ফলাফল যোগের একক (০) হয়। যেমন, ৫ এর সাথে কী যোগ করলে ০ হবে?

ঈশিতা: -৫।

অঙ্ক স্যার: ঠিক। তাহলে ৫ এর যোগের বিপরীত হলো -৫। একইভাবে -৫ এর যোগের বিপরীত হলো ৫। পরিমেয় সংখ্যার ক্ষেত্রেও তাই। ১/২ এর যোগের বিপরীত হলো -১/২। কারণ ১/২ + (-১/২) = ০। যেকোনো পরিমেয় সংখ্যা a এর জন্য, তার যোগের বিপরীত হলো -a।

৭. গুণের বিপরীত বা ব্যাস্তানুপাতিক (Multiplicative Inverse or Reciprocal)

অঙ্ক স্যার: গুণের ক্ষেত্রে বিপরীত কী হবে বলে তোমার মনে হয়? অর্থাৎ, এমন একটি সংখ্যা, যা মূল সংখ্যার সাথে গুণ করলে ফলাফল গুণের একক (১) হয়।

ঈশিতা: ওহ, আমি বুঝেছি! যদি ১/২ থাকে, তাহলে ২ দিয়ে গুণ করলে ১ হবে। তাহলে ১/২ এর গুণের বিপরীত হলো ২। আর ৩/৪ এর জন্য ৪/৩।

অঙ্ক স্যার: দারুণ! একেই আমরা ব্যাস্তানুপাতিক বা রেসিপ্রোকাল বলি। যেকোনো পরিমেয় সংখ্যা a/b এর জন্য, তার গুণের বিপরীত হলো b/a। তবে এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সংখ্যাটি শূন্য হওয়া চলবে না। কারণ ০ এর কোনো গুণের বিপরীত নেই (০ × ? = ১, এমন কোনো সংখ্যা নেই)।

৮. বন্টন ধর্ম (Distributivity)

অঙ্ক স্যার: এটা গুণের ক্ষেত্রে যোগের ওপর প্রযোজ্য হয়। যেমন, a × (b + c) = (a × b) + (a × c)। এটি পরিমেয় সংখ্যার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। চলো, একটি উদাহরণ দেখি।

অঙ্ক স্যার: ধরো, a = ১/২, b = ২/৩, c = ১/৪। তাহলে a × (b + c) কত হয়?

ঈশিতা: ১/২ × (২/৩ + ১/৪) = ১/২ × (৮/১২ + ৩/১২) = ১/২ × ১১/১২ = ১১/২৪।

অঙ্ক স্যার: এবার (a × b) + (a × c) বের করো।

ঈশিতা: (১/২ × ২/৩) + (১/২ × ১/৪) = ২/৬ + ১/৮ = ১/৩ + ১/৮ = (৮/২৪ + ৩/২৪) = ১১/২৪। স্যার, দুটোই একই!

অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক। পরিমেয় সংখ্যা গুণের ক্ষেত্রে যোগের ওপর বন্টন ধর্ম মেনে চলে।

দুটি পরিমেয় সংখ্যার মধ্যে পরিমেয় সংখ্যা (Rational Numbers between Two Rational Numbers)

ঈশিতা: স্যার, আমরা তো জানি যে দুটি পূর্ণ সংখ্যার মধ্যে সসীম সংখ্যক পূর্ণ সংখ্যা থাকে (যেমন, ১ ও ৫ এর মধ্যে ২, ৩, ৪)। কিন্তু দুটি পরিমেয় সংখ্যার মধ্যে কি এমন হয়?

অঙ্ক স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন করেছ, ঈশিতা! এটাই পরিমেয় সংখ্যার একটি খুব আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। দুটি পরিমেয় সংখ্যার মধ্যে অসীম সংখ্যক পরিমেয় সংখ্যা থাকে।

ঈশিতা: অসীম সংখ্যক? কীভাবে?

অঙ্ক স্যার: চলো, একটি উদাহরণ দিয়ে দেখি। ধরো, আমরা ১/৩ এবং ১/২ এর মধ্যে একটি পরিমেয় সংখ্যা খুঁজে বের করতে চাই। সহজতম পদ্ধতি হলো তাদের গড় (average) বের করা।

ঈশিতা: গড় মানে (১/৩ + ১/২) ÷ ২ ?

অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, ঠিক তাই। করো তো দেখি।

ঈশিতা: (১/৩ + ১/২) = (২/৬ + ৩/৬) = ৫/৬। তারপর ৫/৬ ÷ ২ = ৫/৬ × ১/২ = ৫/১২।

অঙ্ক স্যার: তাহলে ৫/১২ সংখ্যাটি ১/৩ এবং ১/২ এর মধ্যে একটি পরিমেয় সংখ্যা। এবার তুমি ৫/১২ এবং ১/২ এর গড় বের করে দেখো, আরেকটি সংখ্যা পেয়ে যাবে। এভাবেই তুমি অনন্তকাল ধরে দুটি সংখ্যার মধ্যে আরও নতুন নতুন সংখ্যা খুঁজে বের করতে পারবে।

ঈশিতা: এটা তো দারুণ! কিন্তু যদি অনেকগুলো সংখ্যা বের করতে হয়, যেমন ১০টা, তাহলে কি বারবার গড় বের করব?

অঙ্ক স্যার: না, সে ক্ষেত্রে আরও সহজ পদ্ধতি আছে। দুটি পরিমেয় সংখ্যাকে এমনভাবে সমহর বিশিষ্ট ভগ্নাংশে রূপান্তর করো, যাতে তাদের লবগুলোর (numerators) মধ্যে পর্যাপ্ত ব্যবধান তৈরি হয়। ধরো, ১/৩ এবং ১/২। এদের সাধারণ হর হলো ৬। তাহলে ১/৩ = ২/৬ এবং ১/২ = ৩/৬। এদের মধ্যে তো কোনো পূর্ণ সংখ্যা নেই। তাহলে আমরা হর ও লবকে একটি বড় সংখ্যা দিয়ে গুণ করি, যেমন ১০ দিয়ে।

ঈশিতা: তাহলে ২/৬ = ২০/৬০ এবং ৩/৬ = ৩০/৬০।

অঙ্ক স্যার: ঠিক ধরেছ! এখন ২০/৬০ এবং ৩০/৬০ এর মধ্যে কতগুলো সংখ্যা আছে?

ঈশিতা: ২১/৬০, ২২/৬০, ২৩/৬০, ..., ২৯/৬০। অনেকগুলো!

অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, এই যে ৯টি সংখ্যা তুমি পেয়ে গেলে। যদি আরও বেশি সংখ্যা বের করতে চাও, তাহলে ১০ এর বদলে ১০০ বা ১০০০ দিয়ে গুণ করতে পারো। মূলকথা হলো, হরকে বড় করে আমরা লবগুলোর মধ্যে ব্যবধান বাড়াই, যা আমাদের অসংখ্য পরিমেয় সংখ্যা খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

প্রশ্নোত্তর পর্ব (Q&A Session)

ঈশিতা: স্যার, এই পরিমেয় সংখ্যাগুলো নিয়ে আমার আরও কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো আমাকে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলে।

অঙ্ক স্যার: অবশ্যই জিজ্ঞেস করো, ঈশিতা। এটাই তো শেখার প্রক্রিয়া।

ঈশিতা:

  • প্রথম প্রশ্ন: স্যার, সব পূর্ণ সংখ্যা কি পরিমেয় সংখ্যা? আর সব পরিমেয় সংখ্যা কি পূর্ণ সংখ্যা?

অঙ্ক স্যার: খুব প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন! হ্যাঁ, সব পূর্ণ সংখ্যাই পরিমেয় সংখ্যা। কারণ তুমি যেকোনো পূর্ণ সংখ্যাকে N/1 আকারে লিখতে পারো, যেখানে N এবং ১ উভয়ই পূর্ণ সংখ্যা এবং ১ ≠ ০। যেমন, ৫ = ৫/১, -৩ = -৩/১। কিন্তু সব পরিমেয় সংখ্যা পূর্ণ সংখ্যা নয়। উদাহরণস্বরূপ, ১/২ একটি পরিমেয় সংখ্যা, কিন্তু এটি কোনো পূর্ণ সংখ্যা নয়। একইভাবে, -৩/৪ ও একটি পরিমেয় সংখ্যা, কিন্তু পূর্ণ সংখ্যা নয়।

ঈশিতা:

  • দ্বিতীয় প্রশ্ন: শূন্য কি একটি পরিমেয় সংখ্যা? কেন?

অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, শূন্য একটি পরিমেয় সংখ্যা। কারণ শূন্যকে আমরা ০/১, ০/২, ০/৫ ইত্যাদি আকারে লিখতে পারি। এখানে p = ০ (যা একটি পূর্ণ সংখ্যা) এবং q = ১, ২, ৫ (যা পূর্ণ সংখ্যা এবং শূন্য নয়)। পরিমেয় সংখ্যার সংজ্ঞানুসারে, ০ একটি পরিমেয় সংখ্যা।

ঈশিতা:

  • তৃতীয় প্রশ্ন: স্যার, দুটি পরিমেয় সংখ্যার মধ্যে ঠিক কতগুলি পরিমেয় সংখ্যা থাকতে পারে?

অঙ্ক স্যার: এইমাত্রই আমরা আলোচনা করলাম, ঈশিতা। দুটি পরিমেয় সংখ্যার মধ্যে অসীম সংখ্যক পরিমেয় সংখ্যা থাকতে পারে। তুমি তাদের গড় বের করে বা সমহর বিশিষ্ট ভগ্নাংশে রূপান্তরিত করে যত খুশি পরিমেয় সংখ্যা খুঁজে পেতে পারো। গণিতে এটাকে 'ঘনত্ব ধর্ম' (Density Property) বলে।

ঈশিতা:

  • চতুর্থ প্রশ্ন: ১ এর গুণের বিপরীত কি ১? আর -১ এর গুণের বিপরীত কি -১?

অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ! ১ এর গুণের বিপরীত হলো ১, কারণ ১ × ১ = ১। আর -১ এর গুণের বিপরীত হলো -১, কারণ (-১) × (-১) = ১। এগুলি বিশেষ কিছু উদাহরণ, যেখানে একটি সংখ্যার গুণের বিপরীত সংখ্যাটি নিজেই হয়। তবে সাধারণত তা হয় না।

আজ আমরা কী শিখলাম?

অঙ্ক স্যার: বাহ্, ঈশিতা! আজ আমরা পরিমেয় সংখ্যা নিয়ে খুব গভীর আলোচনা করলাম। চলো, সংক্ষেপে দেখে নিই আমরা কী কী শিখলাম।

  • ঈশিতা: স্যার, আমি শিখলাম যে পরিমেয় সংখ্যা হলো সেইসব সংখ্যা যাদের p/q আকারে লেখা যায়, যেখানে p আর q পূর্ণ সংখ্যা এবং q শূন্য নয়।
  • অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক! আর আমরা দেখলাম যে স্বাভাবিক সংখ্যা, পূর্ণ সংখ্যা, এবং ভগ্নাংশ সবই পরিমেয় সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত।
  • ঈশিতা: পরিমেয় সংখ্যা যোগ, বিয়োগ এবং গুণের ক্ষেত্রে সংবৃত ধর্ম মেনে চলে, কিন্তু ভাগের ক্ষেত্রে শূন্যের জন্য নয়।
  • অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, শূন্য দিয়ে ভাগ করা যায় না, এটা সবসময় মনে রাখবে।
  • ঈশিতা: যোগ ও গুণের ক্ষেত্রে বিনিময় ধর্ম আর সংযোজন ধর্ম কাজ করে, কিন্তু বিয়োগ আর ভাগের ক্ষেত্রে করে না।
  • অঙ্ক স্যার: খুব ভালো মনে রেখেছ! এছাড়াও আমরা শিখলাম যে ০ হলো যোগের একক এবং ১ হলো গুণের একক।
  • ঈশিতা: যেকোনো সংখ্যার যোগের বিপরীত হলো তার ঋণাত্মক মান, আর গুণের বিপরীত হলো তার ব্যাস্তানুপাতিক, তবে শূন্যের কোনো গুণের বিপরীত নেই।
  • অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, এবং গুণের ক্ষেত্রে যোগের ওপর বন্টন ধর্ম (a × (b + c) = a × b + a × c) মেনে চলে।
  • ঈশিতা: আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, দুটি পরিমেয় সংখ্যার মধ্যে অসীম সংখ্যক পরিমেয় সংখ্যা থাকে, যা আমরা গড় বের করে বা হরকে বড় করে খুঁজে পেতে পারি!
  • অঙ্ক স্যার: অসাধারণ! তোমার ধারণাগুলো এখন বেশ পরিষ্কার। পরিমেয় সংখ্যার এই ধর্মগুলো বীজগণিত এবং উচ্চতর গণিতের ভিত্তি স্থাপন করে। এগুলো ভালোভাবে বুঝলে ভবিষ্যতে অনেক জটিল সমস্যাও সহজে সমাধান করতে পারবে। বাড়িতে অনুশীলন করতে ভুলো না যেন!

ঈশিতা: অবশ্যই স্যার! আজ পরিমেয় সংখ্যা সম্পর্কে আমার সব ভয় কেটে গেল। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ!