বিষয়ের ভূমিকা

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে মুঘল সাম্রাজ্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এই বিশাল ভূখণ্ড শাসনকারী মুঘলরা কেবল তাদের সাম্রাজ্যের বিস্তারই ঘটায়নি, বরং শিল্প, স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছে যা আজও আমাদের প্রভাবিত করে। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে এই সাম্রাজ্যের সূচনা হয় এবং ধীরে ধীরে এটি প্রায় সমগ্র উপমহাদেশকে নিজের অধীনে নিয়ে আসে।

সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যক্রমের চতুর্থ অধ্যায়, 'মুঘল সাম্রাজ্য', আমাদের সেই গৌরবময় এবং জটিল সময়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই অধ্যায়ে আমরা জানতে পারি কীভাবে বাবরという একজন বহিরাগত শাসক ভারতে এসে এক নতুন রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন এবং কীভাবে তাঁর উত্তরসূরিরা, বিশেষ করে আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান এবং ঔরঙ্গজেব, এই সাম্রাজ্যকে তার শিখরে পৌঁছে দেন। আমরা তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যেমন – মনসবদারি প্রথা এবং তাদের রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। এছাড়াও, আকবরের মতো শাসকের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার নীতি 'সুলহ-ই-কুল' কীভাবে এত বড় এবং বৈচিত্র্যময় একটি সাম্রাজ্যকে একত্রিত রাখতে সাহায্য করেছিল, তা নিয়েও আলোচনা করা হবে। এই অধ্যায়টি পড়লে আমরা বুঝতে পারব যে মধ্যযুগে ভারতের মতো একটি বিশাল এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশকে শাসন করা কতটা কঠিন ছিল এবং মুঘলরা সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা কীভাবে করেছিল। চলুন, এই ঐতিহাসিক যাত্রায় মুঘলদের উত্থান ও পতনের কাহিনী বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

মুঘলরা কারা ছিলেন? তাঁদের বংশ পরিচয়

মুঘল শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে শক্তিশালী সম্রাটদের কথা ভেসে ওঠে। কিন্তু এই 'মুঘল' নামের উৎস কোথায়? মুঘলরা দুটি মহান শাসক বংশের উত্তরসূরি ছিলেন।

  • মাতৃসূত্রে: মুঘলরা ছিলেন মোঙ্গল শাসক চেঙ্গিস খানের বংশধর। চেঙ্গিস খান (মৃত্যু ১২২৭) মধ্য এশিয়ার এক বিশাল অঞ্চলের অধিপতি ছিলেন। তাঁর হিংস্রতা এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের কাহিনী ইতিহাসে কুখ্যাত।
  • পিতৃসূত্রে: তাঁরা ছিলেন ইরান, ইরাক এবং আধুনিক তুরস্কের শাসক তৈমুর লঙের (মৃত্যু ১৪০৪) বংশধর।

তবে মজার বিষয় হলো, মুঘলরা নিজেদের 'মুঘল' বা 'মোঙ্গল' বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন না। এর কারণ ছিল চেঙ্গিস খানের নাম অসংখ্য মানুষের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। অন্যদিকে, তাঁরা তাঁদের তৈমুরি বংশপরিচয় নিয়ে অত্যন্ত গর্ববোধ করতেন। কারণ তাঁদের পূর্বপুরুষ তৈমুর ১৩৯৮ সালে দিল্লি দখল করেছিলেন এবং এই বংশের উপর তাঁদের একটি ঐতিহাসিক অধিকার আছে বলে মনে করতেন। বাবর থেকে শুরু করে পরবর্তী মুঘল সম্রাটরা নিজেদের তৈমুরের বংশধর হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁদের দরবারের চিত্রকলাতেও তৈমুরের সঙ্গে নিজেদের ছবি আঁকিয়ে রাখতেন।

মুঘল সামরিক অভিযানসমূহ এবং সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা

মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল এক निर्णायक যুদ্ধের মাধ্যমে। আসুন, আমরা প্রথম দুই মুঘল সম্রাটের সামরিক অভিযানগুলি দেখি।

প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর (১৫২৬-১৫৩০)

জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি মধ্য এশিয়ার ফারগানা রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাঁকে নিজের পৈতৃক সিংহাসন হারাতে হয়। অনেক বছর ধরে ঘুরে বেড়ানোর পর, তিনি ১৫০৪ সালে কাবুল দখল করেন।

এরপর তাঁর নজর পড়ে ভারতের অফুরন্ত ধনসম্পদ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার উপর। সেই সময়ে দিল্লির সুলতান ছিলেন ইব্রাহিম লোদি। তাঁর শাসন দুর্বল ছিল এবং অনেক আফগান সর্দার তাঁর উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন।

  • পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (১৫২৬): বাবর তাঁর ছোট কিন্তু সুসংগঠিত সেনাবাহিনী এবং উন্নত রণকৌশল, বিশেষ করে তুর্কিদের থেকে শেখা 'তুলুগমা' রণনীতি এবং কামানের কার্যকর ব্যবহার করে ইব্রাহিম লোদির বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর মাধ্যমে দিল্লিতে সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে এবং মুঘল শাসনের সূচনা হয়।
  • খানুয়ার যুদ্ধ (১৫২৭): মেবারের শক্তিশালী রাজপুত শাসক রানা সঙ্গ বাবরের বিরুদ্ধে একটি বিশাল জোট গঠন করেন। খানুয়ার প্রান্তরে বাবরের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধেও বাবর তাঁর উন্নত রণকৌশল এবং সেনাবাহিনীর মনোবল বাড়িয়ে জয়লাভ করেন।
  • চান্দেরির যুদ্ধ (১৫২৮): এই যুদ্ধে বাবর চান্দেরির রাজপুতদের পরাজিত করেন।

এই বিজয়গুলির মাধ্যমে বাবর দিল্লি ও আগ্রায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। তবে তিনি বেশিদিন শাসন করতে পারেননি, ১৫৩০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুন (১৫৩০-১৫৪০ এবং ১৫৫৫-১৫৫৬)

বাবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তাঁর পথ বাবার মতোই মসৃণ ছিল না। তিনি তাঁর পিতার ইচ্ছানুযায়ী তাঁর ভাইদের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দেন, যা তাঁর জন্য একটি বড় ভুল প্রমাণিত হয়। তাঁর ভাই কামরান তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান।

হুমায়ুনের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ছিলেন আফগান শাসক শের শাহ সুরি

  • চৌসার যুদ্ধ (১৫৩৯) এবং কনৌজের যুদ্ধ (১৫৪০): এই দুটি যুদ্ধে শের শাহের কাছে হুমায়ুন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এই পরাজয়ের ফলে তিনি সিংহাসন হারিয়ে ভারতে থেকে বিতাড়িত হন এবং পারস্যের সাফাভিদ শাহের দরবারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

প্রায় ১৫ বছর নির্বাসনে কাটানোর পর, হুমায়ুন সাফাভিদ শাহের সাহায্য নিয়ে ১৫৫৫ সালে পুনরায় দিল্লি দখল করতে সক্ষম হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, পরের বছরই তিনি তাঁর গ্রন্থাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। তাঁর জীবন ছিল উত্থান-পতনে ভরা, যা তাঁর নামের অর্থ 'ভাগ্যবান'-এর সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।

মহান মুঘল সম্রাটগণ: আকবর থেকে ঔরঙ্গজেব

হুমায়ুনের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য এক নতুন যুগে প্রবেশ করে, যা আকবরের হাত ধরে শুরু হয়েছিল। এই সময়কালকে প্রায়শই 'মহান মুঘলদের যুগ' বলা হয়।

সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫)

মাত্র ১৩ বছর বয়সে হুমায়ুনের মৃত্যুর পর আকবর সিংহাসনে বসেন। তাঁর অভিভাবক হিসেবে বৈরাম খান তাঁকে শাসনকার্যে সহায়তা করেন। আকবরের শাসনকালকে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়।

  • সাম্রাজ্য বিস্তার: আকবর একজন দূরদর্শী এবং শক্তিশালী শাসক ছিলেন। তিনি তাঁর অভিভাবক বৈরাম খানের সাহায্যে পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে (১৫৫৬) হিমুকে পরাজিত করে নিজের ক্ষমতা সুনিশ্চিত করেন। এরপর তিনি মালওয়া, গন্ডোয়ানা, গুজরাট, বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা এবং দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ জয় করে মুঘল সাম্রাজ্যকে এক বিশাল আকার দেন।
  • প্রশাসনিক সংস্কার: আকবর কেবল একজন বিজেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ প্রশাসক। তিনি মনসবদারি প্রথা চালু করেন, যা ছিল তাঁর সেনাবাহিনীর এবং প্রশাসনের মূল ভিত্তি। তিনি টোডরমলের সাহায্যে এক নতুন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, যা 'জাবত্' নামে পরিচিত, প্রবর্তন করেন।
  • ধর্মীয় নীতি: আকবরের শাসনকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর ধর্মীয় সহনশীলতা এবং উদারনীতি। তিনি বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের নিয়ে তাঁর রাজধানী ফতেপুর সিক্রির 'ইবাদত খানা'-য় ধর্মীয় আলোচনা সভার আয়োজন করতেন। এই আলোচনার ভিত্তিতে তিনি 'সুলহ-ই-কুল' বা 'সকলের জন্য শান্তি' নীতির ধারণা দেন। তিনি জিজিয়া করের মতো বৈষম্যমূলক কর তুলে দেন এবং রাজপুতদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে সাম্রাজ্যের ভিত্তি আরও মজবুত করেন।

সম্রাট জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৭)

আকবরের পুত্র সেলিম 'জাহাঙ্গীর' (বিশ্ব বিজেতা) উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। তিনি তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা বজায় রাখেন। তাঁর শাসনকালে সাম্রাজ্যে শান্তি বজায় ছিল। তবে তাঁর স্ত্রী, মেহের-উন-নিসা, যিনি নূর জাহান (জগতের আলো) নামে পরিচিত ছিলেন, শাসনকার্যে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। জাহাঙ্গীর শিল্প ও চিত্রকলার একজন বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর সময়ে মুঘল চিত্রকলা তার উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছেছিল।

সম্রাট শাহজাহান (১৬২৭-১৬৫৮)

জাহাঙ্গীরের পুত্র শাহজাহানের শাসনকালকে মুঘল স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়। তিনি ছিলেন একজন মহান নির্মাতা। তাঁর অমর কীর্তিগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • তাজমহল: আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে তাঁর প্রিয় স্ত্রী মুমতাজ মহলের স্মরণে নির্মিত এই শ্বেতপাথরের সমাধিটি বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি।
  • লালকেল্লা ও জামা মসজিদ: দিল্লিতে নির্মিত এই স্থাপত্যগুলি মুঘল শক্তির প্রতীক।

তাঁর শাসনকালে সাম্রাজ্যে সমৃদ্ধি থাকলেও, শেষ জীবনে তাঁকে তাঁর পুত্রদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে এক রক্তক্ষয়ী উত্তরাধিকার যুদ্ধ দেখতে হয়। এই যুদ্ধে তাঁর পুত্র ঔরঙ্গজেব বিজয়ী হন এবং শাহজাহানকে আগ্রার দুর্গে বন্দী করে রাখেন।

সম্রাট ঔরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭)

ঔরঙ্গজেব ছিলেন শেষ মহান মুঘল সম্রাট। তিনি তাঁর ভাইদের পরাজিত ও হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন। তাঁর শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্য তার আয়তনের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়। তিনি দাক্ষিণাত্যের বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয় করেন।

কিন্তু তাঁর কিছু নীতি সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

  • দাক্ষিণাত্য নীতি: তিনি তাঁর শাসনের দীর্ঘ ২৬ বছর দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কাটিয়ে দেন। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়।
  • ধর্মীয় নীতি: তিনি আকবরের উদার ধর্মীয় নীতি থেকে সরে আসেন এবং পুনরায় জিজিয়া কর চালু করেন। তাঁর এই নীতি অনেক হিন্দু শাসক, যেমন মারাঠা এবং শিখদের বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করে।

১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দ্রুত দুর্বল হতে শুরু করে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলির উত্থান ঘটে।

মুঘল উত্তরাধিকার প্রথা: কেন ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ হতো?

ইউরোপীয় রাজবংশগুলিতে সাধারণত জ্যেষ্ঠাধিকার (Primogeniture) প্রথা অনুসরণ করা হতো, যেখানে জ্যেষ্ঠ পুত্রই পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতেন। কিন্তু মুঘলরা এই প্রথা অনুসরণ করত না।

তাঁরা তৈমুরি প্রথা বা সহ-উত্তরাধিকার (Coparcenary Inheritance) নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। এই প্রথা অনুযায়ী, পিতার সাম্রাজ্য সমস্ত পুত্রদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হতো। এই নীতির কারণেই সিংহাসনের প্রত্যেক দাবিদার ভাইদের মধ্যে প্রায়শই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং বিদ্রোহ দেখা যেত। শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে হওয়া যুদ্ধ বা ঔরঙ্গজেবের সিংহাসন দখলের ঘটনা এর অন্যতম উদাহরণ। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব মুঘল সাম্রাজ্যকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল।

মুঘলদের শাসনব্যবস্থা: মনসবদার ও জায়গিরদার

মুঘল সাম্রাজ্যের বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড়িয়ে ছিল মনসবদারি ব্যবস্থার উপর। এটি ছিল একটি পদমর্যাদা বা র‍্যাঙ্কিং সিস্টেম, যা আকবর চালু করেছিলেন।

  • মনসব কী? 'মনসব' একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ পদ বা পদমর্যাদা। যে ব্যক্তি এই মনসব পেতেন, তাঁকে মনসবদার বলা হতো। মনসবদাররা ছিলেন সাম্রাজ্যের সামরিক ও বেসামরিক আমলা।
  • জাট ও সওয়ার: একজন মনসবদারের পদমর্যাদা দুটি সংখ্যা দ্বারা নির্ধারিত হতো – 'জাট' (Zat) এবং 'সওয়ার' (Sawar)
    • জাট: এটি মনসবদারের ব্যক্তিগত পদমর্যাদা এবং তাঁর বেতন নির্ধারণ করত। যার জাট যত বেশি, দরবারে তাঁর মর্যাদা তত বেশি।
    • সওয়ার: এটি নির্দেশ করত যে একজন মনসবদারকে কতজন অশ্বারোহী সৈন্য বা 'সওয়ার' রাখতে হবে।
  • মনসবদারদের দায়িত্ব: তাঁদের প্রধান দায়িত্ব ছিল নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে সম্রাটকে সামরিক সহায়তা প্রদান করা। এছাড়াও, তাঁরা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত হতেন।
  • বেতন ও জায়গির: মনসবদাররা তাঁদের বেতন পেতেন রাজস্ব বরাদ্দ বা 'জায়গির' থেকে। জায়গির অনেকটা দিল্লি সুলতানির 'ইকতা'-র মতো ছিল। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, মনসবদাররা জায়গিরের উপর বাস করতেন না বা তার প্রশাসন চালাতেন না। তাঁরা কেবল সেই অঞ্চল থেকে নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের অধিকার পেতেন, যা তাঁদের বেতন হিসেবে গণ্য হতো। রাজস্ব আদায়ের কাজ তাঁদের কর্মচারীরা করত। আকবরের সময়ে জায়গিরগুলি সাবধানে মূল্যায়ন করা হতো যাতে তা মনসবদারের বেতনের সমান হয়। কিন্তু ঔরঙ্গজেবের সময়ে জায়গিরের সংখ্যা কমে যায় এবং মনসবদারের সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে জায়গির পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো, যা প্রশাসনে দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।

জাবত্ প্রথা এবং জমিদার

মুঘলদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করা ভূমি রাজস্ব। এই ব্যবস্থাটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ছিল।

  • জাবত্ (Zabt): আকবরের রাজস্বমন্ত্রী, রাজা টোডরমল, একটি নতুন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা চালু করেন, যা 'জাবত্' নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায়, গত দশ বছরের (১৫৭০-১৫৮০) ফসলের উৎপাদন, মূল্য এবং চাষের জমির একটি সতর্ক সমীক্ষা করা হতো। এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি ফসলের জন্য নগদে একটি নির্দিষ্ট রাজস্ব হার নির্ধারণ করা হতো।
  • রাজস্ব সার্কেল: সমগ্র সাম্রাজ্যকে বিভিন্ন প্রদেশে (সুবা) ভাগ করা হয়েছিল। প্রতিটি প্রদেশকে আবার বিভিন্ন রাজস্ব সার্কেলে ভাগ করা হয়, যেখানে একই রকম রাজস্ব হার প্রযোজ্য ছিল। এই ব্যবস্থাটি প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক ছিল।
  • জমিদার: মুঘলরা রাজস্ব আদায়ের জন্য স্থানীয় প্রধান বা শক্তিশালী ব্যক্তিদের উপর নির্ভর করত, যাদের 'জমিদার' বলা হতো। জমিদাররা ছিলেন মধ্যস্বত্বভোগী, যারা কৃষকদের কাছ থেকে কর আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতেন। কখনও কখনও, জমিদার এবং কৃষকরা একত্রিত হয়ে মুঘল শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করত।

আকবরের নীতি: একটি নিবিড় পর্যবেক্ষণ

আকবরের শাসনকালের বৈশিষ্ট্যগুলি 'আইন-ই-আকবরি' গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা তাঁর বন্ধু এবং সভাসদ আবুল ফজল রচনা করেছিলেন।

প্রশাসনিক নীতি

আকবরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। সাম্রাজ্যকে 'সুবা' বা প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল। প্রতিটি সুবার শাসনভার ছিল একজন 'সুবেদার'-এর উপর, যিনি রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় দায়িত্ব পালন করতেন। প্রতিটি প্রদেশে একজন আর্থিক কর্মকর্তা বা 'দিওয়ান' থাকতেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সুবেদারকে অন্যান্য কর্মকর্তারা, যেমন – 'বকশি' (সামরিক বেতন কর্মকর্তা), 'সদর' (ধর্মীয় ও দাতব্য কাজের মন্ত্রী), 'ফৌজদার' (সামরিক কমান্ডার) এবং 'কোতোয়াল' (শহরের পুলিশ কমান্ডার) সাহায্য করতেন।

ধর্মীয় নীতি: সুলহ-ই-কুল

আকবর যখন সাম্রাজ্য বিস্তার করছিলেন, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি এবং সংস্কৃতির মানুষ বাস করে। সাম্রাজ্যকে স্থিতিশীল করতে হলে সকলের সমর্থন প্রয়োজন। এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর ধর্মীয় নীতির জন্ম হয়।

  • ইবাদত খানা: ১৫৭৫ সালে তিনি ফতেপুর সিক্রিতে 'ইবাদত খানা' বা উপাসনা গৃহ নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি মুসলিম উলেমা, হিন্দু পণ্ডিত, জৈন মুনি, খ্রিস্টান পাদ্রী এবং জরাথুস্ট্রীয় পুরোহিতদের সঙ্গে ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করতেন।
  • ধর্মীয় গোঁড়ামির উপলব্ধি: এই আলোচনা থেকে আকবর বুঝতে পারেন যে ধর্মীয় নেতারা প্রায়শই গোঁড়া হন, তাঁরা নিজ নিজ ধর্মের রীতিনীতি এবং মতামতের উপর জোর দেন, যা সমাজে বিভেদ তৈরি করে।
  • সুলহ-ই-কুল (Sulh-i-kul): এই অভিজ্ঞতা আকবরকে 'সুলহ-ই-কুল' বা 'সর্বজনীন শান্তি'-র ধারণার দিকে নিয়ে যায়। এই নীতির মূল কথা ছিল ধর্মীয় সহিষ্ণুতা। এটি কোনো特定の ধর্মের উপর ভিত্তি করে ছিল না, বরং সততা, ন্যায়বিচার এবং শান্তির মতো নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে ছিল। আবুল ফজল সুলহ-ই-কুল নীতির ভিত্তিতে একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে আকবরকে সাহায্য করেছিলেন, যা জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহানও অনুসরণ করেছিলেন। এই নীতি অনুসারে, সাম্রাজ্যের সকল নাগরিক, তাদের ধর্ম নির্বিশেষে, সমান অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা পাবে, যতক্ষণ না তারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা একে অপরের প্রতি কোনো ক্ষতি করে।

সপ্তদশ শতাব্দীতে এবং তার পরে মুঘল সাম্রাজ্য

মুঘল সম্রাট এবং তাঁদের মনসবদারদের বিশাল বেতন ও জায়গির তাঁদের প্রচুর সম্পদ ও ক্ষমতার অধিকারী করেছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও সামরিক দক্ষতা তার শিখরে পৌঁছেছিল। এর ফলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি ঘটে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীরা ভারতকে একটি 'সোনার দেশ' হিসেবে বর্ণনা করতেন।

কিন্তু এই সমৃদ্ধির আড়ালে একটি অন্ধকার দিকও ছিল।

  • অসম বন্টন: সাম্রাজ্যের বিশাল সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু অভিজাত, অর্থাৎ সম্রাট ও মনসবদারদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। একজন মনসবদারের আয়ের একটি বড় অংশ তাঁর বেতন এবং সৈন্যদের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হতো। এই অর্থ কারিগর এবং কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য ও ফসল কেনার মাধ্যমে অর্থনীতিতে ফিরে আসত, কিন্তু প্রাথমিক উৎপাদক, অর্থাৎ কৃষক ও কারিগরদের হাতে সামান্যই উদ্বৃত্ত থাকত।
  • কৃষকদের দুর্দশা: অভিজাতদের ক্রমবর্ধমান বিলাসিতা মেটানোর জন্য কৃষকদের উপর করের বোঝা বাড়তে থাকে। ফলে, সবচেয়ে ধনীরা আরও ধনী হতে থাকে, আর দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হতে থাকে। অনেক কৃষক দারিদ্র্যের কারণে বিদ্রোহ করতে বাধ্য হয়।
  • সাম্রাজ্যের পতন: ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর (১৭০৭), মুঘল সাম্রাজ্যের পতন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর দুর্বল উত্তরসূরিরা বিশাল সাম্রাজ্যকে ধরে রাখতে পারেননি। সুবেদার এবং জমিদাররা নিজেদের ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে থাকেন এবং হায়দ্রাবাদ ও অবধের মতো নতুন স্বাধীন রাজ্যের উত্থান ঘটে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যে দিল্লি কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকে এবং ব্রিটিশদের আগমনের সাথে সাথে মুঘল শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: মনসবদার ও জায়গিরদারদের মধ্যে সম্পর্ক কী ছিল?

উত্তর: মনসবদার ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা, যাদের একটি নির্দিষ্ট পদমর্যাদা বা 'মনসব' দেওয়া হতো। এই পদের ভিত্তিতে তাঁদের বেতন নির্ধারিত হতো। জায়গিরদার ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি একটি নির্দিষ্ট ভূমি বা 'জায়গির' থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকার পেতেন। সম্পর্কটি হলো, মনসবদাররা তাঁদের বেতন নগদ টাকার পরিবর্তে জায়গির হিসেবে পেতেন। অর্থাৎ, একজন মনসবদারকে একটি জায়গির বরাদ্দ করা হতো এবং তিনি সেই জায়গির থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব দিয়ে নিজের এবং তাঁর অধীনস্থ সৈন্যদের খরচ চালাতেন। তবে মনসবদাররা জায়গিরের মালিক ছিলেন না এবং সাধারণত সেই অঞ্চলে বাসও করতেন না।

প্রশ্ন ২: আকবরের 'সুলহ-ই-কুল' নীতিটি কী ছিল এবং এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

উত্তর: 'সুলহ-ই-কুল' একটি ফার্সি শব্দ, যার অর্থ 'সর্বজনীন শান্তি' বা 'সকলের প্রতি সহনশীলতা'। এটি ছিল সম্রাট আকবরের ধর্মীয় এবং প্রশাসনিক নীতির মূল ভিত্তি। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের উপর ভিত্তি করে শাসন না করা। এটি সততা, ন্যায়বিচার এবং শান্তির মতো সর্বজনীন নৈতিকতার উপর জোর দেয়। এই নীতিটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ এটি ভারতের মতো একটি ধর্মীয়ভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশকে একত্রিত করতে সাহায্য করেছিল। এটি রাজপুতদের মতো অমুসলিম শাসকদের মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত করে তুলেছিল এবং সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছিল।

প্রশ্ন ৩: মুঘলরা কেন তাদের তৈমুরি বংশপরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করত, চেঙ্গিস খানের বংশপরিচয় নিয়ে নয়?

উত্তর: মুঘলরা মাতৃসূত্রে মোঙ্গল শাসক চেঙ্গিস খানের এবং পিতৃসূত্রে তৈমুরের বংশধর ছিলেন। কিন্তু তারা নিজেদের মোঙ্গল বা মুঘল বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন না। এর প্রধান কারণ হলো, চেঙ্গিস খানের ভাবমূর্তি ছিল একজন নিষ্ঠুর এবং হিংস্র শাসক হিসেবে, যিনি লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিলেন। এই নেতিবাচক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে মুঘলরা আগ্রহী ছিলেন না। অন্যদিকে, তাঁদের পূর্বপুরুষ তৈমুর ১৩৯৮ সালে দিল্লি জয় করেছিলেন। তাই তৈমুরি বংশপরিচয় নিয়ে তাঁরা গর্ববোধ করতেন কারণ এটি ভারতে শাসন করার ক্ষেত্রে তাঁদের একটি ঐতিহাসিক অধিকার প্রদান করত এবং তাঁদের গৌরবময় উত্তরাধিকারের প্রতীক ছিল।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা মুঘল সাম্রাজ্য সম্পর্কে যে প্রধান বিষয়গুলি শিখলাম, তা হলো:

  • প্রতিষ্ঠা: বাবর ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।
  • মহান সম্রাটগণ: আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান এবং ঔরঙ্গজেবের শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্য তার ক্ষমতা ও গৌরবের শিখরে পৌঁছেছিল।
  • প্রশাসনিক ব্যবস্থা: আকবরের প্রবর্তিত মনসবদারি প্রথা ছিল মুঘল প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর মূল ভিত্তি। মনসবদাররা ছিলেন পদমর্যাদা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, যারা জায়গির থেকে বেতন পেতেন।
  • রাজস্ব ব্যবস্থা: 'জাবত্' ছিল একটি উন্নত ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, যেখানে জমির সমীক্ষা করে নির্দিষ্ট হারে কর নির্ধারণ করা হতো। জমিদাররা কর আদায়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করত।
  • আকবরের নীতি: আকবরের 'সুলহ-ই-কুল' বা সর্বজনীন শান্তির নীতি বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীকে একত্রিত করে সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করেছিল।
  • স্থাপত্য ও শিল্প: শাহজাহানের আমলে তাজমহল, লালকেল্লার মতো স্থাপত্য নির্মিত হয় এবং জাহাঙ্গীরের সময় মুঘল চিত্রকলা চরম উৎকর্ষ লাভ করে।
  • পতন: ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি, ধর্মীয় গোঁড়ামি, দুর্বল উত্তরাধিকারী এবং আঞ্চলিক শক্তির উত্থান মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণ ছিল।