বিষয়ের ভূমিকা
কৃষি ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ভারত একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং এর জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি কেবল আমাদের খাদ্যের যোগান দেয় না, বরং বিভিন্ন শিল্পের জন্য কাঁচামাল সরবরাহ করে। NCERT দশম শ্রেণির ভূগোল পাঠ্যবইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে ভারতের কৃষির বিভিন্ন দিক, শস্যের ধরণ এবং কৃষিক্ষেত্রে সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই ব্লগে আমরা সেই বিষয়গুলোই সহজ ও সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা করব।
কৃষির ধরণ (Types of Farming)
ভারত একটি বিশাল দেশ, তাই জলবায়ু এবং মাটির বৈচিত্র্য অনুযায়ী এখানে বিভিন্ন ধরণের কৃষি পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়:
- ১. আদিম জীবনধারণ ভিত্তিক কৃষি (Primitive Subsistence Farming): এটি মূলত ছোট জমির টুকরোতে আদিম সরঞ্জাম (যেমন- কোদাল, লাঙল) ব্যবহার করে করা হয়। এটি পুরোপুরি মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতার ওপর নির্ভরশীল। একে 'ঝুম চাষ' বা 'স্থানান্তর কৃষি'ও বলা হয়।
- ২. নিবিড় জীবনধারণ ভিত্তিক কৃষি (Intensive Subsistence Farming): যেখানে জনসংখ্যার চাপ বেশি, সেখানে এই ধরণের চাষ করা হয়। অধিক ফলন পাওয়ার জন্য প্রচুর পরিমাণে জৈব-রাসায়নিক সার এবং সেচ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।
- ৩. বাণিজ্যিক কৃষি (Commercial Farming): এই চাষের প্রধান উদ্দেশ্য হলো উৎপন্ন ফসল বাজারে বিক্রি করা। এতে উচ্চ ফলনশীল বীজ (HYV), রাসায়নিক সার, এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। পাঞ্জাব ও হরিয়ানার ধান-গম চাষ এর বড় উদাহরণ।
- ৪. রোপণ কৃষি (Plantation Farming): এটি এক ধরণের বাণিজ্যিক কৃষি যেখানে একটি বড় এলাকায় একটি মাত্র শস্য চাষ করা হয়। যেমন- চা, কফি, রাবার ইত্যাদি।
শস্যের ঋতু বা শস্য পর্যায় (Cropping Pattern)
ভারতে মূলত তিনটি প্রধান শস্য ঋতু দেখা যায়:
- খরিফ (Kharif): বর্ষাকালের শুরুতে (জুন-জুলাই) বপন করা হয় এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে কাটা হয়। উদাহরণ: ধান, ভুট্টা, পাট, তুলা।
- রবি (Rabi): শীতকালে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বপন করা হয় এবং গ্রীষ্মকালে (এপ্রিল-জুন) কাটা হয়। উদাহরণ: গম, বার্লি, মটর, সরিষা।
- জায়েদ (Zaid): রবি এবং খরিফ মৌসুমের মাঝখানের স্বল্প সময়ে এই চাষ হয়। উদাহরণ: তরমুজ, শসা, শাকসবজি।
প্রধান শস্যসমূহ (Major Crops)
ভারতের মাটির বৈচিত্র্য ও জলবায়ু অনুযায়ী প্রধান শস্যগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. খাদ্যশস্য (Food Crops)
- ধান (Rice): ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ। এটি একটি খরিফ শস্য যার জন্য উচ্চ তাপমাত্রা (২৫° সেলসিয়াসের ওপরে) এবং অধিক আর্দ্রতা (১০০ সেমি-র বেশি বৃষ্টিপাত) প্রয়োজন।
- গম (Wheat): উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের প্রধান খাদ্যশস্য। এটি একটি রবি শস্য। এটি পাকার সময় উজ্জ্বল রোদ এবং বার্ষিক ৫০ থেকে ৭৫ সেমি বৃষ্টিপাত প্রয়োজন।
- ভুট্টা (Maize): এটি খাদ্য এবং পশুখাদ্য উভয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত খরিফ শস্য হলেও বিহারের মতো রাজ্যে এটি রবি মৌসুমেও চাষ হয়।
২. ডাল ও তৈলবীজ
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ডাল উৎপাদনকারী এবং ব্যবহারকারী দেশ। অড়হর, মুগ, মুসুর এবং ছোলা প্রধান ডাল জাতীয় শস্য। এগুলি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, বাদাম, সরিষা, নারকেল ও তিল হলো প্রধান তৈলবীজ যা রান্নার তেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৩. পানীয় শস্য (Beverage Crops)
- চা (Tea): এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রোপণ কৃষি। ভারতের আসাম, পশ্চিমবঙ্গ (দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি) চায়ের জন্য বিখ্যাত। চায়ের জন্য উর্বর মাটি এবং সারা বছর সুষম বৃষ্টিপাত প্রয়োজন।
- কফি (Coffee): ভারত তার উন্নত মানের কফির জন্য বিশ্বে পরিচিত। নীলগিরি পার্বত্য অঞ্চলে ভারতের অধিকাংশ কফি উৎপাদিত হয়।
৪. তন্তু জাতীয় শস্য (Fiber Crops)
- তুলা (Cotton): এটি দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চলের কৃষ্ণ মৃত্তিকায় ভালো জন্মে। তুলা চাষের জন্য ২১০ দিন তুষারমুক্ত আবহাওয়া প্রয়োজন।
- পাট (Jute): একে 'সোনালী তন্তু' বলা হয়। এটি মূলত পশ্চিমবঙ্গের গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে ভালো জন্মে।
প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
ভারতের কৃষিকে উন্নত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:
- সবুজ বিপ্লব (Green Revolution): উচ্চ ফলনশীল বীজ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
- শ্বেত বিপ্লব (White Revolution/Operation Flood): দুধের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
- কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (KCC): কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
- বীমা প্রকল্প: খরা, বন্যা বা পোকার আক্রমণে ফসল নষ্ট হলে কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে 'প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা' চালু করা হয়েছে।
ভূদান ও গ্রামদান আন্দোলন
বিনোবা ভাবে এই অহিংস আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ধনী জমিদারদের কাছ থেকে জমি নিয়ে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। এটি 'রক্তপাতহীন বিপ্লব' নামেও পরিচিত।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. রবি ও খরিফ শস্যের মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: খরিফ শস্য বর্ষাকালে (জুন-জুলাই) চাষ করা হয়, যেমন ধান। অন্যদিকে, রবি শস্য শীতকালে (অক্টোবর-নভেম্বর) চাষ করা হয়, যেমন গম।
২. স্থানান্তর কৃষি বা ঝুম চাষ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: এটি এমন একটি আদিম কৃষি পদ্ধতি যেখানে বনের কোনো অংশ পুড়িয়ে পরিষ্কার করে কয়েক বছর চাষ করা হয় এবং মাটির উর্বরতা কমে গেলে অন্য স্থানে চলে যাওয়া হয়।
৩. ভারতের কৃষিতে বর্তমান প্রধান চ্যালেঞ্জগুলি কী কী?
উত্তর: মাটির ক্ষয়, ভূগর্ভস্থ জলস্তরের নিচে নেমে যাওয়া, ছোট জোত বা জমির অসম বণ্টন এবং জলবায়ু পরিবর্তন ভারতের কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সারসংক্ষেপ
- কৃষি ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক কার্যকলাপ।
- ভারত ধান, গম, ডাল এবং চায়ের মতো শস্য উৎপাদনে বিশ্বে অগ্রণী।
- আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি সংস্কার ভারতের কৃষিকে বাণিজ্যিক রূপ দিচ্ছে।
- টেকসই কৃষি বা জৈব কৃষি বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চাহিদা।