বিষয়ের ভূমিকা

নমস্কার বন্ধুরা! আজ আমরা একাদশ শ্রেণির অর্থনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি - দারিদ্র্য। দারিদ্র্য কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মানবিক সংকট যা একটি দেশের অগ্রগতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। যখন সমাজের একটি বড় অংশ তাদের মৌলিক চাহিদাগুলি যেমন - খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য - পূরণ করতে পারে না, তখন সেই অবস্থাকে দারিদ্র্য বলা হয়।

ভারত, বিশ্বের অন্যতম দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও, দারিদ্র্যের সমস্যার সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে লড়াই করে আসছে। স্বাধীনতার পর থেকে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচির মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে, কিন্তু আজও এটি আমাদের দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই অধ্যায়ে আমরা দারিদ্র্যের ধারণাটি গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করব। আমরা জানব দারিদ্র্য কী, কীভাবে এটি পরিমাপ করা হয়, ভারতে দারিদ্র্যের মূল কারণগুলি কী কী, এবং এই সমস্যা মোকাবেলায় সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে। এই আলোচনা শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দেশ ও সমাজকে বোঝার জন্যও অপরিহার্য। চলুন, এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু করা যাক।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

দারিদ্র্য কী? (What is Poverty?)

সাধারণভাবে, দারিদ্র্য বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবার তাদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাগুলি পূরণ করতে অক্ষম। এই চাহিদাগুলির মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত খাদ্য, পরিষ্কার পানীয় জল, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, পোশাক, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা। তবে অর্থনীতিতে দারিদ্র্যের ধারণাটি আরও ব্যাপক এবং এটিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়: চরম দারিদ্র্য (Absolute Poverty) এবং আপেক্ষিক দারিদ্র্য (Relative Poverty)।

  • চরম দারিদ্র্য (Absolute Poverty): যখন কোনও ব্যক্তির আয় বা ভোগব্যয় জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম স্তরের নিচে থাকে, তখন তাকে চরম দরিদ্র বলা হয়। এই ন্যূনতম স্তরটিকে 'দারিদ্র্য রেখা' (Poverty Line) বলা হয়। বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, বর্তমানে যদি কোনও ব্যক্তির দৈনিক আয় $2.15 (ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা PPP অনুযায়ী) এর কম হয়, তবে তাকে চরম দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। চরম দারিদ্র্য মূলত মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালোরি গ্রহণ, পুষ্টি, এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধার অভাবকে নির্দেশ করে। এটি উন্নয়নশীল দেশগুলির একটি প্রধান সমস্যা।
  • আপেক্ষিক দারিদ্র্য (Relative Poverty): আপেক্ষিক দারিদ্র্য বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট समाज বা দেশের গড় জীবনযাত্রার মানের তুলনায় কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনগ্রসরতা। এক্ষেত্রে, একজন ব্যক্তি হয়তো তার মৌলিক চাহিদাগুলি পূরণ করতে সক্ষম, কিন্তু সমাজের বাকিদের তুলনায় তার আয়, সম্পদ বা জীবনযাত্রার মান অনেক কম। এটি মূলত আয়ের বৈষম্যকে নির্দেশ করে। যেমন, একটি উন্নত দেশে একজন ব্যক্তির গাড়ি না থাকাটা আপেক্ষিক দারিদ্র্যের লক্ষণ হতে পারে, যদিও তার খাদ্য বা বাসস্থানের অভাব নেই। আপেক্ষিক দারিদ্র্য উন্নত এবং উন্নয়নশীল উভয় দেশেই দেখা যায় এবং এটি সামাজিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের একটি সূচক।

ভারতে, দারিদ্র্য বলতে মূলত চরম দারিদ্র্যকেই বোঝানো হয়। সরকার একটি নির্দিষ্ট 'দারিদ্র্য রেখা' নির্ধারণ করে এবং যারা এই রেখার নিচে বসবাস করে, তাদের দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দারিদ্র্য রেখা সময় এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।

ভারতে দারিদ্র্য পরিমাপ (Measuring Poverty in India)

ভারতে দারিদ্র্য পরিমাপের পদ্ধতিটি বেশ জটিল এবং সময়ের সাথে সাথে এর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন কমিটি এবং সংস্থা দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি প্রস্তাব করেছে।

দারিদ্র্য রেখা (Poverty Line): ভারতে দারিদ্র্য পরিমাপের মূল ভিত্তি হলো 'দারিদ্র্য রেখা'। এটি হলো একটি কাল্পনিক রেখা যা ন্যূনতম ভোগব্যয়ের স্তরকে নির্দেশ করে। যে সকল পরিবার বা ব্যক্তির মাসিক মাথাপিছু ভোগব্যয় (Monthly Per Capita Consumption Expenditure - MPCE) এই নির্ধারিত স্তরের নিচে, তাদের দরিদ্র বা 'দারিদ্র্য সীমার নিচে' (Below Poverty Line - BPL) বলে গণ্য করা হয়।

কীভাবে এই রেখা নির্ধারিত হয়?

ঐতিহ্যগতভাবে, ভারতে দারিদ্র্য রেখা নির্ধারণের জন্য ন্যূনতম ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণকে ভিত্তি করা হতো। পরিকল্পনা কমিশন (বর্তমানে নীতি আয়োগ) দ্বারা নির্ধারিত মান অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় একজন ব্যক্তির দৈনিক ন্যূনতম ২৪০০ ক্যালোরি এবং শহরাঞ্চলে ২১০০ ক্যালোরি প্রয়োজন। এই পরিমাণ ক্যালোরিযুক্ত খাদ্য কেনার জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, তার সাথে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো কিছু অপরিহার্য অ-খাদ্যদ্রব্যের খরচ যোগ করে দারিদ্র্য রেখা নির্ধারণ করা হতো।

বিভিন্ন কমিটি এবং তাদের সুপারিশ:

  • ওয়াই. কে. আলাগ কমিটি (Y. K. Alagh Committee, 1979): এই কমিটিই প্রথম ক্যালোরি গ্রহণের উপর ভিত্তি করে গ্রামীণ এবং শহরাঞ্চলের জন্য পৃথক দারিদ্র্য রেখা নির্ধারণের সুপারিশ করে।
  • লাকদাওয়ালা কমিটি (Lakdawala Committee, 1993): এই কমিটি রাজ্য-ভিত্তিক পৃথক দারিদ্র্য রেখা নির্ধারণের সুপারিশ করে, কারণ বিভিন্ন রাজ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় ভিন্ন। তারা వినియోగকারী মূল্য সূচক (Consumer Price Index) ব্যবহার করার কথা বলে।
  • সুরেশ তেন্ডুলকার কমিটি (Suresh Tendulkar Committee, 2009): এই কমিটি দারিদ্র্য পরিমাপের পদ্ধতিতে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। তারা শুধুমাত্র ক্যালোরির উপর নির্ভর না করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বস্ত্র এবং জুতার মতো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির উপর ব্যয়ের হিসাবও অন্তর্ভুক্ত করে। এই কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১১-১২ সালে ভারতে দারিদ্র্যের হার ছিল ২১.৯%।
  • সি. রঙ্গরাজন কমিটি (C. Rangarajan Committee, 2014): এই কমিটি তেন্ডুলকার কমিটির চেয়ে উচ্চতর দারিদ্র্য রেখা নির্ধারণ করে। তাদের মতে, পুষ্টি, বাসস্থান এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার জন্য আরও বেশি ব্যয় প্রয়োজন। এই কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১১-১২ সালে ভারতে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৯.৫%।

বর্তমানে, ভারত সরকারের নীতি আয়োগ (NITI Aayog) দারিদ্র্য সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে। তারা এখন শুধুমাত্র ভোগব্যয়ের উপর নির্ভর না করে 'বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক' (Multidimensional Poverty Index - MPI) এর উপরও জোর দিচ্ছে, যা স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মানের বিভিন্ন সূচকের উপর ভিত্তি করে দারিদ্র্য পরিমাপ করে। এটি দারিদ্র্যের একটি আরও সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে।

ভারতে দারিদ্র্যের কারণ (Causes of Poverty in India)

ভারতে দারিদ্র্য একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যার পিছনে একাধিক ঐতিহাসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কারণ জড়িত। এই কারণগুলিকে বিস্তারিতভাবে বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

  • ঐতিহাসিক কারণ (ব্রিটিশ শাসন): প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ভারতের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। ব্রিটিশরা পরিকল্পিতভাবে ভারতের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প এবং কুটির শিল্পকে ধ্বংস করে দেয়, যা লক্ষ লক্ষ কারিগরকে কর্মহীন করে তোলে। তাদের ভূমি রাজস্ব নীতি, যেমন জমিদারি প্রথা, কৃষকদের শোষণ করত এবং তাদের ঋণের বোঝায় ডুবিয়ে দিত। ব্রিটিশরা ভারতের সম্পদ শোষণ করে ব্রিটেনে নিয়ে যায়, যা ভারতের অর্থনৈতিক विकासকে বাধাগ্রস্ত করে এবং দারিদ্র্যের ভিত্তি স্থাপন করে।
  • জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি: স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের জনসংখ্যা দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিপুল জনসংখ্যা দেশের সীমিত সম্পদের উপর 엄청 চাপ সৃষ্টি করেছে। যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হয়, তখন মাথাপিছু আয় কমে যায় এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। অধিক জনসংখ্যা মানে কর্মসংস্থানের জন্য অধিক প্রতিযোগিতা, যা বেকারত্ব এবং স্বল্প বেতনের সমস্যা বাড়িয়ে তোলে।
  • কৃষি খাতে অনগ্রসরতা: ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনও কৃষির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ভারতীয় কৃষি ব্যবস্থা বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। যেমন - ছোট এবং খণ্ডিত জমির মালিকানা, সেচ ব্যবস্থার অভাব, পুরোনো প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং ঋণের অপ্রতুলতা। এই কারণগুলির জন্য কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কম এবং কৃষকদের আয় অনিশ্চিত। ফলস্বরূপ, গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্র্য ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
  • সম্পদ ও আয়ের অসম বণ্টন: ভারতে আয় এবং সম্পদের বণ্টন অত্যন্ত অসম। দেশের মোট জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ মুষ্টিমেয় কিছু ধনী ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। জমি এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল সম্পদের মালিকানাও একইভাবে অসম। এই বৈষম্যের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের দরিদ্রতম অংশের কাছে পৌঁছায় না, যা ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে তোলে।
  • কর্মসংস্থানের অভাব: ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত পরিষেবা এবং শিল্প খাতের উপর নির্ভরশীল, যা যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি (Jobless Growth)। বিশেষ করে অদক্ষ এবং আধা-দক্ষ শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগের অভাব রয়েছে। এর ফলে, লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার বা ছদ্ম-বেকার (disguised unemployment) অবস্থায় রয়েছে, যা তাদের দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।
  • মূলধনের অভাব এবং অনুন্নত প্রযুক্তি: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষিক্ষেত্রে মূলধনের অভাব একটি বড় সমস্যা। এর ফলে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হয় না। অনুন্নত পরিকাঠামো, যেমন - রাস্তা, বিদ্যুৎ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে বাধাগ্রস্ত করে এবং দারিদ্র্য বাড়ায়।
  • সামাজিক কারণ: ভারতের সামাজিক কাঠামোও দারিদ্র্যের জন্য অনেকাংশে দায়ী। জাতিভেদ প্রথা, লিঙ্গ বৈষম্য, এবং অন্যান্য সামাজিক কুপ্রথাগুলি নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। বিশেষ করে তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি উপজাতি (ST) এবং মহিলাদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলকভাবে বেশি।
  • প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতি: সরকার দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প চালু করলেও, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির কারণে সেই প্রকল্পগুলির সুফল প্রায়শই যোগ্য সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায় না। সরকারি তহবিলের অপচয় এবং দুর্নীতি দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচিগুলিকে অকার্যকর করে তোলে।

দারিদ্র্যের ফলাফল (Consequences of Poverty)

দারিদ্র্য কেবল আর্থিক সংকট নয়, এটি মানুষের জীবনে এবং সমগ্র সমাজে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলাফলগুলি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলতে থাকে।

  • অপুষ্টি, ক্ষুধা ও স্বাস্থ্যহানি: দারিদ্র্যের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ফলাফল হলো অপুষ্টি এবং ক্ষুধা। দরিদ্র পরিবারগুলি পর্যাপ্ত এবং পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারে না, যার ফলে শিশুরা অপুষ্টির শিকার হয় এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। দরিদ্র মানুষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হয় এবং পরিষ্কার পানীয় জলের অভাবে জলবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। তাদের ভালো চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়ার সামর্থ্য থাকে না, ফলে অসুস্থতা তাদের আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।
  • শিক্ষার অভাব ও নিরক্ষরতা: দরিদ্র পরিবারগুলি তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারে না কারণ তাদের কাছে স্কুলের ফি, বই বা পোশাক কেনার টাকা থাকে না। অনেক সময় শিশুদের অল্প বয়স থেকেই পরিবারের আয়ের জন্য কাজ করতে হয়, যা শিশুশ্রমের জন্ম দেয়। শিক্ষার অভাবে তারা ভালো চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।
  • কম জীবনযাত্রার মান: দরিদ্র মানুষ একটি নিম্নমানের জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। তাদের বাসস্থান সাধারণত অস্বাস্থ্যকর এবং জনাকীর্ণ হয়। বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধার অভাব থাকে। এই পরিস্থিতি তাদের আত্মসম্মান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
  • সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বৃদ্ধি: দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব সমাজে হতাশা ও বঞ্চনার জন্ম দেয়। এর ফলে চুরি, ডাকাতি এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় সামাজিক অস্থিরতা এবং হিংসাত্মক ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি হুমকি।
  • ঋণের ফাঁদ (Debt Trap): দরিদ্র পরিবারগুলি প্রায়শই অসুস্থতা, বিবাহ বা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এই উচ্চ সুদের কারণে তারা কখনও ঋণ শোধ করতে পারে না এবং ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। এই ঋণের বোঝা তাদের দারিদ্র্যকে আরও স্থায়ী করে তোলে।
  • শিশুশ্রম: পরিবারের আয়ের জন্য দরিদ্র শিশুরা প্রায়শই বিপজ্জনক এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়। এটি তাদের শৈশব কেড়ে নেয় এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য সরকারি নীতি ও কর্মসূচি (Government Policies and Programmes for Poverty Alleviation)

স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত সরকার দারিদ্র্য দূরীকরণকে একটি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্যে সরকার একটি ত্রিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে:

  1. প্রবৃদ্ধি-ভিত্তিক কৌশল (Growth-oriented Approach): এই কৌশলের মূল ধারণা হলো, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে তার সুফল (trickle-down effect) সমাজের দরিদ্রতম স্তরেও পৌঁছাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলিতে শিল্পায়ন এবং সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে এই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল।
  2. দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি (Specific Poverty Alleviation Programmes): সরকার বুঝতে পারে যে শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধির উপর নির্ভর করলে চলবে না। তাই দরিদ্রদের জন্য সরাসরি কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: স্ব-কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং মজুরি-ভিত্তিক কর্মসংস্থান কর্মসূচি।
  3. ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ (Providing Minimum Basic Amenities): এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দরিদ্রদের জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো মৌলিক সুবিধাগুলি নিশ্চিত করা।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মসূচি:

  • মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন (MGNREGA), ২০০৫: এটি বিশ্বের বৃহত্তম মজুরি-ভিত্তিক কর্মসংস্থান কর্মসূচি। এই আইনের অধীনে, গ্রামীণ এলাকার প্রতিটি পরিবারকে প্রতি আর্থিক বছরে অন্তত ১০০ দিনের অদক্ষ কায়িক শ্রমের কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এটি গ্রামীণ দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব কমাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
  • জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন (National Food Security Act), ২০১৩: এই আইনের লক্ষ্য হলো দেশের দুই-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যাকে ভর্তুকিযুক্ত মূল্যে খাদ্যশস্য সরবরাহ করে খাদ্য ও পুষ্টির সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এর অধীনে গণবণ্টন ব্যবস্থা (PDS), মিড-ডে মিল এবং অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
  • প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা (Pradhan Mantri Jan Dhan Yojana - PMJDY), ২০১৪: এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি পরিবারকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা। এর মাধ্যমে দরিদ্র মানুষ সঞ্চয় করতে পারে, ঋণ পেতে পারে এবং সরকারি ভর্তুকি সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয় (Direct Benefit Transfer - DBT), যা দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করে।
  • জাতীয় সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি (National Social Assistance Programme - NSAP): এই কর্মসূচির অধীনে বয়স্ক, বিধবা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পেনশন বা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
  • স্বর্ণজয়ন্তী গ্রাম স্বরোজগার যোজনা (SGSY) / জাতীয় গ্রামীণ জীবনধারণ মিশন (NRLM): এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো গ্রামীণ দরিদ্রদের, বিশেষ করে মহিলাদের, স্বনির্ভর গোষ্ঠী (Self-Help Groups - SHGs) তৈরি করতে সাহায্য করা এবং তাদের ব্যাংক ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করে স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।

কর্মসূচিগুলির সমালোচনামূলক মূল্যায়ন (Critical Assessment of the Programmes)

সরকারের এই প্রচেষ্টাগুলি সত্ত্বেও, দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচির বাস্তবায়নে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে।

  • বাস্তবায়নে ফাঁক: অনেক ভালো পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির কারণে সেগুলি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় না।
  • অযোগ্য সুবিধাভোগী: অনেক সময় অযোগ্য ব্যক্তিরা এই প্রকল্পগুলির সুবিধা পায়, যখন প্রকৃত দরিদ্ররা বঞ্চিত হয়।
  • অপর্যাপ্ত সম্পদ: দেশের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় এই কর্মসূচিগুলির জন্য বরাদ্দকৃত সম্পদ প্রায়শই অপর্যাপ্ত হয়।
  • জনগণের অংশগ্রহণের অভাব: অনেক কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে না, যা সেগুলির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

তবে এই সমস্যা সত্ত্বেও, এই কর্মসূচিগুলি লক্ষ লক্ষ মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে সাহায্য করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মানে উন্নতি হয়েছে। তবে দারিদ্র্যকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে হলে আরও সমন্বিত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: দারিদ্র্য রেখা (Poverty Line) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: দারিদ্র্য রেখা হলো একটি কাল্পনিক রেখা যা একটি নির্দিষ্ট সমাজে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম আয় বা ভোগব্যয়ের স্তরকে নির্দেশ করে। যে সকল ব্যক্তি বা পরিবারের আয় বা ভোগব্যয় এই নির্ধারিত স্তরের নিচে থাকে, তাদের দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। ভারতে, এটি সাধারণত ন্যূনতম ক্যালোরি গ্রহণ এবং কিছু অপরিহার্য অ-খাদ্যদ্রব্যের ব্যয়ের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।

প্রশ্ন ২: আপেক্ষিক দারিদ্র্য এবং চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: চরম দারিদ্র্য বলতে বোঝায় জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদাগুলি (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান) পূরণ করতে না পারার অবস্থা। এটি একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম মানের উপর ভিত্তি করে পরিমাপ করা হয়। অন্যদিকে, আপেক্ষিক দারিদ্র্য বলতে বোঝায় একটি দেশের গড় জীবনযাত্রার মানের তুলনায় কম আয় বা সম্পদের অধিকারী হওয়া। এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি হয়তো তার মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম, কিন্তু সমাজের বাকিদের তুলনায় সে বঞ্চিত। চরম দারিদ্র্য উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বেশি দেখা যায়, আর আপেক্ষিক দারিদ্র্য উন্নত দেশগুলির একটি প্রধান সমস্যা।

প্রশ্ন ৩: MGNREGA কীভাবে গ্রামীণ দারিদ্র্য কমাতে সাহায্য করে?

উত্তর: MGNREGA বা মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন গ্রামীণ দারিদ্র্য কমাতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি গ্রামীণ পরিবারগুলিকে বছরে ১০০ দিনের কাজের আইনি অধিকার প্রদান করে, যা তাদের একটি নিশ্চিত আয়ের উৎস দেয়। এটি বিশেষ করে খরা বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন কৃষিকাজ থাকে না, তখন বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ পরিকাঠামো, যেমন রাস্তা, পুকুর এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে।

প্রশ্ন ৪: ভারতে দারিদ্র্যের প্রধান কারণগুলি কী কী?

উত্তর: ভারতে দারিদ্র্যের প্রধান কারণগুলি হলো: (১) ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ঐতিহাসিক শোষণ, (২) জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি, (৩) কৃষি খাতের অনগ্রসরতা এবং কম উৎপাদনশীলতা, (৪) আয় ও সম্পদের চরম বৈষম্য, (৫) পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, (৬) সামাজিক কারণ যেমন জাতিভেদ প্রথা এবং লিঙ্গ বৈষম্য, এবং (৭) প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতি।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা দারিদ্র্য সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারলাম। আসুন মূল বিষয়গুলি একবার দেখে নেওয়া যাক:

  • দারিদ্র্য: এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মানুষ জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না। এটি চরম এবং আপেক্ষিক - এই দুই প্রকারের হতে পারে।
  • দারিদ্র্য পরিমাপ: ভারতে দারিদ্র্য রেখার মাধ্যমে দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়, যা ন্যূনতম ভোগব্যয়ের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। বিভিন্ন কমিটি (তেন্ডুলকার, রঙ্গরাজন) এর পরিমাপ পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে।
  • দারিদ্র্যের কারণ: ভারতে দারিদ্র্যের পিছনে ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং জনসংখ্যাগত একাধিক কারণ দায়ী।
  • দারিদ্র্যের ফলাফল: এর ফলে অপুষ্টি, স্বাস্থ্যহানি, নিরক্ষরতা, নিম্ন জীবনযাত্রা, সামাজিক অস্থিরতা এবং ঋণের ফাঁদের মতো ভয়াবহ সমস্যা তৈরি হয়।
  • সরকারি পদক্ষেপ: সরকার দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য প্রবৃদ্ধি-ভিত্তিক কৌশল, নির্দিষ্ট কর্মসূচি (যেমন MGNREGA, NFSA) এবং মৌলিক চাহিদা পূরণের নীতি গ্রহণ করেছে।
  • চ্যালেঞ্জ: এই কর্মসূচিগুলির বাস্তবায়নে দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সম্পদের অভাবের মতো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

দারিদ্র্য একটি জটিল সমস্যা, এবং এর সমাধানের জন্য একটি বহুমুখী এবং সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের উপর জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই সমস্যা সম্পর্কে জানা এবং এর সমাধানে অবদান রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব।