বিষয়ের ভূমিকা
গণতন্ত্রের মূল ধারণাটি কেবল জনগণের শাসন নয়, বরং এটি ক্ষমতার সঠিক বণ্টনের ওপর টিকে থাকে। দশম শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রথম অধ্যায় 'ক্ষমতার বণ্টন' (Power Sharing) আমাদের শেখায় যে কীভাবে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা বিভিন্ন স্তরে এবং গোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয় যাতে সমাজের প্রতিটি অংশ শাসন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। এই অধ্যায়টি মূলত বেলজিয়াম এবং শ্রীলঙ্কার দুটি পৃথক উদাহরণের মাধ্যমে আমাদের বোঝায় যে ক্ষমতার বণ্টন কেন অপরিহার্য এবং এর অভাব কী ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। শিক্ষার্থীদের জন্য এই অধ্যায়টি বোঝা অত্যন্ত জরুরি কারণ এটি আধুনিক রাজনীতির মূল ভিত্তি স্থাপন করে।
বেলজিয়াম ও শ্রীলঙ্কার গল্প: দুটি বিপরীত চিত্র
ক্ষমতার বণ্টনের গুরুত্ব বোঝার জন্য এনসিইআরটি বইয়ে দুটি দেশের জাতিগত গঠন এবং তাদের গৃহীত পদক্ষেপের তুলনা করা হয়েছে।
১. বেলজিয়ামের প্রেক্ষাপট:
বেলজিয়াম ইউরোপের একটি ক্ষুদ্র দেশ যার জনসংখ্যা আমাদের হরিয়ানা রাজ্যের চেয়েও কম। কিন্তু এর জাতিগত গঠন অত্যন্ত জটিল।
- জাতিগত গঠন: দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৯ শতাংশ মানুষ ফ্লেমিশ (Flemish) অঞ্চলে থাকেন এবং ওলন্দাজ (Dutch) ভাষায় কথা বলেন। ৪০ শতাংশ মানুষ ওয়ালোনিয়া (Wallonia) অঞ্চলে থাকেন এবং ফরাসি (French) ভাষায় কথা বলেন। অবশিষ্ট ১ শতাংশ মানুষ জার্মান ভাষায় কথা বলেন।
- রাজধানী ব্রাসেলস: এখানে চিত্রটি উল্টো। ব্রাসেলসের ৮০ শতাংশ মানুষ ফরাসিভাষী এবং ২০ শতাংশ ওলন্দাজভাষী।
- সংঘাতের কারণ: ফরাসিভাষী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টি ছিল তুলনামূলকভাবে ধনী এবং শক্তিশালী। অন্যদিকে, ওলন্দাজভাষী সংখ্যাগুরুরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিক্ষার সুবিধা অনেক পরে পেয়েছিল। এটি ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
২. শ্রীলঙ্কার প্রেক্ষাপট:
শ্রীলঙ্কা ভারতের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র। এখানেও জাতিগত বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়।
- জাতিগত গঠন: প্রধান সামাজিক গোষ্ঠী হলো সিংহলি (Sinhala), যারা মোট জনসংখ্যার ৭৪ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রধান গোষ্ঠী হলো তামিল (Tamil), যারা ১৮ শতাংশ।
- তামিলদের উপবিভাগ: তামিলদের মধ্যে আবার দুটি ভাগ রয়েছে—শ্রীলঙ্কান তামিল (১৩%) এবং ভারতীয় তামিল (যাদের পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশ আমলে বাগানে কাজ করতে এসেছিলেন)।
- ধর্মীয় বিভাজন: সিংহলিদের অধিকাংশই বৌদ্ধ, আর তামিলদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম উভয়ই রয়েছে। প্রায় ৭ শতাংশ খ্রিস্টান উভয় গোষ্ঠী থেকেই রয়েছেন।
শ্রীলঙ্কায় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ (Majoritarianism)
শ্রীলঙ্কা ১৯৪৮ সালে স্বাধীন হয়। সেখানকার সিংহলি নেতারা তাদের সংখ্যাধিক্যের জোরে শাসন ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন। এর ফলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার 'সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ' নীতি গ্রহণ করে।
- ১৯৫৬ সালের আইন: ১৯৫৬ সালে একটি আইন পাস করা হয় যার মাধ্যমে তামিল ভাষাকে উপেক্ষা করে সিংহলি ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- সরকারি চাকুরি ও শিক্ষা: বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে সিংহলি আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়।
- ধর্মীয় প্রচার: রাষ্ট্রীয়ভাবে বৌদ্ধ ধর্মকে সংরক্ষণ ও উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফলাফল: এই পদক্ষেপগুলো শ্রীলঙ্কান তামিলদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার বোধ তৈরি করে। তারা মনে করে যে কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। এর ফলে তামিল ও সিংহলিদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটিতে একটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ (Civil War) শুরু হয়, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দেয়।
বেলজিয়ামের বুদ্ধিমত্তা ও সমঝোতা (Accommodation)
বেলজিয়াম শ্রীলঙ্কার মতো ভুল করেনি। তারা বুঝতে পেরেছিল যে সংঘাত এড়াতে হলে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে সম্মান জানানো প্রয়োজন। ১৯৭০ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে তারা তাদের সংবিধানে চারবার সংশোধন আনে।
- সমান প্রতিনিধিত্ব: কেন্দ্রীয় সরকারে ওলন্দাজ এবং ফরাসিভাষী মন্ত্রীদের সংখ্যা সমান রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠী একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
- রাজ্য সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় সরকারের অনেক ক্ষমতা রাজ্যের দুটি আঞ্চলিক সরকারকে দেওয়া হয়। রাজ্য সরকারগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ নয়।
- ব্রাসেলসের ব্যবস্থা: রাজধানীতে একটি পৃথক সরকার গঠিত হয় যেখানে উভয় সম্প্রদায়ের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়।
- সামাজিক সরকার (Community Government): তৃতীয় এক ধরনের সরকার ব্যবস্থা তৈরি করা হয় যা সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং ভাষা সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখাশোনা করবে। এই সরকারটি নির্দিষ্ট ভাষার মানুষের দ্বারা নির্বাচিত হয়, তারা যেখানেই থাকুন না কেন।
বেলজিয়ামের এই মডেলটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয় এবং এটি দেশে শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
ক্ষমতার বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা কেন?
ক্ষমতার বণ্টন কেন প্রয়োজন, তার পিছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করে:
- সুচিন্তিত বা যুক্তিপূর্ণ কারণ (Prudential Reasons): ক্ষমতার বণ্টন বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমায়। যেহেতু সামাজিক সংঘাত প্রায়ই সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে পরিচালিত করে, তাই ক্ষমতার বণ্টন রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সহায়ক। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের ঐক্যের জন্য উপকারী।
- নৈতিক কারণ (Moral Reasons): ক্ষমতার বণ্টন হলো গণতন্ত্রের আত্মা। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যারা ক্ষমতার অনুশীলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাদের শাসনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। বৈধ সরকার সেটাই যেখানে নাগরিকরা অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।
ক্ষমতার বণ্টনের বিভিন্ন রূপ
আধুনিক গণতন্ত্রে ক্ষমতার বণ্টন সাধারণত চারটি উপায়ে দেখা যায়:
- ক্ষমতার অনুভূমিক বণ্টন (Horizontal Distribution): যখন ক্ষমতা সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন—আইনসভা, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে ভাগ করা হয়। একে 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' (Checks and Balances) ব্যবস্থাও বলা হয় কারণ প্রতিটি অঙ্গ একে অপরের ওপর নজর রাখে।
- ক্ষমতার উলম্ব বা স্তরভিত্তিক বণ্টন (Vertical Distribution): যখন ক্ষমতা বিভিন্ন স্তরের সরকারের মধ্যে ভাগ করা হয়, যেমন—পুরো দেশের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এবং আঞ্চলিক স্তরে রাজ্য সরকার। ভারতে একে 'যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো' বলা হয়।
- সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টন: ক্ষমতা বিভিন্ন ধর্মীয় এবং ভাষাগত গোষ্ঠীর মধ্যেও ভাগ করা যেতে পারে। বেলজিয়ামের 'সামাজিক সরকার' এর একটি চমৎকার উদাহরণ। ভারতের 'সংরক্ষিত নির্বাচন মণ্ডলী' ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়কে ক্ষমতার অংশীদার করার একটি উপায়।
- রাজনৈতিক দল ও চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী: বহুদলীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতার বণ্টন ঘটে যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জোট সরকার গঠন করে। এছাড়াও বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী (যেমন—ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক) সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে পরোক্ষভাবে ক্ষমতার অংশীদার হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের মূল কারণ কী ছিল?
উত্তর: শ্রীলঙ্কায় সিংহলি সরকার কর্তৃক গৃহীত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী নীতিগুলো তামিলদের অধিকার খর্ব করে এবং তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার বোধ তৈরি করে। ১৯৫৬ সালের আইন এবং তামিলদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণই গৃহযুদ্ধের প্রধান কারণ।
২. বেলজিয়ামের 'সামাজিক সরকার' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: এটি ওলন্দাজ, ফরাসি এবং জার্মান ভাষাভাষী মানুষের দ্বারা নির্বাচিত একটি বিশেষ ধরনের সরকার। এই সরকারের হাতে মূলত শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ভাষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে।
৩. ক্ষমতার বণ্টনের নৈতিক কারণটি কী?
উত্তর: নৈতিক কারণ অনুযায়ী, ক্ষমতার বণ্টন হলো গণতন্ত্রের মূল চেতনা। গণতন্ত্রের অর্থই হলো জনগণের শাসন, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের শাসন প্রক্রিয়ায় মত প্রকাশের অধিকার থাকবে।
সারসংক্ষেপ
- ক্ষমতার বণ্টন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং সামাজিক সংঘাত দূর করে।
- বেলজিয়াম সমঝোতার মাধ্যমে বৈচিত্র্যকে মেনে নিয়েছিল, অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের পথে চলে ধ্বংস ডেকে এনেছিল।
- ক্ষমতার সুচিন্তিত কারণ সংঘাত কমায় এবং নৈতিক কারণ গণতন্ত্রের আত্মাকে রক্ষা করে।
- আইনসভা, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার অনুভূমিক বণ্টন সুশাসন নিশ্চিত করে।
- যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ক্ষমতার উলম্ব বণ্টনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়।