বিষয়ের ভূমিকা

গণতন্ত্রের জগতে রাজনৈতিক দলগুলি একটি অপরিহার্য অঙ্গ। আমরা যখনই গণতন্ত্র, সরকার বা নির্বাচন নিয়ে কথা বলি, তখন রাজনৈতিক দলগুলির কথা স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। সাধারণ মানুষের কাছে গণতন্ত্র মানেই রাজনৈতিক দল। এই অধ্যায়ে আমরা জানব রাজনৈতিক দলগুলির অর্থ কী, গণতন্ত্রে তাদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, ভারতে কতগুলি দল রয়েছে এবং এই দলগুলি কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।

ভাবুন তো, যদি কোনও রাজনৈতিক দল না থাকত, তাহলে কী হতো? নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থী স্বতন্ত্র বা নির্দল হিসেবে দাঁড়াতেন। সেক্ষেত্রে সরকার গঠন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত এবং সরকারের স্থায়িত্ব থাকত না। কেউই দেশের জন্য বড় কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারতেন না। রাজনৈতিক দলগুলি এই শূন্যস্থান পূরণ করে। তারা বিভিন্ন প্রার্থীকে একত্রিত করে, একটি সাধারণ নীতি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করে। তাই, গণতন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এই অধ্যায়ের মাধ্যমে আমরা রাজনৈতিক দলগুলির কার্যকারিতা এবং তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

রাজনৈতিক দলের অর্থ কী? (Meaning of a Political Party)

একটি রাজনৈতিক দল হলো এমন একদল সংগঠিত মানুষ যারা একত্রিত হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং সরকারে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। তারা সমাজের জন্য কিছু নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে তাদের নীতি অন্যদের চেয়ে ভালো। এই দলগুলি সমাজের বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট অবস্থান নেয় এবং সেই মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচি রূপায়ণ করতে চায়।

একটি রাজনৈতিক দলের মূলত তিনটি প্রধান উপাদান থাকে:

  • নেতা (The Leaders): দলের শীর্ষস্থানে থাকা ব্যক্তিরা, যারা দলের নীতি নির্ধারণ করেন এবং নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বা দল পরিচালনা করেন।
  • সক্রিয় সদস্য (The Active Members): এরা দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সভা, মিছিল, প্রচার ইত্যাদি আয়োজনে এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এরা নেতা এবং সমর্থকদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেন।
  • সমর্থক বা অনুগামী (The Followers): এরা দলের আদর্শে বিশ্বাসী এবং দলকে সমর্থন করেন। নির্বাচনের সময় তারা এই দলকে ভোট দেন। এরা দলের আনুষ্ঠানিক সদস্য না হলেও দলের ভিত্তি তৈরি করেন।

রাজনৈতিক দলের কাজ কী? (Functions of Political Parties)

আধুনিক গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলি বিভিন্ন ধরনের কাজ করে থাকে। তাদের কাজগুলিকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  1. নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা (Contesting Elections): রাজনৈতিক দলগুলির প্রধান কাজ হলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। দলগুলি তাদের প্রার্থী বাছাই করে এবং নির্বাচনে জেতার জন্য তাদের মনোনয়ন দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু দেশে দলের সদস্যরা এবং সমর্থকরা প্রার্থী বাছাই করে, কিন্তু ভারতের মতো দেশে দলের শীর্ষ নেতারাই প্রার্থী চূড়ান্ত করেন।
  2. নীতি ও কর্মসূচি प्रस्तुत করা (Putting forward policies and programmes): দলগুলি দেশের মানুষের সামনে বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচি তুলে ধরে। ভোটাররা তাদের পছন্দ অনুযায়ী একটি দলকে বেছে নেয়। একটি সরকার সাধারণত শাসক দলের দ্বারা গৃহীত নীতিগুলিই বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করে। এই নীতি ও কর্মসূচিগুলি সাধারণত 'নির্বাচনী ইশতেহার' বা 'ম্যানিফেস্টো' আকারে প্রকাশ করা হয়।
  3. আইন তৈরিতে ভূমিকা (Making Laws): রাজনৈতিক দলগুলি দেশের জন্য আইন তৈরিতে একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। আইনসভায় (যেমন সংসদ বা বিধানসভা) যে কোনও আইন পাশ করার জন্য বিতর্ক হয়। যেহেতু আইনসভার বেশিরভাগ সদস্যই কোনও না কোনও দলের অন্তর্ভুক্ত, তাই দলের নির্দেশ মতোই তারা ভোট দেন।
  4. সরকার গঠন ও পরিচালনা (Forming and running governments): নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, সেই দল সরকার গঠন করে। দল নেতাদের মধ্য থেকে মন্ত্রী বাছাই করা হয় এবং তাদের বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলীয় নীতির ভিত্তিতেই সরকার দেশ পরিচালনা করে।
  5. বিরোধী দলের ভূমিকা পালন (Playing the role of opposition): নির্বাচনে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না, তারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। তারা সরকারের ভুল নীতি ও ব্যর্থতার সমালোচনা করে এবং সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের ওপর নজর রাখে। এর মাধ্যমে তারা সরকারকে সর্বদা সজাগ ও দায়িত্বশীল রাখতে সাহায্য করে।
  6. জনমত গঠন করা (Shaping public opinion): রাজনৈতিক দলগুলি দেশের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে জনমত গঠন করে। তারা সভা, সমিতি, আন্দোলন এবং মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের মতামত প্রচার করে। প্রায়শই, জনগণ যে মতামত পোষণ করে তা রাজনৈতিক দলগুলির দ্বারা প্রভাবিত হয়।
  7. সরকারি সুযোগ-সুবিধা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া (Providing access to government machinery and welfare schemes): সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি আধিকারিকদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা এক্ষেত্রে একটি সেতুর মতো কাজ করেন। মানুষ সহজেই তাদের কাছে যেতে পারে এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে বা তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারে। এই কারণে মানুষ রাজনৈতিক দলগুলিকে নিজেদের কাছের মনে করে।

রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা কেন? (Why do we need Political Parties?)

রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য আমরা একটি দলবিহীন পরিস্থিতি কল্পনা করতে পারি।

  • অস্থির সরকার: যদি কোনও দল না থাকত, তবে নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থী স্বতন্ত্র বা নির্দল হিসেবে দাঁড়াতেন। কেউই দেশব্যাপী বড় কোনও প্রতিশ্রুতি দিতে পারতেন না। সরকার গঠিত হলেও তার কোনও স্থায়িত্ব থাকত না, কারণ বিভিন্ন স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্যে কোনও সমন্বয় থাকত না।
  • নীতিগত অনিশ্চয়তা: প্রতিটি স্বতন্ত্র সদস্য কেবল নিজের নির্বাচনী এলাকার কথাই ভাবতেন, সমগ্র দেশের জন্য নীতি তৈরি করা কঠিন হয়ে যেত। এর ফলে দেশের উন্নয়নের গতি থমকে যেত।
  • প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের অভাব: রাজনৈতিক দলগুলি বিভিন্ন মত ও গোষ্ঠীর মানুষকে একত্রিত করে একটি বড় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। দল না থাকলে, সমাজের বিভিন্ন অংশের মতামত সরকারের কাছে পৌঁছানো কঠিন হতো। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের জন্য দল অপরিহার্য।

এভাবেই, রাজনৈতিক দলগুলি গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য শর্ত। তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, সরকার গঠন করে, বিরোধী হিসেবে কাজ করে এবং জনমত গঠন করে গণতন্ত্রকে কার্যকর করে তোলে।

কতগুলি রাজনৈতিক দল থাকা উচিত? (How many parties should we have?)

গণতন্ত্রে যে কোনও নাগরিক দল গঠন করতে স্বাধীন। ভারতে নির্বাচন কমিশনের কাছে ৭৫০টিরও বেশি দল নথিভুক্ত রয়েছে। কিন্তু সব দলই নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিযোগী নয়। সাধারণত কয়েকটি দলই সরকার গঠনের দৌড়ে এগিয়ে থাকে। দল ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বজুড়ে তিন ধরনের ব্যবস্থা দেখা যায়:

১. একদলীয় ব্যবস্থা (One-Party System)

এই ব্যবস্থায় শুধুমাত্র একটি দলকেই দেশ শাসন করার অনুমতি দেওয়া হয়। যেমন, চিনে শুধুমাত্র কমিউনিস্ট পার্টি শাসন করে। যদিও আইনত সেখানে অন্য দল গঠনের অনুমতি রয়েছে, কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি যে কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া অন্য কারও পক্ষে ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়। এই ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বলে মনে করা হয় না, কারণ এখানে জনগণের কাছে কোনও বিকল্প থাকে না।

২. দ্বিদলীয় ব্যবস্থা (Two-Party System)

কিছু দেশে ক্ষমতা সাধারণত দুটি প্রধান দলের মধ্যে আবর্তিত হয়। নির্বাচনে অন্য দল থাকলেও, শুধুমাত্র দুটি দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জেতার ক্ষমতা রাখে। যেমন - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি) এবং যুক্তরাজ্য (লেবার পার্টি ও কনজারভেটিভ পার্টি)। এই ব্যবস্থায় সরকার সাধারণত স্থিতিশীল হয়।

৩. বহুদলীয় ব্যবস্থা (Multi-Party System)

যখন নির্বাচনে বেশ কয়েকটি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং দুই বা ততোধিক দলের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা থাকে, তখন তাকে বহুদলীয় ব্যবস্থা বলে। ভারত এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই ব্যবস্থায়, কোনও একটি দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে, বেশ কয়েকটি দল মিলে জোট গঠন করে সরকার গঠন করে, যাকে 'জোট সরকার' (Coalition Government) বলা হয়। এই ব্যবস্থা বিভিন্ন ধরনের মত ও স্বার্থকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেয়, কিন্তু কখনও কখনও এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতাও দেখা দিতে পারে।

জাতীয় এবং রাজ্যস্তরের দল (National and State Parties)

ভারতের মতো একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দুই ধরনের রাজনৈতিক দল দেখা যায় - কিছু দল দেশের কয়েকটি রাজ্য বা একটি মাত্র রাজ্যে সীমাবদ্ধ (রাজ্যস্তরের দল), এবং কিছু দল দেশব্যাপী বিস্তৃত (জাতীয় দল)। ভারতের নির্বাচন কমিশন দলগুলিকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাদের প্রতীক বরাদ্দ করে। এই স্বীকৃতির জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়।

রাজ্যস্তরের দল (State Party)

একটি দলকে 'রাজ্যস্তরের দল' বা 'আঞ্চলিক দল' হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত নিম্নলিখিত শর্তগুলির মধ্যে অন্তত একটি পূরণ করতে হয়:

  • রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে প্রদত্ত মোট ভোটের অন্তত ৬% পেতে হবে এবং কমপক্ষে ২টি আসনে জয়লাভ করতে হবে।
  • লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে প্রদত্ত মোট ভোটের অন্তত ৬% পেতে হবে এবং ওই রাজ্য থেকে লোকসভায় কমপক্ষে ১টি আসনে জয়লাভ করতে হবে।
  • বিধানসভা নির্বাচনে মোট আসনের অন্তত ৩% বা কমপক্ষে ৩টি আসনে (যেটি বেশি) জয়লাভ করতে হবে।

জাতীয় দল (National Party)

একটি দলকে 'জাতীয় দল' হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে নিম্নলিখিত শর্তগুলির মধ্যে অন্তত একটি পূরণ করতে হয়:

  • লোকসভা নির্বাচনে বা চারটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে প্রদত্ত মোট ভোটের অন্তত ৬% পেতে হবে এবং লোকসভায় কমপক্ষে ৪টি আসনে জয়লাভ করতে হবে।
  • লোকসভায় মোট আসনের অন্তত ২% (অর্থাৎ ১১টি আসন) জিততে হবে এবং এই আসনগুলি কমপক্ষে তিনটি ভিন্ন রাজ্য থেকে আসতে হবে।
  • কমপক্ষে চারটি রাজ্যে 'রাজ্যস্তরের দল' হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হবে।

এই শর্তগুলি পূরণ করলে একটি দল জাতীয় দলের মর্যাদা পায় এবং সারা দেশে একটি নির্দিষ্ট প্রতীক ব্যবহারের অধিকার পায়। যেমন - ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP), ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (INC), বহুজন সমাজ পার্টি (BSP) ইত্যাদি কয়েকটি জাতীয় দল।

রাজনৈতিক দলগুলির সামনে চ্যালেঞ্জ (Challenges to Political Parties)

সারা বিশ্বে মানুষ রাজনৈতিক দলের ওপর অসন্তুষ্ট। এর কারণ দলগুলি তাদের কাজ সঠিকভাবে করতে পারছে না। ভারতেও রাজনৈতিক দলগুলি কিছু গভীর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি:

  1. দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অভাব (Lack of internal democracy): বেশিরভাগ দলেই ক্ষমতা এক বা কয়েকজন নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। দলে নিয়মিত সাংগঠনিক নির্বাচন হয় না, সদস্যপদের তালিকাও ঠিকমতো রাখা হয় না। এর ফলে সাধারণ কর্মীরা দলের শীর্ষে পৌঁছাতে পারেন না এবং দলের সিদ্ধান্তে তাদের কোনও ভূমিকা থাকে না।
  2. বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার (Dynastic succession): অনেক দলেই শীর্ষ পদগুলি একটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। দলের প্রধানের পর তার ছেলে বা মেয়েই দলের নেতা হন, যা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। এর ফলে যোগ্য এবং অভিজ্ঞ নেতারা উঠে আসতে পারেন না।
  3. অর্থ ও পেশী শক্তির প্রভাব (Growing role of money and muscle power): দলগুলি নির্বাচন জেতার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। তারা এমন প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয় যাদের কাছে প্রচুর অর্থ আছে বা যারা অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। অনেক সময় অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও টিকিট পেয়ে যান, কারণ তাদের জেতার ক্ষমতা বেশি থাকে। এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় বিপদ।
  4. সঠিক বিকল্পের অভাব (Lack of meaningful choice): সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বেশিরভাগ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য কমে গেছে। অর্থনীতি বা বিদেশনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মতামতের বিশেষ কোনও পার্থক্য দেখা যায় না। ফলে ভোটারদের কাছে একটি দলকে ছেড়ে অন্য দলকে বেছে নেওয়ার মতো বিশেষ কোনও বিকল্প থাকে না।

দল কীভাবে সংস্কার করা যায়? (How can parties be reformed?)

এই চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করার জন্য ভারতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং আরও কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে:

গৃহীত পদক্ষেপ:

  • দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-Defection Law): সাংসদ এবং বিধায়করা যাতে টাকা বা পদের লোভে এক দল থেকে অন্য দলে চলে যেতে না পারেন, তার জন্য সংবিধানে পরিবর্তন করে এই আইন আনা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, কোনও নির্বাচিত প্রতিনিধি দল পরিবর্তন করলে তাকে তার আসন হারাতে হবে।
  • হলফনামা (Affidavit): সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে, এখন প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় একটি হলফনামা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এতে প্রার্থীকে তার সম্পত্তি এবং তার বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলার বিবরণ দিতে হয়। এর ফলে ভোটাররা প্রার্থীদের সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পায়।
  • সাংগঠনিক নির্বাচন বাধ্যতামূলক: নির্বাচন কমিশন একটি আদেশ জারি করেছে যেখানে দলগুলিকে নিয়মিত সাংগঠনিক নির্বাচন করতে এবং আয়কর রিটার্ন জমা দিতে বলা হয়েছে। যদিও দলগুলি প্রায়শই এই নিয়মগুলি কেবল কাগজে-কলমে পালন করে।

প্রস্তাবিত সংস্কার:

  • দলের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন: রাজনৈতিক দলগুলির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করার জন্য একটি আইন তৈরি করা উচিত। এই আইনে দলের সদস্যদের তালিকা রাখা, অভ্যন্তরীণ নির্বাচন করা এবং একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষকে দলীয় বিবাদের বিচারক হিসেবে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া উচিত।
  • মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ: রাজনৈতিক দলগুলির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থায় এবং নির্বাচনে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ টিকিট মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করা উচিত।
  • নির্বাচনে সরকারি অর্থায়ন (State Funding of Elections): দলগুলির ওপর থেকে অর্থের প্রভাব কমাতে সরকারের উচিত নির্বাচনের খরচ বহন করা। পেট্রোল, কাগজ, টেলিফোন বিল ইত্যাদির মতো খরচ সরকার বহন করতে পারে। এর ফলে দুর্নীতি কমতে পারে।

এই সংস্কারগুলি রাজনৈতিক দলগুলিকে আরও গণতান্ত্রিক এবং স্বচ্ছ করে তুলতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: জোট সরকার (Coalition Government) কী?

উত্তর: বহুদলীয় ব্যবস্থায় যখন কোনও একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা (অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি আসন) পায় না, তখন দুই বা ততোধিক দল একত্রিত হয়ে সরকার গঠন করে। এই ধরনের সরকারকে জোট সরকার বলা হয়। ভারতে ১৯৯০-এর দশক থেকে জাতীয় স্তরে এবং বিভিন্ন রাজ্যে প্রায়শই জোট সরকার গঠিত হয়েছে।

প্রশ্ন ২: বিরোধী দলের প্রধান কাজ কী?

উত্তর: গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রধান কাজ হলো সরকারের নীতি ও কাজের সমালোচনা করা এবং সরকারের ভুল-ত্রুটিগুলি জনগণের সামনে তুলে ধরা। তারা আইনসভায় বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তুলে, বিতর্ক করে এবং সভা-সমিতির মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারকে স্বৈরাচারী হতে বাধা দেয় এবং গণতন্ত্রকে সচল রাখে।

প্রশ্ন ৩: দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-Defection Law) কী এবং কেন এটি প্রয়োজন হয়েছিল?

উত্তর: দলত্যাগ বিরোধী আইন ১৯৮৫ সালে ভারতের সংবিধানে ৫২তম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত করা হয়। এই আইন অনুসারে, যদি কোনও নির্বাচিত সাংসদ বা বিধায়ক স্বেচ্ছায় তার দল ত্যাগ করেন অথবা দলের নির্দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে সংসদে বা বিধানসভায় ভোট দেন, তবে তিনি তার সদস্যপদ হারাবেন। এই আইনের প্রয়োজন হয়েছিল কারণ অনেক নির্বাচিত প্রতিনিধি পদের লোভ বা অর্থের বিনিময়ে এক দল থেকে অন্য দলে চলে যেতেন, যা জনগণের রায়ের অপমান এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ ছিল। এই 'আয়ারাম গয়ারাম' সংস্কৃতি বন্ধ করার জন্যই এই আইন আনা হয়েছিল।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা রাজনৈতিক দল সম্পর্কে যে বিষয়গুলি শিখলাম তা সংক্ষেপে নিচে দেওয়া হলো:

  • রাজনৈতিক দল: এটি এমন একটি সংগঠন যা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং সরকারে ক্ষমতা লাভের চেষ্টা করে। এর তিনটি অংশ - নেতা, সক্রিয় সদস্য ও সমর্থক।
  • দলের কাজ: নির্বাচন করা, নীতি নির্ধারণ, আইন তৈরি, সরকার গঠন ও পরিচালনা, বিরোধী ভূমিকা পালন, জনমত গঠন এবং মানুষের কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।
  • দল ব্যবস্থা: বিশ্বে তিন ধরনের দল ব্যবস্থা দেখা যায় - একদলীয়, দ্বিদলীয় এবং বহুদলীয়। ভারত একটি বহুদলীয় ব্যবস্থার উদাহরণ।
  • জাতীয় ও রাজ্যস্তরের দল: নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত কিছু শর্ত পূরণের ভিত্তিতে দলগুলিকে জাতীয় বা রাজ্যস্তরের দলের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • চ্যালেঞ্জ: ভারতীয় দলগুলি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব, বংশতন্ত্র, অর্থ ও পেশী শক্তির প্রভাব এবং ভোটারদের জন্য সঠিক বিকল্পের অভাবের মতো সমস্যার সম্মুখীন।
  • সংস্কার: দলত্যাগ বিরোধী আইন এবং হলফনামার মতো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে এবং নির্বাচনে অর্থের প্রভাব কমাতে আরও সংস্কার প্রয়োজন।

রাজনৈতিক দল ছাড়া আধুনিক গণতন্ত্র কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। যদিও তাদের অনেক ত্রুটি রয়েছে, তবুও এগুলি গণতন্ত্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান।