বিষয়ের ভূমিকা
মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক এক অনন্য বিবর্তনের সাক্ষী। সৃষ্টির আদিতে মানুষ ছিল প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। তারা খাদ্যের জন্য বন্য ফলমূল সংগ্রহ করত এবং শিকারের ওপর নির্ভর করত। তাদের বাসস্থান ছিল গুহা বা গাছের ডাল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষ কৃষি কাজ শিখেছে, পশুপালন শুরু করেছে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনের ফলেই গড়ে ওঠেছে 'মানব পরিবেশ'।
সপ্তম শ্রেণির ভূগোলের এই সপ্তম অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে মানুষ বসতি গড়ে তোলে, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করে এবং একে অপরের সাথে তথ্যের আদান-প্রদান বা যোগাযোগ স্থাপন করে। আজকের এই দ্রুতগতির বিশ্বে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাই পৃথিবীকে একটি 'বিশ্বগ্রামে' (Global Village) পরিণত করেছে। এই পাঠটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভৌগোলিক প্রেক্ষিত বুঝতে সাহায্য করবে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. বসতি (Settlements)
বসতি হলো এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ তাদের ঘরবাড়ি তৈরি করে। প্রাচীনকালে মানুষ নদীর ধারে বসতি স্থাপন করত কারণ সেখানে পর্যাপ্ত জল এবং উর্বর ভূমি পাওয়া যেত। সভ্যতার বিকাশ এবং বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে বসতিগুলো আরও বৃহৎ ও সংঘবদ্ধ হতে থাকে।
- অস্থায়ী বসতি: যে বসতিগুলো অল্প সময়ের জন্য তৈরি করা হয়, তাকে অস্থায়ী বসতি বলে। গভীর অরণ্য, মরুভূমি বা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ প্রায়শই শিকার, ফলমূল সংগ্রহ বা ঋতু পরিবর্তনের কারণে স্থান পরিবর্তন করে। এই ধরনের যাযাবর জীবনধারায় যে বাড়ি বা তাবু তৈরি করা হয় তা অস্থায়ী।
- স্থায়ী বসতি: বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ স্থায়ী বসতিতে বাস করে। এখানে মানুষ দীর্ঘ সময় বসবাসের জন্য স্থায়ী ঘরবাড়ি নির্মাণ করে।
- বসতির ধরণ: গ্রামীণ বসতি এবং শহরতলি বা শহুরে বসতি। গ্রামীণ বসতি সাধারণত বিক্ষিপ্ত (Scattered) হতে পারে যেখানে বাড়িগুলো দূরে দূরে থাকে (যেমন পাহাড় বা অরণ্যে)। আবার তা নিবিড় বা ঘনবসতিপূর্ণ (Compact) হতে পারে যেখানে সমতল ভূমিতে অনেক বাড়ি পাশাপাশি থাকে।
২. পরিবহন (Transport)
পরিবহন হলো সেই মাধ্যম যার সাহায্যে মানুষ এবং পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচল করে। সভ্যতার শুরুতে মানুষ পায়ে হেঁটে চলত এবং পণ্য বহন করার জন্য পশুকে ব্যবহার করত। চাকার আবিষ্কার পরিবহন ব্যবস্থায় বিপ্লব আনে। পরিবহনের প্রধান চারটি মাধ্যম হলো:
ক) সড়কপথ (Roadways):
স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য সড়কপথ সবচেয়ে জনপ্রিয়। রাস্তা পাকা বা কাঁচা দুই ধরণের হতে পারে। ভারতে উত্তর ভারতের সমভূমি অঞ্চলে রাস্তার জাল বিছানো রয়েছে। হিমাচল প্রদেশের মানালি-লেহ মহাসড়ক বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম সড়কপথ। এছাড়া আধুনিক ভারতে 'সোনালী চতুর্ভুজ' (Golden Quadrilateral) দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই এবং কলকাতাকে যুক্ত করেছে।
খ) রেলপথ (Railways):
অল্প খরচে ভারী মালপত্র এবং বহু যাত্রী দূরে পাঠানোর জন্য রেলপথ অতুলনীয়। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার এবং শিল্প বিপ্লবের পর রেলপথের ব্যাপক প্রসার ঘটে। বর্তমানে ডিজেল ও বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন এবং সুপারফাস্ট ট্রেনের কারণে যাতায়াত অনেক দ্রুত হয়েছে। রাশিয়ার 'ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথ' বিশ্বের দীর্ঘতম রেলপথ যা সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ভ্লাদিভোস্টক পর্যন্ত বিস্তৃত।
গ) জলপথ (Waterways):
প্রাচীনকাল থেকেই ভারী ও বৃহৎ পণ্য পরিবহনের জন্য জলপথ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি মূলত দুই প্রকার:
- অভ্যন্তরীণ জলপথ: নদী এবং হ্রদের মাধ্যমে যাতায়াত। যেমন- গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদী ব্যবস্থা, উত্তর আমেরিকার গ্রেট লেকস।
- সামুদ্রিক পথ: এক দেশ থেকে অন্য দেশে বাণিজ্যের জন্য সমুদ্রপথ ব্যবহৃত হয়। যেমন- সুয়েজ খাল বা পানামা খাল হয়ে যাতায়াত।
ঘ) আকাশপথ (Airways):
বিংশ শতাব্দীতে উদ্ভাবিত এই মাধ্যমটি দ্রুততম কিন্তু সবচেয়ে ব্যয়বহুল। এটি দুর্গম স্থানে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় যেখানে সড়ক বা রেলপথ নেই। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় হেলিকপ্টার খাদ্য ও ওষুধ বিতরণে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
৩. যোগাযোগ (Communication)
যোগাযোগ বলতে বোঝায় একে অপরের কাছে সংবাদ বা তথ্য পৌঁছে দেওয়া। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে যোগাযোগের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে।
- গণমাধ্যম (Mass Media): সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে আমরা একসাথে অনেক মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছাতে পারি। একেই গণমাধ্যম বলা হয়।
- স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ: স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আজ বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত হয়েছে। এটি খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
- ইন্টারনেট ও ই-মেইল: বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট ছাড়া জীবন কল্পনা করা কঠিন। ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে তথ্য ও ছবি পাঠাতে পারছি। এর ফলে আমাদের শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা অনেক কমে গেছে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. বসতি স্থাপনের জন্য আদর্শ স্থান নির্বাচনের শর্তগুলো কী কী?
উত্তর: বসতি স্থাপনের জন্য আদর্শ স্থান নির্বাচনের প্রধান শর্তগুলো হলো— পানীয় জলের সহজলভ্যতা, অনুকূল জলবায়ু, বসবাসের উপযোগী সমতল ভূমি এবং উর্বর মাটি যা কৃষিকাজের জন্য উপযোগী।
২. ভারতের 'সোনালী চতুর্ভুজ' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ভারতের চারটি প্রধান মহানগর— দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই এবং কলকাতাকে যুক্তকারী ছয় লেনের অতি-উন্নত মহাসড়ক নেটওয়ার্ককেই সোনালী চতুর্ভুজ বলা হয়।
৩. বর্তমান যুগে ইন্টারনেটের সুবিধা কী কী?
উত্তর: ইন্টারনেট আমাদের বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা ঘরে বসেই রেল বা বিমানের টিকিট বুক করতে পারি, শিক্ষা ও গবেষণার তথ্য পাই এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সাথে ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা বলতে পারি।
৪. রেলপথের সুবিধা কেন সড়কপথের চেয়ে বেশি হতে পারে?
উত্তর: দীর্ঘ দূরত্বের ভ্রমণে রেলপথ অনেক বেশি আরামদায়ক এবং সাশ্রয়ী। বিশেষ করে কয়লা, লোহা বা ভারী শিল্পজাত পণ্য সড়কপথের তুলনায় রেলে অনেক বেশি পরিমাণে এবং কম খরচে পরিবহন করা সম্ভব।
সারসংক্ষেপ
- মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাকৃতিক পরিবেশকে পরিবর্তন করে বসতি নির্মাণ করে।
- বসতি মূলত দুই প্রকার— গ্রামীণ ও শহুরে। গ্রামীণ মানুষ কৃষি ও প্রাথমিক বৃত্তিতে যুক্ত থাকে, আর শহরের মানুষ শিল্প ও সেবামূলক কাজে যুক্ত।
- পরিবহনের চারটি প্রধান মাধ্যম হলো সড়কপথ, রেলপথ, জলপথ এবং আকাশপথ। প্রতিটি মাধ্যমের নিজস্ব সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে।
- আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন ইন্টারনেট এবং স্যাটেলাইট পৃথিবীকে সংকুচিত করে দিয়েছে এবং বিশ্বকে একটি বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত করেছে।
- পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে এই উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।