রাহুল: স্যার, আমি আজকাল দেখি বিভিন্ন অ্যাপে যখন আমরা কোনো জায়গা খুঁজি, তখন সেটা একটা ম্যাপের মধ্যে একদম সঠিক একটা বিন্দুর মাধ্যমে দেখানো হয়। এমনকি আমার বাবার গাড়ি যখন সার্ভিসিং-এ যায়, তখন সেটার লোকেশন ট্র্যাক করা হয়। এটা কীভাবে সম্ভব হয় স্যার? গণিতের এর পিছনে কোনো ভূমিকা আছে কি?
অঙ্ক স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন করেছো, রাহুল! তোমার এই কৌতূহল থেকেই আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বেরিয়ে এসেছে। হ্যাঁ, গণিতের একটা বিশেষ শাখা এর পিছনে কাজ করে, যার নাম স্থানাঙ্ক জ্যামিতি (Coordinate Geometry)। এটা এমন একটা পদ্ধতি যা দিয়ে আমরা একটা সমতলের (plane) ওপর কোনো বিন্দুর অবস্থানকে সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করতে পারি। আজ আমরা দশম শ্রেণির গণিতের সপ্তম অধ্যায়, এই স্থানাঙ্ক জ্যামিতি নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করব। কেমন?
রাহুল: দারুন হবে স্যার! আমি এটা জানার জন্য খুব আগ্রহী। কিন্তু স্থানাঙ্ক জ্যামিতি আসলে কী?
অঙ্ক স্যার: চলো, তাহলে শুরু করা যাক। স্থানাঙ্ক জ্যামিতি হলো গণিতের সেই শাখা যেখানে জ্যামিতিক সমস্যাগুলিকে বীজগণিত ব্যবহার করে সমাধান করা হয়। এর মূল ধারণা হলো, যেকোনো বিন্দুর অবস্থানকে দুটি সংখ্যার সাহায্যে প্রকাশ করা। এই দুটি সংখ্যাকে আমরা বলি স্থানাঙ্ক (Coordinates)।
স্থানাঙ্ক জ্যামিতির ভিত্তি: কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা (Cartesian Coordinate System)
অঙ্ক স্যার: ফরাসি গণিতজ্ঞ রেনে দেকার্ত (René Descartes) এই পদ্ধতির প্রবর্তন করেছিলেন, তাই এর নাম কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা। এটা বুঝতে হলে, প্রথমে আমাদের একটি সমতল কল্পনা করতে হবে। তারপর সেই সমতলে দুটি পরস্পর লম্ব সরলরেখা টানতে হবে। এদের একটিকে বলা হয় অনুভূমিক অক্ষ বা X-অক্ষ এবং অন্যটিকে বলা হয় উল্লম্ব অক্ষ বা Y-অক্ষ।
রাহুল: ওহ, তাহলে কি এটা সেই গ্রাফ পেপারের মতো, যেটা আমরা ছোটবেলায় ব্যবহার করতাম?
অঙ্ক স্যার: ঠিক ধরেছো, রাহুল! গ্রাফ পেপার এর একটা বাস্তব উদাহরণ। যেখানে X-অক্ষ ও Y-অক্ষ একে অপরকে ছেদ করে, সেই বিন্দুটিকে বলা হয় মূলবিন্দু (Origin)। এর স্থানাঙ্ক হলো (0, 0)। X-অক্ষের ডানদিককে ধনাত্মক দিক এবং বাঁ দিককে ঋণাত্মক দিক ধরা হয়। একইভাবে, Y-অক্ষের উপরের দিক ধনাত্মক এবং নিচের দিক ঋণাত্মক হয়।
রাহুল: আচ্ছা স্যার, তাহলে কোনো বিন্দুর স্থানাঙ্ক কীভাবে লিখি আমরা?
অঙ্ক স্যার: প্রতিটি বিন্দুর অবস্থানকে দুটি সংখ্যার জোড় দিয়ে বোঝানো হয়, যেমন (x, y)। এখানে প্রথম সংখ্যাটি (x) X-অক্ষ বরাবর মূলবিন্দু থেকে বিন্দুর দূরত্ব বোঝায়, যাকে আমরা ভুজ (abscissa) বলি। আর দ্বিতীয় সংখ্যাটি (y) Y-অক্ষ বরাবর মূলবিন্দু থেকে বিন্দুর দূরত্ব বোঝায়, যাকে আমরা কোটি (ordinate) বলি। সবসময় ভুজের মান আগে এবং কোটির মান পরে লেখা হয়, এবং তারা প্রথম বন্ধনী দিয়ে আবদ্ধ থাকে, মাঝখানে একটি কমা থাকে।
রাহুল: তার মানে যদি আমি (3, 2) লিখি, তাহলে X-অক্ষ বরাবর 3 একক ডানে গিয়ে Y-অক্ষ বরাবর 2 একক উপরে যেতে হবে, তাই তো?
অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক বলেছো! তুমি বিষয়টি বুঝতে পেরেছো। এই X-অক্ষ এবং Y-অক্ষ সমতলকে চারটি অংশে ভাগ করে, যাদের পাদ বা চতুর্ভাগ (Quadrants) বলা হয়।
- প্রথম পাদ (First Quadrant): x ও y উভয়ই ধনাত্মক (+, +)
- দ্বিতীয় পাদ (Second Quadrant): x ঋণাত্মক, y ধনাত্মক (-, +)
- তৃতীয় পাদ (Third Quadrant): x ও y উভয়ই ঋণাত্মক (-, -)
- চতুর্থ পাদ (Fourth Quadrant): x ধনাত্মক, y ঋণাত্মক (+, -)
দূরত্ব নির্ণয়ের সূত্র (Distance Formula)
রাহুল: স্যার, আমি যদি দুটো বিন্দুর অবস্থান জানি, তাহলে তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব কীভাবে বের করব? ধরুন, আমার স্কুলের অবস্থান আর আমার বাড়ির অবস্থান জানি, তাহলে এই দুটোর দূরত্ব?
অঙ্ক স্যার: বাহ! খুবই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। এর জন্যই আমাদের কাছে রয়েছে দূরত্ব নির্ণয়ের সূত্র। এটি স্থানাঙ্ক জ্যামিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। মনে করো, আমাদের কাছে দুটি বিন্দু আছে: P(x1, y1) এবং Q(x2, y2)। তাহলে P ও Q বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব (PQ) হবে:
PQ = √[(x2 - x1)2 + (y2 - y1)2]
রাহুল: এই সূত্রটা কোথা থেকে এলো স্যার? এটা কি পিথাগোরাসের উপপাদ্য-এর সাথে সম্পর্কিত?
অঙ্ক স্যার: তোমার অনুমান সঠিক, রাহুল! এটা আসলে পিথাগোরাসের উপপাদ্য থেকেই এসেছে। যদি তুমি P এবং Q বিন্দুকে প্লট করো এবং সেখান থেকে X-অক্ষ ও Y-অক্ষের সমান্তরাল করে রেখা টানো, তাহলে তুমি একটি সমকোণী ত্রিভুজ দেখতে পাবে। সেই সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজই হলো P ও Q বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব। X-অক্ষ বরাবর পার্থক্য (x2 - x1) এবং Y-অক্ষ বরাবর পার্থক্য (y2 - y1) হলো সেই ত্রিভুজের দুটি বাহু। পিথাগোরাসের উপপাদ্য অনুযায়ী, অতিভুজের বর্গ = (লম্ব)২ + (ভূমি)২। সেই হিসাবেই এই সূত্রটি গঠিত হয়েছে।
চলো, একটা উদাহরণ দেখি। ধরো, A(2, 3) এবং B(5, 7) দুটি বিন্দু। এদের মধ্যবর্তী দূরত্ব বের করি।
এখানে x1 = 2, y1 = 3, x2 = 5, y2 = 7।
AB = √[(5 - 2)2 + (7 - 3)2]
= √[(3)2 + (4)2]
= √[9 + 16]
= √25
= 5 একক।
রাহুল: বাহ! এটা তো খুব সহজ। তার মানে দুটো বিন্দুর স্থানাঙ্ক জানা থাকলে আমরা যেকোনো দূরত্ব বের করতে পারব। কিন্তু স্যার, এই সূত্রটার ব্যবহার আর কোথায় কোথায় হতে পারে?
অঙ্ক স্যার: এর অনেক ব্যবহার আছে, রাহুল। যেমন:
- ত্রিভুজের প্রকার নির্ণয়: তিনটি বিন্দুর স্থানাঙ্ক দেওয়া থাকলে, তুমি দূরত্ব সূত্র ব্যবহার করে প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য বের করতে পারবে। তারপর সেই দৈর্ঘ্যের ওপর ভিত্তি করে বলতে পারবে যে ত্রিভুজটি সমবাহু, সমদ্বিবাহু, বিষমবাহু নাকি সমকোণী।
- চতুর্ভুজের প্রকার নির্ণয়: চারটি বিন্দুর স্থানাঙ্ক দেওয়া থাকলে, তুমি বাহু এবং কর্ণগুলোর দৈর্ঘ্য বের করে চতুর্ভুজটি সামান্তরিক, আয়তক্ষেত্র, বর্গক্ষেত্র নাকি রম্বস, তা নির্ধারণ করতে পারবে।
- সমরেখ (Collinear) বিন্দু: তিনটি বিন্দু সমরেখ হবে যদি প্রথম দুটি বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং শেষ দুটি বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্বের যোগফল প্রথম ও শেষ বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান হয় (অর্থাৎ, AB + BC = AC)।
- একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে সমদূরবর্তী বিন্দু: যদি কোনো বিন্দু অন্য দুটি বিন্দু থেকে সমান দূরত্বে থাকে, তাহলে আমরা দূরত্ব সূত্র ব্যবহার করে সেই সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি।
চলো, আরেকটি উদাহরণ দেখি। দেখাই যে, বিন্দুগুলি A(1, 7), B(4, 2), C(-1, -1) এবং D(-4, 4) একটি বর্গক্ষেত্রের শীর্ষবিন্দু গঠন করে।
এখানে আমাদের AB, BC, CD, DA এবং কর্ণ AC, BD এর দৈর্ঘ্য বের করতে হবে।
AB = √[(4-1)2 + (2-7)2] = √[32 + (-5)2] = √[9 + 25] = √34
BC = √[(-1-4)2 + (-1-2)2] = √[(-5)2 + (-3)2] = √[25 + 9] = √34
CD = √[(-4-(-1))2 + (4-(-1))2] = √[(-3)2 + (5)2] = √[9 + 25] = √34
DA = √[(1-(-4))2 + (7-4)2] = √[(5)2 + (3)2] = √[25 + 9] = √34
দেখো, চারটি বাহুর দৈর্ঘ্যই সমান। এটা রম্বস বা বর্গক্ষেত্র হতে পারে। এখন কর্ণগুলো বের করি।
AC = √[(-1-1)2 + (-1-7)2] = √[(-2)2 + (-8)2] = √[4 + 64] = √68
BD = √[(-4-4)2 + (4-2)2] = √[(-8)2 + (2)2] = √[64 + 4] = √68
যেহেতু চারটি বাহু সমান (√34) এবং কর্ণ দুটিও সমান (√68), তাই বিন্দুগুলি একটি বর্গক্ষেত্রের শীর্ষবিন্দু গঠন করে।
রাহুল: দারুণ! এটা তো অনেকটা ডিটেকটিভের কাজ করার মতো। প্রমাণ করা যাচ্ছে জ্যামিতিক আকারগুলো কী রকম!
রেখাংশ বিভাজন সূত্র (Section Formula)
অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, ঠিক তাই। এবার চলো অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যাই। ধরো, তোমার কাছে একটি লম্বা দড়ি আছে যার দু’প্রান্তে দুটি গিঁট বাঁধা আছে। তুমি সেই দড়িটিকে একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ করতে চাও। স্থানাঙ্ক জ্যামিতিতে, যদি দুটি বিন্দু থাকে এবং তাদের সংযোগকারী রেখাংশকে অন্য একটি বিন্দু নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ করে, তবে সেই বিন্দুর স্থানাঙ্ক বের করার জন্য আমরা রেখাংশ বিভাজন সূত্র ব্যবহার করি।
মনে করো, A(x1, y1) এবং B(x2, y2) দুটি বিন্দু। একটি বিন্দু P(x, y) এই AB রেখাংশকে m1 : m2 অনুপাতে (অভ্যন্তরস্থভাবে) ভাগ করে। তাহলে P বিন্দুর স্থানাঙ্ক হবে:
P(x, y) = [(m1x2 + m2x1) / (m1 + m2), (m1y2 + m2y1) / (m1 + m2)]
রাহুল: এটা একটু জটিল লাগছে স্যার! m1 এবং m2 কী?
অঙ্ক স্যার: ভয় পেও না, রাহুল! m1 এবং m2 হলো সেই অনুপাত যে অনুপাতে P বিন্দু রেখাংশটিকে ভাগ করছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি রেখাংশকে 1:2 অনুপাতে ভাগ করা হয়, তাহলে m1 = 1 এবং m2 = 2। এই সূত্রটিও সদৃশ ত্রিভুজের ধারণা থেকে এসেছে, তবে এখন আমরা সরাসরি সূত্রটি ব্যবহার করা শিখবো।
উদাহরণ: বিন্দু A(4, -3) এবং B(8, 5)-এর সংযোজক রেখাংশকে P বিন্দু 3:1 অনুপাতে অভ্যন্তরস্থভাবে ভাগ করে। P বিন্দুর স্থানাঙ্ক নির্ণয় করো।
এখানে x1 = 4, y1 = -3, x2 = 8, y2 = 5, m1 = 3, m2 = 1।
x = (m1x2 + m2x1) / (m1 + m2) = (3 * 8 + 1 * 4) / (3 + 1) = (24 + 4) / 4 = 28 / 4 = 7
y = (m1y2 + m2y1) / (m1 + m2) = (3 * 5 + 1 * (-3)) / (3 + 1) = (15 - 3) / 4 = 12 / 4 = 3
সুতরাং, P বিন্দুর স্থানাঙ্ক হলো (7, 3)।
মধ্যবিন্দু সূত্র (Midpoint Formula)
অঙ্ক স্যার: রেখাংশ বিভাজন সূত্রের একটি বিশেষ রূপ হলো মধ্যবিন্দু সূত্র। যদি কোনো বিন্দু একটি রেখাংশকে ঠিক মাঝখানে ভাগ করে, অর্থাৎ 1:1 অনুপাতে ভাগ করে, তাহলে m1 = 1 এবং m2 = 1 হয়। এই মানগুলো বসিয়ে দিলে আমরা পাই:
P(x, y) = [(x1 + x2) / 2, (y1 + y2) / 2]
রাহুল: এটা তো আরও সহজ! তাহলে যেকোনো রেখাংশের মধ্যবিন্দু বের করতে হলে শুধু X স্থানাঙ্কগুলোর গড় এবং Y স্থানাঙ্কগুলোর গড় বের করলেই হবে?
অঙ্ক স্যার: একদম ঠিক, রাহুল! চলো একটা উদাহরণ দেখি। বিন্দু A(2, 5) এবং B(6, 1) এর মধ্যবিন্দু বের করো।
x = (2 + 6) / 2 = 8 / 2 = 4
y = (5 + 1) / 2 = 6 / 2 = 3
সুতরাং, মধ্যবিন্দুর স্থানাঙ্ক হলো (4, 3)।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার: ত্রিভুজের ভরকেন্দ্র (Centroid of a Triangle)
অঙ্ক স্যার: এই বিভাজন সূত্রের একটা চমৎকার ব্যবহার হলো ত্রিভুজের ভরকেন্দ্র (Centroid) নির্ণয়। মনে আছে, ত্রিভুজের মধ্যমাগুলো যে বিন্দুতে মিলিত হয়, তাকে ভরকেন্দ্র বলে? আর প্রতিটি মধ্যমা ভরকেন্দ্র দ্বারা 2:1 অনুপাতে বিভক্ত হয়।
যদি একটি ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুগুলো A(x1, y1), B(x2, y2) এবং C(x3, y3) হয়, তাহলে তার ভরকেন্দ্রের স্থানাঙ্ক (G) হবে:
G(x, y) = [(x1 + x2 + x3) / 3, (y1 + y2 + y3) / 3]
এটাও মনে রাখা সহজ: তিনটি X স্থানাঙ্কের গড় এবং তিনটি Y স্থানাঙ্কের গড়।
ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল (Area of a Triangle)
রাহুল: স্যার, আমরা তো সাধারণ জ্যামিতিতে ত্রিভুজের ভূমি ও উচ্চতা দিয়ে ক্ষেত্রফল বের করা শিখেছি। কিন্তু স্থানাঙ্ক জানা থাকলে কি সেটা সম্ভব?
অঙ্ক স্যার: হ্যাঁ, রাহুল! স্থানাঙ্ক জ্যামিতিতে তিনটি শীর্ষবিন্দুর স্থানাঙ্ক জানা থাকলে আমরা খুব সহজে ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল বের করতে পারি। এটি খুবই উপযোগী একটি সূত্র, বিশেষ করে যখন ত্রিভুজের উচ্চতা সরাসরি দেওয়া থাকে না।
যদি একটি ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুগুলি A(x1, y1), B(x2, y2) এবং C(x3, y3) হয়, তাহলে ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল হবে:
ক্ষেত্রফল = 1/2 |x1(y2 - y3) + x2(y3 - y1) + x3(y1 - y2)|
এখানে দুটি উল্লম্ব রেখা (|...|) পরম মান (absolute value) বোঝায়, কারণ ক্ষেত্রফল কখনও ঋণাত্মক হতে পারে না।
রাহুল: এই সূত্রটা দেখতে একটু বড় মনে হচ্ছে স্যার। এটা মনে রাখার কোনো সহজ উপায় আছে?
অঙ্ক স্যার: আছে রাহুল! তুমি একটা প্যাটার্ন মনে রাখতে পারো। x-এর ক্রম 1, 2, 3 এবং y-এর ক্রম 23, 31, 12। মানে (y2 - y3), (y3 - y1), (y1 - y2)। তুমি চাইলে একটা ঘড়ির কাঁটার মতো সাইক্লিক অর্ডারে মনে রাখতে পারো: x1(y2-y3), x2(y3-y1), x3(y1-y2)।
চলো একটা উদাহরণ দেখি। বিন্দু A(1, -1), B(-4, 6) এবং C(-3, -5) দ্বারা গঠিত ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করো।
এখানে x1 = 1, y1 = -1
x2 = -4, y2 = 6
x3 = -3, y3 = -5
ক্ষেত্রফল = 1/2 |1(6 - (-5)) + (-4)(-5 - (-1)) + (-3)(-1 - 6)|
= 1/2 |1(6 + 5) - 4(-5 + 1) - 3(-7)|
= 1/2 |1(11) - 4(-4) - 3(-7)|
= 1/2 |11 + 16 + 21|
= 1/2 |48|
= 24 বর্গ একক।
বিন্দুগুলির সমরেখতা (Collinearity of Points)
অঙ্ক স্যার: এই ক্ষেত্রফলের সূত্র ব্যবহার করে আমরা তিনটি বিন্দুর সমরেখতাও পরীক্ষা করতে পারি। যদি তিনটি বিন্দু সমরেখ হয়, অর্থাৎ তারা একই সরলরেখার উপর অবস্থিত হয়, তাহলে তারা কোনো ত্রিভুজ গঠন করতে পারে না। এর অর্থ হলো, তাদের দ্বারা গঠিত ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল শূন্য হবে।
রাহুল: ওহ, তাহলে যদি আমি ক্ষেত্রফলের সূত্র দিয়ে উত্তর শূন্য পাই, তার মানে বিন্দুগুলো একই লাইনে আছে?
অঙ্ক স্যার: ঠিক ধরেছো, রাহুল! এটা সমরেখতা পরীক্ষার একটি খুব কার্যকর পদ্ধতি।
Q&A সেশন
রাহুল: স্যার, আমি এই অধ্যায় থেকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে চাই।
অঙ্ক স্যার: অবশ্যই, রাহুল। জিজ্ঞাসা করো।
রাহুল: প্রশ্ন ১: X-অক্ষের উপর অবস্থিত একটি বিন্দুর স্থানাঙ্ক কী রূপে লেখা যায়? আর Y-অক্ষের উপর অবস্থিত একটি বিন্দুর?
অঙ্ক স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন! X-অক্ষের উপর যেকোনো বিন্দুর y স্থানাঙ্ক সবসময় 0 হয়। তাই X-অক্ষের উপর অবস্থিত একটি বিন্দুর স্থানাঙ্ক (x, 0) রূপে লেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, (5, 0) বা (-3, 0)। একইভাবে, Y-অক্ষের উপর যেকোনো বিন্দুর x স্থানাঙ্ক সবসময় 0 হয়। তাই Y-অক্ষের উপর অবস্থিত একটি বিন্দুর স্থানাঙ্ক (0, y) রূপে লেখা যায়। যেমন, (0, 7) বা (0, -2)। মনে রেখো, মূলবিন্দু (0,0) উভয় অক্ষের উপরই অবস্থিত।
রাহুল: প্রশ্ন ২: একটি বিন্দুর স্থানাঙ্ক (a, b) এবং মূলবিন্দু থেকে তার দূরত্ব 5 একক। তাহলে a এবং b-এর মধ্যে সম্পর্ক কী হবে?
অঙ্ক স্যার: চমৎকার প্রশ্ন! আমরা জানি, মূলবিন্দুর স্থানাঙ্ক (0, 0)। তাহলে বিন্দু (a, b) এবং মূলবিন্দু (0, 0)-এর মধ্যবর্তী দূরত্ব নির্ণয়ের সূত্রটি ব্যবহার করি।
দূরত্ব = √[(a - 0)2 + (b - 0)2]
5 = √[a2 + b2]
উভয় পক্ষকে বর্গ করে পাই:
52 = a2 + b2
25 = a2 + b2
সুতরাং, a2 + b2 = 25 হলো a এবং b-এর মধ্যে সম্পর্ক। এর মানে হলো, যে সকল বিন্দুর স্থানাঙ্কের বর্গের সমষ্টি 25 হবে, সেই সকল বিন্দুর মূলবিন্দু থেকে দূরত্ব 5 একক হবে।
রাহুল: প্রশ্ন ৩: যদি বিন্দু P(x, y) বিন্দু A(7, 1) এবং B(3, 5) থেকে সমদূরবর্তী হয়, তাহলে x এবং y-এর মধ্যে একটি সম্পর্ক নির্ণয় করুন।
অঙ্ক স্যার: এটি দূরত্ব সূত্রের একটি ব্যবহারিক সমস্যা। যেহেতু P বিন্দু A এবং B থেকে সমদূরবর্তী, তার মানে PA = PB।
PA2 = PB2
[(x - 7)2 + (y - 1)2] = [(x - 3)2 + (y - 5)2]
(x2 - 14x + 49) + (y2 - 2y + 1) = (x2 - 6x + 9) + (y2 - 10y + 25)
x2 - 14x + 49 + y2 - 2y + 1 = x2 - 6x + 9 + y2 - 10y + 25
উভয় পক্ষ থেকে x2 এবং y2 বাদ দিলে:
-14x - 2y + 50 = -6x - 10y + 34
-14x + 6x - 2y + 10y = 34 - 50
-8x + 8y = -16
8y - 8x = -16
8(y - x) = -16
y - x = -16 / 8
y - x = -2
x - y = 2
সুতরাং, x - y = 2 হলো x এবং y-এর মধ্যে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক। এই সম্পর্কটি একটি সরলরেখা নির্দেশ করে, যার উপর P বিন্দুটি অবস্থিত।
রাহুল: প্রশ্ন ৪: P(-2, 3) এবং Q(4, -1) বিন্দু দুটির সংযোগকারী রেখাংশকে Y-অক্ষ কোন অনুপাতে ভাগ করে?
অঙ্ক স্যার: চমৎকার প্রশ্ন! মনে করো Y-অক্ষ P(-2, 3) এবং Q(4, -1) বিন্দু দুটির সংযোগকারী রেখাংশকে K:1 অনুপাতে R(0, y) বিন্দুতে ভাগ করে, কারণ Y-অক্ষের উপর x স্থানাঙ্ক সর্বদা 0 হয়।
বিভাজন সূত্র অনুযায়ী, R বিন্দুর x স্থানাঙ্ক হবে:
0 = (K * x2 + 1 * x1) / (K + 1)
0 = (K * 4 + 1 * (-2)) / (K + 1)
0 = (4K - 2) / (K + 1)
যেহেতু K + 1 ≠ 0, তাই 4K - 2 = 0
4K = 2
K = 2 / 4
K = 1/2
সুতরাং, Y-অক্ষ রেখাংশটিকে 1:2 অনুপাতে ভাগ করে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা কারণ এটি নির্দেশ করে যে কোনো অক্ষ একটি রেখাংশকে কোন অনুপাতে ছেদ করে তা কীভাবে বের করা যায়।
আজ আমরা কী শিখলাম?
অঙ্ক স্যার: রাহুল, আজকের আলোচনা থেকে আমরা স্থানাঙ্ক জ্যামিতির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখলাম। তুমি কি সংক্ষেপে বলতে পারবে, প্রধান প্রধান বিষয়গুলো কী কী?
রাহুল: হ্যাঁ স্যার! আমি চেষ্টা করছি।
- স্থানাঙ্ক জ্যামিতি কী: এটি জ্যামিতিক সমস্যা সমাধানের জন্য বীজগণিত ব্যবহার করে, যেখানে বিন্দুর অবস্থান সংখ্যার সাহায্যে প্রকাশ করা হয়।
- কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা: X-অক্ষ, Y-অক্ষ এবং মূলবিন্দু (0,0) নিয়ে গঠিত, যা সমতলকে চারটি চতুর্ভাগে ভাগ করে। যেকোনো বিন্দুর স্থানাঙ্ক (ভুজ, কোটি) রূপে লেখা হয়।
- দূরত্ব নির্ণয়ের সূত্র: দুটি বিন্দু P(x1, y1) এবং Q(x2, y2)-এর মধ্যবর্তী দূরত্ব PQ = √[(x2 - x1)2 + (y2 - y1)2] দিয়ে নির্ণয় করা যায়। এটি পিথাগোরাসের উপপাদ্য থেকে এসেছে এবং ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজের প্রকার নির্ণয়ে সাহায্য করে।
- রেখাংশ বিভাজন সূত্র: একটি বিন্দু P(x, y) যদি A(x1, y1) এবং B(x2, y2) কে m1 : m2 অনুপাতে ভাগ করে, তবে P-এর স্থানাঙ্ক হয় [(m1x2 + m2x1) / (m1 + m2), (m1y2 + m2y1) / (m1 + m2)]।
- মধ্যবিন্দু সূত্র: বিভাজন সূত্রের একটি বিশেষ রূপ, যেখানে মধ্যবিন্দুর স্থানাঙ্ক হয় [(x1 + x2) / 2, (y1 + y2) / 2]।
- ত্রিভুজের ভরকেন্দ্র: তিনটি শীর্ষবিন্দুর স্থানাঙ্ক থেকে ভরকেন্দ্র নির্ণয় করা যায় [(x1 + x2 + x3) / 3, (y1 + y2 + y3) / 3]।
- ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল: তিনটি শীর্ষবিন্দু A(x1, y1), B(x2, y2) এবং C(x3, y3) দ্বারা গঠিত ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল = 1/2 |x1(y2 - y3) + x2(y3 - y1) + x3(y1 - y2)|।
- বিন্দুগুলির সমরেখতা: যদি তিনটি বিন্দুর দ্বারা গঠিত ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল শূন্য হয়, তাহলে বিন্দুগুলি সমরেখ হয়।
অঙ্ক স্যার: অসাধারণ সারসংক্ষেপ, রাহুল! তুমি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছো। মনে রাখবে, স্থানাঙ্ক জ্যামিতি শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্য নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও এর অনেক ব্যবহার রয়েছে। মানচিত্র তৈরি, প্রকৌশল, কম্পিউটার গ্রাফিক্স সহ অনেক ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ দেখা যায়। নিয়মিত অনুশীলন করলে এই অধ্যায়টি তোমার কাছে আরও সহজ ও মজার মনে হবে।
রাহুল: অনেক ধন্যবাদ স্যার! আজকের আলোচনাটা আমার স্থানাঙ্ক জ্যামিতি সম্পর্কে সব দ্বিধা দূর করে দিয়েছে এবং আমার খুব ভালো লেগেছে। এখন আমি এই অধ্যায়ের সমস্যাগুলো আত্মবিশ্বাসের সাথে সমাধান করতে পারব।
অঙ্ক স্যার: শুনে খুব আনন্দিত হলাম, রাহুল। এটাই তো আমি চাই! গণিতের আসল মজা লুকিয়ে আছে তার প্রয়োগে এবং সমস্যা সমাধানে। আবার দেখা হবে!