বিষয়ের ভূমিকা
গণতন্ত্রের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো – আইনসভা (Legislature), কার্যपालिका (Executive) এবং বিচারবিভাগ (Judiciary)। প্রতিটি স্তম্ভের নিজস্ব ভূমিকা ও দায়িত্ব রয়েছে, যা একটি দেশের শাসনব্যবস্থাকে সচল রাখে। আজকের এই বিশদ আলোচনায় আমরা NCERT-এর একাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়, অর্থাৎ ‘কার্যपालिका’ বা Executive নিয়ে深入 আলোচনা করব। সরকারের এই অঙ্গটি আইনসভা দ্বারা প্রণীত আইন ও নীতিসমূহকে বাস্তবায়িত করার দায়িত্বে থাকে।
আমরা যখন ‘সরকার’ শব্দটি ব্যবহার করি, তখন সাধারণত আমরা কার্যपालिका বা Executive-কেই বুঝি। কার্যपालिका শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত নয়; এর মধ্যে রয়েছে লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মচারী, যারা আমলা (Bureaucrats) হিসেবে পরিচিত। এই অধ্যায়ে আমরা ভারতের শাসনব্যবস্থার কার্যনির্বাহী অঙ্গের গঠন, ক্ষমতা, কার্যাবলী এবং এর বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানব। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার পার্থক্য থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্রের গুরুত্ব পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়কে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হবে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
কার্যपालिका কী? বিভিন্ন ধরনের কার্যपालिका
সরকারের যে অঙ্গ নিয়ম-কানুন ও আইনকে বাস্তবে প্রয়োগ করে এবং প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করে, তাকেই কার্যपालिका বা Executive বলা হয়। কার্যপালিকার প্রধান কাজ হলো আইনসভার তৈরি করা আইনগুলোকে কার্যকর করা।
নীতিগতভাবে, কার্যপালিকার আকার ও গঠনে ভিন্নতা দেখা যায়। কিছু কার্যপালিকার নেতৃত্বে থাকেন একজন ব্যক্তি, আবার কোথাও একটি গোষ্ঠী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূলত তিন ধরনের কার্যपालिका দেখা যায়:
- সংসদীয় ব্যবস্থা (Parliamentary System): এই ব্যবস্থায়, সরকার প্রধান হন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হন এবং আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। এই ব্যবস্থায় একজন রাষ্ট্রপ্রধানও থাকেন, যিনি নামমাত্র শাসক (Nominal Head) হতে পারেন (যেমন ভারতের রাষ্ট্রপতি) অথবা একজন সাংবিধানিক রাজা/রানি হতে পারেন (যেমন ব্রিটেনে)। এই ব্যবস্থায়, কার্যपालिका এবং আইনসভা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। ভারত, জার্মানি, ইতালি, জাপান এবং ব্রিটেনের মতো দেশে এই ব্যবস্থা প্রচলিত।
- রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা (Presidential System): এই ব্যবস্থায়, রাষ্ট্রপতিই হলেন একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকার প্রধান। রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন এবং তিনি আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল এবং ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে এই ব্যবস্থা দেখা যায়।
- অর্ধ-রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা (Semi-Presidential System): এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দুজনেই থাকেন, কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থার চেয়ে রাষ্ট্রপতির হাতে অনেক বেশি ক্ষমতা থাকে। কখনও কখনও, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী একই দলের হতে পারেন, আবার ভিন্ন দলেরও হতে পারেন। ফ্রান্স, রাশিয়া এবং শ্রীলঙ্কায় এই ধরনের ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়।
ভারতের সংসদীয় কার্যपालिका: কেন এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো?
ভারতের সংবিধান প্রণেতারা বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থা পর্যালোচনার পর সংসদীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল:
- দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা: সংসদীয় ব্যবস্থায় কার্যपालिका (মন্ত্রিসভা) আইনসভার (লোকসভা) কাছে দায়বদ্ধ থাকে। আইনসভা অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে কার্যপালিকাকে পদচ্যুত করতে পারে। এটি সরকারের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কমায়।
- অভিজ্ঞতা: ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকাকালীন ಭಾರತীয়রা সংসদীয় ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত ছিল। ১৯১৯ এবং ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এই ব্যবস্থার একটি ভিত্তি তৈরি করেছিল। তাই এই পরিচিত ব্যবস্থাটি গ্রহণ করা সহজ ছিল।
- ব্যক্তিপূজার আশঙ্কা হ্রাস: রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তির হাতে বিপুল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, যা ব্যক্তিপূজার জন্ম দিতে পারে। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে এটি বিপজ্জনক হতে পারতো। সংসদীয় ব্যবস্থায় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার মধ্যে বণ্টিত থাকে, যা এই ঝুঁকি কমায়।
এই ব্যবস্থায়, রাষ্ট্রপতি হলেন আনুষ্ঠানিক বা নামমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান (Nominal Head) এবং প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভা হলেন প্রকৃত কার্যনির্বাহী (Real Executive)।
রাষ্ট্রপতি: নির্বাচন, ক্ষমতা এবং পদমর্যাদা
ভারতীয় সংবিধানের ৫২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ভারতে একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন। তিনি হলেন ভারতের প্রথম নাগরিক এবং দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও সংহতির প্রতীক।
রাষ্ট্রপতির নির্বাচন প্রক্রিয়া
ভারতের রাষ্ট্রপতি জনগণের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত হন না। তিনি একটি নির্বাচক মণ্ডলী (Electoral College) দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচক মণ্ডলীর সদস্যরা হলেন:
- সংসদের উভয় কক্ষের (লোকসভা ও রাজ্যসভা) নির্বাচিত সদস্যরা।
- সমস্ত রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যরা।
- দিল্লি ও পুদুচেরি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যরা।
এই নির্বাচনটি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) এবং একক হস্তান্তরযোগ্য ভোট (Single Transferable Vote) পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলী
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- শাসন বিভাগীয় ক্ষমতা (Executive Powers): ভারত সরকারের সমস্ত শাসন সংক্রান্ত কাজ রাষ্ট্রপতির নামে পরিচালিত হয়। তিনি প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী, রাজ্যের রাজ্যপাল, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, UPSC-এর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ করেন। তিনি ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক (Supreme Commander)।
- আইন বিভাগীয় ক্ষমতা (Legislative Powers): রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান ও সমাপ্তি ঘোষণা করতে পারেন এবং লোকসভা ভেঙে দিতে পারেন। সংসদে পাস হওয়া কোনো বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতি ছাড়া আইনে পরিণত হয় না। তিনি সংসদে ভাষণ দেন এবং সংসদের অধিবেশন বন্ধ থাকাকালীন অধ্যাদেশ বা অর্ডিন্যান্স (Ordinance) জারি করতে পারেন।
- অর্থনৈতিক ক্ষমতা (Financial Powers): রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়া কোনো অর্থবিল (Money Bill) লোকসভায় পেশ করা যায় না। তিনি ভারতের আকস্মিক তহবিল (Contingency Fund of India) নিয়ন্ত্রণ করেন এবং প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অর্থ কমিশন (Finance Commission) গঠন করেন।
- বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা (Judicial Powers): রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ করেন। সংবিধানের ৭২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, তিনি কোনো অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তির দণ্ডাদেশ স্থগিত, হ্রাস বা ক্ষমা করতে পারেন। এমনকি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দণ্ডও তিনি ক্ষমা (Pardon) করতে পারেন।
- জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত ক্ষমতা (Emergency Powers): সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে তিন ধরনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার ক্ষমতা দিয়েছে:
- জাতীয় জরুরি অবস্থা (National Emergency - Article 352): যুদ্ধ, বহিরাগত আক্রমণ বা সশস্ত্র বিদ্রোহের কারণে।
- রাজ্যে সাংবিধানিক অচলাবস্থা বা রাষ্ট্রপতি শাসন (State Emergency - Article 356): কোনো রাজ্যে সাংবিধানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে।
- আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial Emergency - Article 360): দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হলে।
রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা (Discretionary Powers)
সাধারণত, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার পরামর্শ মেনে চলতে বাধ্য। সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কিন্তু ৪৪তম সংশোধনীতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভার পরামর্শ পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারেন। যদি মন্ত্রিসভা সেই পরামর্শ পুনরায় পাঠায়, তবে রাষ্ট্রপতি তা মানতে বাধ্য থাকবেন।
তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি নিজের विवेक বা বুদ্ধি প্রয়োগ করতে পারেন:
- প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ: লোকসভা নির্বাচনে কোনো দল বা জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে, কাকে সরকার গড়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন, সেই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতি নিজের विवेक অনুযায়ী নেন।
- ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ: সংসদ কর্তৃক পাস হওয়া কোনো বিল (অর্থবিল ছাড়া) রাষ্ট্রপতি সম্মতি না দিয়ে পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারেন। একে বলা হয় সাসপেনসিভ ভেটো (Suspensive Veto)। এছাড়াও, তিনি বিলে সম্মতি না দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেলে রাখতে পারেন, যা পকেট ভেটো (Pocket Veto) নামে পরিচিত।
- লোকসভা ভেঙে দেওয়া: যদি কোনো সরকার লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং কোনো বিকল্প সরকার গঠনের সম্ভাবনা না থাকে, তখন রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভার পরামর্শে বা নিজের विवेक অনুযায়ী লোকসভা ভেঙে দিতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভা
ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হলেন সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। তিনি হলেন প্রকৃত সরকার প্রধান।
প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ ও ক্ষমতা
সংবিধানের ৭৫(১) ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন। প্রথা অনুযায়ী, লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কোনো নির্দিষ্ট কার্যকাল নেই; তিনি রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি পর্যন্ত পদে থাকেন, যার অর্থ হলো যতক্ষণ পর্যন্ত লোকসভায় তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রধান কাজগুলি হলো:
- মন্ত্রিসভা গঠন: প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের তালিকা তৈরি করেন এবং রাষ্ট্রপতি তাঁদের নিয়োগ করেন। তিনি মন্ত্রীদের মধ্যে দপ্তর বণ্টন করেন।
- সরকারের প্রধান: তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এবং সরকারের নীতি নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করেন।
- রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিসভার যোগসূত্র: সংবিধানের ৭৮ ধারা অনুযায়ী, সরকারের সমস্ত সিদ্ধান্ত ও আইন প্রণয়নের প্রস্তাব সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করা প্রধানমন্ত্রীর কর্তব্য।
- জাতির নেতা: প্রধানমন্ত্রী হলেন সমগ্র দেশের নেতা। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।
- লোকসভার নেতা: তিনি লোকসভার নেতা হিসেবে সংসদের কার্যপরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মন্ত্রিসভা (Council of Ministers)
প্রধানমন্ত্রীকে সাহায্য করার জন্য একটি মন্ত্রিসভা থাকে। এই মন্ত্রিসভাকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়:
- ক্যাবিনেট মন্ত্রী (Cabinet Ministers): এঁরা হলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং নিজ নিজ মন্ত্রকের প্রধান। সরকারের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ক্যাবিনেট বৈঠকেই নেওয়া হয়।
- রাষ্ট্র মন্ত্রী (Ministers of State): এঁরা ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের অধীনে কাজ করেন অথবা কোনো ছোট দপ্তরের স্বাধীন দায়িত্বে থাকতে পারেন।
- উপমন্ত্রী (Deputy Ministers): এঁরা ক্যাবিনেট মন্ত্রী বা রাষ্ট্র মন্ত্রীদের প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করেন।
যৌথ দায়িত্বশীলতা (Collective Responsibility): সংসদীয় ব্যবস্থার একটি মূল ভিত্তি হলো যৌথ দায়িত্বশীলতা। এর অর্থ হলো, সমগ্র মন্ত্রিসভা তাদের সমস্ত কাজের জন্য সম্মিলিতভাবে লোকসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে। যদি কোনো একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয় বা সরকারের কোনো নীতি লোকসভায় পরাজিত হয়, তবে সমগ্র মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে হয়। এর মূল কথা হলো – “তাঁরা একসঙ্গে সাঁতার কাটেন এবং একসঙ্গে ডুবে যান” (They swim and sink together)।
স্থায়ী কার্যपालिका: আমলাতন্ত্র (The Permanent Executive: Bureaucracy)
কার্যপালিকার যে অংশটি স্থায়ী এবং পেশাদার, তা হলো আমলাতন্ত্র বা नौकरशाही। রাজনৈতিক কার্যपालिका (মন্ত্রীরা) নির্বাচনে হেরে গেলে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু আমলারা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত চাকরিতে স্থায়ী থাকেন। তাই এঁদের স্থায়ী কার্যपालिका বলা হয়।
আমলাতন্ত্রের ভূমিকা ও গঠন
দক্ষ ও প্রশিক্ষিত আমলাদের ছাড়া কোনো সরকারই চলতে পারে না। তাঁদের প্রধান কাজগুলি হলো:
- নীতি প্রণয়নে সহায়তা: মন্ত্রীরা নীতি নির্ধারণ করেন, কিন্তু সেই নীতি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, পরিসংখ্যান এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শ আমলারাই প্রদান করেন।
- নীতি রূপায়ণ: সরকারের গৃহীত নীতি ও আইনকে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত করার মূল দায়িত্ব আমলাদের।
- প্রশাসনের ধারাবাহিকতা রক্ষা: সরকার পরিবর্তন হলেও আমলারা স্বপদে বহাল থাকেন। এটি প্রশাসনিক কাজে একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
ভারতীয় আমলাতন্ত্র অত্যন্ত সুগঠিত। এর শীর্ষে রয়েছে সর্বভারতীয় পরিষেবা (All India Services) مانند ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা (IAS), ভারতীয় পুলিশ পরিষেবা (IPS) এবং ভারতীয় বন পরিষেবা (IFS)। এছাড়াও রয়েছে কেন্দ্রীয় পরিষেবা (Central Services) ও রাজ্য পরিষেবা (State Services)। এই আমলাদের নিয়োগ করা হয় একটি স্বাধীন সংস্থা, ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (UPSC)-এর মাধ্যমে, যা মেধার ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে প্রার্থী নির্বাচন করে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ভারতের রাষ্ট্রপতিকে কেন নামমাত্র শাসক (Nominal Head) বলা হয়?
উত্তর: ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে নামমাত্র বা আনুষ্ঠানিক শাসক বলা হয় কারণ তিনি নিজের ক্ষমতাবলে প্রায় কোনো সিদ্ধান্তই নেন না। সংবিধান অনুযায়ী, তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য। যদিও সরকারের সমস্ত কাজ তাঁর নামে পরিচালিত হয়, প্রকৃত ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার হাতে। তাই রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান (Head of the State), কিন্তু সরকার প্রধান (Head of the Government) নন।
প্রশ্ন ২: যৌথ দায়িত্বশীলতা বা সমষ্টিগত দায়বদ্ধতা (Collective Responsibility) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যৌথ দায়িত্বশীলতা হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি মূল নীতি। এর অর্থ হলো, একটি নির্দিষ্ট নীতি বা সিদ্ধান্তের জন্য সমগ্র মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে লোকসভার কাছে দায়ী থাকে, এমনকি যদি সেই সিদ্ধান্তটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোনো একজন মন্ত্রী সমর্থন না-ও করে থাকেন। যদি লোকসভায় সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়, তবে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী বা নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রী নন, বরং সমগ্র মন্ত্রিসভাকে একসঙ্গে পদত্যাগ করতে হয়। এটি সরকারের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন ৩: স্থায়ী কার্যपालिका এবং রাজনৈতিক কার্যপালিকার মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: স্থায়ী কার্যपालिका এবং রাজনৈতিক কার্যপালিকার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:
- স্থায়িত্ব: রাজনৈতিক কার্যपालिका (প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা) অস্থায়ী; তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত হন এবং নির্বাচনে হেরে গেলে পদচ্যুত হন। অন্যদিকে, স্থায়ী কার্যपालिका (আমলারা) চাকরির বয়সসীমা পর্যন্ত স্থায়ী থাকেন।
- নিয়োগ: রাজনৈতিক কার্যনির্বাহীরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন। আর স্থায়ী কার্যনির্বাহীরা মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে (যেমন UPSC) নিযুক্ত হন।
- দলীয় وابستگی: রাজনৈতিক কার্যনির্বাহীরা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হন এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত দলীয় আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু আমলারা হলেন অ-রাজনৈতিক এবং তাঁদের নিরপেক্ষভাবে কাজ করার কথা।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায় থেকে আমরা ভারতের কার্যपालिका সম্পর্কে যা কিছু শিখলাম, তার একটি সংক্ষিপ্ত সার নিচে দেওয়া হলো:
- কার্যपालिका হলো সরকারের সেই অঙ্গ যা আইন প্রয়োগ ও প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্বে থাকে।
- ভারত একটি সংসদীয় কার্যपालिका ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যেখানে রাষ্ট্রপতি হলেন নামমাত্র প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী।
- রাষ্ট্রপতি পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন এবং তাঁর হাতে শাসন, আইন, অর্থ, বিচার ও জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে, যা তিনি মন্ত্রিসভার পরামর্শে প্রয়োগ করেন।
- কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন ত্রিশঙ্কু সংসদ, রাষ্ট্রপতি নিজের विवेक বা বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।
- প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকার প্রধান এবং মন্ত্রিসভার নেতা। মন্ত্রিসভা যৌথ দায়িত্বশীলতার নীতির উপর ভিত্তি করে কাজ করে এবং লোকসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে।
- আমলাতন্ত্র বা স্থায়ী কার্যपालिका হলো প্রশাসনের মেরুদণ্ড, যা নীতি প্রণয়নে সহায়তা করে এবং তা বাস্তবায়িত করে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
আশা করি, এই বিস্তারিত আলোচনাটি আপনাদের ভারতের কার্যনির্বাহী ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ও গভীর ধারণা তৈরিতে সাহায্য করবে।