বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের চারপাশের পরিবেশ অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবে পরিপূর্ণ। এদের মধ্যে কিছু জীবকে আমরা খালি চোখে দেখতে পাই, যেমন গাছে থাকা পোকা বা মাটিতে ঘুরে বেড়ানো পিঁপড়া। কিন্তু এমন অসংখ্য জীব রয়েছে যাদের খালি চোখে একেবারেই দেখা যায় না। এদের দেখার জন্য অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা মাইক্রোস্কোপের সাহায্য নিতে হয়। এই অত্যন্ত ক্ষুদ্র জীবগুলিকেই বলা হয় অণুজীব (Microorganisms বা Microbes)। NCERT অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকের দ্বিতীয় অধ্যায় 'অনুজীব: বন্ধু ও শত্রু'-তে এই অণুজীবগুলির চমৎকার ও রহস্যময় জগৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

অণুজীব আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একদিকে এগুলি আমাদের খাদ্য তৈরি, ওষুধ প্রস্তুত এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে সত্যকারের 'বন্ধু'র ভূমিকা পালন করে; অন্যদিকে এরা মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদের দেহে নানাবিধ মরণঘাতী রোগ সৃষ্টি করে এবং খাদ্যদ্রব্য নষ্ট করে 'শত্রু' হয়ে দাঁড়ায়। আজকের এই বিশদ নিবন্ধে আমরা অনুজীবের ধরন, তাদের উপকারিতা ও অপকারিতা এবং খাদ্য সংরক্ষণের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. অণুজীব কী এবং এরা কোথায় বাস করে?

অণুজীব হলো অতি ক্ষুদ্র এককোশী বা বহুকোশী জীব, যা খালি চোখে দৃশ্যমান নয়। এরা অত্যন্ত সহনশীল এবং পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র মানিয়ে নিতে পারে। মেরু অঞ্চলের বরফশীতল আবহাওয়া থেকে শুরু করে মরুভূমির প্রচণ্ড উত্তাপ, কিংবা গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে শুরু করে উষ্ণ প্রশ্রবণেও অণুজীবেরা বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি মানুষ সহ অন্যান্য জীবের দেহের ভেতরে ও বাইরে এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

২. অণুজীবের প্রধান প্রকারভেদ

সাধারণত অণুজীবগুলিকে প্রধানত চারটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা হয়:

  • ব্যাকটেরিয়া (Bacteria): এরা এককোষী জীব। উদাহরণ: Lactobacillus, Rhizobium
  • ছত্রাক (Fungi): এরা এককোশী বা বহুকোশী হতে পারে এবং নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না। উদাহরণ: ইস্ট (Yeast), পেনিসিলিয়াম (Penicillium), পাউরুটিতে জন্মানো ছত্রাক (Bread mould)।
  • প্রোটোজোয়া (Protozoa): এরা এককোষী প্রাণীজাতীয় জীব। উদাহরণ: অ্যামিবা (Ameoba), প্যারামেসিয়াম (Paramecium)।
  • শৈবাল (Algae): এরা সালোকসংশ্লেষ করতে সক্ষম এককোষী বা বহুকোশী উদ্ভিদজাতীয় জীব। উদাহরণ: স্পাইরোগাইরা (Spirogyra), ক্ল্যামাইডোমোনাস (Chlamydomonas)।

বিশেষ দ্রষ্টব্য - ভাইরাস (Virus): ভাইরাসকেও অণুজীব বলা হয়, তবে এরা অন্যান্য অণুজীবের থেকে কিছুটা ভিন্ন। ভাইরাস কোনো জীবদেহের বাইরে নিষ্প্রাণ বস্তুর মতো অবস্থান করে। কিন্তু যখনই এরা কোনো পোষক দেহে (Host Organism) প্রবেশ করে, তখন পোষক কোশের বংশবৃদ্ধি পদ্ধতি ব্যবহার করে নিজেদের বৃদ্ধি ঘটায়। ফ্লু, পোলিও, গুটিবসন্ত এবং কোভিড-১৯ হলো ভাইরাসঘটিত রোগের উদাহরণ।

৩. বন্ধু ভাবাপন্ন অণুজীব (উপকারী অণুজীব)

অণুজীব আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহুবিধ উপকারে আসে। নিচে এদের প্রধান উপকারিতাগুলি উল্লেখ করা হলো:

  • খাদ্যদ্রব্য তৈরিতে: দুধ থেকে দই তৈরিতে Lactobacillus নামক ব্যাকটেরিয়া সাহায্য করে। এই ব্যাকটেরিয়া দুধে বংশবৃদ্ধি করে দুধের ল্যাকটোজকে ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত করে। পাউরুটি, কেক, এবং জিলাপি তৈরিতে ইস্ট (Yeast) ব্যবহৃত হয়। ইস্ট শ্বসনের সময় কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি করে, যা ময়দার খামিরকে ফুলিয়ে তোলে।
  • বাণিজ্যিক ব্যবহার: বড় মাপের অ্যালকোহল, মদ (Wine) এবং অ্যাসিটিক অ্যাসিড (ভিনেগার) তৈরিতে অণুজীব ব্যবহৃত হয়। শস্যে থাকা শর্করাকে ইস্ট গাজন (Fermentation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যালকোহলে পরিণত করে। ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ১৮৫৭ সালে প্রথম গাজন প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন।
  • ওষুধ প্রস্তুতি ও প্রতিষেধক (Vaccine): যখন আমরা অসুস্থ হই, তখন ডাক্তার প্রায়শই অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotics) ট্যাবলেট বা ইনজেকশন দেন। এই অ্যান্টিবায়োটিকগুলি ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক থেকে তৈরি হয়। পেনিসিলিন হলো প্রথম আবিষ্কৃত অ্যান্টিবায়োটিক, যা ১৯২৯ সালে অ্যালেক্সান্ডার ফ্লেমিং আবিষ্কার করেছিলেন। এছাড়া বসন্ত, যক্ষ্মা, পোলিও এবং হেপাটাইটিসের মতো রোগের প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন অণুজীব থেকেই তৈরি হয়। ১৭৯৮ সালে এডওয়ার্ড জেনার গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন।
  • মৃত্তিকার উর্বরতা বৃদ্ধি: কিছু ব্যাকটেরিয়া যেমন Rhizobium এবং নীল-সবুজ শৈবাল বায়ুমণ্ডল থেকে মুক্ত নাইট্রোজেন শোষণ করে মাটিতে নাইট্রোজেন যৌগ হিসেবে সঞ্চয় করতে পারে। একে নাইট্রোজন সংবন্ধন (Nitrogen Fixation) বলা হয়, যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।
  • পরিবেশ পরিষ্কারকরণ: অণুজীবেরা পচনশীল জৈব বর্জ্য যেমন উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ, মৃত প্রাণী ও মলমূত্র ভেঙে সরল উপাদানে পরিণত করে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। ফলে পরিবেশ পরিষ্কার থাকে এবং পুষ্টি উপাদান পুনরায় মাটিতে ফিরে আসে।

৪. ক্ষতিকারক অণুজীব (শত্রু অণুজীব)

সব অণুজীব কিন্তু বন্ধু নয়। যেসব অণুজীব মানুষ, অন্যান্য প্রাণী বা উদ্ভিদে রোগ সৃষ্টি করে, তাদের রোগজীবাণু (Pathogens) বলা হয়।

  • ছোঁয়াচে রোগ (Communicable Diseases): যেসব রোগ আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি, স্পর্শ বা বাতাস, জল ও খাদ্যের মাধ্যমে সুস্থ মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে, সেগুলিকে ছোঁয়াচে রোগ বলে। যেমন: কলেরা, সাধারণ সর্দি-কাশি, যক্ষ্মা (TB) এবং গুটিবসন্ত।
  • রোগের বাহক (Carriers): কিছু পতঙ্গ ও প্রাণী রোগজীবাণু বহনে সাহায্য করে। যেমন— ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক হলো স্ত্রী এডিস মশা (Aedes mosquito) এবং ম্যালেরিয়ার পরজীবীর (Plasmodium) বাহক হলো স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা (Anopheles mosquito)। মাছিও পচা খাবার থেকে জীবাণু বহন করে ভালো খাবারে ছড়িয়ে দেয়।
  • উদ্ভিদের রোগ: লেবুর ক্যাঙ্কার (Citrus Canker - ব্যাকটেরিয়াঘটিত), গম গাছের মরিচা রোগ (Wheat Rust - ছত্রাকঘটিত), ভেন্ডি বা ঢ্যাঁড়শের হলুদ মোজাইক রোগ (Yellow Vein Mosaic - ভাইরাসঘটিত) ইত্যাদি উদ্ভিদের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।

৫. খাদ্য সংরক্ষণ (Food Preservation)

পচে যাওয়া খাদ্য খেলে ফুড পয়জনিং (Food Poisoning) হতে পারে, যা গুরুতর অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই খাবারকে অণুজীবের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা জরুরি। খাদ্য সংরক্ষণের মূল পদ্ধতিগুলি হলো:

  • রাসায়নিক পদ্ধতি: সোডিয়াম বেনজয়েট এবং সোডিয়াম মেটাবাইসালফাইট লবণ ও অ্যাসিড ব্যবহার করে আচার, জ্যাম ও জেলি দীর্ঘকাল ভালো রাখা হয়।
  • লবণ ও চিনি দ্বারা সংরক্ষণ: মাছ, মাংস, আম, তেঁতুল ইত্যাদি শুকনো লবণ দিয়ে ঢেকে রাখলে অণুজীব বৃদ্ধি পেতে পারে না। আবার জ্যাম ও জেলি তরল খাদ্য চিনি যোগ করে সংরক্ষিত হয়, কারণ চিনি আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়।
  • উত্তাপ ও শীতলীকরণ পদ্ধতি: দুধ বা জল ফুটিয়ে নিলে জীবাণু ধ্বংস হয়। অন্যদিকে রেফ্রিজারেটরে কম তাপমাত্রায় অণুজীব নিষ্ক্রিয় থাকে।
  • পাস্তুরাইজেশন (Pasteurization): লুই পাস্তুর আবিষ্কৃত এই পদ্ধতিতে দুধকে প্রায় ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড উত্তপ্ত করার পর দ্রুত ঠান্ডা করে বোতলজাত বা প্যাকেটজাত করা হয়। এর ফলে দুধে জীবাণু জন্মাতে পারে না।
  • প্যাকিং এবং সিলিং: বায়ু নিরুদ্ধ (Air-tight) পাত্র বা প্যাকেটে খাদ্য রাখলে অণুজীবের প্রবেশ বাধা পায়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: পাউরুটি তৈরির সময় খামির বা ইস্ট কেন ফোলে?

উত্তর: পাউরুটি তৈরির সময় ময়দার সাথে ইস্ট মেশালে ইস্ট দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এবং শসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) গ্যাস নির্গত করে। এই গ্যাসের বুদ্বুদ ময়দার খামিরের মধ্যে আটকে যায় এবং আয়তন বাড়িয়ে দেয়। ফলে পাউরুটি নরম ও ছিদ্রযুক্ত হয়ে ফুলে ওঠে।

প্রশ্ন ২: পাস্তুরাইজেশন (Pasteurization) পদ্ধতি কী?

উত্তর: পাস্তুরাইজেশন হলো দুধ জীবাণুমুক্ত করার একটি বিশেষ পদ্ধতি। এতে দুধকে প্রথমে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত ফুটিয়ে নিয়ে সাথে সাথে অত্যন্ত দ্রুত ঠান্ডা করে ফেলা হয়। এই তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তনের ফলে দুধে থাকা ক্ষতিকারক অণুজীব ধ্বংস হয়ে যায়। লুই পাস্তুর এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

প্রশ্ন ৩: অ্যান্টিবায়োটিক কী এবং এটি ব্যবহারের সময় কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?

উত্তর: অ্যান্টিবায়োটিক হলো অণুজীব (যেমন ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক) থেকে প্রস্তুত ওষুধ যা দেহে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে বা তাদের মেরে ফেলে। সতর্কতা: (১) কেবল অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত। (২) ডাক্তারের দেওয়া নির্দিষ্ট কোর্স সম্পূর্ণ করা আবশ্যক। (৩) অপ্রয়োজনে বা ভাইরাল ইনফেকশনে (যেমন সর্দি-কাশিতে) অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়, কারণ এতে ভবিষ্যতে ওষুধটি দেহে কার্যকর নাও হতে পারে।

প্রশ্ন ৪: নাইট্রোজেন সংবন্ধন (Nitrogen Fixation) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: বায়ুমণ্ডলে প্রায় ৭৮% নাইট্রোজেন থাকলেও উদ্ভিদ সরাসরি তা বাতাস থেকে গ্রহণ করতে পারে না। শিম্বগোত্রীয় উদ্ভিদের (যেমন মটর, চনা) মূলের গুটিতে থাকা Rhizobium ব্যাকটেরিয়া এবং কিছু নীল-সবুজ শৈবাল বায়ুমণ্ডলের মুক্ত নাইট্রোজেনকে দ্রবণীয় নাইট্রোজেন যৌগে রূপান্তর করে মাটিতে সঞ্চয় করে। এই প্রক্রিয়াকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন বলে।

সারসংক্ষেপ

  • অণুজীব হলো অতি ক্ষুদ্র জীব যা খালি চোখে দেখা যায় না; এদের প্রধান চার ধরন হলো ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, প্রোটোজোয়া এবং শৈবাল।
  • ভাইরাস কোষীয় গঠনহীন বিশেষ এক প্রকার অণুজীব যা কেবল পোষকদেহে বংশবৃদ্ধি করে।
  • অণুজীব দই, পাউরুটি, অ্যালকোহল, ওষুধ ও ভ্যাকসিন তৈরিতে এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
  • কিছু অণুজীব ছোঁয়াচে রোগ সৃষ্টি করে মানুষ, পশু ও উদ্ভিদের ক্ষতি করে।
  • পাস্তুরাইজেশন, লবণ, চিনি ও রাসায়নিক পদার্থের সাহায্যে খাদ্য দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব।