বিষয়ের ভূমিকা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে বিশ্ব রাজনীতি মূলত দুটি মেরুতে বিভক্ত ছিল। একদিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লক এবং অন্যদিকে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক। এই অবস্থাকে বলা হতো ‘দ্বিমেরু বিশ্ব’ (Bipolar World)। তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আকস্মিক পতনের ফলে এই দ্বিমেরু ব্যবস্থার অবসান ঘটে। দ্বাদশ শ্রেণি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই দ্বিতীয় অধ্যায়টি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে কেন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল এবং তার পরবর্তী সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে কী ধরনের আমূল পরিবর্তন এসেছিল। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা সোভিয়েত ব্যবস্থা, মিখাইল গর্বাচেভের সংস্কার নীতি, এবং ‘শক থেরাপি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. সোভিয়েত ব্যবস্থা (Soviet System) কী ছিল?

সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর গঠিত হয়েছিল। এটি মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী আদর্শের উপর ভিত্তি করে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করত। সোভিয়েত ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল নিম্নরূপ:

  • একদলীয় শাসন: এখানে কেবলমাত্র কমিউনিস্ট পার্টির অস্তিত্ব ছিল। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা বিরোধী মতাদর্শের কোনো স্থান ছিল না।
  • রাষ্ট্রীয় মালিকানা: উৎপাদনের সকল উপকরণের ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। জমি থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা—সবই ছিল সরকারি।
  • পরিকল্পিত অর্থনীতি: রাষ্ট্রই নির্ধারণ করত কী উৎপন্ন হবে এবং কীভাবে তা বণ্টিত হবে। কোনো মুক্ত বাজার ব্যবস্থা ছিল না।
  • সামাজিক নিরাপত্তা: সোভিয়েত ইউনিয়ন তার নাগরিকদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রদান করত।

২. মিখাইল গর্বাচেভ এবং তার সংস্কার নীতি

১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে মিখাইল গর্বাচেভ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। তিনি সোভিয়েত ব্যবস্থায় বিদ্যমান স্থবিরতা কাটাতে দুটি বিশেষ নীতি গ্রহণ করেন:

  • পেরেস্ত্রোইকা (Perestroika): এর অর্থ হলো ‘পুনর্গঠন’। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো সংস্কারের জন্য এটি চালু করা হয়।
  • গ্লাসনস্ত (Glasnost): এর অর্থ হলো ‘খোলাখুলি আলোচনা’ বা ‘স্বচ্ছতা’। সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা ও তথ্য জানার অধিকার প্রদানের লক্ষ্যে এটি শুরু হয়েছিল।

তবে গর্বাচেভের এই সংস্কারগুলি হিতে বিপরীত হয়। মানুষ যে স্বাধীনতা পায়, তা ব্যবহার করে তারা সোভিয়েত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই সরব হয়ে ওঠে এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্রতর হয়।

৩. সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণসমূহ

কেন একটি সুপারপাওয়ার বা মহাশক্তি মাত্র কয়েক বছরে ভেঙে গেল? এর প্রধান কারণগুলি হলো:

  • অর্থনৈতিক স্থবিরতা: সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের সম্পদের সিংহভাগ খরচ করত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং মহাকাশ গবেষণায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অভাব দেখা দেয়।
  • রাজনৈতিক দুর্নীতি: দীর্ঘ ৭০ বছরের শাসনে কমিউনিস্ট পার্টি আমলাতান্ত্রিক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সাধারণ মানুষের সাথে সরকারের কোনো সংযোগ ছিল না।
  • পাশ্চাত্যের তুলনায় পিছিয়ে পড়া: সোভিয়েত নাগরিকরা বুঝতে পারছিলেন যে আমেরিকা বা পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় তাদের জীবনযাত্রার মান অনেক নিচে।
  • জাতীয়তাবাদের উত্থান: রাশিয়া, বাল্টিক দেশসমূহ (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া), ইউক্রেন ও জর্জিয়ার মতো প্রজাতন্ত্রগুলিতে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয়তাবাদী বিক্ষোভ বাড়তে থাকে।

৪. শক থেরাপি (Shock Therapy) ও তার ফলাফল

সোভিয়েত পতনের পর রাষ্ট্রগুলি সমাজতন্ত্র থেকে সরাসরি পুঁজিবাদে রূপান্তরের চেষ্টা করে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) দ্বারা নির্দেশিত এই বেদনাদায়ক রূপান্তর প্রক্রিয়াকে ‘শক থেরাপি’ বলা হয়। এর ফল ছিল ভয়াবহ:

  • রাশিয়ার মুদ্রার মান মারাত্মকভাবে কমে যায়।
  • সবচেয়ে বড় শিল্পকারখানাগুলো নামমাত্র দামে ব্যক্তিগত মালিকানায় বিক্রি করে দেওয়া হয়, যাকে ‘ইতিহাসের বৃহত্তম গ্যারেজ সেল’ বলা হয়।
  • সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়।

৫. ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও রাশিয়ার সাথে ভারতের গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রয়েছে। ভারত ও রাশিয়া উভয়েই একটি ‘বহুমেরু বিশ্ব’ (Multipolar World) গঠনের পক্ষপাতী। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, মহাকাশ গবেষণা এবং জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে রাশিয়া আজও ভারতের অন্যতম প্রধান সহযোগী।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১. বার্লিন প্রাচীরের পতন কবে হয়েছিল এবং এটি কিসের প্রতীক?
উত্তর: ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর বার্লিন প্রাচীরের পতন হয়। এটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি এবং দ্বিমেরু বিশ্ব ব্যবস্থার অবসানের প্রধান প্রতীক।

২. ‘শক থেরাপি’র একটি প্রধান কুফল কী ছিল?
উত্তর: শক থেরাপির ফলে রাশিয়ার সরকারি নিয়ন্ত্রিত বিশাল শিল্প ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের সঞ্চিত অর্থ মূল্যহীন হয়ে পড়েছিল।

৩. সোভিয়েত ইউনিয়ন কত সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়?
উত্তর: ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুশ আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির ঘোষণা দেয়।

সারসংক্ষেপ

  • সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটায়।
  • পুঁজিবাদ এবং গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের তুলনায় বেশি শক্তিশালী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
  • আমেরিকা বিশ্বের একমাত্র মহাশক্তি (Unipolar Power) হিসেবে আবির্ভূত হয়।
  • সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলি স্বাধীনতা লাভ করে এবং নতুন সার্বভৌম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
  • ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য এই পরিবর্তন বৈদেশিক নীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ তৈরি করে।