বিষয়ের ভূমিকা

দ্বাদশ শ্রেণি ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায় ‘বন্ধু, সমাজ এবং বর্ণ’ আমাদের প্রাচীন ভারতীয় সমাজের এক অনন্য দর্পণের সামনে দাঁড় করায়। এই অধ্যায়ে আমরা খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের সামাজিক গঠন, পারিবারিক কাঠামো, লিঙ্গভিত্তিক প্রথা এবং বর্ণভেদের শিকড় নিয়ে আলোচনা করব। তৎকালীন সময়ে সামাজিক নিয়মকানুন কীভাবে নির্ধারিত হতো এবং তার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর কেমন ছিল, তা বোঝা এই অধ্যায়ের মূল উদ্দেশ্য। মহাকাব্য বিশেষত মহাভারতের বিশ্লেষণ আমাদের সেই সময়ের সমাজজীবন বুঝতে সাহায্য করে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. মহাভারতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

মহাভারত কেবল একটি মহাকাব্য নয়, এটি তৎকালীন সামাজিক ইতিহাসের এক বিশাল আকর। ঐতিহাসিক ভি. এস. সুকথনকারের নেতৃত্বে মহাভারতের একটি জটিল সংস্করণ বা 'ক্রিটিক্যাল এডিশন' তৈরি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায়:

  • বিভিন্ন অঞ্চলের পাণ্ডুলিপির মধ্যে মিল ও অমিল খুঁজে বের করা।
  • তৎকালীন সময়ে সামাজিক আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত।
  • ধর্মসূত্র ও ধর্মশাস্ত্রের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজের নীতি নির্ধারণ।

২. বর্ণ ব্যবস্থা এবং সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস

প্রাচীন ভারতীয় সমাজে বর্ণ ব্যবস্থা কঠোরভাবে সমাজকে চারটি স্তরে ভাগ করেছিল:

  • ব্রাহ্মণ: সমাজের সর্বোচ্চ শিখরে এবং বেদ অধ্যয়ন ও যজ্ঞের দায়িত্বে।
  • ক্ষত্রিয়: শাসনকার্য এবং যুদ্ধবিগ্রহ পরিচালনা করা এদের কাজ।
  • বৈশ্য: কৃষি, পশুপালন এবং বাণিজ্যের সাথে যুক্ত।
  • শূদ্র: উপরোক্ত তিনটি বর্ণের সেবা করা।

স্মৃতিশাস্ত্র অনুযায়ী, এই বর্ণ নির্ধারণ ছিল জন্মগত, কিন্তু বাস্তবে সমাজ সবসময় এই নিয়মের অনুগত ছিল না। অনেক সময় অ-ক্ষত্রিয় রাজাদের উত্থান এই প্রথার অসারতা প্রমাণ করে।

৩. বর্ণবহির্ভূত মানুষ ও অস্পৃশ্যতা

বর্ণ ব্যবস্থার বাইরেও এক বড় জনগোষ্ঠী ছিল যারা 'অন্ত্যজ' বা ম্লেচ্ছ হিসেবে পরিচিত ছিল। মনুস্মৃতিতে এদের জন্য অত্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। চণ্ডালদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা এবং তাদের জীবনযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা তৎকালীন সামাজিক বৈষম্যের চরম নিদর্শন।

৪. লিঙ্গভিত্তিক অধিকার ও সম্পত্তি

প্রাচীন সমাজে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো ছিল প্রধান। নারীদের সম্পত্তির অধিকার ছিল সীমিত। কেবলমাত্র পিতার মৃত্যুর পর ভাইদের মধ্যে সম্পত্তির বণ্টন হতো। তবে 'প্রভাবতী গুপ্ত'-এর মতো নারী শাসকদের উদাহরণ প্রমাণ করে যে, সমাজে কিছু ব্যতিক্রমও ছিল যেখানে নারীরা রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করতেন।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: মহাভারতের 'ক্রিটিক্যাল এডিশন' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ভি. এস. সুকথনকারের নেতৃত্বে দেশজুড়ে থাকা মহাভারতের বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে সেগুলোর সাধারণ শ্লোকগুলো চিহ্নিত করে যে সংস্করণ তৈরি করা হয়েছিল, তাকেই ক্রিটিক্যাল এডিশন বলে।

প্রশ্ন ২: বর্ণ এবং জাতির মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: বর্ণ হলো শাস্ত্রীয়ভাবে নির্ধারিত চারটি প্রধান গোষ্ঠী। অন্যদিকে জাতি হলো একই পেশা বা কুল ভিত্তিক অনেক বেশি জটিল ও নমনীয় সামাজিক গোষ্ঠী।

প্রশ্ন ৩: চণ্ডালদের অবস্থান কোথায় ছিল?
উত্তর: চণ্ডালরা বর্ণ ব্যবস্থার বাইরে ছিল এবং তাদের সমাজ থেকে দূরে বাস করতে হতো। তাদের মৃতদেহ বহন ও বর্জ্য পরিষ্কারের মতো 'অপবিত্র' কাজ করতে হতো।

সারসংক্ষেপ

  • মহাভারতের ক্রিটিক্যাল এডিশন প্রাচীন সমাজের আদর্শ ও বাস্তবের তুলনামূলক চিত্র দেয়।
  • বর্ণ ব্যবস্থা জন্মগত হলেও সামাজিক বিবর্তনে এর প্রয়োগ সবসময় কঠোর ছিল না।
  • পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীর সম্পত্তির অধিকার ছিল নামমাত্র।
  • অন্ত্যজ বা চণ্ডালদের জীবনযাত্রার মাধ্যমে তৎকালীন সামাজিক বৈষম্য ফুটে ওঠে।