বিষয়ের ভূমিকা

আজ আমরা যখন 'বিশ্বায়ন' বা 'Globalization' শব্দটি শুনি, তখন আমাদের মনে আসে এক সংযুক্ত বিশ্বের ছবি, যেখানে ইন্টারনেট, বহুজাতিক সংস্থা (MNC) আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশগুলি একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু এই ধারণাটি কি একেবারেই নতুন? উত্তর হলো, না। বিশ্বায়নের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং আকর্ষণীয়। দশম শ্রেণির ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায়, 'ভূ-বিশ্বায়িত বিশ্বের সৃষ্টি' (The Making of a Global World), আমাদের সেই ঐতিহাসিক পথচলার কথাই বলে।

এই অধ্যায়ে আমরা জানব কীভাবে প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বাণিজ্য, ভ্রমণ, এবং ভাবনার আদান-প্রদানের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল। আমরা দেখব কীভাবে সিল্ক রুটের মতো প্রাচীন বাণিজ্যপথ শুধু পণ্যই নয়, সংস্কৃতি ও জ্ঞানকেও এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে পৌঁছে দিয়েছে। এরপর আমরা উনিশ শতকের দিকে যাব, যখন প্রযুক্তি, উপনিবেশবাদ এবং মানুষের বিপুল পরিমাণ অভিবাসন বিশ্ব অর্থনীতিকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল। সবশেষে, আমরা দুটি বিশ্বযুদ্ধ, মহামন্দা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করব, যা আজকের বিশ্বায়নের ভিত্তি স্থাপন করেছে।

এই অধ্যায়টি কেবল কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ নয়, এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে আজকের বিশ্বব্যবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে শত শত বছরের বাণিজ্য, সংঘাত, সহযোগিতা এবং আদান-প্রদানের এক জটিল ইতিহাস। চলুন, এই увлекательным যাত্রায় পা বাড়াই এবং বিশ্বায়নের শিকড় অন্বেষণ করি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. প্রাক-আধুনিক বিশ্ব (The Pre-Modern World)

বিশ্বায়নের ধারণা আধুনিক হলেও এর উপাদানগুলো—মানুষের চলাচল, পণ্যের বিনিময়, এবং ধারণার আদান-প্রদান—প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান ছিল। প্রাক-আধুনিক বিশ্বে এই সংযোগগুলো আজকের মতো দ্রুত বা ব্যাপক না হলেও, তা বিশ্বকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিল।

সিল্ক রুট: বিশ্বকে সংযুক্ত করার এক প্রাচীন জাল

সিল্ক রুট বা রেশম পথ নামটি শুনলেই চীনের উজ্জ্বল রেশম কাপড়ের কথা মনে পড়ে। তবে এটি কেবল একটি পথ ছিল না, বরং এটি ছিল স্থল এবং সমুদ্রপথে বিস্তৃত অসংখ্য পথের এক বিশাল নেটওয়ার্ক যা এশিয়াকে ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার সাথে সংযুক্ত করেছিল। খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই এই পথগুলি সক্রিয় ছিল এবং মধ্যযুগ পর্যন্ত এর গুরুত্ব বজায় ছিল।

  • বাণিজ্যের প্রবাহ: এই পথ ধরে চীনের রেশম, মৃৎশিল্প এবং চা পশ্চিমে যেত। বিনিময়ে, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মশলা ও বস্ত্র এবং রোম থেকে সোনা, রুপা ও মূল্যবান পাথর পূর্ব দিকে আসত। এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট।
  • সাংস্কৃতিক বিনিময়: সিল্ক রুট কেবল পণ্যের আদান-প্রদান করত না, এটি ছিল সংস্কৃতি, ধর্ম এবং ভাবনার আদান-প্রদানের এক বিশাল মাধ্যম। বৌদ্ধধর্ম ভারত থেকে এই পথ ধরেই মধ্য এশিয়া, চীন, কোরিয়া এবং জাপানে ছড়িয়ে পড়েছিল। একইভাবে, খ্রিস্টান মিশনারি এবং মুসলিম প্রচারকরাও এই পথ ব্যবহার করে তাদের ধর্ম ও দর্শন প্রচার করতেন।

খাদ্যের যাত্রা: আলু, টমেটো এবং বিশ্বায়ন

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক সাধারণ খাবার, যেমন আলু, টমেটো, ভুট্টা বা লঙ্কা, আদতে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় ফসল নয়। এগুলির উৎস ছিল আমেরিকা মহাদেশে। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা 'আবিষ্কারের' পর এই ফসলগুলি ইউরোপ এবং এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

  • আলুর প্রভাব: আলুর উদাহরণটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ইউরোপে, বিশেষ করে আয়ারল্যান্ডের মতো দরিদ্র দেশগুলিতে, আলু একটি প্রধান খাদ্যে পরিণত হয়েছিল। এটি সস্তা এবং পুষ্টিকর হওয়ায় গরিব মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছিল। কিন্তু এর ওপর অতি নির্ভরশীলতার একটি ভয়ংকর পরিণতিও ছিল। ১৮৪০-এর দশকে, 'আইরিশ পটেটো ফেমিন' বা আলুর দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যখন একটি রোগের কারণে পুরো আলুর ফসল নষ্ট হয়ে যায়। খাদ্যের অভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায় বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এই ঘটনাটি দেখায় যে কীভাবে বিশ্বায়িত খাদ্য ব্যবস্থা একটি অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
  • অন্যান্য খাদ্য: একইভাবে, নুডলস বা পাস্তার মতো খাবারও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। মনে করা হয়, নুডলস চীন থেকে পশ্চিমে গেছে এবং আরব বণিকদের মাধ্যমে পাস্তা ইতালিতে পৌঁছেছে।

বিজয়, রোগ এবং বাণিজ্য: আমেরিকা জয়ের পেছনের কাহিনী

ষোড়শ শতকে ইউরোপীয় নাবিকরা যখন আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছায়, তখন থেকেই বিশ্বায়নের এক নতুন এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয়। ইউরোপীয়দের, বিশেষ করে স্পেন ও পর্তুগালের, আমেরিকা জয়ের পেছনে শুধু তাদের উন্নত সামরিক প্রযুক্তিই কারণ ছিল না, এর পেছনে একটি ভয়ংকর জৈবিক অস্ত্রও কাজ করেছিল—রোগ।

  • স্মলপক্সের মারণাস্ত্র: আমেরিকার আদিবাসীরা হাজার হাজার বছর ধরে বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে তাদের শরীরে ইউরোপ থেকে আসা স্মলপক্স বা গুটিবসন্তের মতো রোগের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। ইউরোপীয়দের জন্য এটি একটি সাধারণ রোগ হলেও, আমেরিকার আদিবাসীদের জন্য এটি ছিল এক মহামারী। এই রোগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যায়, যা ইউরোপীয়দের জন্য বিজয়কে অনেক সহজ করে দিয়েছিল।
  • সম্পদের শোষণ: আমেরিকা জয়ের পর ইউরোপীয়রা সেখানকার বিপুল খনিজ সম্পদ, বিশেষ করে পেরু এবং মেক্সিকোর রুপার খনিগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে। এই রুপা ইউরোপে প্রবাহিত হয় এবং এর মাধ্যমে তারা এশিয়ার সাথে বাণিজ্য করত। এই সম্পদের শোষণ ইউরোপকে সমৃদ্ধ করেছিল, কিন্তু আমেরিকার আদিবাসী সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

২. উনিশ শতক (১৮১৫-১৯১৪) - বিশ্ব অর্থনীতির জন্ম

উনিশ শতকে বিশ্ব অর্থনীতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। অর্থনীতিবিদরা এই সময়ে তিনটি প্রধান 'প্রবাহ' বা 'Flow'-এর কথা বলেন যা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন আকার দিয়েছিল।

তিনটি প্রবাহ: বাণিজ্য, শ্রম এবং মূলধন

  1. বাণিজ্যের প্রবাহ (Flow of Trade): এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে কৃষিপণ্যের বাণিজ্য, বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর একটি বড় উদাহরণ হলো ব্রিটেনের 'কর্ন ল' (Corn Laws) বা শস্য আইন। সরকার ಭೂস্বামীদের চাপে বিদেশ থেকে ভুট্টা আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু শিল্পপতি এবং শহরের বাসিন্দারা খাদ্যের উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করলে সরকার এই আইন তুলে নিতে বাধ্য হয়। ফলে, সস্তায় আমদানি করা খাদ্যশস্যে দেশ ছেয়ে যায়, যা ব্রিটেনের কৃষকদের সর্বনাশ করলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ায়। এই চাহিদা মেটাতে পূর্ব ইউরোপ, রাশিয়া, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় বিপুল পরিমাণে জমি চাষাবাদের আওতায় আনা হয়।
  2. শ্রমের প্রবাহ (Flow of Labour): এটি হলো মানুষের অভিবাসন। উনিশ শতকে প্রায় ৫ কোটি মানুষ ইউরোপ থেকে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমায়। সারা বিশ্ব জুড়ে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ ভালো জীবন এবং কাজের সন্ধানে নিজের দেশ ছেড়েছিল। এই বিপুল অভিবাসন বিশ্বজুড়ে কৃষিকাজ এবং শিল্পায়নকে সম্ভব করে তুলেছিল।
  3. মূলধনের প্রবাহ (Flow of Capital): লন্ডন সহ বিভিন্ন আর্থিক কেন্দ্র থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মূলধন বা পুঁজি বিনিয়োগ করা হচ্ছিল। এই পুঁজি খনি, কৃষি এবং রেললাইন, বন্দর ইত্যাদি পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

প্রযুক্তির ভূমিকা: বিশ্বকে ছোট করে আনা

উনিশ শতকের এই পরিবর্তনগুলির পেছনে প্রযুক্তির এক বিশাল ভূমিকা ছিল।

  • রেলওয়ে ও স্টিমশিপ: রেলওয়ে এবং বাষ্পীয় জাহাজ আবিষ্কারের ফলে পণ্য পরিবহন অনেক দ্রুত এবং সস্তা হয়ে যায়। বিশাল পরিমাণ কৃষিপণ্য এখন বন্দর পর্যন্ত নিয়ে আসা এবং জাহাজে করে অন্য মহাদেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।
  • টেলিগ্রাফ: টেলিগ্রাফের আবিষ্কার যোগাযোগের জগতে বিপ্লব নিয়ে আসে। এখন মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খবর পাঠানো যেত।
  • রেফ্রিজারেটেড শিপ (হিমায়িত জাহাজ): এটি ছিল একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। এর আগে, জীবন্ত পশু ইউরোপে রপ্তানি করা হতো, যা ছিল ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। হিমায়িত জাহাজের ফলে এখন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড থেকে মাংস কেটে হিমায়িত করে ইউরোপে পাঠানো সম্ভব হলো। এর ফলে ইউরোপে মাংসের দাম কমে যায় এবং সাধারণ মানুষের খাদ্য তালিকায় মাংস যোগ হয়।

উনিশ শতকের শেষের দিকে উপনিবেশবাদ

বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে ইউরোপীয় শক্তিগুলির মধ্যে উপনিবেশ দখলের প্রতিযোগিতাও তীব্রতর হয়। ১৮৮৫ সালে বার্লিনে ইউরোপীয় শক্তিগুলি একটি সভায় বসে আক্ষরিক অর্থেই আফ্রিকার মানচিত্র এঁকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। এই নতুন উপনিবেশবাদ কেবল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণই প্রতিষ্ঠা করেনি, এটি উপনিবেশগুলির অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।

আফ্রিকায় 'রিন্ডারপেস্ট' বা গবাদি পশুর প্লেগের উদাহরণটি ভয়াবহ। ১৮৯০-এর দশকে এই রোগটি আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় ৯০% গবাদি পশুকে হত্যা করে। এর ফলে আফ্রিকানদের জীবন-জীবিকা ধ্বংস হয়ে যায় এবং খনি ও বাগানে কাজ করার জন্য শ্রমিক হিসেবে যোগ দিতে বাধ্য হয়। এভাবেই ইউরোপীয়রা আফ্রিকানদের শ্রমবাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

ভারতে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের অভিবাসন (Indentured Labour)

উপনিবেশগুলিতে, বিশেষ করে ভারতে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে 'চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক' বা 'গিরমিটিয়া' হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়েছিল। এটি ছিল এক ধরনের দাসপ্রথার নতুন রূপ।

  • শ্রমিকদের গন্তব্য: ভারতের বিহার, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ইত্যাদি অঞ্চল থেকে শ্রমিকদের ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ (ত্রিনিদাদ, গায়ানা, সুরিনাম), মরিশাস, ফিজি, মালয়েশিয়া এবং শ্রীলঙ্কায় আখ, রবার ও চা বাগানে কাজ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হতো।
  • দুর্দশা: তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। কাজের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং জীবনযাত্রা ছিল অমানবিক। অনেকেই আর দেশে ফিরতে পারেননি। তবে, এই শ্রমিকরা তাদের নতুন দেশে নিজেদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। ত্রিনিদাদের 'হোসায়' (মহররমের শোভাযাত্রা) বা راستাফারিয়ানিজমের মতো সাংস্কৃতিক রূপগুলি ভারতীয় অভিবাসীদের সংস্কৃতির মিশ্রণের ফল।

৩. আন্তঃযুদ্ধ অর্থনীতি (The Inter-war Economy)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) বিশ্ব অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়। এই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়কালটি ছিল অর্থনৈতিক অস্থিরতায় পূর্ণ, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল মহামন্দা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব

এটি ছিল প্রথম আধুনিক শিল্পযুদ্ধ, যেখানে মেশিনগান, ট্যাঙ্ক, এবং বিমানের মতো প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এর অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

  • অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন: যুদ্ধের বিপুল খরচের জন্য ব্রিটেন আমেরিকার কাছ থেকে বিপুল ঋণ নেয়। ফলে, যুদ্ধের শেষে ব্রিটেন একটি ঋণদাতা দেশ থেকে ঋণগ্রহীতা দেশে পরিণত হয়। অন্যদিকে, আমেরিকা এক অন্যতম আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
  • উৎপাদন সংকট: যুদ্ধের সময় কৃষিজ উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধ শেষে যখন উৎপাদন আবার শুরু হয়, তখন বাজারে কৃষিপণ্যের জোগান অতিরিক্ত হয়ে যায়। ফলে দাম পড়ে যায় এবং কৃষকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মহা মন্দা (The Great Depression)

১৯২৯ সালে শুরু হওয়া এই অর্থনৈতিক মন্দা ছিল বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সংকট। এর পেছনে একাধিক কারণ ছিল।

  • কারণসমূহ:
    ১. কৃষিতে অতিরিক্ত উৎপাদন: কৃষিপণ্যের দাম ক্রমাগত কমছিল, যা কৃষকদের আয় কমিয়ে দিচ্ছিল।
    ২. মার্কিন ঋণের সংকোচন: অনেক দেশই মার্কিন ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। যখন আমেরিকা ঋণ দেওয়া কমিয়ে দেয়, তখন বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়।
    ৩. শেয়ার বাজারের পতন: ১৯২৯ সালের অক্টোবরে মার্কিন শেয়ার বাজার (ওয়াল স্ট্রিট) ধসে পড়ে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে।
  • বিশ্বব্যাপী প্রভাব: আমেরিকার ব্যাংকগুলি çöke যায়, কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, এবং বেকারত্ব চরমে পৌঁছায়। যেহেতু বিশ্ব অর্থনীতি আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাই এই মন্দা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।
  • ভারতের ওপর প্রভাব: ঔপনিবেশিক ভারতও এই মন্দার প্রভাব থেকে বাঁচতে পারেনি। ভারতে কৃষিপণ্যের দাম ৫০% কমে যায়। কৃষকরা ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাদের কর ছাড় দিতে অস্বীকার করে। এই অর্থনৈতিক দুর্দশা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তুলেছিল।

৪. যুদ্ধ-পরবর্তী বন্দোবস্ত এবং ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর ছিল। এই যুদ্ধের পর বিশ্ব নেতারা বুঝতে পারেন যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এই ভাবনা থেকেই নতুন এক বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম হয়।

ব্রেটন উডস সম্মেলন

১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস নামক স্থানে মিত্রশক্তির দেশগুলি একটি সম্মেলনে মিলিত হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। এই সম্মেলন থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জন্ম নেয়:

  1. আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (International Monetary Fund - IMF): এর কাজ হলো সদস্য দেশগুলির বৈদেশিক বাণিজ্য এবং আর্থিক ঘাটতি বা উদ্বৃত্তের ভারসাম্য রক্ষা করা।
  2. বিশ্বব্যাংক (World Bank): এর আনুষ্ঠানিক নাম হলো International Bank for Reconstruction and Development। এর প্রাথমিক কাজ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলির পুনর্গঠনের জন্য ঋণ প্রদান করা।

এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে 'ব্রেটন উডস টুইনস' বা 'ব্রেটন উডস যমজ' বলা হয়। এই ব্যবস্থাটি মূলত পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলির স্বার্থে তৈরি হয়েছিল এবং আমেরিকা এর ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রাখত (ভেটো ক্ষমতা)।

উপনিবেশ মুক্তি এবং উন্নয়নশীল বিশ্ব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া এবং আফ্রিকার অনেক দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং অনগ্রসর অর্থনীতি। তাদের উন্নয়নের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু IMF এবং বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলি মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলির সমস্যা সমাধানের জন্য তৈরি হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে, উন্নয়নশীল দেশগুলি নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একত্রিত হয়। তারা জি-৭৭ (G-77) নামে একটি গোষ্ঠী তৈরি করে এবং একটি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (New International Economic Order - NIEO) দাবি করে। তাদের দাবি ছিল—নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, কাঁচামালের ন্যায্য মূল্য এবং উন্নত দেশগুলির বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার।

৫. বিশ্বায়ন যুগের সমাপ্তি এবং নতুন শুরু

১৯৭০-এর দশকে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ডলারের সাথে অন্যান্য মুদ্রার স্থির বিনিময় হারের ব্যবস্থা শেষ হয়ে যায় এবং পরিবর্তনশীল বিনিময় হার (floating exchange rate) ব্যবস্থা চালু হয়।

এই সময়ে একটি নতুন প্রবণতা শুরু হয়। আমেরিকা ও ইউরোপের বহুজাতিক সংস্থাগুলি (MNCs) তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলি এশিয়ার দেশগুলিতে, বিশেষ করে চীনে, স্থানান্তর করতে শুরু করে। এর কারণ ছিল সেখানে শ্রমের মজুরি অনেক কম ছিল।

  • চিনের উত্থান: চিনের নিম্ন মজুরি এবং বিশাল বাজার এটিকে বিশ্ব অর্থনীতির একটি নতুন কেন্দ্রে পরিণত করে। মোবাইল ফোন, খেলনা, টেলিভিশন থেকে শুরু করে প্রায় সব কিছুই চিনে তৈরি হতে শুরু করে।
  • নতুন বিশ্বায়ন: এই শিল্প স্থানান্তরের ফলে বিশ্ব বাণিজ্য এবং পুঁজির প্রবাহ পুনরায় বৃদ্ধি পায়, যা আধুনিক বিশ্বায়নের ভিত্তি স্থাপন করে। এই বিশ্বায়ন যেমন একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এনেছে, তেমনই অন্যদিকে অসাম্য এবং পরিবেশগত সংকটও তৈরি করেছে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: সিল্ক রুটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর: সিল্ক রুটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল বহুমুখী। এটি কেবল একটি বাণিজ্য পথ ছিল না, বরং এটি ছিল প্রাক-আধুনিক বিশ্বের 'গ্লোবাল হাইওয়ে'। এর গুরুত্বগুলি হলো:

  • অর্থনৈতিক সংযোগ: এটি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে রেশম, মশলা, মূল্যবান ধাতু এবং অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম ছিল, যা উভয় অঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছিল।
  • সাংস্কৃতিক বিনিময়: এই পথ ধরে ধর্ম (যেমন বৌদ্ধধর্ম), দর্শন, শিল্পকলা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান এক সভ্যতা থেকে অন্য সভ্যতায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
  • বিশ্ব সংযোগের প্রতীক: সিল্ক রুট প্রমাণ করে যে বিশ্বায়নের ধারণাটি নতুন নয়; প্রাচীনকালেও বিশ্ব একে অপরের সাথে বাণিজ্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিল।

প্রশ্ন ২: মহামন্দার জন্য কোন কারণগুলো দায়ী ছিল?

উত্তর: ১৯২৯ সালের মহামন্দার পেছনে একাধিক কারণ জড়িত ছিল। প্রধান কারণগুলি হলো:

  • কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত উৎপাদন: যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কৃষিপণ্যের উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে দাম মারাত্মকভাবে পড়ে যায় এবং কৃষকদের আয় কমে যায়।
  • মার্কিন ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা: অনেক দেশই তাদের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য আমেরিকার ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯২৮ সাল থেকে আমেরিকা ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়।
  • শেয়ার বাজারে ফটকাবাজি ও পতন: মার্কিন শেয়ার বাজারে অতিরিক্ত ফটকাবাজির ফলে একটি 'বাবল' তৈরি হয়েছিল। ১৯২৯ সালে সেই বাবল ফেটে গেলে শেয়ার বাজার ধসে পড়ে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি ভয়াবহ ধাক্কা দেয়।

প্রশ্ন ৩: ব্রেটন উডস সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এর ফলাফল কী হয়েছিল?

উত্তর: ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর লক্ষ্য ছিল পূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক সংকট এড়ানো যা অতীতে যুদ্ধের কারণ হয়েছিল।
ফলাফল: এই সম্মেলন থেকে দুটি প্রধান আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছিল:

  1. আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF): সদস্য দেশগুলির মধ্যে মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলায় সহায়তা করা।
  2. বিশ্বব্যাংক (World Bank): যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলির পুনর্গঠন এবং উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ প্রদান করা।
এই ব্যবস্থাটি প্রায় তিন দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়টি থেকে আমরা বিশ্বায়নের দীর্ঘ এবং জটিল ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারলাম। আসুন মূল বিষয়গুলি আরেকবার দেখে নেওয়া যাক:

  • প্রাচীন সংযোগ: বিশ্বায়ন কোনো আধুনিক ঘটনা নয়। প্রাচীন সিল্ক রুটের মতো বাণিজ্য পথগুলি পণ্য, সংস্কৃতি এবং ভাবনার আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিশ্বকে সংযুক্ত করেছিল।
  • উনিশ শতকের বিশ্বায়ন: উনিশ শতকে প্রযুক্তি (রেল, স্টিমশিপ) এবং তিনটি প্রধান প্রবাহ—বাণিজ্য, শ্রম (অভিবাসন) এবং পুঁজি—বিশ্ব অর্থনীতিকে এক নতুন আকার দেয়। এই সময়ে উপনিবেশবাদও বিশ্বায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
  • যুদ্ধের প্রভাব: দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং মহামন্দা বিশ্ব অর্থনীতিকে profundamente প্রভাবিত করে। এটি অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রকে ইউরোপ থেকে আমেরিকায় স্থানান্তরিত করে।
  • যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস সম্মেলনের মাধ্যমে IMF এবং বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, যা পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রদান করে।
  • নতুন বিশ্বায়ন: ১৯৭০-এর দশকে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার পতনের পর এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলির উৎপাদন কেন্দ্র এশিয়ায় (বিশেষ করে চীনে) স্থানান্তরের মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বায়নের যুগ শুরু হয়।

'ভূ-বিশ্বায়িত বিশ্বের সৃষ্টি' অধ্যায়টি আমাদের দেখায় যে ইতিহাস কীভাবে বর্তমানকে রূপ দেয়। আজকের সংযুক্ত বিশ্ব সেই দীর্ঘ যাত্রারই একটি ফল, যা বিজয় ও বিপর্যয়, সহযোগিতা ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।