আজকের শিরোনাম: ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে সংঘাত এবং রাজ্যে কেন্দ্রের নতুন আইন কার্যকর

কলকাতা, ২৯শে নভেম্বর, ২০২৫: পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের সাক্ষী থাকছে। একদিকে ভোটার তালিকা বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং ভারতের নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সংঘাত চরমে উঠেছে, অন্যদিকে দীর্ঘ টালবাহানার পর রাজ্য সরকার কেন্দ্রের নতুন ওয়াকফ আইন মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই দুটি ঘটনাই রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে গভীর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) ঘিরে নির্বাচন কমিশনের সাথে তৃণমূলের সংঘাত

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল। নির্বাচন কমিশন দ্বারা পরিচালিত 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' বা SIR প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং কমিশনের মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার ফলে রাজ্যের প্রায় ৪০ জন নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে বুথ লেভেল অফিসাররাও (BLO) রয়েছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরে গিয়ে এই বিষয়ে তাদের অভিযোগ জানায় এবং তীব্র প্রতিবাদ করে।

তৃণমূলের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং এই প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ মানুষ ও ভোটকর্মীরা চরম হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। যদিও নির্বাচন কমিশন তৃণমূলের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কমিশন পাল্টা জানিয়েছে যে, তারা বুথ লেভেল অফিসারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর এবং এই বিষয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) অফিসের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর ঘেরাওয়ের মতো ঘটনার পর, কমিশন কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দিয়ে অফিসের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার এবং প্রয়োজনে দপ্তরটি আরও সুরক্ষিত স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

এই বিতর্কের মধ্যেই, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া চলাকালীন প্রায় ১৫ লক্ষ মৃত ভোটারের নাম চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছ ও ত্রুটিমুক্ত করতে ১২ জন বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে, যাতে কোনও যোগ্য নাগরিকের নাম বাদ না যায় এবং কোনও অযোগ্য নাম অন্তর্ভুক্ত না হয়। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যের বহু প্রান্তিক মানুষ, বিশেষত মতুয়া এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর নাগরিকরা তাদের ভোটাধিকার হারাতে পারেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

(আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)

দীর্ঘ বিরোধের অবসান: রাজ্যে কেন্দ্রের ওয়াকফ আইন গ্রহণ

কয়েক মাস ধরে চলা অচলাবস্থার পর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার অবশেষে কেন্দ্রের নতুন 'ওয়াকফ (সংশোধনী) আইন, ২০২৫' মেনে নিতে সম্মত হয়েছে। রাজ্য সরকার এতদিন ধরে এই আইনের বিরোধিতা করে আসছিল এবং এর বিরুদ্ধে আদালতেও গিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রের নির্দেশিকা মেনেই রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তর জেলার আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছে, আগামী ৫ই ডিসেম্বরের মধ্যে রাজ্যের প্রায় ৮২,০০০ ওয়াকফ সম্পত্তির তথ্য কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড করতে হবে।

এই নতুন সংশোধিত আইন অনুযায়ী, ওয়াকফ বোর্ড এবং ট্রাইব্যুনালে অমুসলিম সদস্যরাও থাকতে পারবেন এবং কোনও সম্পত্তি ওয়াকফ কিনা, সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে। তৃণমূল সরকার প্রথম থেকেই এই আইনের বিরোধিতা করে আসছিল এবং তাদের অভিযোগ ছিল যে, এই আইনটি রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের উপর হস্তক্ষেপ। তবে আইনি লড়াইয়ে প্রতিকূল রায় আসায় এবং কেন্দ্রের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় রাজ্য সরকার এই আইন কার্যকর করার পথে এগিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজ্য সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের সচিব এই বিষয়ে একটি আট-দফা কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে 'উমীদ' নামক কেন্দ্রীয় পোর্টালের সাথে পরিচিত হওয়া, মুতাওয়াল্লিদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা এবং তথ্য আপলোডের জন্য জেলাস্তরে বিশেষ হেল্প ডেস্ক তৈরি করা। রাজ্যের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

(আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)