বিষয়ের ভূমিকা

জীববিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চিত্তাকর্ষক অধ্যায় হলো 'কলা' বা Tissue। আমরা আগের অধ্যায়ে জেনেছি যে, কোষ হলো জীবনের মৌলিক একক। কিন্তু এককোষী জীবের ক্ষেত্রে একটিমাত্র কোষই সমস্ত জৈবিক ক্রিয়া (যেমন—খাদ্য গ্রহণ, শ্বসন, রেচন) সম্পন্ন করে। কিন্তু আমাদের মতো বহুকোষী জীবে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে কোটি কোটি কোষ রয়েছে, যারা সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো থাকে এবং নির্দিষ্ট কাজ ভাগ করে নেয়। এই শ্রম বিভাজনই বা 'Division of Labour' হলো কলার মূল ভিত্তি।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, একই আকৃতি এবং একই উৎস থেকে উৎপন্ন একগুচ্ছ কোষ যখন সম্মিলিতভাবে কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে, তখন তাকে কলা বলা হয়। এই পোস্টে আমরা নবম শ্রেণির এনসিইআরটি (NCERT) পাঠ্যসূচি অনুযায়ী উদ্ভিদ ও প্রাণী কলার প্রকারভেদ, তাদের গঠন এবং কার্যাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. উদ্ভিদ কলা (Plant Tissues)

উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের মধ্যে জীবনযাত্রার অনেক পার্থক্য রয়েছে। উদ্ভিদ সাধারণত স্থির থাকে, তাই তাদের এমন কলার প্রয়োজন যা তাদের যান্ত্রিক শক্তি ও কাঠামো প্রদান করে। উদ্ভিদের বৃদ্ধিও নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভিদ কলাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়:

  • ভাজক কলা (Meristematic Tissue): উদ্ভিদের যে নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোষ বিভাজন ঘটে, সেখানে এই কলা থাকে। অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এটি তিন প্রকার:
    ১. অগ্রস্থ ভাজক কলা (Apical Meristem): এটি কাণ্ড ও মূলের অগ্রভাগে থাকে এবং দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
    ২. পার্শ্বস্থ ভাজক কলা (Lateral Meristem): এটি কাণ্ড বা মূলের পরিধি বা স্থূলতা বৃদ্ধি করে।
    ৩. নিবেশিত ভাজক কলা (Intercalary Meristem): এটি পাতার গোড়ায় বা পর্বের মধ্যবর্তী অংশে দেখা যায়।
  • স্থায়ী কলা (Permanent Tissue): যখন ভাজক কলার কোষগুলি বিভাজিত হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে নির্দিষ্ট আকার ও কাজ গ্রহণ করে, তখন তাকে স্থায়ী কলা বলে। এই প্রক্রিয়াকে 'ডিফারেন্সিয়েশন' বা পৃথকীকরণ বলা হয়।

২. সরল স্থায়ী কলা (Simple Permanent Tissue)

এই কলাগুলি এক প্রকারের কোষ দিয়ে গঠিত। এদের মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  • প্যারেনকাইমা (Parenchyma): এটি উদ্ভিদের সবচেয়ে সাধারণ কলা। এই কোষগুলি সজীব এবং এদের মধ্যে অনেকটা আন্তঃকোষীয় ফাঁক থাকে। এরা খাদ্য সঞ্চয় করে। যখন এতে ক্লোরোফিল থাকে, তখন একে 'ক্লোরেনকাইমা' বলে এবং এটি সালোকসংশ্লেষণে সাহায্য করে। জলজ উদ্ভিদে বড় বায়ু কুঠুরি থাকলে তাকে 'অ্যারেনকাইমা' বলে।
  • কোলেনকাইমা (Collenchyma): এটি উদ্ভিদে নমনীয়তা প্রদান করে। গাছের কচি কাণ্ড বা পাতার বোঁটা ভাঙা ছাড়াই বাঁকানো সম্ভব হয় এই কলার কারণে। এদের কোষ প্রাচীর কোণগুলিতে স্থূল হয়।
  • স্কেলেরেনকাইমা (Sclerenchyma): এটি উদ্ভিদকে শক্ত ও মজবুত করে। নারকেলের ছোবড়া বা বীজের শক্ত আবরণ এই কলা দিয়ে তৈরি। এর কোষগুলি মৃত এবং লিগনিন যুক্ত হওয়ায় অত্যন্ত শক্ত হয়।

৩. জটিল স্থায়ী কলা (Complex Permanent Tissue)

একাধিক ধরণের কোষ নিয়ে গঠিত কলাকে জটিল কলা বলে। জাইলেম ও ফ্লোয়েম হলো এর প্রধান উদাহরণ। এদের একত্রে 'পরিবহন কলা' (Vascular Tissue) বলা হয়।

  • জাইলেম (Xylem): এটি জল ও খনিজ লবণ মূল থেকে পাতায় পরিবহন করে। এর উপাদানগুলি হলো—ট্র্যাকিড, ট্রাকিয়া, জাইলেম প্যারেনকাইমা এবং জাইলেম তন্তু।
  • ফ্লোয়েম (Phloem): এটি পাতায় তৈরি খাদ্য উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দেয়। এর উপাদানগুলি হলো—সিব নল (Sieve tubes), সঙ্গী কোষ (Companion cells), ফ্লোয়েম তন্তু এবং ফ্লোয়েম প্যারেনকাইমা।

৪. প্রাণী কলা (Animal Tissues)

প্রাণীদের জীবন প্রক্রিয়া উদ্ভিদের তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল। কাজ অনুযায়ী প্রাণীদের দেহে চার ধরণের প্রধান কলা দেখা যায়:

  • আবরণী কলা (Epithelial Tissue): এটি শরীরের বাইরের আবরণ এবং দেহের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর প্রতিরক্ষা স্তর তৈরি করে। কাজ ও গঠন অনুযায়ী এটি বিভিন্ন প্রকারের হয়, যেমন—সরল আঁশাকার (Squamous), ঘনকাকার (Cuboidal) এবং স্তম্ভাকার (Columnar) আবরণী কলা।
  • যোগ কলা (Connective Tissue): নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে।
    ১. রক্ত: এটি একটি তরল যোগ কলা যা পুষ্টি, গ্যাস ও বর্জ্য পরিবহন করে।
    ২. অস্থি: এটি শরীরের কাঠামো তৈরি করে।
    ৩. তরুণাস্থি (Cartilage): এটি হাড়ের সংযোগস্থলে ঘর্ষণ কমায় এবং কান বা নাকের ডগায় থাকে।
    ৪. লিগামেন্ট ও টেনডন: লিগামেন্ট দুটি হাড়কে যুক্ত করে এবং টেনডন পেশিকে হাড়ের সাথে যুক্ত করে।
  • পেশি কলা (Muscular Tissue): আমাদের চলাফেরার জন্য এই কলা দায়ী। এটি তিন প্রকার:
    ১. ঐচ্ছিক পেশি (Striated/Voluntary): যা আমাদের ইচ্ছামতো কাজ করে (যেমন হাতের পেশি)।
    ২. অনৈচ্ছিক পেশি (Smooth/Involuntary): যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই (যেমন পাকস্থলীর পেশি)।
    ৩. হৃদপেশি (Cardiac muscle): হৃদপিণ্ডের দেওয়ালে থাকা এই পেশি সারা জীবন ছন্দময়ভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়।
  • স্নায়ু কলা (Nervous Tissue): উদ্দীপনা গ্রহণ ও শরীরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বার্তা পাঠানোর কাজ করে এই কলা। মস্তিষ্ক, সুষুম্নাকাণ্ড এবং স্নায়ু এই কলা দিয়ে গঠিত। এর একককে বলা হয় 'নিউরন'।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১. উদ্ভিদ ও প্রাণী কলার মধ্যে একটি প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: উদ্ভিদের অধিকাংশ কলা মৃত এবং যান্ত্রিক শক্তি প্রদানকারী হয় কারণ তারা স্থির থাকে। অন্যদিকে, প্রাণীদের অধিকাংশ কলা সজীব এবং চলাফেরার জন্য বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়।

২. জাইলেম ও ফ্লোয়েম কলার প্রধান কাজ কী?
উত্তর: জাইলেম মূল থেকে জল ও খনিজ পদার্থ ঊর্ধ্বমুখে পাতায় পরিবহন করে। ফ্লোয়েম পাতায় প্রস্তুত খাদ্য উদ্ভিদের সমস্ত সজীব অঙ্গে (উভয় মুখে) পরিবহন করে।

৩. নিউরনের গঠন কীরূপ?
উত্তর: একটি নিউরন তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত—কোষ দেহ (Cell body), ডেনড্রাইট (ক্ষুদ্র শাখা) এবং অ্যাক্সন (দীর্ঘ শাখা)। এটি বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করে।

সারসংক্ষেপ

  • একই উৎস ও কাজ সম্পন্ন একগুচ্ছ কোষকে কলা বলে।
  • উদ্ভিদ কলা মূলত ভাজক ও স্থায়ী কলায় বিভক্ত।
  • সরল স্থায়ী কলা হলো প্যারেনকাইমা, কোলেনকাইমা ও স্কেলেরেনকাইমা।
  • জাইলেম ও ফ্লোয়েম উদ্ভিদের সংবহন তন্ত্র গঠন করে।
  • প্রাণী দেহের চারটি প্রধান কলা হলো—আবরণী, যোগ, পেশি এবং স্নায়ু কলা।
  • রক্ত হলো এক বিশেষ ধরণের তরল যোগ কলা।
  • পেশি কলা সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে চলাফেরায় সাহায্য করে।
  • স্নায়ু কলা নিউরনের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে শরীরকে নিয়ন্ত্রিত রাখে।