বিষয়ের ভূমিকা
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত ভারতীয় ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুগ। এই দীর্ঘ এক হাজার বছরের সময়কালে ভারতীয় উপমহাদেশে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। এনসিইআরটি দ্বাদশ শ্রেণি ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় 'রাজা, কিষাণ এবং শহর' (Kings, Farmers and Towns)-এ মূলত এই সময়কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটি গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এই অধ্যায়ে আমরা মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থান, নতুন রাজ্য ও সাম্রাজ্যের বিকাশ, গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তন, মুদ্রাব্যবস্থার প্রসার এবং প্রাচীন শহরগুলির গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারি। ব্রাহ্মী ও খরোষ্টি লিপির পাঠোদ্ধার কীভাবে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস উন্মোচনে সাহায্য করেছিল, তাও এই অধ্যায়ের একটি অন্যতম আকর্ষণ। বাংলাভাষী শিক্ষার্থীদের জন্য এই পুরো বিষয়টি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে নিচে আলোচনা করা হলো।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
এই অধ্যায়ের মূল বিষয়বস্তুগুলিকে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
- ব্রাহ্মী ও খরোষ্টি লিপির পাঠোদ্ধার: ১৮৩০-এর দশকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা জেমস প্রিন্সেপ ব্রাহ্মী এবং খরোষ্টি লিপি পাঠোদ্ধার করেন। এই দুটি লিপিই প্রাচীন ভারতের বেশিরভাগ শিলালিপি ও মুদ্রায় খোদাই করা ছিল। এর ফলে সম্রাট অশোকের নাম 'পিয়াদসি' (প্রিয়দর্শী) শিলালিপিতে প্রথম শনাক্ত করা সম্ভব হয়, যা ভারতীয় পুরাতত্ত্ব ও ইতিহাসের গবেষণায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল।
- ষোড়শ মহাজনপদ এবং মগধের উত্থান: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক ছিল নতুন রাষ্ট্র গঠন এবং লোহার ব্যবহার বৃদ্ধির যুগ। এই সময়ে উত্তর ভারতে ষোড়শ মহাজনপদ গড়ে ওঠে, যার মধ্যে বজ্জি, মগধ, কোশল, বংশ ও অবন্তী অন্যতম প্রধান ছিল। এর মধ্যে মগধ সবচেয়ে শক্তিশালী মহাজনপদে পরিণত হয়। এর প্রধান কারণগুলি ছিল উর্বর কৃষিভূমি, লোহা খনির নৈকট্য, শক্তিশালী হাতি সংগ্রহ করার সুবিধা এবং অজাতশত্রু ও পদ্মনন্দ বা মহাপদ্ম নন্দ-র মতো শক্তিশালী শাসকদের উপস্থিতি।
- মৌর্য সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ও শাসনব্যবস্থা: চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং বিন্দুসার ও অশোকের মাধ্যমে প্রসারিত মৌর্য সাম্রাজ্য ছিল প্রাচীন ভারতের প্রথম বিশালাকার সাম্রাজ্য। মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা' এবং কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র' থেকে এই সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে জানা যায়। সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে ছিল রাজধানী পাটলীপুত্র এবং তক্ষশীলা ও উজ্জয়িনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক কেন্দ্র। অশোকের ধম্ম নীতি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।
- নতুন অর্থনৈতিক ও কৃষিভিত্তিক বিকাশ: এই যুগে লোহার ফলার ব্যবহার কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব আনে। ধান উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি (যেমন রোপণ পদ্ধতি) গঙ্গার উপত্যকায় কৃষির ফলন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে গ্রামীণ সমাজে বৈষম্য তৈরি হয় এবং বড় বড় ভূস্বামী (গৃহপতি) ও স্বাধীন কৃষকদের (কিষাণ) আবির্ভাব ঘটে।
- শহরায়ন ও বাণিজ্য প্রসার: কৃষি ও উদ্বৃত্ত উৎপাদনের হাত ধরে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে নতুন শহর গড়ে ওঠে, যাকে বলা হয় 'দ্বিতীয় নগরায়ণ'। পাটলিপুত্র, পুষ্করাবতী, উজ্জয়িনী, মথুরা এবং তাম্রলিপ্তির মতো শহরগুলি রাজনৈতিক ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসারের ফলে কুষাণ ও সাতবাহন রাজারা প্রচুর সংখ্যায় সোনা ও রূপোর মুদ্রা প্রচলন করেন।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: জেমস প্রিন্সেপ কে ছিলেন এবং ভারতীয় ইতিহাসে তাঁর অবদান কী?
উত্তর: জেমস প্রিন্সেপ ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ ও মুদ্রাতত্ত্ববিদ। ১৮৩০-এর দশকে তিনি প্রাচীন ভারতের ব্রাহ্মী এবং খরোষ্টি লিপি পাঠোদ্ধার করেন। তাঁর এই আবিষ্কারের ফলেই সম্রাট অশোকের শিলালিপি পড়তে পারা সম্ভব হয় এবং প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস পুনর্গঠন সহজতর হয়।
প্রশ্ন ২: মৌর্য সাম্রাজ্য কেন ভারতের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: মৌর্য সাম্রাজ্য ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় বিশাল সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের সময়কালে প্রশাসন, অর্থনীতি, কলার ক্ষেত্রে অসাধারণ উন্নতি ঘটেছিল। সম্রাট অশোকের ধম্ম নীতি মানবতা ও শান্তির বার্তা প্রচার করেছিল যা আজও প্রাসঙ্গিক।
প্রশ্ন ৩: 'দ্বিতীয় নগরায়ণ' বলতে কী বোঝো?
উত্তর: হরপ্পা সভ্যতার পতনের পর দীর্ঘকাল ভারতে বড় শহরের দেখা মেলেনি। তবে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে লোহা ও কৃষির উন্নতির ফলে উদ্বৃত্ত উৎপাদন শুরু হয় এবং নতুন বাণিজ্য কেন্দ্র বা শহর গড়ে ওঠে। একেই ভারতীয় ইতিহাসে 'দ্বিতীয় নগরায়ণ' বলা হয়।
সারসংক্ষেপ
- ব্রাহ্মী ও খরোষ্টি লিপির পাঠোদ্ধার প্রাচীন ভারতের ইতিহাস গবেষণার পথ উন্মুক্ত করেছিল।
- ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে মগধের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সুবিধা তাকে সর্বেসর্বা করে তোলে।
- মৌর্য সাম্রাজ্য সুদৃঢ় প্রশাসন এবং অশোকের ধম্ম নীতির জন্য বিখ্যাত।
- কৃষিতে লোহার ব্যবহার এবং মুদ্রার প্রচলন গ্রামীণ ও শহর অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছিল।