বিষয়ের ভূমিকা
উনিশ শতকের ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উত্থান ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈপ্লবিক ঘটনা। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া ছিল যা ইউরোপের রাজনৈতিক এবং মানসিক মানচিত্রকে আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছিল। এর ফলে বহুমুখী রাজবংশীয় সাম্রাজ্যগুলির পরিবর্তে 'জাতি-রাষ্ট্র' (Nation-State) গঠিত হয়। এই অধ্যায়টি আমাদের শিখায় কীভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে একাত্মতা,Shared Identity বা ভাগ করে নেওয়া ইতিহাসের বোধ তৈরি হয়েছিল। ফ্রেডরিক সোরিউ-এর চিত্রকর্ম থেকে শুরু করে ফরাসি বিপ্লব এবং পরবর্তীতে নেপোলিয়নের প্রশাসনিক সংস্কার—এই সবকিছুই ইউরোপে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. ফ্রেডরিক সোরিউ-এর কল্পনা এবং গণতান্ত্রিক আদর্শ
১৮৪৮ সালে ফরাসি শিল্পী ফ্রেডরিক সোরিউ চারটি চিত্রের একটি সিরিজ তৈরি করেছিলেন। সেখানে তিনি একটি এমন বিশ্বের কল্পনা করেছিলেন যা 'গণতান্ত্রিক এবং সামাজিক প্রজাতন্ত্র' দিয়ে গঠিত। এই চিত্রগুলিতে দেখা যায় ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন বয়সের নারী ও পুরুষরা স্বাধীনতার প্রতিমূর্তির (Statue of Liberty) কাছে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যাচ্ছে। তাদের হাতে রয়েছে মশাল এবং মানুষের অধিকারের সনদ। এটি প্রতীকীভাবে দেখায় যে, মানুষ স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
২. ফরাসি বিপ্লব এবং জাতির ধারণা
১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ছিল আধুনিক জাতীয়তাবাদের প্রথম স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। এই বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র থেকে ফরাসি নাগরিকদের হাতে স্থানান্তরিত হয়। বিপ্লবীরা বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন যা ফরাসি জনগণের মধ্যে একাত্মতার বোধ তৈরি করে:
- লা পাত্রি (La Patrie) এবং লে সিতোয়েন (Le Citoyen): পিতৃভূমি এবং নাগরিকের ধারণা প্রচার করা হয়, যা একটি সংবিধানের অধীনে সমান অধিকারের ওপর জোর দেয়।
- নতুন জাতীয় পতাকা: রাজকীয় পতাকার পরিবর্তে তেরঙা ফরাসি পতাকা গ্রহণ করা হয়।
- জাতীয় সংগীত ও শপথ: নতুন স্তোত্র ও শপথ গ্রহণ করা হয় এবং শহীদদের স্মরণ করা হয়।
- কেন্দ্রীয় প্রশাসন: সারা দেশের জন্য অভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয় এবং অভ্যন্তরীণ কাস্টমস ডিউটি বাতিল করা হয়।
- ফরাসি ভাষা: আঞ্চলিক উপভাষাগুলোকে নিরুৎসাহিত করে প্যারিসে প্রচলিত ফরাসি ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রচার করা হয়।
৩. নেপোলিয়নের কোড (Napoleonic Code)
১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট 'বেসামরিক কোড' বা 'Civil Code' প্রবর্তন করেন। যদিও তিনি ফ্রান্সে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছিলেন, তবে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন:
- জন্মগত সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা হয়।
- আইনের চোখে সকলের সমানাধিকার নিশ্চিত করা হয়।
- সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত করা হয়।
- পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো হয় এবং ওজন ও পরিমাপের অভিন্ন পদ্ধতি চালু করা হয়।
৪. ইউরোপে জাতীয়তাবাদের প্রসার: উদারনীতি ও নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি
আঠারো শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউরোপে কোনো 'জাতি-রাষ্ট্র' ছিল না। জার্মানি, ইতালি বা সুইজারল্যান্ড ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। শিল্পায়নের ফলে একটি নতুন সামাজিক শ্রেণি—'মধ্যবিত্ত শ্রেণি'র উদ্ভব ঘটে। এই শিক্ষিত মধ্যবিত্তরাই প্রথম জাতীয় একতার ধারণা নিয়ে আসে। তাদের কাছে 'উদারতাবাদ' (Liberalism) ছিল ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং আইনের দৃষ্টিতে সাম্য। রাজনৈতিকভাবে এটি একটি ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার এবং সংবিধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে।
৫. বিপ্লবীদের যুগ (১৮৩০-১৮৪৮)
১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের পতনের পর ভিয়েনা কংগ্রেসের মাধ্যমে রক্ষণশীল শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। তবে উদারপন্থী এবং জাতীয়তাবাদীরা এর বিরোধিতা চালিয়ে যান।
- জিউসেপ্পে মাজিনি: তিনি ছিলেন একজন ইতালীয় বিপ্লবী। তিনি 'Young Italy' এবং 'Young Europe' নামক গুপ্ত সংগঠন গঠন করেন এবং ইতালির একত্রীকরণের স্বপ্ন দেখেন।
- গ্রিসের স্বাধীনতা যুদ্ধ: ১৮২১ সালে শুরু হওয়া এই সংগ্রাম ইউরোপের শিক্ষিত অভিজাতদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মনোভাবকে শক্তিশালী করে। ১৮৩২ সালের কনস্টান্টিনোপলের চুক্তির মাধ্যমে গ্রিস একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
- রোমান্টিকতা: জাতীয়তাবাদ কেবল যুদ্ধের মাধ্যমেই নয়, বরং শিল্প, কাব্য, গল্প এবং সংগীতের মাধ্যমেও বিকশিত হয়েছিল। একেই বলা হয় 'রোমান্টিক জাতীয়তাবাদ'।
৬. জার্মানি ও ইতালির একত্রীকরণ
জার্মানি: ১৮৪৮ সালের পর প্রুশিয়ার নেতৃত্বে জার্মানি একত্রীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রুশিয়ার মুখ্যমন্ত্রী ওটো ভন বিসমার্ক ছিলেন এই প্রক্রিয়ার স্থপতি। 'রক্ত ও লৌহ' (Blood and Iron) নীতির মাধ্যমে তিনি তিনটি যুদ্ধের পর ১৮৭১ সালে জার্মানিকে একটি অখণ্ড রাষ্ট্রে পরিণত করেন।
ইতালি: ইতালিও সাতটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল। মাজিনি, কাউন্ট কাভুর এবং জিউসেপ্পে গ্যারিবল্ডির নেতৃত্বে ইতালি একত্রিত হয়। ১৮৬১ সালে দ্বিতীয় ভিক্টর ইমানুয়েলকে ঐক্যবদ্ধ ইতালির রাজা ঘোষণা করা হয়।
৭. জাতীয়তাবাদের রূপক: মারিয়ান ও জার্মেনিয়া
উনিশ শতকে শিল্পীরা জাতিকে এক একজন মানুষের (প্রধানত নারী) রূপে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। ফ্রান্সে জাতির রূপক হিসেবে 'মারিয়ান' (Marianne) ব্যবহৃত হতো, যা স্বাধীনতা ও প্রজাতন্ত্রের প্রতীক। অন্যদিকে, জার্মানির রূপক ছিল 'জার্মেনিয়া' (Germania), যিনি ওক পাতার মুকুট পরতেন, যা বীরত্বের প্রতীক।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ওটো ভন বিসমার্ক কে ছিলেন?
উত্তর: ওটো ভন বিসমার্ক ছিলেন প্রুশিয়ার মুখ্যমন্ত্রী এবং আধুনিক জার্মানির একত্রীকরণের প্রধান কারিগর। তিনি তার সামরিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে জার্মানিকে একটি শক্তিশালী জাতি-রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন।
প্রশ্ন ২: ভিয়েনা কংগ্রেস (১৮১৫) কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ডিউক মেটারনিকের নেতৃত্বে ভিয়েনা কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল নেপোলিয়নের যুদ্ধের ফলে ইউরোপে আসা পরিবর্তনগুলো ফিরিয়ে আনা এবং রক্ষণশীল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা।
প্রশ্ন ৩: জিউসেপ্পে গ্যারিবল্ডি কে ছিলেন?
উত্তর: গ্যারিবল্ডি ছিলেন একজন বিখ্যাত ইতালীয় বিপ্লবী এবং যোদ্ধা। তিনি 'রেড শার্টস' (Red Shirts) নামক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেছিলেন এবং দক্ষিণ ইতালির রাজ্যগুলিকে একত্রিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সারসংক্ষেপ
- ইউরোপে জাতীয়তাবাদ একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার ফসল ছিল যা ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে শুরু হয়।
- নেপোলিয়নের প্রশাসনিক সংস্কার এবং ভিয়েনা কংগ্রেসের রক্ষণশীলতা জাতীয়তাবাদী চেতনাকে উদ্দীপিত করে।
- বিপ্লবীদের সংগ্রাম এবং রোমান্টিক আন্দোলনের ফলে মানুষের মধ্যে দেশের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে।
- জার্মানি এবং ইতালি তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলি থেকে বেরিয়ে এসে ঐক্যবদ্ধ জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
- ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে জাতীয়তাবাদ সাম্রাজ্যবাদের রূপ নিতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দিকে পরিচালিত করে।