বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের দেশ ভারত পৃথিবীর অন্যতম বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি দেশ, যেখানে আমরা প্রকৃতির নানান রূপ দেখতে পাই। উঁচু উঁচু বরফে ঢাকা পাহাড় থেকে শুরু করে বিশাল বিস্তৃত সমভূমি, মালভূমি, মরুভূমি, সমুদ্রের বেলাভূমি এবং অসংখ্য দ্বীপ – সবকিছুই ভারতে বিদ্যমান। এই অধ্যায়ে, নবম শ্রেণির ভূগোলের 'ভারতের ভৌত বৈশিষ্ট্য' নামক অধ্যায়ে, আমরা ভারতের এই বিশাল ভূপ্রকৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করব। আমাদের এই বিশাল দেশের ভূখণ্ড কীভাবে গঠিত হয়েছে এবং এর প্রতিটি অংশের নিজস্বতা ও গুরুত্ব কী, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমরা বোঝার চেষ্টা করব। এই ভৌত বৈশিষ্ট্যগুলি কেবল আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং দেশের জলবায়ু, অর্থনীতি, জনবসতি, কৃষিকাজ এবং জীবনযাত্রার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।
আমরা জানি যে পৃথিবী প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিভিন্ন ভূত্বকীয় পাতের সঞ্চালনের ফলে পৃথিবীর উপরিভাগে এই ধরনের বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ভারতের ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্যও এই ধরনের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ারই ফল। ভারত পূর্বে গোণ্ডোয়ানা ভূমির অংশ ছিল, যা পরে ভেঙে গিয়ে বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশের সৃষ্টি করে। ইউরেশীয় পাতের সঙ্গে ভারতীয় পাতের সংঘর্ষের ফলেই সুবিশাল হিমালয় পর্বতমালার উত্থান হয়, যা ভারতের উত্তরাঞ্চলে এক বিশাল প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এই পর্বতশ্রেণী, এর সাথে উত্তর ভারতের উর্বর সমভূমি, সুপ্রাচীন উপদ্বীপীয় মালভূমি, থর মরুভূমি, উপকূলীয় সমভূমি এবং দ্বীপপুঞ্জ – এই সবই ভারতের ভূপ্রকৃতির প্রধান বিভাগ। এই প্রতিটি বিভাগ তাদের গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে অত্যন্ত স্বতন্ত্র।
এই বিস্তারিত আলোচনায় আমরা প্রতিটি ভূপ্রাকৃতিক বিভাগকে আলাদা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করব, তাদের গঠন প্রক্রিয়া, প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশ ও জীবনযাত্রায় তাদের ভূমিকা সম্পর্কে জানব। এটি কেবল আমাদের ভৌগোলিক জ্ঞানকেই বৃদ্ধি করবে না, বরং আমাদের দেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে একটি গভীর উপলব্ধি দেবে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ভারতকে মূলত ছয়টি প্রধান ভূপ্রাকৃতিক বিভাগে ভাগ করা যায়। এই বিভাগগুলি হলো:
- হিমালয় পর্বতমালা (The Himalayan Mountains)
- উত্তর ভারতের সমভূমি (The Northern Plains)
- উপদ্বীপীয় মালভূমি (The Peninsular Plateau)
- ভারতীয় মরুভূমি (The Indian Desert)
- উপকূলীয় সমভূমি (The Coastal Plains)
- দ্বীপপুঞ্জ (The Islands)
১. হিমালয় পর্বতমালা (The Himalayan Mountains)
হিমালয় পর্বতমালা ভারতের উত্তর সীমান্ত জুড়ে এক বিশাল ও তরুণ ভঙ্গিল পর্বতমালার শৃঙ্খল। এটি বিশ্বের উচ্চতম এবং সবচেয়ে রুক্ষ পর্বতশ্রেণীগুলির মধ্যে অন্যতম। এর গঠন প্রক্রিয়া ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ভারতীয় পাত এবং ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষের ফল। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই দুটি মহাদেশীয় পাতের মধ্যে চাপের ফলে এখানকার পাললিক শিলাস্তর ভাঁজ হয়ে উপরে উঠে আসে এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ পর্বতমালা হিমালয়ের সৃষ্টি হয়। এই পর্বতমালা পশ্চিমে সিন্ধু নদ থেকে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এর প্রস্থ কাশ্মীরে ৪০০ কিলোমিটার থেকে অরুণাচল প্রদেশে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়।
গঠন ও বৈশিষ্ট্য:
হিমালয়কে এর অনুদৈর্ঘ্য বিস্তৃতির ওপর ভিত্তি করে তিনটি প্রধান সমান্তরাল পর্বতশ্রেণীতে ভাগ করা যায়:
- বৃহৎ হিমালয় বা হিমাাদ্রি (The Greater Himalayas or Himadri): এটি হিমালয়ের সবচেয়ে উত্তরের এবং অবিচ্ছিন্ন পর্বতশ্রেণী। এর গড় উচ্চতা ৬,০০০ মিটার। বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলি (যেমন মাউন্ট এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, মাকালু, ধৌলাগিরি, নাঙ্গা পর্বত, অন্নপূর্ণা, নন্দাদেবী, কামেত, নামচা বারোয়া) এই পর্বতশ্রেণীতেই অবস্থিত। হিমাাদ্রি মূলত গ্রানাইট শিলা দ্বারা গঠিত এবং সারা বছর বরফে ঢাকা থাকে। এখান থেকেই অসংখ্য হিমবাহের উৎপত্তি হয়েছে। এর ভাঁজগুলি অপ্রতিসম প্রকৃতির।
- নিম্ন হিমালয় বা হিমাচল (The Lesser Himalayas or Himachal): এটি হিমাাদ্রির দক্ষিণে অবস্থিত এবং এর গড় উচ্চতা ৩,৭০০ থেকে ৪,৫০০ মিটার পর্যন্ত হয়। এখানকার প্রস্থ প্রায় ৫০ কিলোমিটার। হিমাচলের পর্বতশ্রেণীগুলি পাললিক শিলা ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত এবং এখানে পীর পঞ্জাল, ধৌলাধর, মহাভারত ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ পর্বতশ্রেণী রয়েছে। এই অঞ্চলে অনেক মনোরম শৈলশহর গড়ে উঠেছে, যেমন – কাশ্মীর উপত্যকা, কাংড়া উপত্যকা, কুলু উপত্যকা, সিমলা, মুসৌরি, নৈনিতাল, দার্জিলিং ইত্যাদি। এখানে ঘন চিরহরিৎ ও পর্ণমোচী বনভূমি দেখা যায়।
- শিবালিক বা বহিঃহিমালয় (The Shiwaliks or Outer Himalayas): এটি হিমালয়ের সবচেয়ে বাইরের বা দক্ষিণের পর্বতশ্রেণী। এর গড় উচ্চতা ৯০০ থেকে ১১০০ মিটার এবং প্রস্থ ১০ থেকে ৫০ কিলোমিটার। এই পর্বতশ্রেণীগুলো নদী দ্বারা বাহিত নুড়ি, পলি এবং কাদা দ্বারা গঠিত। শিবালিক এবং হিমাচলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে কিছু অনুদৈর্ঘ্য উপত্যকা দেখা যায়, যা 'দুন' নামে পরিচিত। যেমন – দেরাদুন, কোটলি দুন, পাতলি দুন। এই অঞ্চল অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার কারণে বসতি ও কৃষিকাজের জন্য কিছুটা উপযোগী।
আঞ্চলিক বিভাজন:
নদীর উপত্যকাগুলির ওপর ভিত্তি করে হিমালয়কে পশ্চিম থেকে পূর্বে নিম্নলিখিত আঞ্চলিক বিভাগগুলিতে ভাগ করা যায়:
- পঞ্জাব হিমালয়: সিন্ধু নদ এবং শতদ্রু নদের মধ্যবর্তী অংশ।
- কুমায়ুন হিমালয়: শতদ্রু নদ এবং কালী নদের মধ্যবর্তী অংশ।
- নেপাল হিমালয়: কালী নদ এবং তিস্তা নদের মধ্যবর্তী অংশ। এটি হিমালয়ের দীর্ঘতম অংশ।
- আসাম হিমালয়: তিস্তা নদ এবং ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যবর্তী অংশ।
ব্রহ্মপুত্র নদ হিমালয়ের পূর্ব সীমান্তে এক গভীর গিরিখাত সৃষ্টি করেছে, যা দিহাং গিরিখাত নামে পরিচিত। দিহাং গিরিখাতের পর হিমালয় হঠাৎ করে দক্ষিণ দিকে বেঁকে যায় এবং পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির মধ্য দিয়ে চলে যায়, যা পূর্বাঞ্চল বা পূর্বাঞ্চলীয় পর্বতশ্রেণী নামে পরিচিত। এই পর্বতগুলি মূলত বেলেপাথর দ্বারা গঠিত এবং ঘন বন দ্বারা আবৃত। এর মধ্যে পাটকাই বুম, নাগা পাহাড়, মণিপুর পাহাড় এবং মিজো পাহাড় উল্লেখযোগ্য।
গুরুত্ব:
হিমালয় ভারতের জলবায়ু, অর্থনীতি এবং ভূপ্রকৃতির জন্য অপরিহার্য। এটি দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে ধরে রেখে ভারতে বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে এবং উত্তর থেকে আসা শীতল সাইবেরিয়ান বায়ুকে ভারতে প্রবেশে বাধা দেয়। এটি অসংখ্য নদীর উৎস, যা উত্তর ভারতের সমভূমিকে উর্বর করেছে। এছাড়া, এটি বনজ সম্পদ, খনিজ সম্পদ এবং পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
২. উত্তর ভারতের সমভূমি (The Northern Plains)
হিমালয়ের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত এই বিশাল উর্বর সমভূমিটি ভারতের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূপ্রাকৃতিক বিভাগ। এটি সিন্ধু, গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র নদ ও তাদের উপনদীগুলির দ্বারা বাহিত পলিমাটি সঞ্চয়ের ফলে গঠিত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নেমে আসা নদীগুলি পলি বয়ে এনে এখানে সঞ্চয় করেছে, যার ফলে এক বিশাল, সমতল ও উর্বর ভূমি সৃষ্টি হয়েছে। এর বিস্তৃতি প্রায় ৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। এটি প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ২৩০ থেকে ৩২০ কিলোমিটার প্রশস্ত। এই সমভূমি কৃষি ও জনবসতির জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
গঠন ও বৈশিষ্ট্য:
উত্তর ভারতের সমভূমিকে প্রধানত তিনটি নদী অববাহিকার উপর ভিত্তি করে ভাগ করা হয়:
- পশ্চিম সমভূমি (Punjab Plain): সিন্ধু নদ এবং এর উপনদীগুলির (ঝিলাম, চেনাব, ইরাবতী, বিপাশা, শতদ্রু) দ্বারা গঠিত। এই অঞ্চলের একটি বড় অংশ পাকিস্তানে অবস্থিত। ভারতে এর অংশটি পঞ্জাব সমভূমি নামে পরিচিত, যেখানে 'দোয়াব' (দুটি নদীর মধ্যবর্তী ভূমি) বহুলাংশে দেখা যায়। এই সমভূমিতে উর্বর পলিমাটির সঞ্চয় হয় এবং এর ঢাল পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে।
- গঙ্গা সমভূমি (Ganga Plain): এই সমভূমি ঘাগর নদী (পুরাতন সরস্বতী) এবং তিস্তা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে বিস্তৃত। এটি উত্তর ভারত, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশ ও পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত। গঙ্গা এবং তার উপনদীগুলি (যমুনা, গোমতী, ঘাগরা, গণ্ডক, কোশী, চম্বল, বেতোয়া, শোন) এই সমভূমি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর ঢাল সাধারণত পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। এই সমভূমিকে আবার উচ্চ গঙ্গা সমভূমি, মধ্য গঙ্গা সমভূমি এবং নিম্ন গঙ্গা সমভূমিতে ভাগ করা হয়।
- ব্রহ্মপুত্র সমভূমি (Brahmaputra Plain): এটি ব্রহ্মপুত্র নদ এবং এর উপনদীগুলির দ্বারা গঠিত, যা মূলত আসাম রাজ্যে অবস্থিত। এই সমভূমি অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ এবং এর ঢাল পূর্ব দিকে। এই অঞ্চলটি বন্যাপ্রবণ এবং ঘন বনভূমি দ্বারা আবৃত।
আঞ্চলিক বৈচিত্র্য:
উত্তর ভারতের সমভূমির মধ্যে ভূমিরূপের সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা যায়, যা উত্তর থেকে দক্ষিণে চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত:
- ভাঁবর (Bhabar): এটি শিবালিক পর্বতমালার পাদদেশে প্রায় ৮-১৬ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি সংকীর্ণ অঞ্চল। এখানে নদীরা পাহাড় থেকে বয়ে আনা নুড়ি, বালি এবং পাথরের টুকরা সঞ্চয় করে। এই অঞ্চলে নদীর জল অদৃশ্য হয়ে যায়, কারণ নুড়ির স্তর অত্যন্ত ছিদ্রযুক্ত। কৃষিকাজ এখানে সম্ভব নয়।
- তরাই (Terai): ভাঁবর অঞ্চলের দক্ষিণে তরাই অঞ্চল অবস্থিত, যা প্রায় ১৫-৩০ কিলোমিটার প্রশস্ত। এই অঞ্চলে নদীগুলো আবার পৃষ্ঠে ফিরে আসে, যার ফলে এটি একটি ভেজা, জলাভূমি এবং বনভূমিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়। এটি বন্যপ্রাণীর জন্য একটি সমৃদ্ধ আবাসস্থল এবং ঘন বনাঞ্চল দ্বারা আবৃত ছিল, তবে বর্তমানে কৃষিকাজের জন্য অনেক বন কেটে ফেলা হয়েছে।
- ভাঙর (Bhangar): এটি উত্তর ভারতের সমভূমির প্রাচীন পলিমাটি দ্বারা গঠিত উচ্চতর অংশ। এই ভূমি প্লাবনভূমির উপরে অবস্থিত এবং প্রতি বছর নতুন পলি জমা হয় না। এখানে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের কণা দেখা যায়, যা স্থানীয়ভাবে 'কংকর' নামে পরিচিত। ভাঙর মাটি কম উর্বর হলেও, ভালো জলসেচের মাধ্যমে কৃষিকাজ করা যায়।
- খাদর (Khadar): এটি সমভূমির নবীন পলিমাটি দ্বারা গঠিত নিম্নভূমি, যা নদীর প্লাবনভূমির কাছাকাছি অবস্থিত। প্রতি বছর বন্যার সময় এখানে নতুন পলি জমা হয়, যা এটিকে অত্যন্ত উর্বর করে তোলে এবং নিবিড় কৃষিকাজের জন্য আদর্শ। এই মাটি কৃষি উৎপাদনের জন্য খুব ভালো।
গুরুত্ব:
উত্তর ভারতের সমভূমি কৃষি উৎপাদনের জন্য ভারতের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। এখানকার উর্বর মাটি, অনুকূল জলবায়ু এবং পর্যাপ্ত জল সরবরাহ নিবিড় কৃষিকাজের ভিত্তি। এছাড়াও, এই অঞ্চল দেশের সর্বাধিক জনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং এখানে অসংখ্য বৃহৎ শহর ও শিল্পকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
৩. উপদ্বীপীয় মালভূমি (The Peninsular Plateau)
উপদ্বীপীয় মালভূমি হলো ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন এবং স্থিতিশীল ভূখণ্ড। এটি গোণ্ডোয়ানা ভূমির একটি অংশ ছিল এবং আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত। এর সাধারণ ঢাল পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে। এই মালভূমির আকৃতি অনেকটা ত্রিভুজাকার এবং এর উচ্চতা সাধারণত ৫০০ থেকে ৯০০ মিটার পর্যন্ত হয়। এখানে মৃদু ঢালের পাহাড় এবং বিস্তৃত উপত্যকা দেখা যায়।
প্রধান বিভাগ:
উপদ্বীপীয় মালভূমিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
ক) মধ্য উচ্চভূমি (The Central Highlands):
- অবস্থান: এটি নর্মদা নদীর উত্তরে অবস্থিত এবং দাক্ষিণাত্য মালভূমির উত্তর অংশ গঠন করে। এর বিস্তার পশ্চিমে আরাবল্লী পর্বতশ্রেণী থেকে পূর্বে ছোটনাগপুর মালভূমি পর্যন্ত।
- গঠন: এর পশ্চিম অংশ স্থানীয়ভাবে মালওয়া মালভূমি নামে পরিচিত। আরাবল্লী পর্বতমালা হলো বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত, যা মধ্য উচ্চভূমির উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। বিন্ধ্য পর্বতশ্রেণী এই অঞ্চলের দক্ষিণ সীমা নির্ধারণ করে।
- নদীপ্রবাহ: এই অঞ্চলের নদীগুলি দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বে প্রবাহিত হয়, যেমন চম্বল, সিন্ধ, বেতোয়া এবং কেন, যা ইঙ্গিত করে যে এই অঞ্চলের ঢাল উত্তর-পূর্ব দিকে।
- পূর্বাঞ্চলীয় প্রসার: মধ্য উচ্চভূমির পূর্বাঞ্চলীয় প্রসারকে স্থানীয়ভাবে বুন্দেলখণ্ড এবং বাঘেলখণ্ড নামেও জানা যায়। আরও পূর্বে এই মালভূমি ছোটনাগপুর মালভূমিতে বিস্তৃত, যা খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
খ) দাক্ষিণাত্য মালভূমি (The Deccan Plateau):
- অবস্থান: এটি একটি ত্রিভুজাকার ভূখণ্ড যা নর্মদা নদীর দক্ষিণে অবস্থিত। এর উত্তর প্রান্তে সাতপুরা পর্বতশ্রেণী রয়েছে এবং এর পূর্বে মহাদেব, কাইমুর পাহাড় এবং মাইকাল পর্বতশ্রেণীগুলি এর পূর্ব সীমান্ত গঠন করে।
- গঠন: দাক্ষিণাত্য মালভূমি পশ্চিম দিকে উচ্চ এবং পূর্ব দিকে ঢালু। এর একটি অংশ উত্তর-পূর্ব দিকে বিস্তৃত, যা স্থানীয়ভাবে মেঘালয়, কার্বি-আংলং মালভূমি এবং উত্তর কাছাড় পাহাড় নামে পরিচিত। এটি ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে একটি ফল্ট বা ফাটল দ্বারা বিচ্ছিন্ন।
- দাক্ষিণাত্য ফঁদ (Deccan Trap): এই মালভূমির একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো দাক্ষিণাত্য ফঁদ, যা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে গঠিত লাভা দ্বারা গঠিত কালো মাটি অঞ্চল। এখানকার শিলাগুলি আগ্নেয় প্রকৃতির, যা সময়ের সাথে সাথে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে কালো মাটিতে পরিণত হয়েছে, যা তুলা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
- পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট:
- পশ্চিমঘাট পর্বতমালা: এটি দাক্ষিণাত্য মালভূমির পশ্চিম প্রান্তে আরব সাগরের সমান্তরালে অবস্থিত। এটি একটি অবিচ্ছিন্ন পর্বতশ্রেণী এবং উচ্চতায় ১,৬০০ মিটার পর্যন্ত উঁচু। পশ্চিমঘাট পর্বতের উচ্চতা উত্তর থেকে দক্ষিণে বৃদ্ধি পায়। এখানে উল্লেখযোগ্য গিরিপথ যেমন থলঘাট, ভোরঘাট এবং পালঘাট রয়েছে। এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলি হলো আনাইমুদি (২,৬৯৫ মিটার) এবং দোডাবেট্টা (২,৬৩৭ মিটার)। এই পর্বতমালা পশ্চিম ঢালে অধিক বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- পূর্বঘাট পর্বতমালা: এটি দাক্ষিণাত্য মালভূমির পূর্ব প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের সমান্তরালে অবস্থিত। এটি বিচ্ছিন্ন এবং অনিয়মিত, এবং মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা ও কাবেরী নদী দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এর গড় উচ্চতা ৬০০ মিটার। পূর্বঘাটের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলো মহেন্দ্রগিরি (১,৫০০ মিটার)। পূর্বঘাট এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ঘটায় না বরং বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চল তৈরি করে।
গুরুত্ব:
উপদ্বীপীয় মালভূমি খনিজ সম্পদে (যেমন লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, বক্সাইট ইত্যাদি) সমৃদ্ধ। এর কালো মাটি তুলা, তৈলবীজ এবং অন্যান্য ফসলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এটি পেনিনসুলার ভারতের প্রধান নদীগুলির (যেমন গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী, মহানদী) উৎসস্থল।
৪. ভারতীয় মরুভূমি (The Indian Desert - The Thar Desert)
ভারতীয় মরুভূমি, যা থর মরুভূমি নামেও পরিচিত, আরাবল্লী পর্বতমালার পশ্চিম প্রান্তে রাজস্থানের পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এটি বিশ্বের নবম বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমি।
গঠন ও বৈশিষ্ট্য:
- জলবায়ু: এটি একটি বালুকাময় সমভূমি যা ঢেউ খেলানো বালিয়াড়ি দ্বারা আবৃত। এই অঞ্চলের জলবায়ু অত্যন্ত শুষ্ক, যেখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১৫০ মিমি-এরও কম। এর ফলে এখানে শুষ্ক জলবায়ু এবং স্বল্প উদ্ভিদ দেখা যায়।
- নদী: এই অঞ্চলের প্রধান এবং একমাত্র উল্লেখযোগ্য নদী হলো লুনি, যা একটি অন্তঃসলিলা নদী। এটি শুধুমাত্র বর্ষাকালে প্রবাহিত হয় এবং সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই বালিতে বিলীন হয়ে যায়। এই অঞ্চলে অন্যান্য ছোট ছোট নদী বা জলধারাগুলির বেশিরভাগই অস্থায়ী।
- বালিয়াড়ি: থর মরুভূমির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বার্খান (অর্ধচন্দ্রাকার বালিয়াড়ি), যা ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। তবে, দ্রাঘিমা বরাবর বালিয়াড়িগুলিও মরুভূমির অভ্যন্তরীণ অংশে দেখা যায়।
- উদ্ভিদ: মরুভূমির শুষ্ক পরিবেশে কেবল কাঁটাঝোপ, বাবলা, ফণীমনসা এবং কিছু খরা-সহনশীল গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ জন্মায়।
গুরুত্ব:
থর মরুভূমি তার অনন্য পরিবেশের জন্য বিখ্যাত এবং বিশেষ ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের আবাসস্থল। এটি পর্যটন এবং উট পালনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মরুভূমি অঞ্চল হলেও, সাম্প্রতিককালে ইন্দিরা গান্ধী খাল প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু এলাকায় সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যা কৃষি উৎপাদনকে কিছুটা সম্ভব করেছে।
৫. উপকূলীয় সমভূমি (The Coastal Plains)
উপদ্বীপীয় মালভূমিটি পূর্বে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে আরব সাগর দ্বারা বেষ্টিত। এই মালভূমির দু'পাশে সংকীর্ণ উপকূলীয় সমভূমিগুলি প্রসারিত।
প্রধান বিভাগ:
উপকূলীয় সমভূমিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
ক) পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি (The Western Coastal Plain):
- অবস্থান: এটি আরব সাগরের সমান্তরালে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এবং আরব সাগরের মধ্যে অবস্থিত। এটি অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ এবং এর গড় প্রস্থ ৫০-৮০ কিমি। এটি উত্তর থেকে দক্ষিণে তিনটি ভাগে বিভক্ত:
- কোঙ্কন উপকূল: মুম্বাই থেকে গোয়া পর্যন্ত বিস্তৃত উত্তর অংশ। এই অংশটি বন্দরের জন্য বিখ্যাত।
- কানাড়া সমভূমি: কর্ণাটকের মধ্য অংশ।
- মালাবার উপকূল: কেরালার দক্ষিণাংশ। এই উপকূলে কিছু লেগুন এবং কয়াল (backwaters) দেখা যায়, যা নৌবিহার এবং পর্যটনের জন্য জনপ্রিয়।
- বৈশিষ্ট্য: এই সমভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত ও বিচ্ছিন্ন, এবং এখানে কয়েকটি ছোট ছোট, দ্রুতগামী নদী সমুদ্রে পতিত হয়েছে। প্রাকৃতিক পোতাশ্রয় এবং বন্দরের জন্য এটি আদর্শ।
খ) পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি (The Eastern Coastal Plain):
- অবস্থান: এটি বঙ্গোপসাগরের সমান্তরালে পূর্বঘাট পর্বতমালা এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। এটি পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমির চেয়ে অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত এবং এর গড় প্রস্থ ১০০-১৩০ কিমি। এটি উত্তর থেকে দক্ষিণে দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত:
- উত্তর সরকার উপকূল: মহানদী এবং কৃষ্ণা নদীর মধ্যবর্তী উত্তর অংশ। এখানে চিলকা হ্রদ অবস্থিত, যা ভারতের বৃহত্তম লবণাক্ত জলের হ্রদ।
- করমণ্ডল উপকূল: কৃষ্ণা নদী থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত দক্ষিণ অংশ।
- বৈশিষ্ট্য: পূর্ব উপকূলে মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা এবং কাবেরী নদীর দ্বারা গঠিত বিশাল ব-দ্বীপ দেখা যায়, যা এই অঞ্চলকে অত্যন্ত উর্বর করে তুলেছে। এই সমভূমি পলি সঞ্চয়ের কারণে গঠিত এবং এর উপকূলরেখা অপেক্ষাকৃত মসৃণ।
গুরুত্ব:
উপকূলীয় সমভূমি মৎস্যচাষ, কৃষি (বিশেষত ধান ও নারকেল), বন্দর এবং বাণিজ্য কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার কয়াল ও লেগুনগুলি পর্যটন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনে সাহায্য করে।
৬. দ্বীপপুঞ্জ (The Islands)
ভারতবর্ষের প্রধান ভূখণ্ড ছাড়াও দুটি প্রধান দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে, যা তার ভূপ্রকৃতির বৈচিত্র্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
ক) লক্ষদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জ (The Lakshadweep Islands):
- অবস্থান: এটি আরব সাগরে কেরালা উপকূলের কাছে অবস্থিত। এই দ্বীপপুঞ্জের পূর্ব নাম ছিল লাকাদাইভ, মিনিকয় এবং আমিনদিভি। ১৯৭৩ সালে এগুলির নামকরণ করা হয় লক্ষদ্বীপ।
- গঠন: লক্ষদ্বীপ হলো প্রবাল দ্বারা গঠিত একটি দ্বীপপুঞ্জ (অ্যাটল)। এগুলি আকারে ছোট এবং মোট ৩৭টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। এর আয়তন মাত্র ৩২ বর্গ কিলোমিটার।
- বৈশিষ্ট্য: কাভারাত্তি দ্বীপ হলো লক্ষদ্বীপের প্রশাসনিক সদর দফতর। এই দ্বীপপুঞ্জে উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রচুর বৈচিত্র্য দেখা যায়। পিট্টি দ্বীপ, যা একটি জনবসতিহীন দ্বীপ, একটি পাখির অভয়ারণ্য হিসাবে পরিচিত।
- গুরুত্ব: এর পরিবেশগত গুরুত্ব অপরিসীম। এটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং পর্যটনের জন্য জনপ্রিয়।
খ) আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ (The Andaman and Nicobar Islands):
- অবস্থান: এটি বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এবং উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত। এগুলি আকারে অনেক বড় এবং সংখ্যায় অনেক বেশি।
- গঠন: এই দ্বীপপুঞ্জকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায় – উত্তরে আন্দামান এবং দক্ষিণে নিকোবর। এগুলি মূলত নিমজ্জিত পর্বতশ্রেণীর উত্থান এবং আগ্নেয় ক্রিয়াকলাপের ফল।
- বৈশিষ্ট্য: এই দ্বীপপুঞ্জগুলি ঘন বন দ্বারা আবৃত এবং এখানে বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত দেখা যায়। ভারতের একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, ব্যারেন দ্বীপ, এখানে অবস্থিত। এখানে নিরক্ষীয় জলবায়ু দেখা যায় এবং এর ফলে এখানে ঘন ক্রান্তীয় বৃষ্টিপাত হয়।
- গুরুত্ব: আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারতের কৌশলগত অবস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেশের প্রতিরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এখানকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পোর্ট ব্লেয়ার এই দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী। ভারতের দক্ষিণতম বিন্দু, ইন্দিরা পয়েন্ট, গ্রেট নিকোবর দ্বীপে অবস্থিত।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: হিমালয়ের প্রধান তিনটি সমান্তরাল পর্বতশ্রেণী কী কী? তাদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।
উত্তর: হিমালয়ের প্রধান তিনটি সমান্তরাল পর্বতশ্রেণী হলো:
- বৃহৎ হিমালয় বা হিমাাদ্রি: এটি হিমালয়ের সবচেয়ে উত্তরের এবং উচ্চতম পর্বতশ্রেণী, যার গড় উচ্চতা ৬,০০০ মিটার। বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলি (যেমন মাউন্ট এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা) এখানেই অবস্থিত। এটি গ্রানাইট দ্বারা গঠিত এবং সারা বছর বরফে ঢাকা থাকে।
- নিম্ন হিমালয় বা হিমাচল: এটি হিমাাদ্রির দক্ষিণে অবস্থিত, যার উচ্চতা ৩,৭০০ থেকে ৪,৫০০ মিটার। এখানকার প্রস্থ প্রায় ৫০ কিলোমিটার। এই অংশে পীর পঞ্জাল, ধৌলাধর, মহাভারত ইত্যাদি পর্বতশ্রেণী রয়েছে এবং কাশ্মীর, কুলু উপত্যকার মতো শৈলশহর দেখা যায়।
- শিবালিক বা বহিঃহিমালয়: এটি হিমালয়ের সবচেয়ে দক্ষিণের এবং সর্বনিম্ন পর্বতশ্রেণী, যার উচ্চতা ৯০০ থেকে ১১০০ মিটার। প্রস্থ ১০ থেকে ৫০ কিলোমিটার। এটি নদী দ্বারা বাহিত নুড়ি ও পলি দ্বারা গঠিত। শিবালিক এবং হিমাচলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে 'দুন' নামে অনুদৈর্ঘ্য উপত্যকাগুলি দেখা যায়, যেমন দেরাদুন।
প্রশ্ন ২: উত্তর ভারতের সমভূমির বিভিন্ন আঞ্চলিক বিভাগগুলি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: উত্তর ভারতের সমভূমির মধ্যে ভূমিরূপের সূক্ষ্ম পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে এটিকে উত্তর থেকে দক্ষিণে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
- ভাঁবর (Bhabar): এটি শিবালিকের পাদদেশে ৮-১৬ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি সংকীর্ণ অঞ্চল, যেখানে নদী দ্বারা বাহিত নুড়ি-পাথর জমা হয়। এখানে নদীর জল নুড়ির স্তরের নিচে অদৃশ্য হয়ে যায়।
- তরাই (Terai): ভাঁবর অঞ্চলের দক্ষিণে অবস্থিত এই ভেজা, জলাভূমি এবং বনভূমিপূর্ণ অঞ্চল। এখানে নদীগুলো আবার পৃষ্ঠে ফিরে আসে, যা এটিকে বন্যপ্রাণীর জন্য সমৃদ্ধ আবাসস্থল করে তোলে।
- ভাঙর (Bhangar): এটি সমভূমির পুরাতন পলিমাটি দ্বারা গঠিত উচ্চতর অংশ, যা প্লাবনভূমির উপরে অবস্থিত। এখানে 'কংকর' নামে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের কণা দেখা যায়।
- খাদর (Khadar): এটি সমভূমির নবীন পলিমাটি দ্বারা গঠিত নিম্নভূমি, যা নদীর প্লাবনভূমির কাছাকাছি অবস্থিত। প্রতি বছর বন্যার সময় নতুন পলি জমা হওয়ায় এটি অত্যন্ত উর্বর।
প্রশ্ন ৩: উপদ্বীপীয় মালভূমির মধ্য উচ্চভূমি এবং দাক্ষিণাত্য মালভূমির মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: উপদ্বীপীয় মালভূমির দুটি প্রধান বিভাগ হলো মধ্য উচ্চভূমি এবং দাক্ষিণাত্য মালভূমি। তাদের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি নিম্নরূপ:
- অবস্থান: মধ্য উচ্চভূমি নর্মদা নদীর উত্তরে অবস্থিত, আর দাক্ষিণাত্য মালভূমি নর্মদা নদীর দক্ষিণে অবস্থিত।
- বিস্তৃতি: মধ্য উচ্চভূমি পশ্চিমে আরাবল্লী থেকে পূর্বে ছোটনাগপুর মালভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত। দাক্ষিণাত্য মালভূমি একটি ত্রিভুজাকার ভূখণ্ড যা উত্তরে সাতপুরা, পূর্বে মহাদেব, কাইমুর ও মাইকাল পর্বতশ্রেণী দ্বারা বেষ্টিত।
- নদীপ্রবাহ: মধ্য উচ্চভূমির নদীগুলি (যেমন চম্বল, সিন্ধ, বেতোয়া) দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বে প্রবাহিত হয়। দাক্ষিণাত্য মালভূমির প্রধান নদীগুলি (যেমন গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী) সাধারণত পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়।
- গঠন: মধ্য উচ্চভূমি মূলত মালওয়া মালভূমি, বুন্দেলখণ্ড এবং বাঘেলখণ্ড নিয়ে গঠিত। দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট পর্বতমালা এবং দাক্ষিণাত্য ফঁদ (কালো মাটির অঞ্চল) দেখা যায়।
প্রশ্ন ৪: পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি এবং পূর্ব উপকূলীয় সমভূমির মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি কী কী?
উত্তর: পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি এবং পূর্ব উপকূলীয় সমভূমির মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:
- অবস্থান: পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি আরব সাগরের সমান্তরালে অবস্থিত, আর পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি বঙ্গোপসাগরের সমান্তরালে অবস্থিত।
- বিস্তৃতি ও প্রস্থ: পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি সংকীর্ণ এবং বিচ্ছিন্ন, যার গড় প্রস্থ ৫০-৮০ কিমি। এটি কোঙ্কন, কানাড়া এবং মালাবার উপকূলে বিভক্ত। পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি প্রশস্ত এবং অবিচ্ছিন্ন, যার গড় প্রস্থ ১০০-১৩০ কিমি। এটি উত্তর সরকার এবং করমণ্ডল উপকূলে বিভক্ত।
- নদী ও ব-দ্বীপ: পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমিতে কোনো বড় ব-দ্বীপ দেখা যায় না। এখানে ছোট ছোট নদী দ্রুত সমুদ্রে পতিত হয়। পূর্ব উপকূলীয় সমভূমিতে মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা ও কাবেরী নদীর দ্বারা গঠিত বিশাল উর্বর ব-দ্বীপ দেখা যায়।
- বৈশিষ্ট্য: পশ্চিম উপকূলে কয়াল ও লেগুন দেখা যায়। পূর্ব উপকূলে চিলকা হ্রদের মতো বড় হ্রদ দেখা যায়।
সারসংক্ষেপ
ভারতের ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং একে ছয়টি প্রধান ভূপ্রাকৃতিক বিভাগে ভাগ করা যায়, যার প্রত্যেকটির নিজস্ব গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং গুরুত্ব রয়েছে।
- হিমালয় পর্বতমালা: বিশ্বের নবীনতম ও উচ্চতম ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণী, যা উত্তর ভারতের জলবায়ু ও নদী ব্যবস্থার মূল উৎস।
- উত্তর ভারতের সমভূমি: সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটি দ্বারা গঠিত বিশ্বের অন্যতম উর্বর ও ঘন জনবসতিপূর্ণ কৃষি অঞ্চল, যা ভাঁবর, তরাই, ভাঙর ও খাদর রূপে বিভক্ত।
- উপদ্বীপীয় মালভূমি: ভারতের প্রাচীনতম ও স্থিতিশীল ভূখণ্ড, যা মধ্য উচ্চভূমি এবং দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে বিভক্ত, খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এবং কালো মাটির জন্য বিখ্যাত।
- ভারতীয় মরুভূমি (থর): আরাবল্লীর পশ্চিমে অবস্থিত একটি শুষ্ক ও বালুকাময় অঞ্চল, যেখানে স্বল্প বৃষ্টিপাত হয় এবং লুনি নদী দেখা যায়।
- উপকূলীয় সমভূমি: উপদ্বীপীয় মালভূমির দু'পাশে অবস্থিত পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি, যা মৎস্যচাষ, কৃষি ও বন্দরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং ব-দ্বীপ ও লেগুনে সমৃদ্ধ।
- দ্বীপপুঞ্জ: আরব সাগরের প্রবাল গঠিত লক্ষদ্বীপ এবং বঙ্গোপসাগরের আগ্নেয় ও পর্বতীয় আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, যা জীববৈচিত্র্য ও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
এই প্রতিটি বিভাগ ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করে। এই বৈচিত্র্যই ভারতকে পৃথিবীর অন্যতম অনন্য দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে।