বিষয়ের ভূমিকা
নমস্কার বন্ধুরা! আজ আমরা ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে ডুব দিতে চলেছি। নবম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় – 'ইউরোপে সমাজতন্ত্র এবং রুশ বিপ্লব'। এই অধ্যায়টি কেবল রাশিয়ার ইতিহাস নয়, এটি সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে বদলে দেওয়া এক যুগান্তকারী ঘটনার কাহিনী। ফরাসি বিপ্লব যেমন সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার ধারণা দিয়েছিল, তেমনই রুশ বিপ্লব সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রথম প্রচেষ্টা করেছিল।
আমরা জানব কীভাবে শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপের সমাজ বদলে যাচ্ছিল, শ্রমিকদের অবস্থা কতটা করুণ ছিল, এবং এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ হিসেবে কীভাবে সমাজতন্ত্রের মতো নতুন চিন্তাধারার জন্ম হলো। কার্ল মার্ক্সের মতো চিন্তাবিদরা কীভাবে এক নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন? আর কীভাবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে রাশিয়ায় জার শাসনের অবসান ঘটলো এবং লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করলো? এই অধ্যায়টি আমাদের সেই উত্তাল সময়ের যাত্রায় নিয়ে যাবে, যা বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। চলুন, শুরু করা যাক এই জ্ঞানগর্ভ আলোচনা।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. উদারপন্থী, র্যাডিকাল এবং রক্ষণশীল: পরিবর্তনের ভিন্ন ভিন্ন মত
ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপ জুড়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছিল। কিন্তু সমাজ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে সবার মত এক ছিল না। মূলত তিনটি প্রধান গোষ্ঠীর চিন্তাভাবনা এই সময়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে:
- উদারপন্থী (Liberals): এরা এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল যা সমস্ত ধর্মকে সমানভাবে সম্মান করবে। তারা বংশানুক্রমিক শাসকদের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার বিরোধী ছিল। তারা জনগণের অধিকার রক্ষা করার পক্ষে ছিল এবং একটি প্রতিনিধিত্বমূলক, নির্বাচিত সংসদীয় সরকার এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থার দাবি জানিয়েছিল। তবে, উদারপন্থীরা কিন্তু পুরোপুরি গণতন্ত্রী ছিল না। তারা 'সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার' (Universal Adult Franchise) অর্থাৎ সকল নাগরিকের ভোটের অধিকারে বিশ্বাসী ছিল না। তাদের মতে, শুধুমাত্র সম্পত্তি আছে এমন পুরুষদেরই ভোট দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।
- র্যাডিকাল (Radicals): এই গোষ্ঠী এমন একটি সরকার চেয়েছিল যা দেশের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের উপর ভিত্তি করে গঠিত হবে। তারা নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের (suffragette movements) সমর্থক ছিল। উদারপন্থীদের বিপরীতে, তারা বড় জমিদার এবং ধনী কারখানা মালিকদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ঘোর বিরোধী ছিল। তারা ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিরোধী না হলেও, কয়েকটি হাতে সম্পত্তি কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিপক্ষে ছিল।
- রক্ষণশীল (Conservatives): এই গোষ্ঠী র্যাডিকাল এবং উদারপন্থী উভয়েরই বিরোধী ছিল। ফরাসি বিপ্লবের আগে পর্যন্ত তারা কোনো পরিবর্তনের পক্ষেই ছিল না। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে তারা বুঝতে পারে যে কিছু পরিবর্তন অনিবার্য। তবে তারা মনে করত যে অতীতের ঐতিহ্যকে সম্মান করা উচিত এবং পরিবর্তন ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে হওয়া উচিত, হঠাৎ করে নয়।
এই তিনটি ভিন্ন চিন্তাধারার সংঘাতই উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপের রাজনীতিকে চালিত করেছিল এবং নতুন নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক ধারণার জন্ম দিয়েছিল।
২. শিল্প সমাজ এবং সামাজিক পরিবর্তন: নতুন সমস্যা, নতুন সমাধান
উনবিংশ শতাব্দী ছিল শিল্পায়নের যুগ। নতুন নতুন শহর গড়ে উঠছিল, রেলপথের বিস্তার ঘটছিল এবং কারখানাগুলো অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠছিল। কিন্তু এই শিল্পায়ন অনেক নতুন সামাজিক সমস্যারও জন্ম দেয়।
- শ্রমিকদের দুরবস্থা: কারখানায় কাজের সময় ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ, প্রায়শই দিনে ১২-১৫ ঘন্টা। মজুরি ছিল খুব কম, যা দিয়ে ভালোভাবে জীবনধারণ করা সম্ভব ছিল না।
- বেকারত্ব: শিল্পপণ্যের চাহিদা কমে গেলে বা নতুন প্রযুক্তি এলে শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হতো, ফলে বেকারত্ব একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
- বস্তি জীবন: কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে আসা মানুষ শহরে ভিড় জমাতো। তাদের জন্য উপযুক্ত বাসস্থান বা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল না। ফলে অস্বাস্থ্যকর বস্তি এলাকা গড়ে ওঠে, যেখানে রোগ ও মহামারী লেগেই থাকত।
এই সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছিল উদারপন্থী এবং র্যাডিকালরা। তাদের অনেকেই ছিলেন কারখানার মালিক বা ব্যবসায়ী। তারা বিশ্বাস করত যে, যদি শ্রমিকরা সুস্থ থাকে এবং শিক্ষিত হয়, তবে অর্থনীতির আরও উন্নতি হবে। তারা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা, শ্রম এবং উদ্যোগের উপর জোর দিত। তারা মনে করত, যদি প্রত্যেককে স্বাধীনতা দেওয়া হয় এবং গরিবদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যায়, তবে সমাজ উন্নতি করবে। কিন্তু এই সমাধান সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এক নতুন চিন্তার উদয় হচ্ছিল, যা এই ব্যবস্থার মূলে আঘাত করতে চেয়েছিল।
৩. ইউরোপে সমাজতন্ত্রের আগমন: এক নতুন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে সমাজতন্ত্র (Socialism) একটি সুপরিচিত এবং প্রভাবশালী ধারণা হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। সমাজতন্ত্রীরা ব্যক্তিগত সম্পত্তির ঘোর বিরোধী ছিল। তাদের মতে, সমস্ত সামাজিক সমস্যার মূল কারণ হলো এই ব্যক্তিগত সম্পত্তি। কেন? কারণ, সম্পত্তির মালিকরা শুধু নিজেদের লাভের কথা ভাবে, যারা সেই সম্পত্তিকে উৎপাদনশীল করে তোলে, সেই শ্রমিকদের কল্যাণের কথা তারা ভাবে না।
সমাজতন্ত্রীরা একটি ভিন্ন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত, যেখানে উৎপাদনের সমস্ত উপকরণের (জমি, কারখানা ইত্যাদি) মালিক হবে সমাজ বা রাষ্ট্র, কোনো ব্যক্তি নয়। এতে সকলের সম্মিলিত স্বার্থে উৎপাদন পরিচালিত হবে। এই সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন ধারা ছিল:
- রবার্ট ওয়েন (Robert Owen): একজন ইংরেজ কারখানা মালিক হয়েও তিনি সমবায় (co-operative) ব্যবস্থার প্রবক্তা ছিলেন। তিনি আমেরিকার ইন্ডিয়ানাতে 'নিউ হারমনি' নামে একটি সমবায় গ্রাম প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন।
- লুই ব্লাঁ (Louis Blanc): তিনি চেয়েছিলেন সরকার সমবায় উদ্যোগকে উৎসাহিত করুক এবং পুঁজিবাদী উদ্যোগগুলোকে প্রতিস্থাপন করুক।
- কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels): সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন কার্ল মার্ক্স। এঙ্গেলসের সাথে মিলে তিনি এক বৈপ্লবিক তত্ত্ব প্রদান করেন। মার্ক্সের মতে:
- শিল্প সমাজ হলো 'পুঁজিবাদী' (Capitalist) সমাজ। এখানে পুঁজির মালিক (কারখানার মালিক) অর্থাৎ বুর্জোয়ারা শ্রমিক বা প্রলেতারিয়েতদের শোষণ করে মুনাফা অর্জন করে।
- শ্রমিকদের অবস্থা ততক্ষণ উন্নত হবে না, যতক্ষণ না ব্যক্তিগত মালিকানায় মুনাফা সঞ্চয় করা হবে।
- শ্রমিকদের এই শোষণ থেকে মুক্তি পেতে হলে পুঁজিবাদ এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির শাসনকে উচ্ছেদ করতে হবে।
- মার্ক্স বিশ্বাস করতেন, শ্রমিকদের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সমাজ গঠন করতে হবে, যেখানে সমস্ত সম্পত্তি সামাজিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। এটিই হবে একটি 'কমিউনিস্ট' (Communist) সমাজ। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে পুঁজিপতিদের সাথে সংগ্রামে শ্রমিকদের জয় অনিবার্য এবং সাম্যবাদী সমাজই হবে ভবিষ্যতের স্বাভাবিক সমাজ।
এই ধারণাগুলো ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলনকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। শ্রমিকরা তাদের জীবন ও কাজের অবস্থার উন্নতির জন্য সংগঠন তৈরি করতে শুরু করে। জার্মানিতে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (SPD) গঠিত হয় এবং সংসদীয় নির্বাচনে আসনও জেতে। এভাবেই সমাজতন্ত্র এক শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা রাশিয়ার ইতিহাসকে বদলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।
৪. রুশ সাম্রাজ্য ১৯১৪: বিপ্লবের প্রাক্কালে
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রাশিয়া এক বিশাল সাম্রাজ্য ছিল, যা শাসন করতেন জার দ্বিতীয় নিকোলাস। এই সাম্রাজ্য ছিল বৈচিত্র্যময়, কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে।
- রাজনৈতিক অবস্থা: রাশিয়া ছিল একটি স্বৈরতন্ত্র (Autocracy)। জারের ক্ষমতা ছিল সীমাহীন। সেখানে কোনো সংসদ ছিল না এবং রাজনৈতিক দল গঠন করা ছিল বেআইনি।
- অর্থনীতি ও সমাজ: রাশিয়ার প্রায় ৮৫% মানুষ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। শিল্প ছিল শুধুমাত্র কয়েকটি প্রধান শহরে, যেমন সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং মস্কোতে, সীমাবদ্ধ। কৃষকদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। বেশিরভাগ জমি ছিল অভিজাত, চার্চ এবং জারের হাতে। কৃষকরা এই জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে চাইত এবং প্রায়শই খাজনা দিতে অস্বীকার করত ও জমিদারদের হত্যা করত।
- শ্রমিকদের অবস্থা: যদিও শ্রমিকদের সংখ্যা কম ছিল, তারা ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। সরকারি নিয়মকানুন থাকা সত্ত্বেও কারখানার মালিকরা তা মানত না, ফলে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ ছিল ভয়াবহ। তবে বেতন বা কাজের শর্ত নিয়ে অসন্তুষ্ট হলে তারা প্রায়ই ধর্মঘট করত।
৫. রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের প্রসার এবং দলের বিভাজন
রাশিয়ার সমস্ত রাজনৈতিক দল ১৯১৪ সালের আগে পর্যন্ত বেআইনি ছিল। কার্ল মার্ক্সের ধারণার উপর ভিত্তি করে ১৮৯৮ সালে গঠিত হয় 'রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক ওয়ার্কার্স পার্টি'। কিন্তু দলের রণকৌশল নিয়ে শীঘ্রই মতভেদ দেখা দেয়। এর ফলে দলটি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়:
- বলশেভিক (Bolsheviks): এই গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন ভ্লাদিমির লেনিন। লেনিন বিশ্বাস করতেন যে, জারশাসিত রাশিয়ার মতো দমনমূলক সমাজে পার্টিকে অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে এবং সদস্যদের সংখ্যা ও গুণমান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। 'বলশেভিক' শব্দের অর্থ 'সংখ্যাগরিষ্ঠ'।
- মেনশেভিক (Mensheviks): তারা মনে করত যে, পার্টি সকলের জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত, যেমনটা জার্মানিতে ছিল। 'মেনশেভিক' শব্দের অর্থ 'সংখ্যালঘু'।
এই দুটি গোষ্ঠীর আদর্শগত পার্থক্যই পরবর্তীকালে রুশ বিপ্লবের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
৬. ১৯০৫ সালের বিপ্লব: রক্তাক্ত রবিবারের ট্র্যাজেডি
১৯০৪-০৫ সাল রাশিয়ার জন্য খুব খারাপ সময় ছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে, ১৯০৫ সালের ২২শে জানুয়ারি, ফাদার গ্যাপনের নেতৃত্বে হাজার হাজার শ্রমিকের একটি মিছিল জারের শীতকালীন প্রাসাদের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে যাত্রা করে। তাদের দাবি ছিল কাজের সময় কমানো, মজুরি বৃদ্ধি এবং কাজের অবস্থার উন্নতি।
কিন্তু জার তাদের দাবি শোনার পরিবর্তে মিছিলে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। পুলিশ ও কসাকদের আক্রমণে ১০০ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন আহত হন। ইতিহাসে এই ঘটনা 'রক্তাক্ত রবিবার' বা 'Bloody Sunday' নামে পরিচিত।
এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ধর্মঘট, ছাত্র ধর্মঘট, এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। আইনজীবী, ডাক্তার, প্রকৌশলীরা সংবিধান সভার দাবি জানায়। চাপের মুখে, জার একটি নির্বাচিত পরামর্শদাতা সংসদ বা 'ডুমা' (Duma) গঠনের অনুমতি দেন। কিন্তু তিনি স্বৈরতন্ত্র ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তিনি প্রথম ডুমাকে মাত্র ৭৫ দিনের মধ্যে এবং দ্বিতীয় ডুমাকে তিন মাসের মধ্যে বরখাস্ত করেন। এরপর তিনি ভোটদানের আইন পরিবর্তন করে তৃতীয় ডুমাকে রক্ষণশীল রাজনীতিবিদদের দিয়ে भरিয়ে দেন, যাতে তার ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকে।
৭. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং রুশ সাম্রাজ্যের পতন
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়ায় প্রাথমিকভাবে জারের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন দেখা যায়। কিন্তু যুদ্ধ যত طولانی হতে থাকে, সমর্থন কমতে শুরু করে। জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার কাছে রুশ সেনাবাহিনী बुरीভাবে পরাজিত হতে থাকে। ১৯১৭ সাল নাগাদ প্রায় ৭০ লক্ষ রুশ সেনা হতাহত হয়।
যুদ্ধের ফলে দেশের শিল্পব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বাল্টিক সাগরে জার্মান নিয়ন্ত্রণের কারণে বাইরে থেকে শিল্পপণ্য আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। দেশে শ্রমিকদের অভাব দেখা দেয়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে এবং শহরগুলিতে রুটি ও ময়দার সংকট দেখা দেয়। সেনাবাহিনীও যুদ্ধের সরঞ্জামের অভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিই ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের মঞ্চ প্রস্তুত করে।
৮. ফেব্রুয়ারি বিপ্লব: স্বৈরতন্ত্রের অবসান
১৯১৭ সালের শীতে রাজধানী পেট্রোগ্রাডের (সেন্ট পিটার্সবার্গের নতুন নাম) অবস্থা ছিল ভয়াবহ। শ্রমিক মহল্লায় খাদ্য সংকট চরমে ওঠে।
- ২২শে ফেব্রুয়ারি: একটি কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এর সমর্থনে আরও ৫০টি কারখানার শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। অনেক কারখানায় নারীরা এই ধর্মঘটের নেতৃত্ব দেন, যে কারণে এই দিনটি পরে 'আন্তর্জাতিক নারী দিবস' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
- ২৫শে ফেব্রুয়ারি: সরকার ডুমা ভেঙে দেয়।
- ২৬শে ও ২৭শে ফেব্রুয়ারি: বিক্ষোভকারীরা শহরের কেন্দ্রস্থলে জড়ো হয় এবং 'রুটি, মজুরি, গণতন্ত্র' স্লোগান দিতে থাকে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ডাকলে, তারা বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে। বরং কিছু সেনা বিদ্রোহ করে শ্রমিকদের সাথে যোগ দেয়।
- ঐ দিন সন্ধ্যায়, বিদ্রোহী সেনা ও ধর্মঘটী শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে 'পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত' (Petrograd Soviet) বা শ্রমিকদের পরিষদ গঠন করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায়, ২রা মার্চ জার দ্বিতীয় নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর সাথে সাথে রাশিয়ার কয়েক শতাব্দীর জার শাসনের অবসান ঘটে। সোভিয়েত এবং ডুমা নেতারা মিলে একটি 'অস্থায়ী সরকার' (Provisional Government) গঠন করে।
৯. ফেব্রুয়ারির পরে: অস্থায়ী সরকার এবং লেনিনের প্রত্যাবর্তন
অস্থায়ী সরকারে মূলত সেনাবাহিনী, জমিদার এবং শিল্পপতিদের প্রভাব ছিল। তারা একটি নির্বাচিত গণপরিষদের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের মতো শ্রমিকদের পরিষদও সক্রিয় ছিল, যা সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করছিল।
এই পরিস্থিতিতে, ১৯১৭ সালের এপ্রিলে বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির লেনিন নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আসেন। তিনি এসেই তাঁর বিখ্যাত 'এপ্রিল থিসিস' (April Theses) ঘোষণা করেন, যেখানে তিনটি প্রধান দাবি ছিল:
- যুদ্ধ অবিলম্বে শেষ করতে হবে।
- সমস্ত জমি কৃষকদের হাতে তুলে দিতে হবে।
- সমস্ত ব্যাংক জাতীয়করণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন যে, এখন সোভিয়েতগুলোর ক্ষমতা দখলের সময় এসেছে। তাঁর এই র্যাডিকাল ধারণাগুলো প্রথমে বলশেভিক পার্টির মধ্যেই অনেকে গ্রহণ করতে পারেনি, কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। গ্রীষ্মকাল জুড়ে শ্রমিক আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয় এবং অস্থায়ী সরকারের ক্ষমতা কমতে শুরু করে।
১০. অক্টোবর বিপ্লব, ১৯১৭: বলশেভিকদের ক্ষমতা দখল
অস্থায়ী সরকার এবং বলশেভিকদের মধ্যে সংঘাত বাড়তে থাকে। লেনিন আশঙ্কা করছিলেন যে অস্থায়ী সরকার স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাই তিনি ক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
- ১৬ই অক্টোবর: লেনিন পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত এবং বলশেভিক পার্টিকে সমাজতান্ত্রিক ক্ষমতা দখলের জন্য রাজি করান। লিওন ট্রটস্কির নেতৃত্বে একটি 'সামরিক বিপ্লবী কমিটি' (Military Revolutionary Committee) গঠন করা হয়।
- ২৪শে অক্টোবর: বিদ্রোহ শুরু হয়। অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী কেরেনস্কি শহর ছেড়ে পালিয়ে যান। সরকারি অনুগত সেনারা দুটি বলশেভিক পত্রিকার দপ্তর দখল করে।
- এর জবাবে, সামরিক বিপ্লবী কমিটি সরকারি দপ্তরগুলো দখল করার এবং মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেয়। সেদিন রাতের মধ্যেই, অরোরার যুদ্ধজাহাজ থেকে শীতকালীন প্রাসাদে গোলাবর্ষণ করা হয় এবং অন্যান্য সরকারি জাহাজগুলোও বিভিন্ন কৌশলগত স্থান দখল করে নেয়।
রাতের মধ্যেই পুরো শহর বিপ্লবী কমিটির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীরা আত্মসমর্পণ করে। এইভাবেই রক্তপাতহীন একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে, যা 'অক্টোবর বিপ্লব' নামে পরিচিত।
১১. অক্টোবরের পরে কী পরিবর্তন হয়েছিল?
ক্ষমতা দখলের পরেই বলশেভিকরা একগুচ্ছ বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে:
- সম্পত্তির জাতীয়করণ: বেশিরভাগ শিল্প ও ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়। জমিকে সামাজিক সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং কৃষকদের অভিজাতদের জমি দখল করার অনুমতি দেওয়া হয়।
- একদলীয় শাসন: রাশিয়া একটি একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বলশেভিক পার্টি নিজেদের নাম পরিবর্তন করে 'রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি' রাখে। ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে পার্টির নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
- গোপন পুলিশ: যারা বলশেভিকদের সমালোচনা করত, তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য 'চেকা' (Cheka) নামে একটি গোপন পুলিশ বাহিনী গঠন করা হয়।
- শান্তি চুক্তি: ১৯১৮ সালের মার্চ মাসে, জার্মানির সাথে ব্রেস্ট-লিটোভস্ক-এ একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসে।
১২. গৃহযুদ্ধ: লাল, সাদা এবং সবুজের লড়াই
বলশেভিকদের ক্ষমতা দখল সবাই মেনে নেয়নি। এর ফলে রাশিয়ায় ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
- লাল ফৌজ (The Reds): এরা ছিল বলশেভিকদের সেনাবাহিনী।
- সাদা ফৌজ (The Whites): এরা ছিল জার-সমর্থক, উদারপন্থী এবং অ-বলশেভিক সমাজতন্ত্রী। তাদের ফ্রান্স, আমেরিকা, ব্রিটেন এবং জাপানের মতো বিদেশি শক্তিগুলো সমর্থন করেছিল কারণ তারা রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের росте উদ্বিগ্ন ছিল।
- সবুজ ফৌজ (The Greens): এরা ছিল সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী (Socialist Revolutionaries) যারা মূলত কৃষকদের সমর্থনের উপর ভিত্তি করে লড়াই করছিল।
গৃহযুদ্ধের সময় লুটপাট, দস্যুতা এবং দুর্ভিক্ষ সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে। তবে, অ-রুশ জাতীয়তাবাদী এবং মুসলিম জাদিদিস্টদের সহযোগিতায় ১৯২০ সালের জানুয়ারির মধ্যে বলশেভিকরা প্রাক্তন রুশ সাম্রাজ্যের বেশিরভাগ অংশের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
১৩. একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন: পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা
গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বলশেভিকরা একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের কাজে মন দেয়। তারা একটি কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনা ব্যবস্থা চালু করে। সরকার পাঁচ বছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করত, যা 'পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা' (Five-Year Plans) নামে পরিচিত।
প্রথম দুটি পরিকল্পনা (১৯২৭-৩২ এবং ১৯৩৩-৩৮) শিল্প বিকাশের উপর জোর দেয়। এর ফলে রাশিয়ার অর্থনীতিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটে। নতুন নতুন শিল্প শহর গড়ে ওঠে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হয় এবং কারখানা শ্রমিক ও কৃষকদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়।
তবে এই দ্রুত শিল্পায়নের একটি অন্ধকার দিকও ছিল। শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত খারাপ, এবং দ্রুত নির্মাণের ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত।
১৪. স্তালিনবাদ এবং সমষ্টিকরণ: একনায়কতন্ত্রের উত্থান
লেনিনের মৃত্যুর পর পার্টির নেতৃত্বে আসেন জোসেফ স্তালিন। ১৯২৭-২৮ সাল নাগাদ সোভিয়েত রাশিয়ার শহরগুলিতে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয়। স্তালিন বিশ্বাস করতেন যে ধনী কৃষক বা 'কুলাক'রা (Kulaks) বেশি মুনাফার আশায় শস্য মজুদ করে রেখেছে।
এই সমস্যার সমাধানের জন্য, স্তালিন 'সমষ্টিকরণ' (Collectivisation) নীতি চালু করেন। এই নীতি অনুসারে, সমস্ত কৃষককে তাদের জমি একত্রিত করে যৌথ খামারে (কলখোজ - Kolkhoz) চাষ করতে বাধ্য করা হয়। খামারের মুনাফা সকল কৃষকের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু কৃষকরা এর তীব্র বিরোধিতা করে। তারা তাদের গবাদি পশু মেরে ফেলে এবং কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। যারা প্রতিরোধ করেছিল, তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। অনেককে নির্বাসিত বা দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই দমন-পীড়ন সত্ত্বেও, উৎপাদন உடனடியாக বাড়েনি। বরং ১৯৩০-৩৩ সালের খারাপ ফসলের কারণে সোভিয়েত ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়।
স্তালিন তার সমালোচকদেরও কঠোর হাতে দমন করেন। পার্টির অভ্যন্তরে যারা তার নীতির সমালোচনা করত, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে গ্রেপ্তার করে শ্রম শিবিরে পাঠানো বা হত্যা করা হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: বলশেভিক এবং মেনশেভিকদের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী ছিল?
উত্তর: বলশেভিক এবং মেনশেভিকদের মধ্যে প্রধান পার্থক্য ছিল দলের গঠন এবং রণকৌশল নিয়ে। ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিকরা বিশ্বাস করত যে পার্টিকে অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে এবং শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বিপ্লবীদেরই সদস্য করা উচিত। অন্যদিকে, মেনশেভিকরা একটি উদারপন্থী দলীয় কাঠামোতে বিশ্বাসী ছিল, যেখানে সকলের জন্য সদস্যপদ উন্মুক্ত থাকবে। আদর্শগতভাবে, বলশেভিকরা সরাসরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিল, যেখানে মেনশেভিকরা একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রের দিকে এগোতে চেয়েছিল।
প্রশ্ন ২: লেনিনের 'এপ্রিল থিসিস' কী ছিল?
উত্তর: 'এপ্রিল থিসিস' ছিল ১৯১৭ সালের এপ্রিলে নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পর ভ্লাদিমির লেনিনের ঘোষিত তিনটি দাবি। এই দাবিগুলো হলো: (১) প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবিলম্বে শেষ করা, (২) সমস্ত জমি কৃষকদের কাছে হস্তান্তর করা, এবং (৩) সমস্ত ব্যাংক জাতীয়করণ করা। এই থিসিসের মাধ্যমে লেনিন ঘোষণা করেন যে, এখন আর অস্থায়ী সরকারকে সমর্থন নয়, বরং 'সোভিয়েতের হাতে সমস্ত ক্ষমতা' তুলে দেওয়ার সময় এসেছে।
প্রশ্ন ৩: স্তালিনের সমষ্টিকরণ নীতি কী ছিল এবং এর ফলাফল কী হয়েছিল?
উত্তর: স্তালিনের সমষ্টিকরণ নীতি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের কৃষি ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করার একটি উদ্যোগ। এই নীতির অধীনে, ব্যক্তিগত খামারগুলোকে বিলুপ্ত করে সমস্ত কৃষককে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত যৌথ খামার বা 'কলখোজ'-এ কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা, শহরগুলিতে সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এর ফলাফল ছিল ভয়াবহ। কৃষকরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে, লক্ষ লক্ষ গবাদি পশু মেরে ফেলা হয়। উৎপাদন না বেড়ে বরং কমে যায়, যার ফলে ১৯৩২-৩৩ সালে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। যারা বিরোধিতা করেছিল, তাদের কঠোরভাবে দমন করা হয়।
সারসংক্ষেপ
আসুন, এই অধ্যায়ের মূল বিষয়গুলো একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক:
- বিপ্লবের প্রেক্ষাপট: উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপে উদারপন্থী, র্যাডিকাল ও রক্ষণশীলদের মধ্যে আদর্শগত সংঘাত, শিল্প বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট সামাজিক সমস্যা এবং কার্ল মার্ক্সের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রসার রুশ বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
- ১৯০৫ সালের বিপ্লব: 'রক্তাক্ত রবিবার'-এর ঘটনা রাশিয়ায় প্রথম বড় ধরনের গণবিদ্রোহের জন্ম দেয়, যার ফলে জার ডুমা বা সংসদ গঠনে বাধ্য হন, যদিও তা ছিল সীমিত ক্ষমতার।
- দুটি প্রধান বিপ্লব: ১৯১৭ সালের বিপ্লব দুটি পর্যায়ে হয়েছিল। ফেব্রুয়ারি বিপ্লব জারতন্ত্রের পতন ঘটায় এবং একটি অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করে। অক্টোবর বিপ্লব লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকদের ক্ষমতায় নিয়ে আসে।
- বলশেভিক শাসন: ক্ষমতা দখলের পর বলশেভিকরা শিল্প, ব্যাংক ও জমির জাতীয়করণ করে। তারা একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং একটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জয়লাভ করে।
- সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন: বিপ্লবের পর রাশিয়া বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনা এবং পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত শিল্পায়ন ঘটায়।
- স্তালিনবাদ: লেনিনের পর স্তালিনের শাসনামলে কৃষির সমষ্টিকরণ এবং ব্যাপক দমন-পীড়নের মাধ্যমে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্ভোগ ও মৃত্যুর কারণ হয়।
রুশ বিপ্লব বিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এটি দেখিয়েছিল যে একটি বিকল্প সমাজ ব্যবস্থা সম্ভব, কিন্তু সেই সাথে এটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণের বিপদ সম্পর্কেও আমাদের সচেতন করে।